লাল ছাতার রহস্য — Part 3 | কালো ডায়েরির গোপন সংকেত | Bireswar Goyenda | Story by Tanmoy Roy | cholo golpo suni
দেবরাজ মল্লিক গ্রেফতার হওয়ার পর কলকাতা শহর যেন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। সংবাদপত্র, টেলিভিশন— সব জায়গাতেই এখন একটাই খবর। আন্তর্জাতিক হীরে পাচার চক্র ধ্বংস হয়েছে।
কিন্তু বীরেশ্বর গোয়েন্দার মনে শান্তি ছিল না।
কারণ তাঁর অভিজ্ঞতা বলছিল— এত বড় নেটওয়ার্কের সবকিছু এত সহজে শেষ হয়ে যেতে পারে না।
সেই রাতেই থানার বড়বাবুর ফোন এল।
— বীরেশ্বরবাবু, একটু থানায় আসতে পারবেন?
— নতুন কিছু হয়েছে?
— খুবই অদ্ভুত একটা ব্যাপার।
বীরেশ্বর সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন।
থানায় পৌঁছে তিনি দেখলেন বড়বাবুর টেবিলের ওপর একটি কালো চামড়ার ডায়েরি রাখা। ডায়েরিটা বেশ পুরনো। কোণাগুলো ছেঁড়া, পাতাগুলো হলদেটে।
বড়বাবু বললেন,
— এটা আজ দেবরাজ মল্লিকের অফিসের সিক্রেট লকার থেকে পাওয়া গেছে।
বীরেশ্বর ডায়েরিটা খুললেন।
ভেতরে বেশিরভাগ পাতাই ফাঁকা। কিন্তু কয়েকটি পাতায় অদ্ভুত কিছু সংকেত লেখা ছিল।
“R-27”
“Night Train”
“Blue Room”
আর সবচেয়ে নিচে বড় অক্ষরে লেখা—
“শেষ চালান এখনও বাকি।”
বীরেশ্বরের চোখ সরু হয়ে এল।
— এর মানে পাচার চক্র পুরোপুরি শেষ হয়নি।
বড়বাবু গম্ভীর গলায় বললেন,
— আমরাও তাই ভাবছি। কিন্তু সমস্যা হল দেবরাজ মুখ খুলছে না।
ঠিক তখনই যতন থানায় ঢুকল।
— স্যার, বাইরে একজন লোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
— কে?
— নাম বলছে না। শুধু বলছে আপনার খুব দরকারি খবর আছে।
বীরেশ্বর বাইরে এসে দেখলেন মাঝবয়সী এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। মুখে দাড়ি, চোখে আতঙ্ক।
লোকটা ফিসফিস করে বলল,
— আপনি যদি অরিন্দম সেনের খুনের আসল সত্য জানতে চান… তাহলে আজ রাত বারোটায় শিয়ালদহ স্টেশনের পুরনো প্ল্যাটফর্মে আসবেন। একা আসবেন।
কথাটা বলেই লোকটা ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
যতন উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
— স্যার, এটা ফাঁদও হতে পারে।
বীরেশ্বর শান্তভাবে বললেন,
— হতে পারে। কিন্তু আমাদের যেতেই হবে।
সেদিন রাত ঠিক বারোটায় বীরেশ্বর আর যতন গোপনে শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছালেন। পুরনো প্ল্যাটফর্মটা প্রায় ফাঁকা। দূরে কয়েকটা লাইট টিমটিম করছে। বাতাসে স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ।
হঠাৎ অন্ধকার থেকে সেই লোকটা বেরিয়ে এল।
সে চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
— দেবরাজ শুধু একজন সদস্য ছিল। আসল মাথা অন্য কেউ।
— কে?
লোকটা উত্তর দেওয়ার আগেই হঠাৎ গুলির শব্দ শোনা গেল।
“ধাম!”
লোকটা বীরেশ্বরের সামনে লুটিয়ে পড়ল।
যতন চিৎকার করে উঠল,
— স্যার! ওকে গুলি করা হয়েছে!
বীরেশ্বর দ্রুত চারদিকে তাকালেন। প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় কালো হুডি পরা একজন লোক দৌড়ে পালাচ্ছে।
বীরেশ্বর তাকে ধাওয়া করলেন।
লোকটা দ্রুত রেললাইনের পাশ দিয়ে দৌড়াচ্ছিল। হঠাৎ একটি মালগাড়ি চলে আসায় বীরেশ্বরের গতি থেমে গেল।
মালগাড়ি সরে যাওয়ার পর দেখা গেল লোকটা অদৃশ্য।
কিন্তু মাটিতে পড়ে আছে একটি ছোট্ট ধাতব চাবি।
চাবির গায়ে খোদাই করা— “B-13”
থানায় ফিরে আহত লোকটাকে হাসপাতালে পাঠানো হল। মৃত্যুর আগে সে শুধু একটা কথাই বলতে পেরেছিল—
— ব্লু রুম… ওখানেই সব প্রমাণ…
পরদিন সকাল থেকে আবার তদন্ত শুরু হল।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরে জানা গেল কলকাতার একটি পুরনো হোটেলে ‘ব্লু রুম’ নামে একটি গোপন কক্ষ রয়েছে। বহু বছর আগে সেটা অবৈধ জুয়ার আড্ডা হিসেবে ব্যবহার হত।
বীরেশ্বর, বড়বাবু আর যতন সেদিন সন্ধ্যায় হোটেলে পৌঁছালেন।
হোটেলটি প্রায় পরিত্যক্ত। দেয়ালের রং উঠে গেছে, করিডোরে মাকড়সার জাল।
ম্যানেজার প্রথমে কিছু বলতে চাইছিল না। কিন্তু পুলিশের চাপের মুখে সে জানাল, বেসমেন্টে একটি পুরনো ঘর আছে যেটাকে আগে ব্লু রুম বলা হত।
তারা নিচে নামতেই ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগল।
ঘরের দরজায় তালা ছিল।
বীরেশ্বর পকেট থেকে B-13 লেখা চাবিটা বের করলেন।
চাবিটা তালায় ঢোকাতেই ‘খট’ করে দরজা খুলে গেল।
ভেতরে অন্ধকার।
টর্চ জ্বালাতেই দেখা গেল ঘরের মাঝখানে একটি বড় টেবিল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে মানচিত্র, বিদেশি পাসপোর্ট আর কিছু ফাইল।
বড়বাবু উত্তেজিত গলায় বললেন,
— এ তো পুরো পাচার চক্রের রেকর্ড!
ঠিক তখনই পিছন থেকে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ঘর অন্ধকারে ডুবে গেল।
একটি ভারী গলা ভেসে এল—
— এতদূর আসা আপনাদের উচিত হয়নি বীরেশ্বরবাবু।
আলো জ্বলে উঠতেই দেখা গেল সামনে দাঁড়িয়ে একজন ভদ্রলোক। নিখুঁত স্যুট, হাতে রিভলভার, ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি।
বীরেশ্বর অবাক হয়ে বললেন,
— আপনি!
লোকটা আর কেউ নয়— শহরের বিখ্যাত শিল্পপতি অমিতাভ রায়। যিনি বহুবার পুলিশের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে এসেছেন।
অমিতাভ ধীরে ধীরে বলল,
— দেবরাজ শুধু আমার হয়ে কাজ করত। আসল ব্যবসা আমি চালাতাম।
যতন রাগে বলল,
— তাহলে অরিন্দমবাবুকে আপনিই খুন করিয়েছেন!
অমিতাভ ঠান্ডা হাসল।
— ও খুব বেশি জেনে গিয়েছিল।
বড়বাবু পিস্তল বের করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু অমিতাভ আগে থেকেই বন্দুক তাক করে রেখেছিল।
— ভুলেও নড়বেন না।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল।
বীরেশ্বর ধীরে ধীরে বললেন,
— আপনি পালাতে পারবেন না। পুরো বিল্ডিং পুলিশ ঘিরে রেখেছে।
অমিতাভ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে হেসে উঠল।
— আপনার সবচেয়ে বড় সমস্যা জানেন? আপনি সবসময় সত্যের খুব কাছে চলে আসেন।
হঠাৎ সে ঘরের লাইট নিভিয়ে দিল।
চারদিকে অন্ধকার। গুলির শব্দ। চিৎকার। ধাক্কাধাক্কি।
কয়েক সেকেন্ড পরে জরুরি আলো জ্বলে উঠতেই দেখা গেল অমিতাভ উধাও।
কিন্তু এবার বীরেশ্বরের মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
যতন অবাক হয়ে বলল,
— স্যার, আপনি হাসছেন কেন?
বীরেশ্বর শান্ত গলায় বললেন,
— কারণ পালানোর সময় সে একটা ভুল করে ফেলেছে।
— কী ভুল?
বীরেশ্বর মেঝে থেকে একটি ছোট্ট সোনালি ব্যাজ তুলে ধরলেন।
ব্যাজে খোদাই করা ছিল একটি চিহ্ন— কালো সাপের ফণা।
বীরেশ্বর বললেন,
— এটাই তাদের গোপন সংগঠনের চিহ্ন। তবে এবার ওদের পালানোর রাস্তা শেষ।
বড়বাবু অবাক হয়ে বললেন,
— মানে?
বীরেশ্বর হালকা হেসে পকেট থেকে একটি ছোট্ট ডিভাইস বের করলেন।
— অমিতাভ যখন ঘরে ঢুকেছিল, তখনই আমি ওর কোটে ট্র্যাকার লাগিয়ে দিয়েছিলাম।
যতনের চোখ বড় হয়ে গেল।
— তাই বলুন! তাহলে এখন আমরা ওকে ধরতে পারব?
— অবশ্যই।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ ট্র্যাকারের সিগন্যাল ধরে কলকাতার উপকণ্ঠে একটি পুরনো ফ্যাক্টরির সামনে পৌঁছে গেল।
ফ্যাক্টরিটা বাইরে থেকে পরিত্যক্ত মনে হলেও ভেতরে আলো জ্বলছিল। চারদিকে সশস্ত্র পাহারা।
বীরেশ্বর নিচু গলায় বললেন,
— এটাই ওদের আসল ঘাঁটি।
বড়বাবু সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলার নির্দেশ দিলেন।
রাত প্রায় তিনটে। হঠাৎ পুলিশের সাইরেন বেজে উঠতেই ফ্যাক্টরির ভেতরে হুলস্থুল পড়ে গেল। পাচারকারীরা পালানোর চেষ্টা করতে লাগল।
কিন্তু এবার পুলিশ পুরো প্রস্তুত ছিল।
একদিকে গুলির লড়াই চলছে, অন্যদিকে পাচারকারীরা গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পালাতে চাইছিল।
বীরেশ্বর আর যতন দ্রুত ফ্যাক্টরির ভেতরে ঢুকে পড়লেন।
ভেতরের বিশাল ঘরে সারি সারি কাঠের বাক্স রাখা। বাক্স খুলতেই দেখা গেল হীরে, বিদেশি মুদ্রা আর নকল পাসপোর্টে ভর্তি।
ঠিক তখনই উপরের অফিসঘর থেকে অমিতাভ রায় বেরিয়ে এল। তার হাতে বন্দুক। মুখে আগের সেই ঠান্ডা হাসি আর নেই। এবার স্পষ্ট আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে।
অমিতাভ চিৎকার করে বলল,
— কেউ সামনে এগোবেন না!
সে যতনকে লক্ষ্য করে বন্দুক তাক করল।
যতন ভয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
অমিতাভ বলল,
— রাস্তা ছেড়ে দিন, না হলে ওকে মেরে ফেলব!
বীরেশ্বর শান্ত গলায় বললেন,
— আপনার খেলা শেষ অমিতাভবাবু। আত্মসমর্পণ করুন।
— কখনো না!
অমিতাভ ট্রিগারে চাপ দিতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই যতন সাহস করে পাশে রাখা একটি লোহার চেইন টেনে ফেলে দিল। উপরের ভারী হুক দুলে এসে অমিতাভের হাতে সজোরে আঘাত করল। বন্দুক মাটিতে পড়ে গেল।
সুযোগ বুঝে বীরেশ্বর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কয়েক সেকেন্ডের ধস্তাধস্তির পর পুলিশ এসে অমিতাভকে গ্রেফতার করল।
সব শেষ হতে তখন ভোর হয়ে গেছে।
ফ্যাক্টরির বাইরে দাঁড়িয়ে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে শহরটাকে আলোকিত করছিল।
বড়বাবু গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন,
— অবশেষে পুরো পাচার চক্র ধরা পড়ল।
পুলিশ উদ্ধার করল কোটি কোটি টাকার হীরে, অবৈধ নথি আর আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
কয়েকদিন পরে আদালতে অমিতাভ রায় এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির রায় ঘোষণা করা হয়। অরিন্দম সেনের হত্যার বিচারও শেষ পর্যন্ত মিলল।
সংবাদপত্রে আবার শিরোনাম হল—
“বীরেশ্বর গোয়েন্দার বুদ্ধিতে ধ্বংস আন্তর্জাতিক হীরে পাচার চক্র।”
কয়েক সপ্তাহ পরে এক শান্ত সন্ধ্যায় বীরেশ্বর নিজের অফিসে বসে চা খাচ্ছিলেন। বাইরে আবার হালকা বৃষ্টি পড়ছে।
যতন জানলার পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বলল,
— স্যার, ভাবতেই অবাক লাগে… একটা সাধারণ লাল ছাতা থেকে এত বড় রহস্য বেরোবে!
বীরেশ্বর মুচকি হেসে বললেন,
— গোয়েন্দাগিরিতে সবচেয়ে সাধারণ জিনিসই অনেক সময় সবচেয়ে বিপজ্জনক রহস্য লুকিয়ে রাখে।
যতন বলল,
— তবে একটা কথা… ওই ছাতাটা আমি জীবনে ভুলব না।
বীরেশ্বর জানলার বাইরে তাকালেন।
বৃষ্টির ফোঁটা ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
আর সেই বৃষ্টির মধ্যেই যেন চিরতরে শেষ হয়ে গেল ‘লাল ছাতার রহস্য’।
সমাপ্ত
................
পাঠকদের উদ্দেশ্যে
আমার গল্পটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
যদি গল্পটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান এবং গল্পটি আপনার বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন।
আপনার প্রতিটি মন্তব্য, পরামর্শ ও উৎসাহ আমাকে আরও ভালো গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।
আবারও ধন্যবাদ।
— তন্ময় রায়

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন