লাল ছাতার রহস্য — Part 2 | হীরে পাচার চক্রের অন্ধকার জাল | Bireswar Goyenda | Story by Tanmoy Roy | cholo golpo suni



পরদিন সকাল।

কলকাতার আকাশে তখনও মেঘের আনাগোনা। কিন্তু বীরেশ্বরের মাথার ভেতরে তার থেকেও ঘন কুয়াশা জমেছিল। লাল ছাতার ভেতর পাওয়া সাতটি হীরে যেন পুরো শহরের এক অন্ধকার দুনিয়ার দরজা খুলে দিয়েছে।


তিনি নিজের অফিসে বসে আগের রাতের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করছিলেন। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিল কিছু ছবি, সংবাদপত্রের কাটিং আর থানার রিপোর্ট।


যে প্রাইভেট ডিটেকটিভ খুন হয়েছিলেন, তাঁর নাম অরিন্দম সেন। তিনি গত কয়েক মাস ধরে কলকাতার এক গোপন হীরে পাচার চক্রের খোঁজ করছিলেন। পুলিশের কাছে কিছু তথ্য পাঠানোর আগেই তাঁকে খুন করা হয়।


বীরেশ্বরের সন্দেহ হচ্ছিল— অরিন্দম হয়তো এমন কিছু জানতে পেরেছিলেন যা পাচার চক্রের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক ছিল।


ঠিক তখনই অফিসে ঢুকল যতন।


লোকটার চোখে এখনও ভয়ের ছাপ। কিন্তু তার ভেতরে একধরনের কৌতূহলও কাজ করছিল।


— স্যার, আজ আমরা কোথায় যাব?


বীরেশ্বর বললেন,


— প্রথমে অরিন্দম সেনের বাড়ি।


তারা ট্যাক্সি নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার এক পুরনো অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছাল। অরিন্দম একাই থাকতেন। পুলিশের অনুমতি নিয়ে বীরেশ্বর তাঁর ঘর পরীক্ষা করতে শুরু করলেন।


ঘরটি অগোছালো ছিল। মনে হচ্ছিল কেউ তন্নতন্ন করে কিছু খুঁজেছে। আলমারি ভাঙা, বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।


কিন্তু বীরেশ্বরের চোখ আটকে গেল টেবিলের ওপর রাখা একটি নোটবুকে।


নোটবুকের শেষ পাতায় কয়েকটি শব্দ লেখা ছিল—


“রেড রেইন… ডক নম্বর ১৭… কালো গুদাম…”


যতন বলল,


— এগুলোর মানে কী স্যার?


বীরেশ্বর বললেন,


— সম্ভবত কোডওয়ার্ড।


ঠিক তখনই তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস খুঁজে পেলেন। টেবিলের নিচে আটকে ছিল একটি ছোট্ট পেনড্রাইভ।


পেনড্রাইভটি নিয়ে তারা দ্রুত থানায় ফিরে এল।


পুলিশের সাইবার টিম সেটি খুলতেই দেখা গেল কয়েকটি ছবি এবং কিছু গোপন নথি রয়েছে।


ছবিগুলোতে দেখা গেল কলকাতার বন্দরের কাছে একটি পরিত্যক্ত গুদামঘর। আর নথিতে কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর নাম।


বড়বাবু অবাক হয়ে বললেন,


— এরা সবাই সমাজে সম্মানিত মানুষ!


বীরেশ্বর ঠান্ডা গলায় বললেন,


— অপরাধীরা সবসময় অপরাধীর মতো দেখতে হয় না।


তদন্তে জানা গেল, পাচার চক্রটি বিদেশ থেকে অবৈধভাবে হীরে এনে কলকাতার মাধ্যমে অন্য দেশে পাঠাত। আর এই পুরো নেটওয়ার্কের মূল মাথা ছিল একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী— দেবরাজ মল্লিক।


দেবরাজ বাইরে থেকে অত্যন্ত ভদ্র এবং সমাজসেবী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আড়ালে সে ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর অপরাধী।


বীরেশ্বর বুঝতে পারলেন, অরিন্দম সেন সম্ভবত দেবরাজের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। তাই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।


সেদিন রাতেই বন্দর এলাকায় নজরদারির পরিকল্পনা করা হল।


বীরেশ্বর, বড়বাবু এবং কয়েকজন সাদা পোশাকের পুলিশ গোপনে ডক নম্বর ১৭-এর আশেপাশে লুকিয়ে রইলেন।


রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে উঠল। দূরে নদীর জল আর জাহাজের সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।


হঠাৎ একটি কালো গাড়ি এসে থামল।


গাড়ি থেকে নেমে এল তিনজন লোক। তাদের একজনকে দেখে বীরেশ্বর সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারলেন।


সে দেবরাজ মল্লিক।


লোকগুলো দ্রুত একটি গুদামের ভেতরে ঢুকে গেল।


বীরেশ্বর ফিসফিস করে বললেন,


— এটাই সুযোগ।


পুলিশ ধীরে ধীরে গুদাম ঘিরে ফেলল।


ভেতরে তখন বড় বড় কাঠের বাক্স খোলা হচ্ছিল। বীরেশ্বর দূর থেকে দেখতে পেলেন বাক্সগুলোর ভেতরে দামি পাথর ভর্তি ছোট ছোট প্যাকেট রয়েছে।


হঠাৎ একজন পাচারকারী পুলিশকে দেখে চিৎকার করে উঠল,


— পুলিশ!


মুহূর্তের মধ্যে গুলির শব্দে এলাকা কেঁপে উঠল।


পুলিশও পাল্টা গুলি চালাতে শুরু করল।


গুদামের ভেতরে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ল। কেউ পালানোর চেষ্টা করছে, কেউ বাক্স লুকোচ্ছে।


দেবরাজ পেছনের দরজা দিয়ে পালাতে যাচ্ছিল। কিন্তু বীরেশ্বর তার পথ আটকে দাঁড়ালেন।


দেবরাজ ঠান্ডা গলায় বলল,


— আপনি ভুল করছেন বীরেশ্বরবাবু। এসবের ফল ভালো হবে না।


বীরেশ্বর বললেন,


— অরিন্দম সেনকেও কি এভাবেই হুমকি দিয়েছিলেন?


দেবরাজের মুখ শক্ত হয়ে গেল।


— আপনি প্রমাণ করতে পারবেন না।


বীরেশ্বর হালকা হাসলেন।


— আপনার বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।


দেবরাজ হঠাৎ পিস্তল বের করল।


কিন্তু ট্রিগার টানার আগেই যতন পিছন থেকে একটি লোহার রড দিয়ে তার হাতে আঘাত করল। পিস্তল মাটিতে পড়ে গেল।


পুলিশ দ্রুত দেবরাজকে গ্রেফতার করল।


কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো পাচার চক্র ধরা পড়ল। গুদাম থেকে কোটি কোটি টাকার হীরে উদ্ধার হল।


পরদিন সমস্ত সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল—


“লাল ছাতার রহস্য ভেদ করে আন্তর্জাতিক হীরে পাচার চক্র ধ্বংস।”


অরিন্দম সেনের মৃত্যুর বিচার মিলল।


আর যতন, যে একজন সাধারণ ট্যাক্সিওয়ালা ছিল, সে অজান্তেই এই বড় অপরাধচক্র ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করল।


কয়েকদিন পরে সন্ধ্যাবেলা বীরেশ্বর অফিসে বসে ছিলেন। বাইরে আবার হালকা বৃষ্টি পড়ছে।


যতন চা নিয়ে এসে বলল,


— স্যার, একটা কথা ভাবছিলাম।


— কী?


— যদি সেদিন ওই লোকটা ছাতাটা আমার ট্যাক্সিতে না ফেলত?


বীরেশ্বর মুচকি হেসে জানলার বাইরে তাকালেন।


— তাহলে হয়তো এই রহস্যের শেষও হতো না।


যতন একটু চুপ করে থেকে বলল,


— তবে একটা কথা মানতেই হবে স্যার… এই লাল ছাতাটা আমার জীবনটাই বদলে দিল।


বীরেশ্বর হেসে বললেন,


— রহস্যের জগতে কখন কোন সাধারণ জিনিস অসাধারণ হয়ে ওঠে, তা কেউ জানে না।


বাইরে তখন বৃষ্টির ফোঁটা ধীরে ধীরে শহরটাকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু বীরেশ্বর জানতেন না— লাল ছাতার রহস্য আসলে এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।




.....continue in Part 3


................

পাঠকদের উদ্দেশ্যে


আমার গল্পটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

যদি গল্পটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান এবং গল্পটি আপনার বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন।

আপনার প্রতিটি মন্তব্য, পরামর্শ ও উৎসাহ আমাকে আরও ভালো গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।

আবারও ধন্যবাদ।


— তন্ময় রায়



✍️ About The Writer

Tanmoy Roy is a Bengali story writer passionate about emotional storytelling, horror, adventure and relationship-based stories.

Follow Him 👇

মন্তব্যসমূহ