খোকা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস | এক মায়ের অপেক্ষা, ব্রিটিশ শাসন ও ভারতের স্বাধীনতার হৃদয়বিদারক ইতিহাস | Story by Tanmoy Roy | Cholo Golpo Suni


১৯৪০ সাল।

তখনও ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়নি। চারদিকে ব্রিটিশ সরকারের কঠোর শাসন। গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনে সুখ বলতে কিছু ছিল না। একদিকে দারিদ্র্য, অন্যদিকে ভয়। দিনের আলোতেও মানুষ নিচু গলায় কথা বলত, আর রাত নামলে চারপাশে নেমে আসত এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতার ভেতরে লুকিয়ে থাকত আতঙ্ক, অজানা ভবিষ্যৎ আর স্বাধীনতার জন্য জমে থাকা রাগ।

বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলো তখনও শহরের খবর পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারত না। কিন্তু বাতাসে একটা পরিবর্তনের গন্ধ ছিল। কোথাও গোপনে আন্দোলন চলছে, কোথাও যুবকেরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে, আবার কোথাও মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে।

এই গল্প সেই সময়ের।

এক কিশোরের গল্প।

এক মায়ের অপেক্ষার গল্প।

আর স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া হাজারো অজানা মানুষের গল্প।

বাংলার এক ছোট্ট গ্রাম—নলডাঙ্গা।

চারদিকে ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়, কাঁচা রাস্তা আর দূরে একটা ছোট নদী। গ্রামের মানুষ খুব সাধারণ জীবন যাপন করত। সকালে মাঠে যাওয়া, দুপুরে গরম রোদে কাজ করা আর সন্ধ্যায় হারিকেনের আলোয় বসে গল্প করা—এই ছিল তাদের পৃথিবী।

এই গ্রামেই বাস করত এক কিশোর—বিনয়।

তার বয়স তখন মাত্র সতেরো। মুখে এখনো শিশুসুলভ সরলতা ছিল, কিন্তু চোখে ছিল বয়সের চেয়ে অনেক বেশি ক্লান্তি। কারণ জীবন তাকে খুব দ্রুত বড় করে দিয়েছিল।

বিনয় যখন মাত্র দুই বছরের শিশু, তখন তার বাবা মারা যান। সেদিনও অন্য দিনের মতো মাঠে কাজ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু আর ফিরে আসেননি। জমির ধারে বিষধর সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হয়।

সেই দিন থেকেই বদলে যায় তাদের জীবন।

বিনয়ের মা একা হয়ে যান। সংসার চালানোর দায়িত্ব পুরোপুরি তার কাঁধে এসে পড়ে। তিনি কখনো অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন, কখনো ধান মাড়াই করতেন, আবার কখনো জমিতে শ্রমিকের কাজ করতেন।

দিন শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরলেও মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করতেন। কারণ তিনি জানতেন—তার কান্না দেখলে ছোট্ট বিনয় আরও ভেঙে পড়বে।

কিন্তু অভাব কি কখনো লুকিয়ে রাখা যায়?

অনেক রাতেই তাদের ঘরে পুরোপুরি খাবার থাকত না। কখনো শুধু ভাত আর লবণ, কখনো শুধু পানি খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তে হতো।

বিনয় ছোট থেকেই এসব দেখেছে।

তাই তার শৈশব অন্য শিশুদের মতো ছিল না। খেলাধুলার বদলে সে দেখেছে মায়ের কষ্ট, ক্ষুধা আর নীরব কান্না।

তবুও মানুষের ভেতরে একসময় একটা স্বপ্ন জন্ম নেয়।

বিনয়েরও হয়েছিল।

সে ভাবত—একদিন সে বড় হবে, টাকা উপার্জন করবে আর তার মাকে এই দুঃখের জীবন থেকে মুক্তি দেবে।

ঠিক সেই সময় গ্রামে এলেন তার এক দূর সম্পর্কের মামা। তিনি কলকাতায় একটি কাপড়ের কারখানায় কাজ করতেন। শহরের গল্প বলতে বলতে তিনি বললেন—

“কলকাতায় কাজের অভাব নেই। পরিশ্রম করলে টাকা রোজগার করা যায়।”

এই কথাগুলো বিনয়ের মনে গেঁথে গেল।

ধীরে ধীরে সে সিদ্ধান্ত নিল—সে কলকাতায় যাবে।

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া সহজ ছিল না।

এক রাতে বিনয় সাহস করে মাকে বলল—

“মা, আমি কলকাতায় যাব।”

মা প্রথমে ভেবেছিলেন ছেলে মজা করছে। কিন্তু যখন বুঝলেন সে সত্যিই যেতে চায়, তখন তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তিনি কাঁপা গলায় বললেন—

“খোকা… শহর খুব নিষ্ঠুর জায়গা। তুই সেখানে একা থাকবি কিভাবে?”

বিনয় চুপ করে রইল।

কারণ তার ভেতরে তখন শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—

“মাকে বাঁচাতে হবে।”

দিনের পর দিন এই নিয়ে কথা চলতে লাগল। মা বারবার আটকানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝলেন—ছেলের সিদ্ধান্ত বদলাবে না।

যাওয়ার আগের রাতে বিনয়ের মা নিজ হাতে রান্না করলেন।

সাধারণ ভাত, ডাল আর একটু আলুভর্তা।

কিন্তু সেই খাবারের ভেতরে ছিল এক মায়ের সবটুকু ভালোবাসা।

খাওয়ার সময় কেউ খুব বেশি কথা বলেনি। শুধু মাঝে মাঝে মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।

রাত গভীর হলে তিনি ধীরে ধীরে বললেন—

“খোকা… তুই গেলে আমি কাকে নিয়ে বাঁচব?”

বিনয় উত্তর দিতে পারল না।

তার বুকটা ভারী হয়ে উঠছিল।

পরদিন ভোরে যখন সে বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল, তখন আকাশে হালকা কুয়াশা ছিল। গ্রামের রাস্তা প্রায় ফাঁকা।

বিনয় গেটের বাইরে পা রাখতেই মা দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।

তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল।

তিনি শুধু বললেন—

“খোকা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস…”

এই একটাই বাক্য যেন বিনয়ের হৃদয়ের গভীরে চিরদিনের জন্য গেঁথে গেল।

কলকাতা তখন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম বড় শহর।

ট্রামের শব্দ, মানুষের ভিড়, পুলিশের টহল আর চারদিকে অস্থিরতা—সবকিছুই বিনয়ের কাছে নতুন লাগছিল।

গ্রামের শান্ত জীবনের সঙ্গে এই শহরের কোনো মিল ছিল না।

প্রথম কয়েকদিন সে খুব ভয় পেত। এত মানুষ, এত শব্দ আর এত ব্যস্ততার মাঝে নিজেকে একদম হারিয়ে ফেলেছিল।

তার মামা তাকে কাপড়ের কারখানায় কাজ দিলেন।

কাজটা ছিল খুব কঠিন।

ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হতো। ভারী বোঝা টানতে গিয়ে হাত কেটে যেত, শরীর ব্যথা করত। কিন্তু বিনয় কখনো অভিযোগ করেনি।

কারণ প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে তার মনে পড়ত মায়ের মুখ।

এক মাস পর সে প্রথম বেতন পেল।

মাত্র পাঁচ টাকা।

কিন্তু সেই টাকার মূল্য তার কাছে ছিল পৃথিবীর সব সুখের চেয়ে বড়।

সে সেই টাকা গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল।

সাথে লিখল একটি চিঠি—

“মা, আমি ভালো আছি। কাজ শিখছি। খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে ফিরব।”

চিঠি হাতে নিয়ে তার মা অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন।

রাতে ঘুমানোর আগে তিনি বারবার সেই চিঠি পড়তেন।

তারপর বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার বাতাস বদলাতে শুরু করল।

চারদিকে স্বাধীনতার আন্দোলনের উত্তেজনা।

যুবকেরা গোপনে সংগঠিত হচ্ছে। কোথাও সভা হচ্ছে, কোথাও ব্রিটিশবিরোধী লিফলেট বিলি হচ্ছে।

রাস্তার মোড়ে মোড়ে ব্রিটিশ পুলিশের টহল বেড়ে গেল।

মানুষ নিচু গলায় “বন্দে মাতরম” বলত।

একদিন বিনয় জানতে পারল—তার মামা শুধু কারখানার শ্রমিক নন, তিনি গোপনে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাহায্য করেন।

কারখানার পেছনের পুরোনো গুদামে লুকিয়ে রাখা হতো গোপন কাগজ, দেশীয় অস্ত্র আর বিপ্লবীদের বার্তা।

প্রথমে বিনয় ভয় পেয়েছিল।

কিন্তু ধীরে ধীরে তার ভয় বদলে গেল দায়িত্বে।

সে বুঝতে পারল—এটা শুধু আন্দোলন নয়, এটা নিজের দেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

সেও জড়িয়ে পড়ল।

দিনে কারখানার শ্রমিক, রাতে স্বাধীনতার সৈনিক।

বিনয়ের কাজ ছিল গোপনে বার্তা পৌঁছে দেওয়া।

কখনো রাতের অন্ধকারে অন্য গ্রামে যাওয়া, কখনো পুলিশের চোখ এড়িয়ে কাগজ লুকিয়ে রাখা।

তার জীবন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল।

সে আর শুধু দরিদ্র গ্রামের ছেলে ছিল না।

সে হয়ে উঠছিল স্বাধীনতার লড়াইয়ের একজন সৈনিক।

একদিন গভীর রাতে দরজায় প্রচণ্ড শব্দ হলো।

মামা দরজা খুলতেই দুইজন আহত যুবক ভেতরে ঢুকে পড়ল।

তাদের শরীর রক্তে ভেজা।

তাড়াতাড়ি তাদের লুকিয়ে ফেলা হলো।

কিছুক্ষণ পর আবার দরজায় ধাক্কা।

এইবার ব্রিটিশ পুলিশ।

ঘরের প্রতিটি কোণ তল্লাশি করা হলো।

বিনয়ের বুক ধড়ফড় করছিল।

কিন্তু ভাগ্যক্রমে কিছু খুঁজে পেল না তারা।

সেদিনের পর বিনয় বুঝে গেল—মৃত্যু এখন তার খুব কাছাকাছি।

কয়েক মাস পর খবর এল—ব্রিটিশ সরকার গোপন আস্তানার খবর পেয়ে গেছে।

সেদিন রাতেই চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হলো গুদামঘর।

চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ আর গুলির শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে উঠল।

ভেতরে ছিল বিনয় আর তার মামা।

তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিল।

গুলির শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল।

একসময় গুলি এসে লাগে তার মামার বুকে।

তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন।

রক্তে ভিজে যাচ্ছিল চারপাশ।

শেষ নিশ্বাসে তিনি শুধু বললেন—

“পালা… দেশের জন্য বাঁচ…”

বিনয়ের চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।

তবুও তাকে পালাতে হলো।

কারণ ধরা পড়লে শুধু তার মৃত্যু নয়, আরও অনেক বিপ্লবীর জীবন বিপদে পড়ে যেত।

সেই রাতেই তার মামা শহীদ হন।

এরপর থেকে বিনয় পলাতক।

ব্রিটিশ সরকার তার নামে ওয়ারেন্ট জারি করল।

যেখানেই দেখা যাবে, সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার।

এক বছরের বেশি সময় সে পালিয়ে পালিয়ে বাঁচল।

কখনো জঙ্গলে, কখনো অন্য গ্রামে, কখনো ছদ্মবেশে শহরে।

প্রতিটি দিন ছিল অনিশ্চিত।

কিন্তু সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল—

মায়ের কাছে ফিরতে না পারা।

মাঝে মাঝে সে দূর থেকে গ্রামের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকত।

মনে হতো দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে।

কিন্তু পারত না।

কারণ সে জানত—পুলিশ তাকে অনুসরণ করছে।

একদিন বিনয় আর থাকতে পারল না।

সে সিদ্ধান্ত নিল—মাকে একবার দেখবেই।

ছদ্মবেশে সে গ্রামের দিকে রওনা দিল।

স্টেশনে নামার পর চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল।

কিন্তু ভাগ্য সেদিন তার পাশে ছিল না।

একজন ব্রিটিশ পুলিশ তাকে চিনে ফেলল।

সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার—

“ওই থামো!”

বিনয় দৌড় দিল।

পিছন থেকে গুলির শব্দ।

মানুষ ছুটোছুটি শুরু করল।

হঠাৎ একটা গুলি এসে লাগে তার পিঠে।

সে মাটিতে পড়ে গেল।

চোখ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছিল।

শেষ মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল তার মায়ের মুখ।

আর কানে বাজতে লাগল সেই পরিচিত কণ্ঠ—

“খোকা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস…”

তারপর সব অন্ধকার হয়ে গেল।

গ্রামে তখনও তার মা প্রতিদিন চিঠি লিখছেন।

একই কথা—

“খোকা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস…”

কিছুদিন পর খবর পৌঁছাল—

বিনয় আর নেই।

মা প্রথমে নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।

তারপর ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন।

তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে তার ছেলে আর ফিরবে না।

তার কাছে বিনয় এখনো বেঁচে আছে।

এখনো কোনো একদিন দরজায় এসে দাঁড়াবে।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলো।

নতুন পতাকা উঠল আকাশে।

চারদিকে আনন্দ, উল্লাস আর বিজয়ের ধ্বনি।

মানুষ রাস্তায় নেমে উদযাপন করল স্বাধীনতা।

কিন্তু নলডাঙ্গা গ্রামের এক কোণে তখনও এক মা বসে আছেন।

হাতে পুরোনো চিঠি।

চোখে শূন্যতা।

আর ঠোঁটে একই বাক্য—

“খোকা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস…”

কারণ কিছু অপেক্ষা কখনো শেষ হয় না।

কিছু ভালোবাসা মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে।

আর স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু যুদ্ধের গল্প নয়—

এটা হাজারো মা, হাজারো পরিবার আর অগণিত অশ্রুর ইতিহাস।


THE END

................

পাঠকদের উদ্দেশ্যে


আমার গল্পটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

যদি গল্পটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান এবং গল্পটি আপনার বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন।

আপনার প্রতিটি মন্তব্য, পরামর্শ ও উৎসাহ আমাকে আরও ভালো গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।

আবারও ধন্যবাদ।


— তন্ময় রায়


✍️ About The Writer

Tanmoy Roy is a Bengali story writer passionate about emotional storytelling, horror, adventure and relationship-based stories.

Follow Him 👇

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ