লাল ছাতার রহস্য — part 1 | রহস্যময় লাল ছাতা | Bireswar Goyenda | Story by Tanmoy Roy | cholo golpo suni
শহরের উত্তর কলকাতার পুরনো একটি তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় নিজের ছোট্ট গোয়েন্দা অফিসে বসে ছিলেন বীরেশ্বর গোয়েন্দা। মাঝারি উচ্চতা, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা, ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি আর অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার জন্য তিনি শহরে বেশ পরিচিত। বড় বড় কেস সমাধান করার পরেও তাঁর স্বভাবের মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। বরং সাধারণ মানুষের সমস্যাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন।
সেদিন সকালে অফিসে বসে তিনি চা খাচ্ছিলেন আর একটি পুরনো ফাইল ঘাঁটছিলেন। জানলার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে টুপটাপ শব্দ হচ্ছিল। ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা বেজে উঠল।
“ট্রিং ট্রিং… ট্রিং ট্রিং…”
বীরেশ্বর ফোনটা তুলে শান্ত গলায় বললেন,
— হ্যালো, কে বলছেন?
ওপাশ থেকে কাঁপা কণ্ঠে ভেসে এল,
— স্যার… আমি যতন বলছি… যতন ট্যাক্সিওয়ালা।
বীরেশ্বর একটু চমকে উঠলেন। যতনকে তিনি চিনতেন। বহুবার বিভিন্ন কাজে লোকটাকে সাহায্য করতে দেখেছেন। ভীষণ সৎ আর পরিশ্রমী মানুষ।
— হ্যাঁ যতন, কী হয়েছে?
— স্যার… আমি খুব বিপদে পড়েছি। আপনার সাহায্য দরকার।
— কী হয়েছে খুলে বলো।
— ফোনে বলা যাবে না স্যার। ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস। আপনি অফিসে আছেন তো?
— আছি। তুমি চলে এসো।
প্রায় এক ঘণ্টা পরে অফিসের সামনে একটি হলুদ ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। বৃষ্টি তখনও পড়ছে। ট্যাক্সি থেকে নেমে ভিজে জামাকাপড় সামলে যতন দ্রুত অফিসের ভেতরে ঢুকল। তার হাতে ছিল একটি লাল রঙের ছাতা।
ছাতাটি অদ্ভুত সুন্দর। চকচকে লাল কাপড়, হাতলে রূপালি নকশা। কিন্তু যতনের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল ছাতাটি তার কাছে সৌন্দর্যের নয়, আতঙ্কের কারণ।
বীরেশ্বর ছাতাটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— বাহ! বেশ সুন্দর ছাতা তো!
যতন গিলে ফেলল শুকনো লালা।
— স্যার, এই ছাতাটার জন্যই আমার জীবন বিপদে পড়েছে।
বীরেশ্বর চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন। এবার তিনি পুরোপুরি মনোযোগ দিলেন।
— ঠিক কী হয়েছে, শুরু থেকে বলো।
যতন গভীর শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করল।
গতকাল সকালে সে প্রতিদিনের মতো ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়েছিল। তখনই এক ভদ্রলোক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাত দেখিয়ে ট্যাক্সি থামান। কালো কোট পরা, মুখে দাড়ি, চোখেমুখে ভয় আর অস্থিরতা। তাঁর হাতে ছিল এই লাল ছাতাটি।
গাড়িতে ওঠার পর থেকেই লোকটা বারবার পিছনে তাকাচ্ছিল। যেন কেউ তাকে অনুসরণ করছে। যতন গন্তব্য জিজ্ঞেস করলে লোকটি বলেছিলেন,
— আগে গাড়ি চালাও। পরে বলছি।
কয়েক মিনিট পর লোকটি হঠাৎ বললেন,
— এখানেই থামাও।
গাড়ি থামতেই তিনি দ্রুত নেমে গেলেন। তারপর আবার ফিরে এসে ছাতাটি যতনের হাতে দিয়ে বললেন,
— কাল ঠিক এই সময় এখানে থাকবে। আমি এসে এটা নিয়ে যাব।
কথাগুলো বলেই লোকটা ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যান।
যতন তখনও বুঝতে পারেনি যে এই ছাতাটি তাকে এক ভয়ংকর খেলায় জড়িয়ে ফেলতে চলেছে।
সারাদিন সে ছাতাটি ট্যাক্সিতেই রেখেছিল। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত ঘটনা শুরু হয়।
বাড়ি ফেরার সময় সে লক্ষ্য করে দু’জন লোক বাইক নিয়ে তাকে অনুসরণ করছে। প্রথমে ব্যাপারটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু বাড়ির কাছ পর্যন্ত লোকগুলো পিছু নেয়।
রাতে প্রায় একটা নাগাদ হঠাৎ ট্যাক্সির কাছে শব্দ শুনে যতনের ঘুম ভাঙে। জানলা দিয়ে সে দেখে একজন লোক টর্চ হাতে তার ট্যাক্সির ভেতর খোঁজাখুঁজি করছে। যতন চিৎকার করতেই লোকটা পালিয়ে যায়।
কিন্তু আসল ভয়টা আসে কিছুক্ষণ পরে।
দরজায় জোরে কিছু আঘাত করার শব্দ হয়। বাইরে গিয়ে যতন দেখতে পায় একটি পাথরে মোড়ানো কাগজ পড়ে আছে। কাগজে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
“লাল ছাতাটা ফেরত দে।”
বীরেশ্বর মন দিয়ে সব শুনছিলেন। তাঁর চোখে এখন রহস্যের ঝিলিক।
— লোকটার মুখ ভালো করে দেখেছিলে?
— না স্যার। অন্ধকার ছিল। আর মুখও ঢাকা ছিল।
— কাগজটা এনেছ?
যতন কাঁপা হাতে পকেট থেকে কাগজ বের করল।
বীরেশ্বর সেটা নিয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন,
— তুমি পুলিশে খবর দাওনি কেন?
— খুব ভয় পেয়েছিলাম স্যার। তারপর আজ সকালে খবরের কাগজে দেখলাম যে সেই ভদ্রলোক খুন হয়েছেন। তখনই আপনার কাছে চলে এলাম।
বীরেশ্বরের চোখ সরু হয়ে এল।
— খুন?
যতন মাথা নাড়ল।
ঘরের ভেতরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ বেড়ে গেল।
বীরেশ্বর সঙ্গে সঙ্গে থানায় ফোন করলেন। থানার বড়বাবুর সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। তিনি পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে জানিয়ে পুলিশ পাঠাতে বললেন।
ফোন রেখে তিনি ছাতাটা হাতে নিলেন। ভালো করে পরীক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে ছাতার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক কিছু বোঝা গেল না।
ঠিক তখনই দরজায় জোরে কড়া নাড়ার শব্দ হল।
“ঠক ঠক ঠক!”
যতনের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
— স্যার… ওরা এসেছে!
বীরেশ্বর শান্ত গলায় বললেন,
— দরজা খোলো।
— কী বলছেন স্যার! লোকগুলো বিপজ্জনক হতে পারে!
— চিন্তা করো না। পুলিশ আসছে। ততক্ষণ ওদের আটকে রাখতে হবে।
যতন কাঁপতে কাঁপতে দরজা খুলল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল চেহারার এক লোক। চোখে নিষ্ঠুরতা, মুখে দাগ, গায়ে কালো জ্যাকেট।
লোকটা ঘরে ঢুকেই গর্জে উঠল,
— ছাতাটা কোথায়?
যতন ভয়ে পিছিয়ে গেল।
বীরেশ্বর শান্তভাবে বললেন,
— কোন ছাতা?
লোকটা এবার কোমর থেকে পিস্তল বের করল।
— নাটক করবেন না। কাল সকালে যে লোকটা এই ট্যাক্সিওয়ালাকে লাল ছাতাটা দিয়েছিল, সেটা কোথায় রেখেছেন বলুন।
বীরেশ্বর বিন্দুমাত্র ভয় পেলেন না। বরং তিনি লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আপনি ভুল করছেন। আমাদের কাছে কোনো লাল ছাতা নেই।
লোকটা চিৎকার করে উঠল,
— তিন গুনব। তারপর গুলি করব!
ঘরের পরিবেশ মুহূর্তে থমথমে হয়ে গেল।
যতনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
লোকটা গুনতে শুরু করল—
— এক…
বীরেশ্বর ধীরে ধীরে টেবিলের পাশে সরে এলেন।
— দুই…
যতন চোখ বন্ধ করে ফেলল।
— তিন!
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা ভেঙে পুলিশ ঢুকে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে গুন্ডাটার হাত থেকে পিস্তল কেড়ে নিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিল।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে লোকটা প্রতিরোধ করার সুযোগই পেল না।
বড়বাবু ঘরে ঢুকে বললেন,
— ভালো কাজ করেছেন বীরেশ্বরবাবু। লোকটাকে আমরা নিয়ে যাচ্ছি।
এরপর বীরেশ্বর, যতন এবং পুলিশ সবাই থানায় গেলেন।
থানার ঘরে বসে বীরেশ্বর আবার ছাতাটি পরীক্ষা করতে লাগলেন। তিনি কাপড়, রড, হাতল— সব খুঁটিয়ে দেখলেন। কিন্তু কিছুই পেলেন না।
বড়বাবু বললেন,
— কী মনে হচ্ছে?
বীরেশ্বর উত্তর দিলেন না। তাঁর চোখ স্থির ছিল ছাতার হাতলের দিকে।
হঠাৎ তিনি হাতলটা ঘোরাতে শুরু করলেন।
একটু পরেই ‘খট’ করে শব্দ হল।
হাতলটা খুলে গেল।
আর তার ভেতর থেকে গড়িয়ে পড়ল সাতটি ছোট ছোট ঝকঝকে পাথর।
যতন বিস্ফারিত চোখে বলল,
— এ আবার কী!
বীরেশ্বর পাথরগুলো হাতে তুলে নিয়ে গভীরভাবে দেখলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
— এগুলো সাধারণ পাথর নয়… এগুলো হীরে।
ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
বড়বাবু অবাক হয়ে বললেন,
— অবিশ্বাস্য!
বীরেশ্বর এবার পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন।
যে ভদ্রলোক খুন হয়েছিলেন তিনি আসলে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। সম্ভবত তিনি একটি আন্তর্জাতিক হীরে পাচার চক্রের সন্ধান পেয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি হীরেগুলো লুকিয়ে দেন এই ছাতার হাতলের মধ্যে।
এবং নিরাপদ ভেবে ছাতাটি যতনের কাছে রেখে যান।
বড়বাবু গভীর গলায় বললেন,
— এর মানে শহরে বড় কোনো পাচার চক্র কাজ করছে।
বীরেশ্বর মাথা নাড়লেন।
— আর এটাই কেবল শুরু।
বড়বাবু বললেন,
— আমরা চাই আপনি এই কেসে পুলিশকে সাহায্য করুন।
বীরেশ্বর হালকা হাসলেন।
— অবশ্যই। কাল থেকেই তদন্ত শুরু করব।
সেদিন থানার বাইরে বেরিয়ে যখন বীরেশ্বর আর যতন রাতের অন্ধকারে হাঁটছিলেন, তখন দু’জনেরই মনে হচ্ছিল— লাল ছাতার রহস্য এখনও শেষ হয়নি। বরং আরও বড় বিপদ তাদের অপেক্ষায় রয়েছে।
......continue in PART 2
................
পাঠকদের উদ্দেশ্যে
আমার গল্পটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
যদি গল্পটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান এবং গল্পটি আপনার বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন।
আপনার প্রতিটি মন্তব্য, পরামর্শ ও উৎসাহ আমাকে আরও ভালো গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।
আবারও ধন্যবাদ।
— তন্ময় রায়

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন