যে স্বপ্নটা মরতে চায়নি - Story by Tanmoy Roy - CHOLO GOLPO SUNI
ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়েছে সবাই। শুধু একটি ঘরে এখনও আলো জ্বলছে। ল্যাপটপের নীলচে আলোয় বসে আছে শুভঙ্কর। সামনে খোলা একটি পুরোনো ওয়েবসাইট।
অনেক বছর আগে নিজের হাতে তৈরি করা ওয়েবসাইট।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর একে একে পুরোনো গল্পগুলো ডিলিট করতে শুরু করল।
একটা।
দুটো।
তিনটে।
গল্পগুলো খুব খারাপ ছিল না। কিন্তু সেগুলো ছিল এমন এক ছেলের লেখা, যে তখনও জীবনের কঠিন বাস্তবতা দেখেনি। যার মাথার ভেতর শুধু স্বপ্ন ছিল।
প্রতিটি গল্প মুছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর হালকা একটা ব্যথা হচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল, যেন নিজেরই একটা অংশকে বিদায় জানাচ্ছে।
কিন্তু সে জানত, কখনও কখনও নতুন করে শুরু করার জন্য পুরোনোকে সরিয়ে ফেলতেই হয়।
মাউসের ওপর হাত রেখে সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল বহু বছর আগের কথা।
একটা ছোট্ট ঘর।
একটা পুরোনো টেলিভিশন।
আর এক কিশোর, যে তখনও জানত না তার জীবন কোন দিকে যেতে চলেছে।
---
শুভঙ্করের জন্ম হয়েছিল একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে।
বাবা চাকরি করতেন।
মা সংসার সামলাতেন।
বাড়িতে অর্থের প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু স্বপ্ন দেখার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না।
মাসের শেষে বাবাকে প্রায়ই হিসাবের খাতা নিয়ে বসতে দেখা যেত।
কোথায় কত খরচ হলো।
কোথায় টাকা বাঁচানো যাবে।
পরের মাসে কীভাবে চলবে।
এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন তিনি।
তবুও যখনই শুভঙ্কর কোনো বই চাইত, বাবা চেষ্টা করতেন সেটি এনে দিতে।
হয়তো নিজের জন্য নতুন শার্ট কেনা পিছিয়ে দিতেন।
কিন্তু ছেলের বই কেনাটা পিছিয়ে দিতেন না।
মাও সবসময় বলতেন,
— যা ভালোবাসিস, সেটা মন দিয়ে কর।
ছোটবেলায় কথাটার অর্থ সে বুঝত না।
কিন্তু বড় হতে হতে বুঝেছিল, এই একটা বাক্যই তার জীবনের অন্যতম বড় শক্তি হয়ে উঠবে।
---
ছোটবেলা থেকেই বইয়ের প্রতি তার অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল।
স্কুল লাইব্রেরির বই।
বন্ধুদের বই।
পুরোনো বইয়ের দোকানের বই।
যা পেত, তাই পড়ত।
গল্পের বই হাতে পেলে সময়ের কথা ভুলে যেত।
বই পড়তে পড়তে সে অন্য জগতে চলে যেত।
একেকটা চরিত্রকে নিজের বন্ধু মনে হতো।
একেকটা গল্প শেষ হলে মনে হতো জীবনের একটা অংশ শেষ হয়ে গেল।
তবে তখনও সে লেখক হওয়ার কথা ভাবেনি।
গল্প পড়তে ভালো লাগত।
ব্যস, এতটুকুই।
কিন্তু একদিন একটা ঘটনা সবকিছু বদলে দিল।
---
সেদিন বিকেলে টেলিভিশনে একটি সিনেমা চলছিল।
শুভঙ্কর খুব মন দিয়ে সিনেমাটা দেখছিল।
সিনেমাটির নাম ছিল 2 States।
গল্পটা ছিল প্রেমের।
কিন্তু সাধারণ প্রেমের গল্প নয়।
দুই ভিন্ন সংস্কৃতি।
দুই ভিন্ন পরিবার।
দুই ভিন্ন পৃথিবী।
আর তাদের এক হওয়ার সংগ্রাম।
সিনেমাটা শেষ হওয়ার পর শুভঙ্কর অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল।
গল্পটা তার খুব ভালো লেগেছিল।
কিন্তু তার চেয়েও বেশি অবাক করেছিল আরেকটি তথ্য।
সে জানতে পারল, সিনেমাটি আসলে একটি উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
উপন্যাসটির লেখক ছিলেন Chetan Bhagat।
শুভঙ্কর বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল।
একজন মানুষ একটা গল্প লিখেছেন।
সেই গল্প বই হয়েছে।
তারপর সেই বই সিনেমা হয়েছে।
আর সেই সিনেমা লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখছে!
সেদিন প্রথমবারের মতো তার মাথায় একটা অদ্ভুত চিন্তা জন্ম নিল।
"গল্প কি এত বড় হতে পারে?"
"একজন লেখক কি এত মানুষের জীবনে পৌঁছে যেতে পারে?"
সেদিন রাতেই সে একটি পুরোনো খাতা বের করেছিল।
আর জীবনের প্রথম গল্প লিখতে বসেছিল।
---
প্রথম গল্পটা খুব একটা ভালো হয়নি।
আজ পড়লে হয়তো সে নিজেই হাসত।
কিন্তু সেটাই ছিল শুরু।
তারপর দ্বিতীয় গল্প।
তৃতীয় গল্প।
চতুর্থ গল্প।
ধীরে ধীরে লেখা তার নেশা হয়ে গেল।
স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগ ছুড়ে রেখে লিখতে বসত।
রাতে ঘুম ভেঙে কোনো আইডিয়া মাথায় এলে খাতা খুলে লিখে রাখত।
কখনও ভূতের গল্প।
কখনও রহস্য।
কখনও প্রেম।
কখনও সম্পূর্ণ কল্পনার জগৎ।
তার ডায়রির পর ডায়রি ভরে উঠতে লাগল।
কিন্তু একটা ব্যাপার ছিল।
সে কাউকে গল্পগুলো দেখাতে সাহস পেত না।
ভয় করত।
যদি সবাই হাসে?
যদি বলে বাজে লিখেছে?
যদি বলে লেখক হওয়া এত সহজ নয়?
তাই গল্পগুলো নিজের কাছেই লুকিয়ে রাখত।
---
নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের ঘোষণা এলো।
ছাত্রদের লেখা জমা দিতে বলা হলো।
বন্ধুরা কবিতা দিল।
কেউ ছবি আঁকল।
কেউ ছোট্ট প্রবন্ধ লিখল।
অনেক দ্বিধা আর ভয়ের পরে শুভঙ্করও একটি গল্প জমা দিল।
গল্প জমা দেওয়ার পর থেকে তার অস্থিরতা শুরু হলো।
সারাক্ষণ মনে হতো—
নির্বাচিত হবে তো?
নাকি হবে না?
প্রকাশের দিন স্কুলে যেন উৎসবের পরিবেশ।
করিডরে ভিড়।
সবাই দেয়াল পত্রিকা দেখছে।
শুভঙ্কর দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ একজন বন্ধু চিৎকার করে উঠল—
— এই শুভঙ্কর! তোর নাম আছে!
সে দৌড়ে গেল।
তারপর দেখল—
সত্যিই।
সেখানে তার নাম।
তার গল্প।
তার লেখা।
সেদিনের সেই মুহূর্তটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হয়ে থাকবে, এটা সে তখন জানত না।
শিক্ষকরা তার প্রশংসা করেছিলেন।
বন্ধুরা গল্পটা পড়ে ভালো বলেছিল।
বাড়ি ফিরে সে বহুবার নিজের নামটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা যেন সে পেয়ে গেছে।
কারণ সেদিন প্রথমবার সে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল—
হয়তো সে সত্যিই লিখতে পারে।
---
তারপর শুরু হলো আরও বড় স্বপ্ন।
সে বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প পাঠাতে শুরু করল।
সংবাদপত্রে ই-মেইল করল।
অনলাইন ম্যাগাজিনে লেখা পাঠাল।
অপেক্ষা করল।
এক সপ্তাহ।
দুই সপ্তাহ।
এক মাস।
দুই মাস।
কিন্তু কোথাও থেকে কোনো উত্তর এল না।
প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো।
প্রতিদিন ই-মেইল চেক করত।
কোনো রিপ্লাই এসেছে কিনা।
কিছুই আসত না।
তবুও সে লেখা ছাড়েনি।
কারণ তার মনে হতো, একদিন না একদিন কেউ না কেউ তার গল্প পড়বেই।
আর সেই আশাটাই তাকে লিখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
---
কিন্তু জীবন সবসময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না।
---
স্কুল শেষ হলো।
কলেজ শুরু হলো।
আর তার সঙ্গে বদলে যেতে শুরু করল শুভঙ্করের জীবন।
----
স্কুল শেষ হলো।
তারপর শুরু হলো কলেজ জীবন।
শুভঙ্কর ভেবেছিল, কলেজে উঠলে হয়তো সে আরও বেশি লিখতে পারবে। আরও বেশি মানুষের সঙ্গে পরিচয় হবে, আরও বেশি অভিজ্ঞতা হবে, আর সেই অভিজ্ঞতাগুলো তার গল্পগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
কিন্তু জীবন সবসময় পরিকল্পনা মেনে চলে না।
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর হঠাৎ করেই তার পৃথিবীটা বদলে গেল।
নতুন বন্ধু।
নতুন পরিবেশ।
নতুন স্বাধীনতা।
স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যেন সে আরেকটি জগতে প্রবেশ করল।
প্রথমদিকে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ডায়রিতে কিছু লাইন লিখত। কখনও নতুন গল্পের আইডিয়া লিখে রাখত।
কিন্তু ধীরে ধীরে জীবনের অন্য ব্যস্ততাগুলো সেই জায়গাটা দখল করতে শুরু করল।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা।
কলেজ ফেস্ট।
ঘুরে বেড়ানো।
নতুন নতুন অভিজ্ঞতা।
সবকিছু মিলিয়ে দিনগুলো দ্রুত কেটে যাচ্ছিল।
তারপর একদিন তার জীবনে এলো প্রেম।
প্রথম প্রেম।
যে বয়সে মানুষ ভবিষ্যতের চেয়ে বর্তমানটাকে বেশি উপভোগ করে, সেই বয়সেই শুভঙ্করও ডুবে গেল নতুন এক অনুভূতির জগতে।
ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা।
রাত জেগে মেসেজ।
একসঙ্গে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা।
জীবন তখন গল্পের চেয়েও সুন্দর মনে হতো।
আর ঠিক সেই কারণেই হয়তো গল্পগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করল।
একসময় সে খেয়াল করল, অনেকদিন হলো সে নতুন কোনো গল্প লেখেনি।
ডায়রিটা আলমারির এক কোণে পড়ে আছে।
কলমের কালি শুকিয়ে গেছে।
মাথায় আর নতুন কোনো প্লট আসে না।
আগে বাসে বসে থাকলে গল্প ভাবত।
এখন বাসে বসে থাকলে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করে।
আগে ঘুমানোর আগে গল্প লিখত।
এখন ঘুমানোর আগে ফোনে কথা বলে।
পরিবর্তনটা এত ধীরে ধীরে এসেছিল যে সে নিজেও বুঝতে পারেনি কখন লেখালেখি তার জীবন থেকে সরে গেছে।
কলেজ শেষ হতে না হতেই বাস্তব জীবন সামনে এসে দাঁড়াল।
চাকরি।
দায়িত্ব।
সংসারের হিসাব।
ভবিষ্যতের চিন্তা।
একসময় যে ছেলেটা লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখত, সে এখন অফিসের ডেডলাইন নিয়ে ব্যস্ত।
সকালে অফিস।
সারাদিন কাজ।
সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফেরা।
তারপর আবার পরের দিনের প্রস্তুতি।
দিনগুলো যেন একই ছকে চলতে লাগল।
কখনও কখনও গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যেত।
সে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকত।
মনে হতো, জীবনে যেন কিছু একটা নেই।
কিছু একটা হারিয়ে গেছে।
কিন্তু ঠিক কী হারিয়েছে, সেটা সে বুঝতে পারত না।
তবুও লেখালেখির সঙ্গে তার সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
ভেতরে ভেতরে কোথাও একটা আগুন এখনও জ্বলছিল।
সেই সময়ই একদিন তার মাথায় একটা নতুন চিন্তা এল।
যেহেতু সে গল্প লিখতে পারছে না, তাহলে পুরোনো গল্পগুলো অন্যভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় না?
সেখান থেকেই শুরু।
সে নিজের লেখা গল্পগুলোকে অডিও স্টোরির আকারে তৈরি করতে শুরু করল।
ইউটিউবে একটি ছোট চ্যানেল খুলল।
প্রথমে খুব বেশি মানুষ শুনত না।
দশজন।
বিশজন।
পঞ্চাশজন।
কিন্তু তাতেও তার ভালো লাগত।
কারণ বহুদিন পর আবার সে গল্পের জগতের কাছাকাছি ফিরতে পেরেছিল।
অফিস থেকে ফিরে কখনও নিজের গল্প রেকর্ড করত।
কখনও এডিট করত।
কখনও নতুন থাম্বনেইল বানাত।
যদিও তখনও সে নতুন গল্প লিখছিল না, তবুও মনে হতো লেখক সত্তাটা পুরোপুরি মারা যায়নি।
শুধু ঘুমিয়ে আছে।
এরই মধ্যে একদিন অফিসে একটি ঘটনা ঘটল।
ঘটনাটা এত সাধারণ ছিল যে সেদিন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, সেটাই শুভঙ্করের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠবে।
সেদিন তাদের টিমে অন্য একটি শাখা থেকে একজন সিনিয়র ম্যানেজার এসেছিলেন।
একসঙ্গে কাজ করার সময় আড্ডা চলছিল।
শুভঙ্করের এক সহকর্মী তখন জাপান ভ্রমণ করে ফিরেছে।
সে নিজের ফেসবুক ব্লগ দেখাচ্ছিল।
জাপানের রাস্তা।
ট্রেন।
খাবার।
মন্দির।
ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।
সবকিছু সুন্দর করে সাজানো ছিল।
সিনিয়র ম্যানেজার বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখলেন।
তারপর হঠাৎ শুভঙ্করের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তুমি তো কাজের সূত্রে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়াও। তুমি এরকম কিছু করো না কেন?
শুভঙ্কর একটু অবাক হলো।
— মানে?
— মানে ব্লগ, লেখালেখি, ট্রাভেল জার্নাল, কিছু একটা। অফিসের বাইরেও একটা সৃজনশীল কাজ থাকা ভালো। এতে মনও ফ্রেশ থাকে।
কথাটা শুনে শুভঙ্কর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর হালকা হেসে বলল,
— আসলে একসময় লিখতাম।
— লিখতে?
— গল্প।
ম্যানেজার আগ্রহ নিয়ে তাকালেন।
— সত্যি? তারপর?
অনেকদিন পর প্রথমবারের মতো শুভঙ্কর নিজের পুরোনো গল্প বলতে শুরু করল।
স্কুল ম্যাগাজিনে গল্প প্রকাশ হওয়ার কথা।
ডায়রির পর ডায়রি ভরে ফেলার কথা।
পত্রিকায় লেখা পাঠানোর কথা।
লেখক হওয়ার স্বপ্নের কথা।
তারপর কলেজ।
তারপর হারিয়ে যাওয়া।
আর মাঝখানে নিজের গল্প নিয়ে ইউটিউবে অডিও স্টোরি বানানোর কথা।
সব শুনে ম্যানেজার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
— তাহলে আবার শুরু করো।
শুভঙ্কর হেসে বলল,
— এত সহজ নাকি?
ম্যানেজারও হেসে ফেললেন।
— শুরু করাটাই সবচেয়ে কঠিন। বাকিটা পরে হয়।
কথাটা খুব সাধারণ ছিল।
হয়তো অন্য কেউ হলে গুরুত্বই দিত না।
কিন্তু শুভঙ্করের মনে কথাটা কোথাও গিয়ে আটকে গেল।
"তাহলে আবার শুরু করো।"
অফিস থেকে ফেরার পরও কথাটা তার মাথায় ঘুরতে লাগল।
পরের দিনও।
তার পরের দিনও।
এক রাতে ঘুম আসছিল না।
হঠাৎ সে আলমারির ভেতর হাত ঢুকিয়ে পুরোনো একটা ডায়রি বের করল।
ধুলো জমে গেছে।
পাতাগুলো হলদেটে হয়ে গেছে।
অনেক লেখা ফিকে হয়ে গেছে।
তবুও যখন সে পড়তে শুরু করল, তখন মনে হলো বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া একজন বন্ধুর সঙ্গে আবার দেখা হয়েছে।
প্রতিটি পাতায় ছিল তার অতীত।
তার স্বপ্ন।
তার কল্পনা।
তার অসমাপ্ত গল্প।
সেই রাতে বহু বছর পর আবার তার মাথায় একটি নতুন গল্পের প্লট এল।
ছোট্ট একটা আইডিয়া।
কিন্তু সেটাই যথেষ্ট ছিল।
কারণ সে বুঝতে পারল, ভেতরের লেখকটা এখনও বেঁচে আছে।
সে হারিয়ে যায়নি।
শুধু অপেক্ষা করছিল।
সঠিক সময়ের জন্য।
আর হয়তো সেই সময়টা অবশেষে এসে গেছে।
---
সেই রাতটার পর থেকে শুভঙ্করের ভেতরে যেন কিছু একটা বদলে যেতে শুরু করল।
সিনিয়র ম্যানেজারের কথাগুলো বারবার তার মাথায় ঘুরছিল।
"তাহলে আবার শুরু করো।"
কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু অনেক সময় মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার জন্য বড় বড় বক্তৃতার প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও কয়েকটি সাধারণ শব্দই যথেষ্ট।
পরের কয়েক সপ্তাহ ধরে শুভঙ্কর সুযোগ পেলেই পুরোনো ডায়রিগুলো পড়ত।
কখনও গভীর রাতে।
কখনও ছুটির দিনে।
কখনও অফিস থেকে ফিরে।
সে অবাক হয়ে দেখল, এত বছর পরেও সেই গল্পগুলোর অনেক চরিত্র তার মনে আছে।
অনেক অসমাপ্ত গল্প এখনও যেন শেষ হওয়ার অপেক্ষায় বসে আছে।
তাদের লেখক ফিরে আসার অপেক্ষায়।
এর কিছুদিন পর কাজের প্রয়োজনে শুভঙ্কর একটি নতুন ল্যাপটপ কিনল।
প্রথমদিকে ল্যাপটপটা শুধুই অফিসের কাজের জন্য ব্যবহার করত।
কিন্তু একদিন হঠাৎ পুরোনো ই-মেইল ঘাঁটতে গিয়ে সে এমন একটি জিনিস খুঁজে পেল, যেটা সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।
তার বহু বছরের পুরোনো ওয়েবসাইট।
কলেজ জীবনের শুরুর দিকে তৈরি করা সেই ওয়েবসাইট।
একসময় যেখানে সে নিজের লেখা গল্প প্রকাশ করত।
অনেক কষ্টে পাসওয়ার্ড উদ্ধার করে সে লগইন করল।
তারপর একে একে পুরোনো লেখাগুলো পড়তে শুরু করল।
কিছু লেখায় হাসি পেল।
কিছু লেখায় লজ্জা লাগল।
কিছু লেখায় আবার নিজের পুরোনো স্বপ্নের গন্ধ পেল।
সেই রাতেই সে একটা সিদ্ধান্ত নিল।
নতুন করে শুরু করবে।
একেবারে শুরু থেকে।
পরের কয়েকদিন ধরে সে পুরোনো ওয়েবসাইটের সমস্ত লেখা পড়ল।
অনেক গল্প মুছে দিল।
কিছু গল্প রেখে দিল স্মৃতি হিসেবে।
তারপর আলমারি থেকে বের করল সেই পুরোনো ডায়রিগুলো।
যেগুলো একসময় তার পৃথিবী ছিল।
সেখানে থাকা গল্পগুলো নতুন করে লিখতে শুরু করল।
কোথাও ভাষা পাল্টাল।
কোথাও চরিত্র বদলাল।
কোথাও সমাপ্তি নতুন করে তৈরি করল।
এবার আর সে নবম শ্রেণির সেই কিশোর নয়।
এবার সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ।
জীবন তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।
সেই অভিজ্ঞতাগুলো গল্পগুলোর ভেতরও ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে লাগল।
কয়েক সপ্তাহ পর প্রথম গল্পটি আবার প্রকাশ করল সে।
বাংলায়।
নিজের ওয়েবসাইটে।
তারপর দ্বিতীয়টি।
তারপর তৃতীয়টি।
প্রথমদিকে খুব বেশি পাঠক ছিল না।
কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু মানুষ আসতে শুরু করল।
কেউ গল্প পড়ে মন্তব্য করল।
কেউ বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করল।
কেউ আবার ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়ে বলল,
— গল্পটা খুব ভালো লেগেছে।
এই ছোট ছোট প্রতিক্রিয়াগুলোই শুভঙ্করকে আবার সেই পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিল।
স্কুল ম্যাগাজিনে প্রথম গল্প প্রকাশ হওয়ার দিন।
শিক্ষকদের প্রশংসা।
বন্ধুদের উৎসাহ।
মনে হচ্ছিল, সে যেন আবার নিজের হারিয়ে যাওয়া পথটা খুঁজে পেয়েছে।
দিন যেতে লাগল।
গল্প বাড়তে লাগল।
পাঠক বাড়তে লাগল।
আর সেই সঙ্গে বাড়তে লাগল শুভঙ্করের আত্মবিশ্বাস।
ঠিক তখনই একদিন সে জানতে পারল Amazon KDP সম্পর্কে।
Kindle Direct Publishing।
একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে একজন লেখক নিজের বই নিজেই প্রকাশ করতে পারে।
প্রকাশকের দরজায় দরজায় ঘুরতে হয় না।
মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় না।
নিজের বই নিজেই পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা যায়।
কথাটা শুনেই শুভঙ্করের বুকের ভেতর পুরোনো একটা স্বপ্ন আবার নড়েচড়ে উঠল।
সে ভাবল,
"যদি আমিও পারি?"
পরের দিন থেকেই শুরু হলো নতুন যুদ্ধ।
সে নিজের গল্পগুলোকে বইয়ের আকারে সাজাতে শুরু করল।
কিন্তু খুব দ্রুতই সে একটি সমস্যার মুখোমুখি হলো।
বাংলা ফন্ট।
প্রথমে ভাবল সহজ হবে।
কিন্তু যত এগোতে লাগল, তত সমস্যা বাড়তে লাগল।
কোথাও যুক্তাক্ষর ভেঙে যাচ্ছে।
কোথাও ফরম্যাট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কোথাও শব্দের বিন্যাস এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
একদিন।
দুইদিন।
তিনদিন।
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন অফিসের পর সে ল্যাপটপের সামনে বসে থাকত।
নতুন নতুন সমাধান খুঁজত।
ভিডিও দেখত।
আর্টিকেল পড়ত।
বিভিন্ন উপায় চেষ্টা করত।
কিন্তু প্রতিবারই নতুন কোনো সমস্যা সামনে এসে দাঁড়াত।
এক রাতে সে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
ল্যাপটপ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল।
মনে হচ্ছিল, এতদূর এসেও হয়তো সে পারবে না।
হয়তো তার স্বপ্ন আবার থেমে যাবে।
ঠিক তখনই তার মাথায় একটি নতুন চিন্তা এল।
বাংলা গল্প।
কিন্তু ইংরেজি ভাষা।
কেন নয়?
চিন্তাটা প্রথমে অসম্ভব মনে হয়েছিল।
কারণ সে গল্পগুলো লিখেছিল বাংলায়।
চরিত্রগুলো বাংলা ভাষায় কথা বলত।
তাদের আবেগও বাংলা ভাষাতেই জন্ম নিয়েছিল।
কিন্তু একটু ভেবে দেখল, ভাষা বদলালেই তো গল্প বদলে যায় না।
অনুভূতি একই থাকে।
স্বপ্ন একই থাকে।
মানুষ একই থাকে।
শুধু ভাষাটা বদলে যায়।
সেই রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিল।
তার ওয়েবসাইটে গল্পগুলো বাংলাতেই থাকবে।
কারণ সেটাই তার শিকড়।
সেটাই তার হৃদয়ের ভাষা।
আর Amazon KDP-র জন্য সে গল্পগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করবে।
শুরু হলো আরেকটি দীর্ঘ যাত্রা।
দিনে অফিস।
রাতে অনুবাদ।
একটি একটি করে গল্প নতুন ভাষায় জন্ম নিতে লাগল।
কখনও একটি অনুচ্ছেদ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত।
কারণ সে শুধু শব্দ অনুবাদ করতে চাইছিল না।
সে অনুভূতি অনুবাদ করতে চাইছিল।
যে আবেগ একজন বাংলা পাঠক অনুভব করবে, সেই একই আবেগ যেন একজন ইংরেজি পাঠকও অনুভব করতে পারে।
কাজটা সহজ ছিল না।
কিন্তু এবার শুভঙ্কর থামেনি।
কারণ এবার সে বুঝেছিল, স্বপ্নের পথে বাধা আসবেই।
বাধা মানেই শেষ নয়।
অনেক সময় বাধা মানেই নতুন রাস্তা খুঁজে নেওয়া।
মাসের পর মাস পরিশ্রমের পর অবশেষে সেই দিনটা এল।
তার প্রথম দুটি বই প্রস্তুত।
সবকিছু যাচাই করা হয়েছে।
কভার তৈরি হয়েছে।
ম্যানুস্ক্রিপ্ট আপলোড হয়েছে।
বাকি শুধু একটি ক্লিক।
শুভঙ্করের হাত কাঁপছিল।
অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছিল।
এক মুহূর্তের জন্য সে চোখ বন্ধ করল।
তারপর Publish বাটনে ক্লিক করল।
কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে একটি বার্তা ভেসে উঠল।
"Your Book Is Under Review."
মাত্র চারটি শব্দ।
কিন্তু শুভঙ্করের কাছে মনে হলো, এই চারটি শব্দের পেছনে লুকিয়ে আছে তার পুরো জীবনের একটি অধ্যায়।
সেদিন রাতে সে ছাদে উঠে গেল।
আকাশ পরিষ্কার।
তারায় ভরা রাত।
শীতল বাতাস বইছে।
অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে।
তারপর একে একে মনে পড়তে লাগল সবকিছু।
মনে পড়ল সেই ছোট্ট ঘর।
পুরোনো টেলিভিশন।
Two States সিনেমা।
মনে পড়ল প্রথম ডায়রির কথা।
প্রথম গল্পের কথা।
স্কুল ম্যাগাজিনে নিজের নাম দেখার কথা।
মনে পড়ল প্রত্যাখ্যান।
মনে পড়ল কলেজ জীবন।
প্রেম।
হারিয়ে যাওয়া বছরগুলো।
মনে পড়ল ইউটিউবে অডিও স্টোরি বানানোর দিনগুলো।
মনে পড়ল সেই সহকর্মীর জাপান ভ্রমণের ব্লগ।
আর মনে পড়ল সেই সিনিয়র ম্যানেজারের কথা।
"তাহলে আবার শুরু করো।"
হয়তো সেই কথাটাই তার জীবনকে আবার ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
আকাশের দিকে তাকিয়ে শুভঙ্কর হালকা হাসল।
হয়তো সে এখনও বিখ্যাত লেখক নয়।
হয়তো তার বই এখনও হাজার হাজার মানুষ পড়েনি।
হয়তো সামনে আরও অনেক ব্যর্থতা অপেক্ষা করছে।
কিন্তু একটা বিষয় সে নিশ্চিত জানত।
সে আবার লিখছে।
আবার স্বপ্ন দেখছে।
আর একজন স্বপ্নবাজ মানুষের কাছে এর চেয়ে বড় জয় আর কিছু হতে পারে না।
কারণ স্বপ্ন কখনও মরে না।
কখনও কখনও তারা শুধু ঘুমিয়ে পড়ে।
আর একদিন, ঠিক সময় এলে, তারা আবার জেগে ওঠে।
শুভঙ্করের স্বপ্নও জেগে উঠেছিল।
আর সেই জেগে ওঠার মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়েছিল তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প।
................
পাঠকদের উদ্দেশ্যে
আমার গল্পটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
যদি গল্পটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান এবং গল্পটি আপনার বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন।
আপনার প্রতিটি মন্তব্য, পরামর্শ ও উৎসাহ আমাকে আরও ভালো গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।
আবারও ধন্যবাদ।
— তন্ময় রায়

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন