একবারে কিছু হয় না...? By TANMOY ROY | CHOLO GOLPO SUNI
"একবারে কিছু হয় না।"
জীবনে এমন কিছু কথা আছে, যেগুলো প্রথমবার শুনতে খুব সাধারণ লাগে। এতটাই সাধারণ যে আমরা সেগুলো নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবিও না। অথচ সেই কথাগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে এমন এক অন্ধকার, যেখান থেকে ফিরে আসতে অনেকেই পারে না।
অর্ণব তখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ে।
আগরতলার একটি সাধারণ স্কুলের ছাত্র।
মেধাবী, ভদ্র আর শান্ত স্বভাবের ছেলে হিসেবে পুরো স্কুলে তার আলাদা পরিচয় ছিল। শিক্ষকরা তাকে উদাহরণ হিসেবে দেখাতেন। ক্লাসে কোনো প্রশ্ন করলে বেশিরভাগ সময় উত্তরটা অর্ণবই দিত।
কিন্তু শুধু পড়াশোনায় নয়, খেলাধুলাতেও সে ছিল সমান দক্ষ।
বিশেষ করে ক্রিকেট।
স্কুলের ক্রিকেট টিমে ওপেনিং ব্যাটসম্যান ছিল সে।
সেদিন বিকেলেও স্কুল মাঠে খেলা চলছিল।
শেষ ওভারে জিততে হলে ছয় রান দরকার।
সবাই উত্তেজিত।
বোলার দৌড়ে এলো।
বল ছুঁড়ল।
অর্ণব ব্যাট ঘুরালো।
বলটা সোজা উড়ে গিয়ে মাঠের বাইরে পড়ল।
ছক্কা।
মাঠ জুড়ে চিৎকার শুরু হয়ে গেল।
বন্ধুরা দৌড়ে এসে তাকে কাঁধে তুলে নিল।
রাহুল হেসে বলল,
— "ভাই, তুই একদিন ইন্ডিয়ার হয়ে খেলবি।"
অর্ণব হাসল।
— "আমি ডাক্তার হব। ক্রিকেট শুধু ভালোবাসি।"
সবাই হেসে উঠল।
সেই হাসির মধ্যে ভবিষ্যতের কত স্বপ্ন ছিল।
কেউ জানত না কয়েক মাস পর সবকিছু বদলে যাবে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে অর্ণব হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসল।
তাদের সংসার খুব বড় ছিল না।
মা, অর্ণব আর তার ছোট বোন মেঘলা।
বাবা মারা গিয়েছিলেন অনেক বছর আগে।
মা একটি সেলাই সেন্টারে কাজ করতেন।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করতেন শুধুমাত্র সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য।
অর্ণব যখন পড়ছিল, মা এক কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
— "খুব ক্লান্ত?"
— "না মা।"
— "আজ খেলা কেমন হলো?"
— "জিতেছি।"
মা হেসে ফেললেন।
— "তুই তো সবকিছুতেই জিতিস।"
দেয়ালের দিকে তাকিয়ে অর্ণব দেখল ডাক্তারদের একটি পোস্টার।
ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার।
মানুষের সেবা করার।
মা পোস্টারটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "একদিন তোর ছবিও এমনই কোথাও থাকবে।"
অর্ণব কিছু বলল না।
শুধু হাসল।
রাতের খাবার খাওয়ার সময় মেঘলা স্কুলের গল্প করছিল।
মেয়েটার বয়স মাত্র তেরো।
কিন্তু দাদার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল সীমাহীন।
— "দাদা, আজ স্কুলে সবাইকে বলেছি আমার দাদা একদিন ডাক্তার হবে।"
অর্ণব হেসে বলল,
— "আগে হতে তো দে।"
— "তুই হবিই।"
মেঘলার চোখে বিশ্বাস ছিল।
অদ্ভুত এক বিশ্বাস।
যে বিশ্বাস শুধু ছোট ভাইবোনেরাই রাখতে পারে।
কয়েক সপ্তাহ পরে।
স্কুল ছুটি হয়েছে।
অর্ণব গেট দিয়ে বেরোচ্ছিল।
হঠাৎ কয়েকজন বড় ছেলে তাকে ডাকল।
— "এই ভাই!"
অর্ণব ফিরে তাকাল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে রকি।
এলাকার পরিচিত ছেলে।
কলেজে পড়ে।
সবসময় স্টাইলিশ পোশাক পরে।
চারপাশে অনেক বন্ধু থাকে।
তার মধ্যে একটা আলাদা আত্মবিশ্বাস ছিল।
যেটা সহজেই মানুষকে আকর্ষণ করে।
— "তুই অর্ণব?"
— "হ্যাঁ।"
— "ক্রিকেট খেলিস?"
— "হ্যাঁ।"
— "ভালো খেলিস।"
অর্ণব একটু অবাক হলো।
রকি হাসল।
— "চল, একদিন আড্ডা দিবি।"
অর্ণব ভদ্রতার খাতিরে মাথা নাড়ল।
তার কাছে ব্যাপারটা খুব সাধারণ মনে হয়েছিল।
প্রথম দিন তারা শুধু চা খেল।
গল্প করল।
হাসাহাসি করল।
দ্বিতীয় দিনও তাই।
তৃতীয় দিনও।
ধীরে ধীরে অর্ণব তাদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠল।
রকিরা বয়সে বড় ছিল।
তাদের গল্পগুলোও আলাদা ছিল।
কলেজ জীবন, বাইক, প্রেম, ঘোরাঘুরি।
সবকিছুই অর্ণবের কাছে নতুন আর আকর্ষণীয় লাগছিল।
একদিন সন্ধ্যায় তারা একটি বাড়ির ছাদে বসেছিল।
আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছে।
চারদিকে কমলা আলো।
গল্প চলছিল।
হঠাৎ রকি পকেট থেকে সিগারেট বের করল।
আগুন জ্বালালো।
ধোঁয়া ছাড়ল।
অর্ণব একটু অস্বস্তি অনুভব করল।
সে এসব থেকে সবসময় দূরে থেকেছে।
রকি তার দিকে তাকাল।
তারপর সিগারেটটা বাড়িয়ে দিল।
— "নে।"
অর্ণব মাথা নাড়ল।
— "না ভাই।"
— "কেন?"
— "খাই না।"
রকি হেসে ফেলল।
পাশে বসা ছেলেরাও হাসল।
— "ভয় পাচ্ছিস?"
— "না।"
— "তাহলে?"
— "ইচ্ছা করছে না।"
রকি এবার একটু সামনে ঝুঁকে এল।
তারপর সেই কথাটা বলল।
যে কথাটা হাজার হাজার ছেলেমেয়ে জীবনের কোনো না কোনো সময় শুনেছে।
— "আরে, একবারে কিছু হয় না।"
অন্যরা সঙ্গে সঙ্গে সায় দিল।
— "হ্যাঁ ভাই।"
— "একটা টান দে।"
— "সবাই তো খায়।"
অর্ণব চুপ করে রইল।
তার ভেতরে একটা যুদ্ধ চলছিল।
একদিকে নিজের মূল্যবোধ।
অন্যদিকে বন্ধুদের সামনে দুর্বল না দেখানোর ইচ্ছা।
কয়েক সেকেন্ড।
শুধু কয়েক সেকেন্ড।
তারপর সে হাত বাড়াল।
সিগারেটটা নিল।
একটা টান দিল।
পরক্ষণেই কাশতে শুরু করল।
চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।
রকিও হাসছিল।
অর্ণবও হাসল।
তার মনে হলো সত্যিই তো...
একবারে কিছু হয় না।
কিন্তু সেদিন সে জানত না—
তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা ঠিক এই মুহূর্তেই শুরু হয়েছে।
----------
সেদিন ছাদ থেকে বাড়ি ফেরার সময় অর্ণবের মনে কোনো অপরাধবোধ ছিল না।
বরং সে নিজেই নিজের ওপর একটু হাসছিল।
এতদিন যে জিনিসটাকে সে ভয় পেত, সেটা করে ফেলেছে।
কই, কিছু তো হলো না!
শরীর ঠিক আছে।
মাথা ঠিক আছে।
সবকিছু স্বাভাবিক।
রকির কথাই ঠিক ছিল।
"একবারে কিছু হয় না।"
কিন্তু মানুষ বুঝতে পারে না, বিপদটা প্রথমবারে হয় না।
বিপদটা শুরু হয় যখন দ্বিতীয়বারের জন্য মন রাজি হয়ে যায়।
পরের সপ্তাহে আবার আড্ডা।
আবার ছাদ।
আবার সিগারেট।
এবার আর রকি জোর করল না।
অর্ণব নিজেই হাত বাড়িয়ে নিল।
সেদিনও কিছু হলো না।
তৃতীয়বারও হলো না।
চতুর্থবারও না।
কিন্তু ধীরে ধীরে একটা জিনিস বদলাতে শুরু করল।
অর্ণবের অভ্যাস।
যে ছেলে প্রতিদিন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরত, সে এখন প্রায়ই বাইরে থেকে দেরি করে ফিরতে লাগল।
যে ছেলে পড়ার টেবিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত, সে এখন বই খুলে মোবাইল দেখতে শুরু করল।
যে ছেলে সকালে উঠে দৌড়াতে যেত, সে এখন দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে।
পরিবর্তনগুলো ছোট ছিল।
এত ছোট যে কেউ প্রথমে খেয়াল করেনি।
মা অবশ্য কিছু একটা টের পাচ্ছিলেন।
এক রাতে খাওয়ার সময় তিনি বললেন,
— "তুই আজকাল এত দেরি করে বাড়ি ফিরিস কেন?"
— "বন্ধুদের সঙ্গে ছিলাম।"
— "কোন বন্ধু?"
— "স্কুলের।"
মিথ্যা বলার সময় অর্ণব চোখ তুলতে পারল না।
মা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর আর কিছু বললেন না।
কিন্তু একজন মা অনেক সময় এমন কিছু বুঝে ফেলেন, যা অন্য কেউ পারে না।
এরপর শুরু হলো আরেক ধাপ।
একদিন রকি তাকে একটি ছোট প্যাকেট দেখাল।
অর্ণব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "এটা কী?"
রকি হাসল।
— "রিল্যাক্স করার জিনিস।"
— "নেশা?"
— "আরে না। অত সিরিয়াস কিছু না।"
অর্ণব অস্বস্তি অনুভব করল।
— "আমি এসব করব না।"
রকি হেসে বলল,
— "সিগারেট খাওয়ার সময়ও তো এমন বলেছিলি।"
সবাই হাসল।
অর্ণব চুপ করে গেল।
সেদিন সে না বলেছিল।
কিন্তু এরপরও বিষয়টা বারবার সামনে আসতে লাগল।
প্রতিবার একই কথা।
— "একবার ট্রাই কর।"
— "কিছু হবে না।"
— "সবাই করে।"
— "তুই এত ভয় পাচ্ছিস কেন?"
ধীরে ধীরে অর্ণবের মনে সন্দেহ তৈরি হলো।
হয়তো সত্যিই কিছু হয় না।
হয়তো সে অযথাই ভয় পাচ্ছে।
এক বিকেলে সে হার মেনে গেল।
শুধু একবার।
শুধু পরীক্ষা করার জন্য।
শুধু কৌতূহল থেকে।
নিজেকে সে এভাবেই বোঝাল।
কিন্তু সেই "শুধু একবার" তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সিদ্ধান্তগুলোর একটি হয়ে দাঁড়াল।
পরের কয়েক মাস যেন ঝাপসা হয়ে গেল।
অর্ণব আগের মতো থাকল না।
তার রেজাল্ট খারাপ হতে শুরু করল।
শিক্ষকরা অবাক।
বন্ধুরা চিন্তিত।
রাহুল একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
— "তোর কী হয়েছে?"
— "কিছু না।"
— "মিথ্যা বলিস না।"
— "বললাম তো কিছু না।"
— "তুই আগের মতো নেই।"
অর্ণব বিরক্ত হয়ে চলে গেল।
সেদিন রাতে রাহুলের কথাগুলো বারবার মাথায় ঘুরছিল।
সে জানত রাহুল ঠিক বলেছে।
সে আর আগের মতো নেই।
কিন্তু সে এটাও জানত যে সে থামতে পারছে না।
কয়েক সপ্তাহ পরে পরীক্ষার ফল বেরোল।
শিক্ষক ক্লাসে দাঁড়িয়ে নাম ডাকছিলেন।
হঠাৎ তিনি থেমে গেলেন।
তার হাতে অর্ণবের রেজাল্ট।
ক্লাস নিস্তব্ধ।
— "অর্ণব, দাঁড়াও।"
অর্ণব উঠে দাঁড়াল।
— "এটা কী?"
সে চুপ।
— "তুমি কি জানো তোমার নম্বর কত কমেছে?"
চুপ।
— "তোমার মতো ছাত্রের কাছে আমি এটা আশা করিনি।"
পুরো ক্লাস তাকিয়ে আছে।
অর্ণবের মাথা নিচু।
প্রথমবার তার লজ্জা লাগছিল।
কিন্তু লজ্জার থেকেও বড় ছিল ভেতরের শূন্যতা।
বাড়িতে ফেরার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো।
মা রেজাল্ট দেখলেন।
তার মুখের রঙ বদলে গেল।
— "এটা কী?"
অর্ণব চুপ।
— "তুই ফেল করার কাছাকাছি চলে গেছিস!"
— "একবার খারাপ হয়েছে।"
— "একবার?"
মায়ের গলায় কষ্ট।
— "তুই কি ভাবিস আমি কিছু বুঝি না?"
অর্ণব বিরক্ত হয়ে উঠল।
— "প্লিজ মা, আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও!"
কথাটা বলেই সে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
বাইরে দাঁড়িয়ে মা নিশ্চুপ।
মেঘলা ভয়ে কিছু বলল না।
সেই রাতে অর্ণব অনেকক্ষণ নিজের ঘরে বসে রইল।
তার মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবী তার বিরুদ্ধে।
কেউ তাকে বোঝে না।
কেউ না।
সে ড্রয়ারের ভিতর হাত ঢুকিয়ে প্যাকেটটা বের করল।
নিজেকে শান্ত করার জন্য।
অন্তত সে তাই ভাবছিল।
দিন যত যাচ্ছিল, তার নির্ভরতা তত বাড়ছিল।
এখন সে শুধু বন্ধুদের সঙ্গে থাকলে নয়, একা থাকলেও নেশা করতে শুরু করেছে।
সে বুঝতে পারছিল কিছু একটা ভুল হচ্ছে।
কিন্তু তখন অনেকটা দেরি হয়ে গেছে।
এক রাতে মেঘলা পানির বোতল নিতে গিয়ে দেখল অর্ণবের ঘরের দরজা পুরোপুরি বন্ধ নেই।
সামান্য ফাঁক।
সে ভেতরে তাকাল।
আর যা দেখল, তাতে তার পৃথিবী যেন থেমে গেল।
তার দাদা।
তার হিরো।
যে মানুষটাকে সে সবসময় অনুসরণ করেছে।
সে নেশা করছে।
মেঘলার হাত থেকে বোতল পড়ে গেল।
শব্দ শুনে অর্ণব চমকে উঠল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
কয়েক সেকেন্ড।
নিঃশব্দ।
তারপর মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
— "দাদা..."
অর্ণব কিছু বলতে পারল না।
— "তুই এসব করিস?"
চুপ।
— "কেন?"
চুপ।
মেঘলার গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
তারপর সে ধীরে ধীরে বলল,
— "তুই তো আমার হিরো ছিলি।"
কথাটা শুনে অর্ণবের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
যেন কেউ তার হৃদয়ের মধ্যে ছুরি বসিয়ে দিয়েছে।
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
আর অর্ণব বসে রইল।
নিঃশব্দে।
অনেকক্ষণ।
সেদিন প্রথমবার সে নিজের প্রতিচ্ছবিকে ঘৃণা করেছিল।
কিন্তু পরদিন...
সে আবার নেশা করেছিল।
কারণ এখন সে শুধু ইচ্ছা দিয়ে আর বের হতে পারছিল না।
সে বন্দি হয়ে গেছে।
নিজেরই তৈরি এক অন্ধকার কারাগারে।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে মেঘলার কথাটা আবার কানে বাজল।
"তুই তো আমার হিরো ছিলি..."
আর প্রথমবার অর্ণবের মনে ভয় ঢুকল।
যদি সে সত্যিই সব হারিয়ে ফেলে?
যদি আর ফিরে আসতে না পারে?
কিন্তু তখনও সে জানত না—
তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর রাত এখনও সামনে অপেক্ষা করছে।
----------
মেঘলার কথাগুলো অর্ণবের মাথা থেকে কিছুতেই বের হচ্ছিল না।
"তুই তো আমার হিরো ছিলি..."
একটা ছোট্ট বাক্য।
কিন্তু সেই বাক্যটা যেন প্রতিদিন তার ভেতরটাকে একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছিল।
আগে যখন সে আয়নার সামনে দাঁড়াত, তখন একজন স্বপ্নবাজ ছেলেকে দেখত।
এখন সে নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারত না।
চোখের নিচে কালি পড়েছে।
মুখ শুকিয়ে গেছে।
ওজন কমে গেছে।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—সে জানত সবকিছু ভুল হচ্ছে, তবুও থামতে পারছিল না।
পরের কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে শুরু করল।
নেশার জন্য তার টাকার প্রয়োজন বাড়তে লাগল।
পকেট খরচ যথেষ্ট হচ্ছিল না।
একদিন সে মায়ের ব্যাগ থেকে টাকা নিয়ে নিল।
প্রথমবার।
মাত্র কয়েকশো টাকা।
নিজেকে বোঝাল—
"পরে ফেরত দিয়ে দেব।"
কিন্তু পরে আর ফেরত দেওয়া হয়নি।
তারপর আবার।
তারপর আরও একবার।
একদিন মা টাকা খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজলেন।
মেঘলাকেও জিজ্ঞেস করলেন।
শেষে অর্ণবকে ডাকলেন।
— "তুই নিয়েছিস?"
অর্ণব চোখ সরিয়ে নিল।
— "না।"
মা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নিচু করলেন।
সেদিন প্রথমবার অর্ণব অনুভব করল—
মা তার ওপর থেকে বিশ্বাস হারাতে শুরু করেছেন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কা এল কিছুদিন পরে।
সেদিন রাতে রকি আর তার বন্ধুরা শহরের বাইরে একটা নির্জন জায়গায় জড়ো হয়েছিল।
গান বাজছিল।
আড্ডা চলছিল।
সবার হাতে নেশার জিনিস।
অর্ণবের মন ভালো ছিল না।
মেঘলার কথা, মায়ের মুখ, রেজাল্ট—সবকিছু মাথায় ঘুরছিল।
সে বলল,
— "আজকে আমার ভালো লাগছে না।"
রকি হেসে বলল,
— "তাহলে আজকেই বেশি দরকার।"
সবাই হেসে উঠল।
সেদিন অর্ণব স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি নেশা করেছিল।
অনেক বেশি।
প্রথমে মাথা হালকা লাগছিল।
তারপর সবকিছু ঝাপসা হতে শুরু করল।
চারপাশের শব্দ দূরে সরে যেতে লাগল।
হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে উঠল।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
— "রকি..."
অর্ণব কাঁপা গলায় ডাকল।
— "আমার... ভালো লাগছে না..."
প্রথমে সবাই হাসল।
ভাবল সে মজা করছে।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর অর্ণব মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
— "ওরে! কী হলো?"
— "উঠ! উঠ!"
— "শ্বাস নিচ্ছে?"
কেউ একজন বলল,
— "পুলিশ কেস হয়ে যাবে।"
আরেকজন বলল,
— "চল এখান থেকে।"
অর্ণব আধখোলা চোখে সব শুনছিল।
সে সাহায্য চাইছিল।
কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিল না।
যাদের সে বন্ধু ভেবেছিল...
যাদের জন্য নিজের পরিবারকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল...
তারা একজন একজন করে চলে গেল।
রকিও।
শেষ মুহূর্তে একবার পিছনে তাকিয়েছিল।
তারপর সেও চলে গিয়েছিল।
অর্ণব একা পড়ে রইল।
নিঃসঙ্গ।
অন্ধকারের মধ্যে।
পরের ঘটনাগুলো তার স্পষ্ট মনে নেই।
কেউ একজন তাকে দেখতে পেয়েছিল।
হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল।
ডাক্তাররা রাতভর চেষ্টা করেছিলেন।
যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন ভোর হয়ে গেছে।
সাদা ছাদ।
অক্সিজেন মাস্ক।
মেশিনের শব্দ।
বিপ... বিপ... বিপ...
ধীরে ধীরে সে মাথা ঘুরিয়ে পাশে তাকাল।
আর যা দেখল, তাতে তার বুক ভেঙে গেল।
মা।
চেয়ারে বসে আছেন।
চোখ লাল।
চুল এলোমেলো।
মুখ শুকিয়ে গেছে।
মনে হচ্ছিল অনেক বছর বয়স বেড়ে গেছে এক রাতেই।
অর্ণব ঠোঁট নাড়ল।
— "মা..."
মা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।
তার হাত শক্ত করে ধরে ফেললেন।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
— "আমি ভেবেছিলাম তোকে হারিয়ে ফেলব।"
অর্ণব কাঁদতে শুরু করল।
ছোট শিশুর মতো।
অনেকদিন জমে থাকা কান্না।
অনুতাপের কান্না।
লজ্জার কান্না।
মা তার কপালে হাত রাখলেন।
তারপর বললেন,
— "তুই যদি নিজেকে হারিয়ে ফেলিস, তাহলে আমি কাকে নিয়ে বাঁচব?"
সেদিন অর্ণব প্রথমবার বুঝল—
নেশা শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না।
ধ্বংস করে তার পরিবারকেও।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে তাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করা হলো।
শুরু হলো জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই।
সেখানে কোনো শর্টকাট ছিল না।
কোনো ম্যাজিক ছিল না।
প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হতো।
নিজের সঙ্গে।
নিজের অভ্যাসের সঙ্গে।
নিজের দুর্বলতার সঙ্গে।
অনেক রাত সে ঘুমাতে পারেনি।
অনেক দিন সে ভেঙে পড়েছে।
অনেকবার মনে হয়েছে—
"সব ছেড়ে দিই।"
কিন্তু প্রতিবার মেঘলার মুখ মনে পড়েছে।
প্রতিবার মায়ের চোখের পানি মনে পড়েছে।
আর সে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে।
মাসের পর মাস কেটে গেল।
ধীরে ধীরে সে বদলাতে শুরু করল।
আবার বই হাতে নিল।
আবার শরীরচর্চা শুরু করল।
আবার নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে শুরু করল।
এক বছর পরে।
একটা স্কুল অডিটোরিয়াম।
সামনে শত শত ছাত্রছাত্রী।
মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে আছে অর্ণব।
একসময় সে ছিল একজন সতর্কবার্তা।
আজ সে একজন উদাহরণ।
মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলল,
— "আমি তোমাদের মতোই একজন ছাত্র ছিলাম।"
হলঘর নিস্তব্ধ।
— "আমিও ভেবেছিলাম, একবারে কিছু হয় না।"
— "একটা সিগারেট..."
— "একটা নেশা..."
— "একটা ভুল সিদ্ধান্ত..."
— "কিছুই হবে না।"
তার গলা কেঁপে উঠল।
— "কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।"
— "খুব ভুল।"
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— "আমি আমার স্বপ্ন হারিয়েছি।"
— "আমার মায়ের বিশ্বাস হারিয়েছি।"
— "আমার বোনের চোখের সেই সম্মান হারিয়েছি।"
সামনের সারিতে বসা অনেক ছাত্র মাথা নিচু করে শুনছিল।
অর্ণব বলল,
— "তোমাদের জীবনে যদি কখনও কেউ বলে—"
— 'একবারে কিছু হয় না'
— "তাহলে মনে রেখো..."
— "একবার থেকেই সবকিছু শুরু হতে পারে।"
পুরো হলঘর নীরব।
কিছুক্ষণ পরে হাততালি শুরু হলো।
ধীরে ধীরে সেই হাততালি পুরো অডিটোরিয়ামে ছড়িয়ে পড়ল।
সেদিন বাড়ি ফেরার পর মেঘলা দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
— "দাদা?"
— "হুম?"
— "একটা কথা বলব?"
— "বল।"
মেঘলা হেসে ফেলল।
তার চোখে পানি।
— "এখন আবার তুই আমার হিরো।"
অর্ণব কিছু বলতে পারল না।
শুধু বোনকে জড়িয়ে ধরল।
সেদিন রাতে অনেকদিন পর সে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল।
আকাশটা আগের মতোই ছিল।
কিন্তু সে বদলে গেছে।
কারণ সে শিখেছে—
মানুষ ভুল করতে পারে।
ভেঙে পড়তে পারে।
অন্ধকারে হারিয়েও যেতে পারে।
কিন্তু যদি ইচ্ছা থাকে, তাহলে ফিরে আসাও সম্ভব।
................
পাঠকদের উদ্দেশ্যে
আমার গল্পটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
যদি গল্পটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান এবং গল্পটি আপনার বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন।
আপনার প্রতিটি মন্তব্য, পরামর্শ ও উৎসাহ আমাকে আরও ভালো গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।
আবারও ধন্যবাদ।
— তন্ময় রায়
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন