Rat race-র শহরে হারিয়ে যাওয়া মানবতা | এক বাস্তব ঘটনার গল্প | Story by Tanmoy Roy | Cholo Golpo Suni
সন্ধ্যাটা তখন ধীরে ধীরে শহরের উপর নেমে আসছিল।
আকাশে দিনের শেষ আলোটুকু মিশে যাচ্ছিল ধূসর রঙের সঙ্গে। রাস্তার ধারে দোকানগুলোর লাইট একে একে জ্বলে উঠছিল। কোথাও চায়ের দোকানে ভিড়, কোথাও অফিস শেষ করে বাড়ি ফেরা মানুষের তাড়াহুড়ো। হর্নের শব্দ, ব্যস্ত রাস্তা আর মানুষের ছুটে চলা— সব মিলিয়ে শহরটা যেন নিজের গতিতে দৌড়াচ্ছিল।
আমিও বেরিয়েছিলাম কাজের জন্য।
ডাক্তারের চেম্বারে যাওয়ার তাড়া ছিল। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজটাই এমন— সময়ের সাথে প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয়। কোন ডাক্তার কখন বসবেন, কখন রোগীর ভিড় বেড়ে যাবে, কখন দেখা করার সুযোগ মিলবে— সব হিসেব করে চলতে হয়।
একটু দেরি মানেই পুরো দিনের প্ল্যান নষ্ট।
সেদিনও মাথার ভিতরে শুধু সময়ের হিসেব চলছিল।
বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল, যদি আর একটু দেরি হয় তাহলে হয়তো ডাক্তারের সাথে আর দেখা হবে না।
বাইক চালিয়ে দ্রুত এগোচ্ছিলাম।
হঠাৎ রাস্তার একটা মোড়ের কাছে পৌঁছাতেই চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটল।
একটা ছেলে বাইক নিয়ে টার্ন নিতে গিয়ে হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তায় পড়ে গেল।
ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটেছিল যে প্রথম কয়েক সেকেন্ড আমি বোঝারই চেষ্টা করছিলাম কী হলো। তারপর দেখি ছেলেটা রাস্তায় পড়ে আছে আর তার বাইকটা পাশেই কাত হয়ে পড়ে আছে।
চারপাশে তখন প্রচুর গাড়ি।
কেউ হর্ন বাজিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে, কেউ একবার তাকিয়ে আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়— একটা মানুষও দাঁড়াল না।
আমি একটু দূরেই ছিলাম।
স্বাভাবিকভাবেই আমার প্রথম ইচ্ছে হয়েছিল বাইক থামানোর। মনে হচ্ছিল ছেলেটার কাছে যাই, অন্তত তাকে উঠতে সাহায্য করি। যদি কোথাও বেশি চোট পেয়ে থাকে তাহলে পাশে দাঁড়াই।
কিন্তু ঠিক তখনই মাথার ভিতরে আরেকটা চিন্তা এসে ধাক্কা মারল।
“আরে… আমার তো দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
“এখন যদি দাঁড়াই, তাহলে হয়তো ডাক্তারের সাথে দেখা হবে না…”
“সবাই তো চলে যাচ্ছে… আমি একাই বা কী করব?”
এই কয়েকটা চিন্তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মাথার ভিতরে যুদ্ধ শুরু করে দিল।
আমি বাইকের গতি একটু কমিয়েছিলাম।
সত্যি বলতে, থামাতেও চেয়েছিলাম।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত থামিনি।
আমি চলে এলাম।
পেছনের আয়নায় শেষবারের মতো দেখেছিলাম ছেলেটা ধীরে ধীরে নিজেই তার বাইকটা তুলছে। তার শরীরের ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল হাতটা বেশ ব্যথা পেয়েছে। তবুও সে একাই উঠে দাঁড়াল।
আর আমি?
আমি শুধু সামনে এগিয়ে গেলাম।
ডাক্তারের চেম্বারে ঠিক সময়েই পৌঁছে গিয়েছিলাম।
সব কাজও ঠিকঠাক হলো। ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বললাম, প্রোডাক্ট নিয়ে আলোচনা করলাম, দিনের কাজও শেষ করলাম।
কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছিল।
বারবার সেই দৃশ্যটা মাথায় ভেসে উঠছিল—
রাস্তায় পড়ে থাকা ছেলেটা…
চারপাশের মানুষের উদাসীনতা…
আর সেই ভিড়ের মধ্যেই আমিও একজন হয়ে যাওয়া।
ছোটবেলায় আমরা পড়েছিলাম—
“মানুষ মানুষের জন্য।”
কিন্তু বড় হতে হতে হয়তো আমরা সবাই ধীরে ধীরে বদলে যাই।
সময় আমাদের এমন একটা দৌড়ের মধ্যে ফেলে দেয়, যেখানে অন্যের কষ্ট দেখার সময়টুকুও থাকে না।
আজকের পৃথিবীটা যেন একটা বিশাল র্যাট রেস।
এখানে সবাই ছুটছে।
কেউ চাকরির জন্য, কেউ টাকার জন্য, কেউ নিজের ভবিষ্যতের জন্য, কেউ শুধু টিকে থাকার জন্য।
আর এই দৌড়ের মধ্যে আমরা ধীরে ধীরে অনুভূতিগুলো হারিয়ে ফেলছি।
আগে রাস্তায় কেউ পড়ে গেলে কয়েকজন ছুটে আসত।
এখন মানুষ প্রথমে মোবাইল বের করে ভিডিও করে।
আগে মানুষ সাহায্য করতে গিয়ে ভাবত না নিজের সময় নষ্ট হবে কি না।
এখন সবাই ভাবে—
“আমি কেন জড়াব?”
“দেরি হয়ে যাবে।”
“অন্য কেউ না হয় সাহায্য করবে।”
কিন্তু সত্যিটা হলো—
সবাই যখন ভাবে “অন্য কেউ সাহায্য করবে”, তখন আসলে কেউই সাহায্য করে না।
সেদিন আমি সেটা খুব কাছ থেকে বুঝেছিলাম।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমি জানতাম আমি ভুল করছি।
তবুও থামিনি।
হয়তো আমি দাঁড়ালে মাত্র দুই মিনিট সময় নষ্ট হতো।
হয়তো শুধু একটা হাত বাড়িয়ে দিলেই ছেলেটার মনে হতো— “না, পৃথিবীতে এখনও মানুষ আছে।”
কিন্তু আমি সেটা করতে পারিনি।
কারণ আমিও তখন সময়ের পিছনে ছুটছিলাম।
আমরা সবাই এখন এতটাই ব্যস্ত হয়ে গেছি যে মানুষের চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দিই।
অফিসের টার্গেট, মিটিং, টাকা, ক্যারিয়ার— সবকিছু এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে যে মানবিকতা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে।
তবে বাস্তবতাও আছে।
আজকের দিনে যদি কেউ নিজের কাজ ঠিকভাবে না করে, তাহলে পিছিয়ে পড়তে হয়। চাকরির চাপ, সংসারের দায়িত্ব, ভবিষ্যতের চিন্তা— সব মিলিয়ে মানুষ নিজেকেই সামলাতে হিমশিম খায়।
তাই হয়তো অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও মানুষ সাহায্য করতে পারে না।
কিন্তু তবুও…
কিছু কিছু ঘটনা আমাদের ভিতরটা নাড়িয়ে দেয়।
সেদিনের সেই ঘটনাটা আমার মনে একটা প্রশ্ন রেখে গেছে—
“আমরা কি সত্যিই এতটা ব্যস্ত হয়ে গেছি যে একটা আহত মানুষকে সাহায্য করার সময়ও নেই?”
হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।
কারণ আমি নিজেও সেই ভিড়ের অংশ হয়ে গিয়েছিলাম।
রাতে বাড়ি ফিরে ঘটনাটা বারবার মাথায় আসছিল।
খাবার খেতে বসেও মনে হচ্ছিল— আমি যদি একটু দাঁড়াতাম তাহলে কী এমন ক্ষতি হতো?
হয়তো কিছুই না।
বরং নিজের কাছেই ভালো লাগত।
কখনও কখনও জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো বাইরে থেকে খুব ছোট মনে হলেও ভিতরে গভীর দাগ রেখে যায়।
সেদিনের ঘটনাটা আমার কাছে ঠিক তেমনই।
আমি জানি না সেই ছেলেটা এখন কেমন আছে।
তার হাতের ব্যথা সেরেছিল কি না, সে ঠিকঠাক বাড়ি পৌঁছেছিল কি না— কিছুই জানি না।
কিন্তু আমি জানি, সেদিন আমি নিজেকে নতুনভাবে চিনেছিলাম।
আর হয়তো সেই কারণেই আজ এই ঘটনাটা লিখছি।
কারণ আমি চাই না আমরা পুরোপুরি অনুভূতিহীন হয়ে যাই।
হয়তো আমরা পৃথিবী বদলাতে পারব না।
সব সমস্যার সমাধানও করতে পারব না।
কিন্তু অন্তত একজন মানুষ বিপদে পড়লে দুই মিনিট দাঁড়াতে তো পারি।
একটা প্রশ্ন করতে তো পারি—
“ভাই, ঠিক আছেন?”
বিশ্বাস করুন, অনেক সময় এই ছোট্ট কথাটাই একজন মানুষের কাছে অনেক বড় ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।
আজকের পৃথিবীতে টাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কাজও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সবকিছুর আগে আমরা মানুষ।
আর মানুষ হিসেবে যদি অন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলি, তাহলে এত দৌড়ে জিতে আসলে লাভ কী?
র্যাট রেসে জিততে গিয়ে যেন আমরা মানুষ হওয়াটাই ভুলে না |
................
পাঠকদের উদ্দেশ্যে
আমার গল্পটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
যদি গল্পটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান এবং গল্পটি আপনার বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন।
আপনার প্রতিটি মন্তব্য, পরামর্শ ও উৎসাহ আমাকে আরও ভালো গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।
আবারও ধন্যবাদ।
— তন্ময় রায়

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন