BREAKING NEWS | The Man Behind His Own Headlines | Bengali Mystery Thriller Story | Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI
কলকাতার আকাশটা সেদিন সকাল থেকেই মেঘলা ছিল।
সূর্য উঠেছে কিনা বোঝার উপায় নেই। পুরো আকাশটা ধূসর মেঘে ঢাকা। মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাস এসে বারান্দার গ্রিলটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
বিভূ বৈদ্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
পঞ্চান্ন নম্বর বাসটা ধীরে ধীরে মোড় ঘুরে চলে গেল। রাস্তার ওপাশে চায়ের দোকানে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে গল্প করছে। একজন অফিসগামী মানুষ তাড়াহুড়ো করে অটো ধরার চেষ্টা করছে।
প্রতিদিনের মতোই সবকিছু চলছে।
শুধু তার জীবনটাই যেন কোথাও আটকে গেছে।
একসময় সকাল মানেই ছিল তাড়াহুড়ো।
ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে যুদ্ধ।
চা শেষ করে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া।
মোবাইলে একের পর এক ফোন।
নিউজ ডেস্কের আপডেট।
জেলার প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ।
কোথাও দুর্ঘটনা হয়েছে কিনা, কোথাও রাজনৈতিক গোলমাল শুরু হয়েছে কিনা, কোথাও বড় খবর এসেছে কিনা—এসব নিয়ে সারাদিনের ব্যস্ততা।
আজকাল আর কিছুই নেই।
এখন তার সকাল শুরু হয় নীরবতা দিয়ে।
আর শেষ হয় অনিশ্চয়তা দিয়ে।
"শুনছো?"
রান্নাঘর থেকে স্ত্রীর গলা ভেসে এল।
বিভূ কোনো উত্তর দিল না।
সে এখনও রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।
"শুনছো বলছি?"
এবার গলায় বিরক্তির সুর।
বিভূ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
"হুঁ?"
"স্কুল থেকে আবার মেসেজ এসেছে।"
স্ত্রী মিতালী রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।
গত কয়েক বছরে মানুষটা যেন অনেক দ্রুত বুড়িয়ে গেছে।
"কিসের মেসেজ?"
"ছেলের ফি।"
বিভূ কিছু বলল না।
মিতালী আবার বলল,
"এই সপ্তাহের মধ্যেই জমা দিতে হবে।"
নীরবতা।
"আর মেয়ের বইয়ের জন্যও টাকা লাগবে।"
বিভূ মাথা নিচু করল।
এমন কথোপকথন তাদের সংসারে নতুন কিছু নয়।
প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো খরচের কথা ওঠে।
কোনো বিল।
কোনো ফি।
কোনো বকেয়া।
কোনো প্রয়োজন।
একসময় যে খরচগুলো খুব সাধারণ মনে হতো, এখন সেগুলোই পাহাড়ের মতো বড়।
মিতালী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
"আমি জানি তোমারও খারাপ লাগে। কিন্তু কী করব বলো?"
বিভূ উত্তর দিল না।
কারণ তার কাছে কোনো উত্তর নেই।
মিতালী ফিরে গেল রান্নাঘরে।
আবার বাসনের শব্দ।
আবার নীরবতা।
ঠিক তখনই টেবিলের উপর রাখা মোবাইলটা কেঁপে উঠল।
একটা মেসেজ।
বিভূ মোবাইলটা হাতে নিল।
ব্যাংক থেকে পাঠানো নোটিফিকেশন।
অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স।
সংখ্যাটা দেখেই তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ খালি হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মোবাইলটা নামিয়ে রাখল।
মাসের এখনও অনেকটা বাকি।
কিন্তু টাকাটা?
টাকাটা যেন মাস শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে।
বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
ছোট ছোট ফোঁটা বারান্দার রেলিংয়ে পড়ে ভেঙে যাচ্ছে।
বিভূ হঠাৎ খেয়াল করল তার হাত কাঁপছে।
বয়স বাড়ার কারণে নয়।
চিন্তার কারণে।
ভয়ের কারণে।
একজন মানুষ যখন দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থতার সঙ্গে বসবাস করে, তখন একটা সময় আসে যখন সে নিজের প্রতিফলনকেও বিশ্বাস করতে পারে না।
বিভূর এখন সেই অবস্থা।
আয়নার সামনে দাঁড়ালে সে মাঝে মাঝে নিজেকেই চিনতে পারে না।
এই কি সেই মানুষ, যাকে একসময় সবাই নাম ধরে চিনত?
যে অফিসে ঢুকলেই সবাই সম্মান করত?
যার ফোন না ধরলে অনেক কাজ আটকে থাকত?
আজ তার ফোন প্রায় সারাদিন নীরব।
ফোন বেজে উঠলেও সেটা সাধারণত কোনো পাওনাদারের কল।
অথবা কোনো ঋণ সংস্থার অফার।
এতটাই বদলে গেছে জীবন।
ঘরের ভেতর থেকে হঠাৎ একটা চিৎকার শোনা গেল।
"বাবা!"
বিভূ চমকে উঠল।
ছেলে অর্ণব।
ক্লাস এইটে পড়ে।
"কী হয়েছে?"
"মোবাইলটা একটু দেবে?"
"কেন?"
"স্কুলের একটা প্রজেক্ট দেখতে হবে।"
বিভূ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মোবাইলটা এগিয়ে দিল।
অর্ণব খেয়াল করল না, কিন্তু মোবাইল দেওয়ার সময় বিভূর মনে একটা অদ্ভুত কষ্ট হল।
একসময় সে ছেলের জন্য নতুন ফোন কিনে দেওয়ার স্বপ্ন দেখত।
এখন নিজের ফোনটাই ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
অর্ণব চলে যাওয়ার পর বিভূ আবার বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
বৃষ্টি তখন একটু বেড়েছে।
রাস্তার মানুষগুলো ছাতা খুলতে শুরু করেছে।
হঠাৎ তার মনে হল, পৃথিবীর সবাই যেন কোথাও না কোথাও পৌঁছাচ্ছে।
শুধু সে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
একই জায়গায়।
একই ব্যর্থতায়।
একই অন্ধকারে।
আর ঠিক তখনই তার মাথায় একটা পুরোনো স্মৃতি ফিরে এল।
চার বছর আগের একটা সকাল।
যেদিন প্রথমবার তার মনে হয়েছিল—
তার জীবনটা হয়তো আর আগের মতো থাকবে না...
_______________________________
চার বছর আগের সেই সকালটার কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে বিভূর।
সেদিনও আকাশটা এমনই মেঘলা ছিল।
তবে তখন তার হাতে কাজ ছিল। মাথার উপর একটা পরিচয় ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা, ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটা ভয় ছিল না।
সকালে অফিসে ঢুকেই সে বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা ঠিক নেই।
সাধারণত অফিসে ঢুকলেই বিভিন্ন বিভাগের লোকজনের কোলাহল শোনা যেত। কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ খবর যাচাই করছে, কেউ ভিডিও এডিট করছে।
কিন্তু সেদিন পরিবেশটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
অস্বস্তিকর রকমের শান্ত।
ডেস্কে বসে কম্পিউটার অন করতে করতেই সে খেয়াল করল, পাশের টেবিলের রণদীপ অদ্ভুতভাবে চুপচাপ বসে আছে।
"কী রে, শরীর খারাপ নাকি?"
রণদীপ মাথা নাড়ল।
"না।"
"তাহলে এমন মুখ করে বসে আছিস কেন?"
লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
"শুনিসনি?"
"কী?"
"আজ আবার কয়েকজনকে ছাঁটাই করবে।"
বিভূর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
কয়েক সপ্তাহ ধরেই গুজব চলছিল।
COVID-এর পর বিজ্ঞাপন কমে গেছে।
আয় কমেছে।
কোম্পানি খরচ কমাতে চাইছে।
কিন্তু গুজব আর বাস্তব এক জিনিস নয়।
বিভূ এতদিন নিজেকে বুঝিয়েছিল, তার কিছু হবে না।
প্রায় পনেরো বছর ধরে সে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত।
নিউজ রিপোর্টার নয়, কিন্তু পুরো সিস্টেমটা সচল রাখার পিছনে তার বড় ভূমিকা ছিল।
জেলার প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্য সংগ্রহ, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়—এসব কাজের জন্য সবাই তাকে চিনত।
এমন একজন মানুষকে কি এত সহজে বাদ দেওয়া যায়?
সেদিন দুপুর নাগাদ উত্তরটা সে পেয়ে গেল।
ম্যানেজমেন্ট থেকে ফোন এল।
তাকে উপরের কনফারেন্স রুমে যেতে বলা হলো।
করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় তার মনে হচ্ছিল, চারপাশের দেয়ালগুলো যেন আগের চেয়ে সংকীর্ণ হয়ে গেছে।
ঘরে ঢুকতেই সে দেখল টেবিলের ওপাশে বসে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক বিভাগের আরেকজন সিনিয়র কর্মী।
তাদের মুখে কৃত্রিম সহানুভূতির ছাপ।
এই ধরনের মুখভঙ্গি বিভূ আগে অনেকবার দেখেছে।
খারাপ খবর দেওয়ার আগে মানুষ সাধারণত এমনই মুখ করে।
"বসুন, মিস্টার বৈদ্য।"
বিভূ চুপচাপ বসল।
তারপর প্রায় দশ মিনিট ধরে তারা নানা ধরনের কর্পোরেট ভাষায় একই কথা বলল।
কোম্পানির আর্থিক সংকট।
অভূতপূর্ব পরিস্থিতি।
কঠিন সিদ্ধান্ত।
পুনর্গঠন।
খরচ কমানো।
সবশেষে মূল কথাটা এল।
"আমরা দুঃখিত, কিন্তু আপনার পদটি আর রাখা সম্ভব হচ্ছে না।"
বিভূ কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, প্রথম কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কষ্টই অনুভব করেনি।
বরং মনে হচ্ছিল, কথাগুলো অন্য কাউকে বলা হচ্ছে।
যেন সে দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছে।
"মানে?"
মানবসম্পদ কর্মকর্তা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"আজ আপনার শেষ কর্মদিবস।"
ঘরের এয়ারকন্ডিশনার তখনও আগের মতোই চলছে।
দেয়ালের ঘড়িটাও আগের মতোই টিকটিক করছে।
শুধু বিভূর জীবনের সময়টা যেন হঠাৎ থেমে গেল।
"পনেরো বছর..."
সে নিজের অজান্তেই বলে ফেলল।
"জি?"
"পনেরো বছর ধরে আমি এখানে কাজ করছি।"
লোকটা কিছু বলল না।
কারণ এর কোনো উত্তর নেই।
কর্পোরেট দুনিয়ায় পনেরো বছরের মূল্য অনেক সময় এক পাতার নোটিশের চেয়েও কম।
মিটিং শেষ হতে বেশি সময় লাগল না।
কাগজে সই করতে হলো।
কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হলো।
তারপর তাকে বলা হলো নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে।
নিজের ডেস্কে ফিরে এসে বিভূ প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল, সত্যিই সব শেষ।
ড্রয়ারের ভেতরে কিছু পুরোনো নোটবুক।
একটা কফির মগ।
দুই-একটা কলম।
কয়েকটা পুরোনো পরিচয়পত্র।
পনেরো বছরের কর্মজীবন শেষ পর্যন্ত এই কয়েকটা জিনিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেল।
ব্যাগে সবকিছু ভরার সময় তার চোখে পড়ল দেয়ালে ঝোলানো অফিসের একটা পুরোনো গ্রুপ ছবি।
সেখানে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মানুষ।
তাদের মধ্যে কেউ ইতিমধ্যেই চাকরি হারিয়েছে।
কেউ অন্য কোথাও চলে গেছে।
আর আজ সেই তালিকায় যোগ হলো তার নামও।
সন্ধ্যায় অফিস থেকে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি পড়ছিল।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বিভূ একবার পিছন ফিরে তাকাল।
প্রতিদিন যে ভবনটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হতো, এটাই তার দ্বিতীয় বাড়ি—
আজ সেই ভবনটা তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত মনে হচ্ছে।
বাসে ওঠার পর সে অনেকক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইল।
মিতালীকে খবরটা কীভাবে বলবে?
ছেলেকে কী বলবে?
মেয়েকে কী বলবে?
সবচেয়ে বড় কথা—
নিজেকে কী বলবে?
জানালার বাইরে বৃষ্টিভেজা শহরটা দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছিল।
আর বিভূর মনে হচ্ছিল, তার জীবনের একটা বড় অংশও ঠিক একইভাবে পিছনে ফেলে আসছে।
সেদিন বাড়ি ফেরার সময় সে জানত না, সামনে আরও কঠিন দিন অপেক্ষা করছে।
সে জানত না, চাকরি হারানোই তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নয়।
বরং সেটাই ছিল শুরু।
একটা দীর্ঘ পতনের শুরু।
_______________________________
চাকরি হারানোর প্রথম কয়েক সপ্তাহ বিভূ নিজেকে বারবার একটা কথাই বলেছিল—
"এটা সাময়িক।"
পনেরো বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে একজন মানুষ বেশিদিন বেকার থাকবে কেন?
একটা না একটা কাজ নিশ্চয়ই মিলবে।
প্রথমদিকে তার আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি ছিল না।
বরং সে বেশ পরিকল্পনা করেই এগোচ্ছিল।
পুরোনো সহকর্মীদের ফোন করা।
চেনাজানা লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জীবনবৃত্তান্ত পাঠানো।
যেখানে সুযোগের কথা শুনত, সেখানেই আবেদন করত।
প্রথম মাসটা কেটে গেল আশায়।
দ্বিতীয় মাসটা কেটে গেল অপেক্ষায়।
তৃতীয় মাসে এসে সে প্রথমবারের মতো অস্বস্তি অনুভব করল।
কারণ বেশিরভাগ জায়গা থেকে কোনো উত্তরই আসছিল না।
যারা উত্তর দিচ্ছিল, তারা সাধারণত একটা কথাই বলছিল—
"আমরা জানাব।"
কিন্তু কেউ আর জানাত না।
একদিন দুপুরে একটা ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হলো।
বহুদিন পর বিভূর মনে একটু উত্তেজনা তৈরি হলো।
সকালে অনেক যত্ন করে শার্ট ইস্ত্রি করল।
পুরোনো ফাইলটা বের করল।
সার্টিফিকেটগুলো আবার গুছিয়ে নিল।
মিতালীও সেদিন একটু আশাবাদী দেখাচ্ছিল।
"ভালো করে কথা বলো। নিশ্চয়ই হয়ে যাবে।"
বিভূ হেসে মাথা নাড়ল।
তারও তাই মনে হচ্ছিল।
কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলল।
ইন্টারভিউ বোর্ডে বসা ছেলেটার বয়স তিরিশের বেশি হবে না।
সে বিভূর জীবনবৃত্তান্ত দেখল।
মাথা নাড়ল।
কিছু প্রশ্ন করল।
তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
"আপনার বয়স কত?"
"তিপ্পান্ন।"
ছেলেটার মুখের ভাব অদৃশ্যভাবে বদলে গেল।
সেই পরিবর্তনটা খুব সূক্ষ্ম।
কিন্তু বিভূ বুঝতে পারল।
কারণ গত কয়েক মাসে সে এমন পরিবর্তন অনেকবার দেখেছে।
"আমরা আসলে একটু dynamic profile খুঁজছি।"
ভদ্র ভাষায় বলা কথাটার অর্থ খুব পরিষ্কার।
তারা কম বয়সী কাউকে চায়।
যে কম বেতনে বেশি সময় কাজ করবে।
বাইরে বেরিয়ে আসার পর বিভূ অনেকক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা যেন অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে।
একসময় অভিজ্ঞতা ছিল শক্তি।
এখন সেটাই বোঝা।
এরপর একের পর এক ইন্টারভিউ।
একের পর এক প্রত্যাখ্যান।
কখনও বলা হয়—
"আপনি overqualified।"
কখনও বলা হয়—
"আপনার profile আমাদের requirement-এর সঙ্গে match করছে না।"
কখনও আবার কোনো কারণই জানানো হয় না।
ধীরে ধীরে সঞ্চয় কমতে শুরু করল।
প্রথমে তেমন সমস্যা মনে হয়নি।
বহু বছরের চাকরিতে কিছু টাকা জমেছিল।
মিতালীও বলেছিল,
"চিন্তা কোরো না। কিছু একটা হয়ে যাবে।"
কিন্তু সময় যত এগোল, সেই সঞ্চয়ও তত কমতে লাগল।
একদিন ব্যাংকের পাসবুক আপডেট করতে গিয়ে বিভূর বুকটা কেঁপে উঠল।
যে সংখ্যাটা একসময় তাকে নিরাপত্তা দিত, সেটা এখন দ্রুত ছোট হয়ে যাচ্ছে।
বাড়ি ফেরার পথে সে কোনো কথা বলেনি।
মিতালীও বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা হয়েছে।
কিন্তু সেদিন আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে মেয়ে হঠাৎ বলল,
"বাবা, পুজোতে আমরা কি এবারও নতুন জামা কিনব?"
বিভূর হাত থেমে গেল।
খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন।
প্রতিবছরই তো নতুন জামা কেনা হয়।
কিন্তু এবার সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তার গলাটা শুকিয়ে গেল।
"দেখি মা।"
মেয়েটা মাথা নাড়ল।
সে হয়তো কিছু বুঝল না।
কিন্তু বিভূ বুঝল।
একটা সময় ছিল, এই প্রশ্নের উত্তরে সে সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁ বলত।
আজ সে "দেখি" বলছে।
সেই রাতেই অনেকক্ষণ ঘুম আসেনি।
বিছানায় শুয়ে সে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল।
পাশে মিতালী ঘুমিয়ে।
অন্য ঘরে ছেলে-মেয়ে।
সবাই তার উপর নির্ভর করছে।
আর সে?
সে নিজেই জানে না আগামী মাসে কী হবে।
পরের বছরটা আরও কঠিন গেল।
ধার করতে শুরু করতে হলো।
প্রথমে আত্মীয়দের কাছ থেকে।
তারপর বন্ধুদের কাছ থেকে।
প্রথম কয়েকবার খুব লজ্জা লাগত।
পরে সেটা অভ্যাস হয়ে গেল।
আর সেই অভ্যাসটাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত।
কারণ বিভূ কখনও কারও কাছে হাত পাতার মানুষ ছিল না।
একসময় উল্টো মানুষ তার কাছে সাহায্য চাইত।
আজ পরিস্থিতি বদলে গেছে।
এক বিকেলে পুরোনো এক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হলো।
লোকটা এখন একটা বড় ডিজিটাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে কাজ করে।
চায়ের দোকানে বসে দুজনে অনেকক্ষণ কথা বলল।
বিদায় নেওয়ার আগে সহকর্মী বলল,
"খারাপ লাগিস না বিভূদা, কিন্তু এখন বাজারটা খুব কঠিন।"
বিভূ হেসে বলল,
"জানি।"
কিন্তু সে জানত, কথাটা পুরো সত্যি নয়।
বাজার কঠিন।
তবু কাজ হচ্ছে।
নতুন লোকও চাকরি পাচ্ছে।
শুধু সে পাচ্ছে না।
কারণ তার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে।
কারণ সে এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সে নতুনদের মতো তরুণ নয়, আবার পুরোনোদের মতো প্রতিষ্ঠিতও নয়।
সেদিন বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বিভূ।
অনেকক্ষণ।
চোখের নিচে কালি পড়েছে।
চুলে পাকা রং বেড়েছে।
মুখে আগের সেই আত্মবিশ্বাস নেই।
হঠাৎ তার মনে হলো—
সে শুধু চাকরি হারায়নি।
সে নিজের পরিচয়ও হারিয়েছে।
একসময় সে জানত সে কে।
আজ সে নিজেই নিশ্চিত নয়।
সেই রাতে বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তার।
ঘড়িতে তখন রাত তিনটে।
ঘুম আর এল না।
বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় দাঁড়াল।
অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একটা প্রশ্ন মাথায় এল—
যদি আর কোনো চাকরি না মেলে?
যদি এটাই তার বাকি জীবন হয়?
প্রশ্নটার উত্তর তার জানা ছিল না।
কিন্তু সেই রাতেই, বহুদিন পর, তার মাথায় আরেকটা চিন্তা প্রথমবারের মতো উঁকি দিল।
চাকরি যদি না-ই মেলে...
তাহলে কি নিজের জন্য নতুন একটা রাস্তা তৈরি করা যায়?
___________________________
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ একটা বিষয় বুঝতে শেখে।
সব যুদ্ধ চিৎকার করে লড়া হয় না।
কিছু যুদ্ধ হয় সম্পূর্ণ নীরবে।
বিভূর পরিবারও ঠিক তেমন একটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।
বাইরের কেউ দেখলে হয়তো বুঝতেই পারত না।
তাদের সংসারে প্রতিদিন রান্না হচ্ছে।
ছেলে স্কুলে যাচ্ছে।
মেয়ে পড়াশোনা করছে।
সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হয়।
কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার আড়ালে প্রতিদিন একটু একটু করে জমা হচ্ছিল চাপ।
আর সেই চাপের সবচেয়ে বড় অংশটা বহন করছিল মিতালী।
এক সন্ধ্যায় বিভূ ড্রয়িংরুমে বসে খবর দেখছিল।
আসলে খবর দেখছিল না।
টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে ছিল মাত্র।
মাথার ভেতর অন্য চিন্তা ঘুরছিল।
হঠাৎ রান্নাঘর থেকে মিতালীর গলা ভেসে এল।
"শুনছো?"
"হুঁ?"
"গ্যাসের বুকিং করতে হবে।"
বিভূ কিছু বলল না।
"আর রেশনটাও প্রায় শেষ।"
আবার নীরবতা।
মিতালী এবার আর কিছু বলল না।
কারণ সে জানত, বিভূ ইচ্ছে করে চুপ থাকে না।
সে উত্তর খুঁজে পায় না।
গত কয়েক বছরে মিতালী একটা জিনিস শিখে গেছে।
একজন মানুষ যখন নিজের ব্যর্থতার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে, তখন তাকে প্রতিদিন নতুন করে দোষ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
সে নিজেই নিজেকে যথেষ্ট শাস্তি দেয়।
সেদিন রাতের খাওয়ার সময় অর্ণব বলল,
"বাবা, আমাদের স্কুলে একটা educational tour হবে।"
বিভূ মুখ তুলল।
"কোথায়?"
"শান্তিনিকেতন।"
ছেলেটার চোখে উচ্ছ্বাস।
বয়স তেরো।
এই বয়সে পৃথিবী এখনও সম্ভাবনায় ভরা।
"সবাই যাচ্ছে।"
বিভূ হাসার চেষ্টা করল।
"ভালো তো।"
"টাকাটা আগামী সপ্তাহে জমা দিতে হবে।"
মুহূর্তের মধ্যে টেবিলের পরিবেশ বদলে গেল।
অর্ণব সেটা বুঝতে পারেনি।
কিন্তু মিতালী বুঝেছে।
বিভূও বুঝেছে।
"কত?"
অর্ণব টাকার অঙ্কটা বলল।
বিভূ চুপ করে গেল।
ছেলেটা হয়তো প্রথমবার লক্ষ্য করল, তার বাবার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেছে।
"না গেলেও হবে।"
অর্ণব আস্তে করে বলল।
কথাটা শুনে বিভূর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
একটা বাচ্চা ছেলে যখন নিজের ইচ্ছাগুলো নিজে থেকেই কমিয়ে ফেলতে শেখে, তখন বুঝতে হবে সে সংসারের অবস্থা বুঝতে শুরু করেছে।
আর সেই উপলব্ধি কোনো বাবার জন্য সুখের নয়।
"দেখি কী করা যায়।"
বিভূ বলল।
কিন্তু সে জানত, এই "দেখি" শব্দটার অর্থ কী।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর মেয়েটা তার কাছে এসে বসল।
"বাবা?"
"হুঁ?"
"তুমি ছোটবেলায় ভূতের গল্প পড়তে?"
বিভূ অবাক হয়ে তাকাল।
"কেন?"
"আমাদের লাইব্রেরিতে একটা বই এসেছে। আমি নিতে চাই।"
মেয়েটার চোখ দুটো চকচক করছে।
বিভূ হেসে ফেলল।
"অবশ্যই নেবে।"
"সত্যি?"
"হ্যাঁ।"
মেয়েটা খুশি হয়ে দৌড়ে চলে গেল।
মুহূর্তটা খুব ছোট।
খুব সাধারণ।
কিন্তু বিভূর চোখ হঠাৎ ভিজে উঠল।
কারণ সে বুঝতে পারছিল, এই ছোট ছোট খুশিগুলোই এখন তার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়।
রাত গভীর হলে মিতালী বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
বিভূ তখন একা বসে ছিল।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ।
অনেক বছরের সংসারে এমন নীরবতা অস্বস্তিকর নয়।
বরং স্বাভাবিক।
"তুমি খুব চিন্তা করছো, তাই না?"
মিতালী বলল।
বিভূ হালকা হাসল।
"না।"
"মিথ্যে বলো না।"
আবার নীরবতা।
কিছুক্ষণ পরে বিভূ বলল,
"আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমি তোমাদের হতাশ করেছি।"
মিতালী তার দিকে তাকাল।
"এইসব আবার কী?"
"সত্যি বলছি।"
বিভূ ধীরে ধীরে বলল।
"আমি যদি চাকরিটা রাখতে পারতাম..."
"তুমি ইচ্ছে করে হারাওনি।"
"জানি।"
"তাহলে?"
বিভূ কোনো উত্তর দিল না।
কারণ বিষয়টা যুক্তির নয়।
অপরাধবোধের।
একজন বাবা যখন সন্তানের ইচ্ছা পূরণ করতে পারে না, তখন সে যুক্তি খোঁজে না।
সে শুধু নিজেকে দোষ দেয়।
মিতালী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"একটা কথা বলব?"
"বলো।"
"তুমি এখনও আগের মানুষটাই আছো।"
বিভূ হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
"না।"
"আছো।"
"না, নেই।"
"আছো। শুধু তুমি নিজে সেটা দেখতে পাচ্ছো না।"
বিভূ আকাশের দিকে তাকাল।
মেঘের ফাঁকে চাঁদের আলো দেখা যাচ্ছে।
খুব ক্ষীণ।
খুব দুর্বল।
কিন্তু আছে।
হঠাৎ তার মনে হলো, গত চার বছরে সে শুধু চাকরি খুঁজেছে।
শুধু অন্য কারও সুযোগের অপেক্ষা করেছে।
কিন্তু নিজের জন্য কিছু করার কথা কি কখনও ভেবেছে?
একসময় খবরের জগতটাই ছিল তার জীবন।
সারাদিন ফোন।
তথ্য।
সূত্র।
ঘটনা।
মানুষ।
এখনও তো সেই অভিজ্ঞতাগুলো তার কাছে আছে।
এখনও তো বহু পুরোনো পরিচিত মানুষ আছে।
তাহলে?
তাহলে কি সত্যিই সব শেষ?
নাকি এখনও কিছু বাকি আছে?
সেই রাতেই, বহুদিন পর, বিভূ একটা পুরোনো হার্ডডিস্ক বের করল।
সেখানে জমা ছিল তার বহু বছরের কাজের স্মৃতি।
পুরোনো নিউজ ক্লিপ।
ভিডিও।
ফাইল।
ছবি।
কম্পিউটারের সামনে বসে একটার পর একটা ফোল্ডার খুলতে খুলতে তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া একটা অংশকে আবার খুঁজে পাচ্ছে।
ঘড়িতে তখন রাত দুটো।
সারা বাড়ি ঘুমিয়ে।
শুধু বিভূ জেগে।
স্ক্রিনের আলো তার মুখে পড়ছে।
আর বহুদিন পর প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
হয়তো এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি।
হয়তো এখনও একটা সুযোগ বাকি আছে।
আর সেই সুযোগটাই খুব শিগগির তার জীবনের গতিপথ বদলে দিতে চলেছে।
___________________________
সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিভূ প্রথমবারের মতো অনেকদিন পর একটা অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করল।
উত্তেজনাটা খুব বড় কিছু নয়।
কিন্তু গত কয়েক বছরে সে এমন অনুভূতি প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।
চা হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আগের রাতের চিন্তাগুলো আবার মাথায় ফিরে এল।
নিউজ।
তথ্য।
ভিডিও।
সূত্র।
এই জগতটাই তো সে সবচেয়ে ভালো চেনে।
তাহলে কেন সে এতদিন ধরে শুধু অন্যের চাকরির অপেক্ষা করে বসে আছে?
মিতালী তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত।
বিভূ হঠাৎ বলল,
"শোনো?"
"হুঁ?"
"আমি একটা কাজ করার কথা ভাবছি।"
মিতালী ঘুরে তাকাল।
"কী কাজ?"
"নিজের একটা নিউজ পেজ খুলব।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
মিতালী কিছু বলল না।
সে জানত, বহুদিন পর বিভূর চোখে এই ধরনের আলো দেখা যাচ্ছে।
"করো।"
বিভূ অবাক হয়ে তাকাল।
"এইটুকুই বলবে?"
মিতালী হেসে ফেলল।
"আমি আর কী বলব? অন্তত এটা এমন একটা কাজ যেটা তুমি সত্যিই জানো।"
সেদিন দুপুরেই বিভূ পুরোনো ডেস্কটাকে পরিষ্কার করল।
ধুলো জমে থাকা ল্যাপটপটা বের করল।
চার্জারে লাগাল।
স্ক্রিনে পুরোনো ওয়ালপেপারটা ভেসে উঠতেই তার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।
মনে হলো, অনেকদিন পর সে যেন নিজের পুরোনো জীবনের দরজাটা আবার খুলছে।
প্রথম কাজ ছিল একটা নাম ঠিক করা।
খাতা নিয়ে বসে গেল।
একটার পর একটা নাম লিখতে লাগল।
"সিটি আপডেট।"
"জনতার খবর।"
"আজকের সংবাদ।"
কোনোটাই ভালো লাগল না।
সবগুলোই যেন কোথাও না কোথাও আগে শোনা।
সন্ধ্যার দিকে অর্ণব পড়তে পড়তে বলল,
"বাবা, নাম নিয়ে এত ভাবছ কেন?"
"কারণ নামটাই তো প্রথম পরিচয়।"
"তাহলে এমন নাম দাও, যেটা মানুষ একবার শুনলেই মনে রাখবে।"
ছেলের কথাটা মাথায় গেঁথে গেল।
রাতের খাওয়া শেষ হওয়ার পরও বিভূ খাতাটা নিয়ে বসে রইল।
একসময় হঠাৎ একটা নাম মাথায় এলো।
"খবর এখন"
দুটি সাধারণ শব্দ।
কিন্তু নামটার মধ্যে একটা তাড়াহুড়ো ছিল।
একটা জরুরিতা ছিল।
যেন এইমাত্র কোথাও কিছু ঘটেছে, আর মানুষ সেটা জানতে চাইছে।
বিভূ কয়েকবার নামটা মনে মনে উচ্চারণ করল।
"খবর এখন..."
তার ভালো লাগল।
খুব ভালো লাগল।
সে সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে সার্চ করল।
নামটা খালি।
কেউ ব্যবহার করেনি।
বহুদিন পর তার মনে হলো, সে সত্যিই নতুন কিছু শুরু করতে যাচ্ছে।
সেই রাতেই পেজ তৈরি হয়ে গেল।
খবর এখন
প্রোফাইল ছবি।
কভার ছবি।
বেসিক তথ্য।
সবকিছু সাজাতে সাজাতে তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নতুন করে একটা অফিস তৈরি করছে।
শুধু এবার অফিসটা তার নিজের।
পেজের বর্ণনায় সে লিখল—
"দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ খবর সবার আগে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা।"
স্ক্রিনে পেজটার নাম ভেসে উঠতেই বিভূ কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
অন্য কারও কাছে এটা হয়তো একটা সাধারণ ফেসবুক পেজ।
কিন্তু তার কাছে এটা ছিল নতুন করে শুরু করার সুযোগ।
চার বছরের ব্যর্থতা, অপমান আর অনিশ্চয়তার পর প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
হয়তো এখনও খেলা শেষ হয়ে যায়নি।
পরের দিন সকালেই সে পুরোনো কয়েকজন পরিচিতকে ফোন করল।
জেলার এক পুরোনো সংবাদদাতা।
একজন ক্যামেরাম্যান।
একজন রাজনৈতিক কর্মী।
যারা একসময় খবরের সূত্র হিসেবে কাজ করত।
প্রথমে সবাই অবাক হলো।
তারপর ধীরে ধীরে আগ্রহ দেখাতে শুরু করল।
"আবার শুরু করছ নাকি?"
একজন হেসে বলল।
"দেখি। এবার নিজের জন্য।"
বিভূ উত্তর দিল।
ফোন রাখার পর তার মনে হলো, হয়তো এখনও সব সংযোগ শেষ হয়ে যায়নি।
হয়তো এখনও কিছু মানুষ তাকে মনে রেখেছে।
এক সপ্তাহের মধ্যে সে কয়েকটা ছোট খবর সংগ্রহ করে ফেলল।
বেশিরভাগই স্থানীয় ঘটনা।
কোথাও রাস্তা খারাপ।
কোথাও জল জমে আছে।
কোথাও ছোটখাটো দুর্ঘটনা।
জাতীয় খবর নয়।
বড় কিছু নয়।
তবু শুরু তো।
এবার ভিডিও বানানোর পালা।
বহুদিন পর ক্যামেরার সামনে বসে তার অদ্ভুত লাগছিল।
একসময় এই পরিবেশ তার কাছে খুব স্বাভাবিক ছিল।
আজ যেন সবকিছু নতুন।
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেছে।
শুধু বিভূ কম্পিউটারের সামনে বসে ভিডিও এডিট করছে।
ক্লিপ কাটছে।
অডিও ঠিক করছে।
শিরোনাম লিখছে।
একটা সময় ক্লান্ত হয়ে সে চেয়ারে হেলান দিল।
স্ক্রিনে তার প্রথম ভিডিও প্রস্তুত।
মাত্র তিন মিনিট চব্বিশ সেকেন্ড।
কিন্তু ভিডিওটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হচ্ছিল, এটা শুধু একটা ভিডিও নয়।
এটা গত চার বছরের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে তার প্রথম জবাব।
মাউসের কার্সর ধীরে ধীরে "Publish" বাটনের উপর গিয়ে থামল।
বিভূ গভীর শ্বাস নিল।
তারপর ক্লিক করল।
ভিডিও আপলোড হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
Published Successfully
বিভূ অনেকক্ষণ স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, জীবনটা হয়তো সত্যিই নতুন করে শুরু হতে চলেছে।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
আর সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে বিভূ নিজের প্রথম ভিডিওর পেজটা রিফ্রেশ করল।
স্ক্রিনে সংখ্যা ভেসে উঠল।
Views: 0
সে হালকা হাসল।
শুরু তো হয়েছে।
এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
তার বিশ্বাস ছিল—
আর কয়েক মাস।
আর একটু পরিশ্রম।
আর একটু ধৈর্য।
তারপর হয়তো সব বদলে যাবে।
সে জানত না, সত্যিই সব বদলাবে।
তবে যেভাবে বদলাবে, সেটা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
_________________________________
ভিডিওটা আপলোড করার পর প্রায় দশ মিনিট ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসেছিল বিভূ।
Views: 0
তারপর ১।
তারপর ৩।
আরও কিছুক্ষণ পরে ৭।
সেদিন সংখ্যাগুলো দেখে তার খারাপ লাগেনি।
কারণ সে জানত, নতুন একটা পেজ রাতারাতি জনপ্রিয় হয় না।
সময় লাগে।
ধৈর্য লাগে।
পরিশ্রম লাগে।
আর পরিশ্রম করতে সে প্রস্তুত ছিল।
সেই রাতেই ঘুমোতে যাওয়ার আগে আরও একবার পেজটা খুলেছিল সে।
Views: 19
মুখে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠেছিল।
উনিশজন মানুষ।
পৃথিবীর কোথাও উনিশজন মানুষ তার ভিডিওটা দেখেছে।
সংখ্যাটা ছোট।
কিন্তু শূন্য নয়।
শুরু করার জন্য সেটাই যথেষ্ট।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথম কাজ ছিল মোবাইলটা হাতে নেওয়া।
ফেসবুক খুলে ভিডিওর অবস্থা দেখা।
Views: 43
বিভূর মনটা হালকা হয়ে গেল।
এভাবেই শুরু হয়েছিল।
প্রথম সপ্তাহ।
প্রথম মাস।
তারপর দ্বিতীয় মাস।
প্রতিদিন একটা করে ভিডিও।
কখনও দুটো।
কখনও তিনটে।
খবর সংগ্রহ করা।
ভিডিও বানানো।
এডিট করা।
থাম্বনেইল তৈরি করা।
শিরোনাম লেখা।
আপলোড করা।
আবার পরের খবরের খোঁজ।
একটা সময় সে বুঝতেই পারছিল না, সে আসলে চাকরি করছে নাকি নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।
কিন্তু সে থামেনি।
কারণ তার বিশ্বাস ছিল—
একদিন না একদিন ফল আসবেই।
এক সন্ধ্যায় মিতালী চা নিয়ে তার পাশে এসে বসল।
বিভূ তখন ল্যাপটপের সামনে।
স্ক্রিনে ফেসবুকের analytics খোলা।
"কী দেখছো?"
মিতালী জিজ্ঞেস করল।
"ভিউ।"
"কেমন হচ্ছে?"
বিভূ একটু হেসে বলল,
"মোটামুটি।"
মিতালী স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
ভিডিওটার ভিউ—
৩১
সে কিছু বলল না।
বিভূও না।
দুজনেই জানত, ৩১ ভিউকে "মোটামুটি" বলা যায় না।
কিন্তু মাঝে মাঝে মানুষ সত্যিটাকে অন্য নামে ডাকে।
নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
দিন কেটে যাচ্ছিল।
আর "খবর এখন"-এর পেজে জমা হচ্ছিল ভিডিও।
দশটা।
কুড়িটা।
তিরিশটা।
পঞ্চাশটা।
কিন্তু ফলাফল প্রায় একই।
কোনোটায় ২৫ ভিউ।
কোনোটায় ৪০।
কোনোটায় ৮০।
মাঝে মাঝে ১০০ পার হলে বিভূর ভালো লাগত।
তারপর আবার বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়াত।
একশো ভিউ দিয়ে সংসার চলে না।
একশো ভিউ দিয়ে স্কুলের ফি জমা হয় না।
একশো ভিউ দিয়ে বিদ্যুতের বিল মেটে না।
এক রাতে অর্ণব পড়তে পড়তে বলল,
"বাবা?"
"হুঁ?"
"তোমার পেজে এখন কতজন ফলোয়ার?"
বিভূ স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
সংখ্যাটা খুব বড় নয়।
"একশো সাতাত্তর।"
অর্ণব মাথা নাড়ল।
"একদিন অনেক হবে।"
বিভূ হাসল।
"আশা করি।"
ছেলেটা আবার পড়ায় মন দিল।
কিন্তু বিভূর মনে হলো, অর্ণব তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিষয়টা তার ভালো লাগল না।
কারণ বাবারা সন্তানদের সান্ত্বনা দেয়।
উল্টোটা নয়।
সেদিন গভীর রাতে সে আবার analytics খুলল।
গত এক মাসের performance।
গ্রাফটা প্রায় সোজা।
কোনো বড় উত্থান নেই।
কোনো বড় পরিবর্তন নেই।
শুধু ধীর, ক্লান্ত, হতাশাজনক অগ্রগতি।
বিভূ চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
চার মাস।
পুরো চার মাস হয়ে গেছে।
এত পরিশ্রম।
এত সময়।
এত আশা।
তারপরও সে এখনও শুরুতেই দাঁড়িয়ে।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
বিদ্যুতের বিল।
বকেয়া পরিশোধের নোটিশ।
বিভূ মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
মনে পড়ল, আগামী সপ্তাহে অর্ণবের স্কুলের ফি-ও দিতে হবে।
মেয়ের বইয়ের টাকাও বাকি।
রান্নাঘরে গ্যাস প্রায় শেষ।
আর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের অবস্থা?
সেটা না ভাবাই ভালো।
একটা সময় সে বিশ্বাস করত, কঠোর পরিশ্রমের মূল্য একদিন না একদিন পাওয়া যায়।
এখন সে নিশ্চিত নয়।
কারণ গত চার বছর ধরে সে পরিশ্রমই তো করছে।
তবুও ফল কোথায়?
ঘড়িতে তখন রাত একটা।
সারা বাড়ি ঘুমিয়ে।
শুধু বিভূ জেগে।
স্ক্রিনের আলো তার ক্লান্ত মুখে পড়ছে।
সে আবার পেজটা রিফ্রেশ করল।
নতুন ভিডিও।
দুপুরে আপলোড করেছিল।
অনেক যত্ন করে বানানো।
তথ্য যাচাই করা।
ভালোভাবে সম্পাদনা করা।
পরিষ্কার উপস্থাপনা।
সব মিলিয়ে তার মতে এটাই ছিল সবচেয়ে ভালো ভিডিও।
স্ক্রিনে সংখ্যা ভেসে উঠল।
Views: 21
বিভূ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
একুশ।
মাত্র একুশ।
তারপর অ্যালগরিদম তাকে নিচে আরেকটা ভিডিও দেখাল।
অন্য একটা ছোট নিউজ পেজ।
মাসখানেক আগেও যাদের ফলোয়ার ছিল তার চেয়েও কম।
ভিডিওর শিরোনামটা চটকদার।
থাম্বনেইলটা আরও চটকদার।
খবরের গুরুত্ব খুব বেশি নয়।
তবুও...
87K Views
বিভূর হাত থেমে গেল।
সে আবার সংখ্যাটা দেখল।
ভুল দেখছে না তো?
না।
সত্যিই সাতাশি হাজার।
একটা ভিডিও।
সাতাশি হাজার ভিউ।
কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে বসে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে ভিডিওটা খুলল।
কী এমন করেছে ওরা?
কেন মানুষ এটা দেখছে?
কেন?
ভিডিওটা চলতে শুরু করল।
আর সেই মুহূর্তে বিভূ বুঝতেও পারল না, সে এমন একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চলেছে—
যেটা তার পুরো জীবনটাই বদলে দেবে।
____________________________
ভিডিওটা শেষ হতে বেশি সময় লাগল না।
মোটে দুই মিনিট।
বিভূ পুরোটা মন দিয়ে দেখল।
একবার।
তারপর আবার।
তারপর তৃতীয়বার।
কিন্তু যতবারই দেখছে, ততবারই তার বিভ্রান্তি বাড়ছে।
খবরটা বিশেষ কিছু নয়।
একটা স্থানীয় ঘটনা।
তথ্যও খুব বেশি নেই।
ভিডিওর মানও অসাধারণ নয়।
তবু—
87K Views
সংখ্যাটা মাথার ভেতর বারবার ঘুরতে লাগল।
রাত তখন প্রায় দেড়টা।
সারা বাড়ি ঘুমিয়ে।
শুধু বিভূ ল্যাপটপের সামনে বসে।
তার চোখের সামনে একের পর এক ভিডিও খুলছে।
একটা পেজ।
আরেকটা পেজ।
তারপর আরও একটা।
যেগুলো আগে কখনও গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি।
আজ দেখছে।
খুঁটিয়ে দেখছে।
কারণ সে বুঝতে চায়।
সমস্যাটা কোথায়?
কেন মানুষ তার ভিডিও দেখছে না?
প্রথম পেজ।
খবরের চেয়ে নাটকীয়তা বেশি।
দ্বিতীয় পেজ।
তথ্যের চেয়ে আবেগ বেশি।
তৃতীয় পেজ।
শিরোনাম পড়েই মনে হয় পৃথিবী শেষ হয়ে যাচ্ছে।
বিভূ চুপচাপ দেখতে থাকল।
একসময় সে খাতা বের করল।
নোট নিতে শুরু করল।
শিরোনামগুলো লিখে রাখল।
থাম্বনেইলের ভাষা লিখে রাখল।
ভিডিওর গঠন লিখে রাখল।
আর ধীরে ধীরে একটা বিষয় পরিষ্কার হতে লাগল।
মানুষ খবর দেখতে আসে না।
মানুষ অনুভূতি দেখতে আসে।
ভয়।
রাগ।
কৌতূহল।
আতঙ্ক।
চমক।
এই জিনিসগুলোই তাদের আটকে রাখে।
একটা তথ্যভিত্তিক, নির্ভুল, শান্ত ভিডিওর চেয়ে—
একটা উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও অনেক বেশি মনোযোগ পায়।
বিষয়টা মেনে নিতে তার খারাপ লাগছিল।
কারণ পুরো কর্মজীবনে সে একটা জিনিস শিখেছিল—
খবর মানে সত্য।
তথ্য।
যাচাই।
দায়িত্ব।
কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়া যেন অন্য নিয়মে চলে।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও বিষয়টা মাথা থেকে গেল না।
চা খেতে খেতে সে আবার কয়েকটা জনপ্রিয় ভিডিও দেখল।
অর্ণব স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মিতালী রান্নাঘরে।
আর বিভূ বসে আছে স্ক্রিনের সামনে।
ভিডিও।
ভিডিও।
ভিডিও।
হঠাৎ মিতালী এসে দাঁড়াল।
"কী এত দেখছো?"
"অন্য পেজ।"
"কেন?"
বিভূ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"বোঝার চেষ্টা করছি।"
"কী?"
"মানুষ কী দেখতে চায়।"
মিতালী উত্তর দিল না।
কারণ প্রশ্নটার উত্তর তারও জানা নেই।
সেদিন দুপুরে একটা ছোটখাটো খবর পেল বিভূ।
একটা বাজারে আগুন লেগেছিল।
বড় কোনো ক্ষতি হয়নি।
ফায়ার ব্রিগেড এসে দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে।
খবরটা নিয়ে ভিডিও বানাতে বসে সে থমকে গেল।
পুরোনো অভ্যাস অনুযায়ী তার প্রথম শিরোনাম ছিল—
"স্থানীয় বাজারে অগ্নিকাণ্ড, দ্রুত নিয়ন্ত্রণে পরিস্থিতি"
খুব স্বাভাবিক।
খুব তথ্যভিত্তিক।
খুব নিরস।
সে কিছুক্ষণ শিরোনামটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আগের রাতে দেখা ভিডিওগুলোর কথা মনে পড়ল।
ধীরে ধীরে শিরোনামটা মুছে দিল।
নতুন করে লিখল—
"হঠাৎ আগুনে আতঙ্ক! বাজারে কী ঘটেছিল?"
কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর চেয়ারে হেলান দিল।
মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনো ভুল কাজ করছে।
কিন্তু আবার মনে হলো—
খবর তো একই আছে।
শুধু উপস্থাপনাটা বদলেছে।
তাহলে সমস্যা কোথায়?
ভিডিওটা আপলোড করে সে অপেক্ষা করতে লাগল।
এক ঘণ্টা।
দুই ঘণ্টা।
তিন ঘণ্টা।
সন্ধ্যার দিকে analytics খুলতেই সে থমকে গেল।
সংখ্যাটা খুব বড় নয়।
কিন্তু আগের তুলনায় অনেক বেশি।
দুইশোরও বেশি ভিউ।
সাধারণত যেখানে চল্লিশ-পঞ্চাশের মধ্যে আটকে যেত।
সেখানে এবার কয়েকশো।
বিভূর বুকের ভেতর হালকা উত্তেজনা তৈরি হলো।
কাকতালীয়?
নাকি সত্যিই কিছু বদলাচ্ছে?
পরের সপ্তাহে সে আরও পরীক্ষা করল।
আরও কিছু শিরোনাম।
আরও কিছু thumbnail।
আরও কিছু পরিবর্তন।
খবর একই।
কিন্তু উপস্থাপনা একটু বেশি নাটকীয়।
ফলাফলও একই।
ভিউ বাড়ছে।
খুব বেশি নয়।
কিন্তু বাড়ছে।
প্রথমবারের মতো "খবর এখন"-এর follower সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করল।
একদিন রাতে analytics-এর গ্রাফের দিকে তাকিয়ে বিভূর মনে হলো, বহুদিন পর সে সামনে এগোচ্ছে।
সংখ্যাগুলো এখনও ছোট।
কিন্তু অন্তত মৃত নয়।
ঠিক তখনই তার মাথার ভেতর একটা অস্বস্তিকর চিন্তা জন্ম নিল।
যদি মানুষ সত্যিই তথ্যের জন্য না আসে?
যদি তারা শুধু উত্তেজনার জন্য আসে?
তাহলে একজন সংবাদকর্মীর কাজ কী?
সত্য বলা?
নাকি মানুষের মনোযোগ ধরে রাখা?
প্রশ্নটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলল।
কারণ এর উত্তর সে জানত।
অন্তত একসময় জানত।
কিন্তু ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা।
বকেয়া বিল।
স্কুলের ফি।
আর প্রতিদিনের ব্যর্থতা—
এসব জিনিস মানুষকে নিজের বিশ্বাস নিয়েও সন্দেহ করতে শেখায়।
সেদিন গভীর রাতে বিভূ আবার পেজটা খুলল।
নতুন follower এসেছে।
নতুন comment এসেছে।
নতুন share এসেছে।
সংখ্যাগুলো খুব বড় নয়।
তবুও অনেকদিন পর তার মনে হলো—
হয়তো সে একটা সূত্র খুঁজে পেয়েছে।
হয়তো অবশেষে বুঝতে পারছে, এই খেলাটা কীভাবে খেলতে হয়।
আর সেই উপলব্ধিটাই ধীরে ধীরে তাকে এমন একটা পথে নিয়ে যেতে শুরু করল—
যেখান থেকে আর ফিরে আসা সহজ নয়।
_______________________________________________
অলৌকিকভাবে নয়।
হঠাৎ করেও নয়।
কিন্তু পরিবর্তনটা চোখে পড়ার মতো।
আগে যেখানে একটা ভিডিও পঞ্চাশ ভিউ পেত, এখন সেখানে দুইশো।
আগে যেখানে একশো ভিউ পেলে ভালো লাগত, এখন সেটা স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।
Follower-ও বাড়ছে।
খুব দ্রুত নয়।
তবু বাড়ছে।
বিভূ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে analytics দেখত।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে আবার দেখত।
একটা সময় সে বুঝতে পারল, ভিউয়ের সংখ্যা দেখাটা তার অভ্যাস হয়ে গেছে।
ঠিক যেমন কেউ বারবার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চেক করে।
অথবা পরীক্ষার ফল বেরোনোর অপেক্ষা করে।
সংখ্যাগুলো যেন তার মনের উপর অদ্ভুত প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
ভিউ বাড়লে মন ভালো।
ভিউ কমলে মন খারাপ।
একটা সময় সে নিজেও বুঝতে পারছিল না, সে খবর তৈরি করছে নাকি সংখ্যার পেছনে ছুটছে।
তবু একটা বিষয় তাকে খুশি করছিল।
অনেকদিন পর সে আবার নিজেকে দরকারি মনে করতে শুরু করেছে।
এক সন্ধ্যায় মিতালী বলল,
"আজ তোমাকে বেশ খুশি লাগছে।"
বিভূ হেসে ফেলল।
"খুশি হওয়ার মতো কিছু হয়েছে।"
"কী?"
"আজ তিনশো নতুন follower এসেছে।"
মিতালী সংখ্যাটার গুরুত্ব বুঝল না।
কিন্তু বিভূ বুঝল।
কারণ এই তিনশো follower-এর পেছনে লুকিয়ে আছে বহু মাসের পরিশ্রম।
বহু রাত জেগে কাজ করা।
বহু হতাশা।
বহু ব্যর্থতা।
সেই রাতেই একটা পুরোনো সূত্রের ফোন এল।
লোকটার নাম সঞ্জয়।
একসময় জেলার নানা খবর প্রথমে তার কাছ থেকেই পেত বিভূ।
"হ্যালো বিভূদা।"
"হ্যাঁ বলো।"
ওপাশ থেকে চাপা গলায় উত্তর এল।
"একটা বড় ঘটনা হয়েছে।"
বিভূর ভেতরে পুরোনো উত্তেজনাটা জেগে উঠল।
"কী ঘটনা?"
"একজন ব্যবসায়ীকে খুন করা হয়েছে।"
বিভূ চুপ করে গেল।
খুন।
শব্দটা শুনলেই মানুষের মনোযোগ বদলে যায়।
সঞ্জয় আরও কিছু তথ্য দিল।
ঘটনাটা শহরের উপকণ্ঠে।
পুলিশ এখনও পুরো তথ্য প্রকাশ করেনি।
স্থানীয় কিছু সাংবাদিক ছাড়া খুব বেশি কেউ জানেও না।
ফোন কেটে যাওয়ার পর বিভূ কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইল।
তারপর পুরোনো দিনের মতো দ্রুত কাজ শুরু করল।
একজনকে ফোন।
তারপর আরেকজনকে।
তারপর তৃতীয়জনকে।
খণ্ড খণ্ড তথ্য জুড়ে একটা বড় ছবি তৈরি হতে লাগল।
মৃত ব্যবসায়ীর নাম।
ঘটনার সময়।
ঘটনাস্থল।
পুলিশের প্রাথমিক অনুমান।
সবকিছু না।
কিন্তু অন্যদের চেয়ে বেশি।
অনেক বেশি।
বহুদিন পর বিভূর মনে হলো, সে আবার নিজের পুরোনো জায়গায় ফিরে এসেছে।
রাতের মধ্যেই সে ভিডিও তৈরির কাজে লেগে গেল।
এবার কাজ করার সময় তার ভেতরে অন্যরকম একটা শক্তি কাজ করছিল।
কারণ এটা সাধারণ খবর নয়।
এটা বড় খবর।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—
এই খবরটা অন্য অনেকের আগেই তার হাতে এসেছে।
রাত দুটো নাগাদ ভিডিও তৈরি শেষ হলো।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিভূ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর ভিডিও আপলোড করে দিল।
খবর এখন
ব্রেকিং নিউজ
শিরোনামটা এবার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
কিন্তু বিভূর মনে হলো, এইবার সেটা প্রাপ্য।
কারণ খবরটাও বড়।
ভিডিও আপলোড করে সে ঘুমোতে গেল।
কিন্তু ঘুম এল না।
বারবার মনে হচ্ছিল—
কতজন দেখছে?
কতজন share করছে?
কতজন comment করছে?
রাত তিনটায় উঠে আবার মোবাইল চেক করল।
তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
Views: 1,432
এক মুহূর্তের জন্য সে বিশ্বাসই করতে পারল না।
এক হাজার চারশো।
তার জীবনের অন্য সব ভিডিও মিলিয়েও এত ভিউ হয়নি।
সে আবার সংখ্যা দেখল।
ভুল নয়।
সত্যিই এক হাজারের বেশি।
ঘুমটা পুরো উধাও হয়ে গেল।
সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথম কাজ ছিল আবার পেজ খোলা।
সংখ্যাটা এবার আরও বড়।
Views: 8,900
Share-এর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
Comment আসছে।
Follower বাড়ছে।
মানুষ ভিডিওটা অন্যদের পাঠাচ্ছে।
বিভূ অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার হাত কাঁপছিল।
উত্তেজনায়।
অবিশ্বাসে।
আনন্দে।
অনেকদিন পর তার মনে হলো, হয়তো এতদিনের পরিশ্রম সত্যিই ফল দিতে শুরু করেছে।
সারাদিন সে প্রায় প্রতি দশ মিনিটে analytics খুলছিল।
সংখ্যাগুলো বাড়ছিল।
নিরন্তর।
অবিরাম।
যেন কেউ থামার সুযোগই দিচ্ছে না।
বিকেলের দিকে অর্ণব স্কুল থেকে ফিরে বলল,
"বাবা!"
"কী?"
"তোমার ভিডিওটা আমি দেখেছি।"
বিভূ হেসে ফেলল।
"কেমন?"
"অনেক মানুষ দেখছে।"
ছেলেটার গলায় গর্ব ছিল।
খুব সামান্য।
কিন্তু বিভূ সেটা টের পেল।
আর সেই মুহূর্তে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিল।
বহুদিন পর সে নিজেকে ব্যর্থ মনে করছিল না।
সেদিন রাতে মিতালীও খেয়াল করল, অনেকদিন পর বিভূর মুখে হাসি।
খাওয়ার টেবিলে সে আগের চেয়ে বেশি কথা বলছে।
বেশি প্রাণবন্ত লাগছে।
কিন্তু কেউ জানত না, তার ভেতরে আরেকটা জিনিস জন্ম নিচ্ছে।
খুব ধীরে।
খুব নীরবে।
ভিউয়ের নেশা।
স্বীকৃতির নেশা।
সংখ্যার নেশা।
রাত বারোটার পরে সারা বাড়ি ঘুমিয়ে পড়ার পর বিভূ আবার একা বসে analytics খুলল।
স্ক্রিনে বড় বড় সংখ্যা জ্বলছে।
Views: 27,000+
Shares: 3,000+
Followers: দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে
বিভূর চোখ সেই সংখ্যাগুলোর উপর স্থির হয়ে রইল।
এতদিন ধরে সে শুধু ব্যর্থতা দেখেছে।
আজ সে সাফল্য দেখছে।
এবং সেই সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়—
খুন।
হঠাৎ তার মাথায় একটা অস্বস্তিকর উপলব্ধি এল।
গত কয়েক মাসে যত ভিডিও বানিয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ কোনটা দেখল?
কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নয়।
কোনো সামাজিক সমস্যা নয়।
কোনো তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন নয়।
একটা খুন।
একজন মানুষের মৃত্যু।
বিভূ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল।
তার সামনে স্ক্রিনে সংখ্যাগুলো বাড়ছে।
আর ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করল—
অপরাধ শুধু পুলিশ আর আদালতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়।
অপরাধ বিক্রিও হয়।
মনোযোগ বিক্রি করে।
ভিউ বিক্রি করে।
আর সেই উপলব্ধিটাই অদূর ভবিষ্যতে তাকে এমন এক সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে চলেছে—
যার পর আর কিছুই আগের মতো থাকবে না।
_____________________________________________
ব্যবসায়ীর খুনের খবরটা "খবর এখন"-এর জন্য একটা মোড় ঘোরানো ঘটনা হয়ে দাঁড়াল।
পরের কয়েকদিন ধরে সেই ভিডিওতেই মানুষ আসতে থাকল।
পুরোনো ভিডিওও দেখতে লাগল।
Follower বাড়ল।
Page reach বাড়ল।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
বিভূর আত্মবিশ্বাস বাড়ল।
অনেকদিন পর সে আবার সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজ করার আগ্রহ অনুভব করছিল।
কিন্তু সেই আগ্রহের সঙ্গে আরও একটা জিনিস ধীরে ধীরে জুড়ে যাচ্ছিল।
প্রত্যাশা।
এখন আর সে শুধু ভিডিও আপলোড করত না।
সে অপেক্ষা করত।
সংখ্যার জন্য।
Reaction-এর জন্য।
Share-এর জন্য।
Comment-এর জন্য।
একটা ভিডিও ভালো করলে তার মন ভালো থাকত।
খারাপ করলে পুরো দিনটাই নষ্ট হয়ে যেত।
এক বিকেলে মিতালী খেয়াল করল, বিভূ খাওয়ার টেবিলেও ফোন নামাচ্ছে না।
বারবার স্ক্রিন দেখছে।
"কী হয়েছে?"
মিতালী জিজ্ঞেস করল।
"কিছু না।"
"কিছু না হলে পাঁচ মিনিটে সাতবার ফোন দেখছ কেন?"
বিভূ হেসে উড়িয়ে দিল।
কিন্তু উত্তরটা সে নিজেও জানত।
সে analytics দেখছিল।
একটা নতুন ভিডিও কত দ্রুত ছড়াচ্ছে সেটা দেখছিল।
আর এই অভ্যাসটা প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ছিল।
তার মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তনও দেখা দিতে শুরু করল।
আগে কোনো খবর পেলে সে প্রথমে তথ্য যাচাই করত।
এখন সে প্রথমে ভাবত—
"এটা মানুষ দেখবে তো?"
একদিন একটা গুজব ছড়াল যে শহরের এক স্কুলে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় কয়েকজন ছাত্র অসুস্থ হয়েছে।
পুরো তথ্য তখনও পরিষ্কার নয়।
পুলিশ কিছু বলেনি।
স্কুলও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
পুরোনো বিভূ হয়তো অপেক্ষা করত।
সব তথ্য নিশ্চিত হওয়ার জন্য।
কিন্তু নতুন বিভূ একটা ভিডিও বানিয়ে ফেলল।
সাবধানে।
আইন ভাঙার মতো কিছু নয়।
কিন্তু শিরোনামটা এমন—
যেটা মানুষকে ক্লিক করতে বাধ্য করে।
ভিডিওটা ভালো চলল।
খুব ভালো।
আর সেই সাফল্য তাকে আরও সাহসী করে তুলল।
দিনের পর দিন একই জিনিস চলতে থাকল।
একটু বেশি নাটকীয় thumbnail।
একটু বেশি চমকপ্রদ headline।
একটু বেশি আবেগ।
একটু কম সতর্কতা।
পার্থক্যগুলো খুব ছোট।
কিন্তু জমতে জমতে বড় হয়ে উঠছিল।
আর একই সময়ে তার ব্যক্তিগত জীবনেও চাপ বাড়ছিল।
এক সন্ধ্যায় বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল একজন লোক।
মিতালী দরজা খুলতেই লোকটা বলল,
"বিভূদা আছেন?"
বিভূ বেরিয়ে এল।
লোকটাকে সে চিনত।
নাম গৌতম দে।
পাড়ারই মানুষ।
বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।
কয়েক মাস আগে তার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিল বিভূ।
টাকার অঙ্ক খুব বড় নয়।
কিন্তু এখনও ফেরত দিতে পারেনি।
গৌতমের মুখ গম্ভীর।
"কী খবর বিভূদা?"
"ভালো।"
"আমার টাকার খবরটা কেমন?"
প্রশ্নটা শুনে বিভূ অস্বস্তি বোধ করল।
"আরেকটু সময় দাও।"
গৌতম হেসে উঠল।
কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা ছিল না।
"এই কথাটা তো তিন মাস ধরে শুনছি।"
বিভূ চুপ করে রইল।
পাশে দাঁড়িয়ে মিতালীও কিছু বলল না।
গৌতম এবার একটু নিচু গলায় বলল,
"দেখো, আমিও টাকার গাছ লাগিয়ে বসে নেই।"
"জানি।"
"জানো যখন, তখন ফেরত দিচ্ছ না কেন?"
কথাটা খুব জোরে বলা হয়নি।
তবু বিভূর কানে অপমানের মতো লাগল।
কারণ সে জানত, লোকটা ভুল কিছু বলছে না।
তবুও শুনতে খারাপ লাগছিল।
অনেক খারাপ।
শেষ পর্যন্ত কোনো রকমে পরিস্থিতি সামলে গৌতম চলে গেল।
কিন্তু যাওয়ার আগে বলে গেল,
"পরের মাসের মধ্যে না পেলে আমি আর ভদ্রভাবে কথা বলব না।"
দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না।
রাতে খাওয়ার সময়ও বিভূ প্রায় চুপচাপ ছিল।
মিতালী একবার বলল,
"লোকটা হয়তো নিজের টাকার জন্যই বলেছে।"
বিভূ কোনো উত্তর দিল না।
কারণ বিষয়টা টাকার ছিল না।
বিষয়টা ছিল আত্মসম্মানের।
পরদিন থেকে সে গৌতমকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল।
রাস্তায় দেখলে অন্যদিকে চলে যেত।
দোকানে দেখলে অপেক্ষা করত।
মুখোমুখি হতে চাইত না।
কিন্তু ছোট শহরে কাউকে চিরদিন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
একদিন বাজারে দুজনের আবার দেখা হয়ে গেল।
গৌতম দূর থেকেই ডাকল,
"বিভূদা!"
বিভূ শুনেও না শোনার ভান করল।
গৌতম এবার সামনে এসে দাঁড়াল।
"কথা বলারও সময় নেই নাকি?"
চারপাশে লোকজন ছিল।
খুব বেশি নয়।
তবু কয়েকজন।
বিভূর সেটা ভালো লাগল না।
"এখন ব্যস্ত আছি।"
"কিসে ব্যস্ত?"
গৌতমের গলায় কটাক্ষ।
"ফেসবুকে খবর দিতে?"
বিভূর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
"তুমি কী বলতে চাইছ?"
"কিছু না। শুধু ভাবছিলাম, খবর দিতে সময় আছে, টাকা ফেরত দিতে নেই।"
কথাটা আশপাশের দু-একজনও শুনে ফেলল।
তাদের মধ্যে একজন হালকা হেসে উঠল।
সেই হাসিটাই বিভূর ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিল।
সে কোনো উত্তর না দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
কিন্তু সেদিন রাতে ঘটনাটা বারবার মাথায় ফিরে এল।
গৌতমের কথা।
মানুষের হাসি।
নিজের অসহায়তা।
সবকিছু।
একদিকে সে সোশ্যাল মিডিয়ায় ধীরে ধীরে পরিচিত হচ্ছে।
মানুষ তার ভিডিও দেখছে।
তার নাম জানছে।
অন্যদিকে বাস্তব জীবনে সে এখনও ধার শোধ করতে না পারা একজন বেকার মানুষ।
এই দ্বন্দ্বটা তাকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছিল।
রাত গভীর হলে সে আবার analytics খুলল।
সংখ্যাগুলো বাড়ছে।
Follower বাড়ছে।
Comment বাড়ছে।
মানুষ তার কথা শুনছে।
কিন্তু তবুও কেন তার জীবন বদলাচ্ছে না?
কেন এখনও তাকে অপমান শুনতে হচ্ছে?
কেন এখনও সে টাকার জন্য দুশ্চিন্তা করছে?
প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর তার কাছে ছিল না।
তবে একটা বিষয় সে বুঝতে শুরু করেছিল।
যে পৃথিবীতে মনোযোগই সবচেয়ে বড় মুদ্রা, সেখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের সীমারেখা ভুলে যায়।
আর বিভূও হয়তো সেই দিকেই হাঁটছিল।
সে তখনও জানত না—
খুব শিগগিরই গৌতম দে-র সঙ্গে তার আরেকবার দেখা হবে।
আর সেই সাক্ষাৎ তাদের দুজনের জীবনকেই বদলে দেবে।
_____________________________________________________
সারা সপ্তাহটাই অদ্ভুত কেটেছিল বিভূর।
বাইরে থেকে দেখলে সবকিছু স্বাভাবিক।
প্রতিদিনের মতো ভিডিও।
প্রতিদিনের মতো খবর।
প্রতিদিনের মতো analytics।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন কিছু একটা বদলে যাচ্ছিল।
গৌতম দে-র সঙ্গে বাজারের সেই ঘটনাটা বারবার ফিরে আসছিল মাথায়।
কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল।
কোনো গালাগাল নয়।
কোনো হুমকিও নয়।
তবু অপমানের স্মৃতি অনেক সময় শব্দের চেয়ে বেশি জ্বালায়।
বিশেষ করে যখন মানুষ নিজের অবস্থান সম্পর্কে আগেই অনিশ্চিত থাকে।
সেদিন রাতেও বিভূ কম্পিউটারের সামনে বসে ছিল।
নতুন একটা ভিডিও আপলোড করেছে।
খুব খারাপ যায়নি।
তবু তার মন ভালো ছিল না।
ঘড়িতে তখন সাড়ে দশটা।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
বিভূ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে কলটা ধরল।
"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে ভেসে এল পরিচিত গলা।
গৌতম।
"চিনতে পেরেছ?"
বিভূর মুখ শক্ত হয়ে গেল।
"কী ব্যাপার?"
"কথা আছে।"
"ফোনেই বলো।"
"ফোনে বলা যাবে না।"
"কেন?"
গৌতম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"আজই দেখা করতে হবে।"
"এখন?"
"হ্যাঁ।"
"কাল বলো।"
"না। আজ।"
গলাটা এমন ছিল, যেন কোনো আলোচনা নয়।
সিদ্ধান্ত জানানো হচ্ছে।
বিভূর বিরক্তি বাড়তে লাগল।
"কোথায়?"
গৌতম একটা জায়গার নাম বলল।
শহরের প্রান্তে পুরোনো গুদামঘরের পাশের রাস্তা।
এলাকাটা খুব ব্যস্ত নয়।
রাতে তো আরও ফাঁকা হয়ে যায়।
ফোন কেটে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল বিভূ।
যাওয়া উচিত?
নাকি নয়?
শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত নিল যাবে।
বিষয়টা শেষ করা দরকার।
চিরদিন এভাবে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়।
মিতালীকে বলল, একটা খবরের সূত্রের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে।
এটা পুরোপুরি মিথ্যা নয়।
তবু পুরো সত্যিও নয়।
রাত তখন প্রায় এগারোটা।
আকাশে মেঘ জমেছে।
বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
বিভূ মোটরবাইক চালিয়ে নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছাল।
গৌতম আগেই এসে দাঁড়িয়ে ছিল।
একটা পুরোনো স্ট্রিটলাইটের নিচে।
আলোটা বারবার জ্বলছে আর নিভছে।
দৃশ্যটা অদ্ভুত লাগছিল।
বিভূ বাইক থেকে নামল।
"কী এমন জরুরি কথা?"
গৌতম সরাসরি উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
"আমার টাকাটা কবে দেবে?"
বিভূ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আবার সেই একই কথা?"
"হ্যাঁ। কারণ একই সমস্যাও এখনও আছে।"
"আমি বলেছি না, একটু সময় লাগবে।"
"কত সময়?"
"জানি না।"
"মানে?"
"মানে জানি না।"
গৌতম এবার হেসে ফেলল।
সেই একই তিক্ত হাসি।
"তুমি সত্যিই ভাবছ আমি বোকা?"
বিভূর ধৈর্য ভাঙতে শুরু করল।
"তুমি কী চাও?"
"আমার টাকা।"
"এই মুহূর্তে নেই।"
"কিন্তু ফেসবুকে বড় সাংবাদিক সাজার সময় আছে।"
বিভূর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
"আবার শুরু করো না।"
"কেন করব না?"
গৌতম এগিয়ে এল।
"পাড়ার সবাই জানে তুমি কী করছ।"
"কী করছি?"
"নাটক।"
শব্দটা বাতাসে ছুরির মতো কেটে গেল।
বিভূর বুকের ভেতর জমে থাকা রাগটা যেন এক মুহূর্তে জেগে উঠল।
গত কয়েক বছরের অপমান।
ব্যর্থতা।
বেকারত্ব।
অর্থকষ্ট।
সবকিছু মিলেমিশে এক অদ্ভুত উত্তাপ তৈরি করছিল।
"মুখ সামলে কথা বলো।"
সে নিচু গলায় বলল।
গৌতম পিছিয়ে গেল না।
বরং আরও একধাপ এগিয়ে এল।
"নাহলে কী করবে?"
চারপাশে তখন সম্পূর্ণ নীরবতা।
দূরে কোথাও বজ্রপাতের শব্দ হলো।
তারপর প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল।
একটা।
দুটো।
তারপর আরও।
বাতাস ঠান্ডা হয়ে উঠতে লাগল।
কিন্তু দুই মানুষের ভেতরে তখন অন্য ঝড়।
"তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ।"
বিভূ বলল।
"আর তুমি?"
গৌতম উত্তর দিল।
"তুমি কি সীমা মানছ?"
"আমি তোমার টাকা ফেরত দেব।"
"কবে?"
"দেব বলেছি!"
"কিন্তু কবে?"
একই প্রশ্ন।
বারবার।
বারবার।
বারবার।
হঠাৎ গৌতম বিভূর শার্টের কলার চেপে ধরল।
খুব জোরে নয়।
তবু যথেষ্ট।
বিভূর মাথার ভেতর যেন কিছু একটা ছিঁড়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে হাত সরানোর চেষ্টা করল।
"হাত ছাড়ো!"
"আগে উত্তর দাও!"
"ছাড়ো বলছি!"
বৃষ্টির গতি বেড়ে গেল।
স্ট্রিটলাইটের আলো ভিজে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
দুজনের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হলো।
একটা হাত।
একটা ধাক্কা।
একটা টান।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে পরে কোনটা আগে আর কোনটা পরে ঘটেছিল, সেটা মনে করাও কঠিন।
গৌতম পিছিয়ে গেল।
নাকি তাকে পিছিয়ে দেওয়া হলো?
বিভূ নিজেও নিশ্চিত নয়।
মাটিতে জল জমেছিল।
পা পিছলে গেল।
নাকি ধাক্কার কারণে ভারসাম্য হারাল?
পরের মুহূর্তেই একটা ভারী শব্দ হলো।
ধপ!
গৌতম মাটিতে পড়ে গেছে।
মাথাটা রাস্তার ধারের ভাঙা সিমেন্টের কোণায় লেগেছে।
এক মুহূর্তের জন্য সবকিছু থেমে গেল।
বৃষ্টি।
বাতাস।
শব্দ।
সময়।
সবকিছু।
বিভূ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে।
হাত কাঁপছে।
মাথার ভেতর ঝড় বইছে।
"গৌতম?"
কোনো উত্তর নেই।
সে আরও কাছে গেল।
"গৌতম!"
লোকটা নড়ল না।
বৃষ্টির জল মুখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
চোখ বন্ধ।
শরীর স্থির।
বিভূ হাঁটু গেড়ে বসল।
হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল।
ঠান্ডা।
অস্বাভাবিকভাবে স্থির।
তার বুকের ভেতর হঠাৎ একটা ভয় জন্ম নিল।
সেই ধরনের ভয়, যা মানুষ জীবনে খুব কমবার অনুভব করে।
সে চারদিকে তাকাল।
রাস্তা ফাঁকা।
কেউ নেই।
কোনো সাক্ষী নেই।
কোনো শব্দ নেই।
শুধু বৃষ্টি।
অবিরাম বৃষ্টি।
তার মাথায় প্রথম চিন্তাটা এলো—
অ্যাম্বুলেন্স।
পুলিশ।
হাসপাতাল।
কিন্তু সেই চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা চিন্তাও জন্ম নিল।
খুব দ্রুত।
খুব অস্বস্তিকর।
খুব বিপজ্জনক।
একটা বড় ঘটনা ঘটেছে।
একটা এমন ঘটনা, যেটা কাল শহরের আলোচনার বিষয় হবে।
পুলিশ আসবে।
সাংবাদিক আসবে।
মানুষ কথা বলবে।
আর "খবর এখন"?
সেটা কি সবার আগে খবরটা পেতে পারে?
বিভূর বুকের ভেতর কাঁপন শুরু হলো।
সে নিজের চিন্তাকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।
একজন মানুষ মাটিতে পড়ে আছে।
সম্ভবত মৃত।
আর তার মাথায় খবরের কথা আসছে?
সে পিছিয়ে গেল।
দুই কদম।
তারপর আরও দুই কদম।
বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল।
অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে।
গৌতমের নিথর শরীরের দিকে তাকিয়ে।
আর সেই মুহূর্তে, জীবনে প্রথমবারের মতো, তার ভেতরে মানুষ আর সংবাদকর্মীর সীমারেখাটা ঝাপসা হয়ে গেল।
লোকটার শরীরটা আর নড়ছিল না।
চারপাশে শুধু বৃষ্টির শব্দ।
বিভূ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আর সেই মুহূর্তে তার মাথায় প্রথম যে চিন্তাটা এল, সেটা পুলিশের নয়।
সেটা ছিল খবরের।
___________________________________
সেই রাতে ঠিক কতক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, পরে আর মনে করতে পারেনি বিভূ।
পাঁচ মিনিট?
দশ মিনিট?
নাকি আরও বেশি?
সময় যেন হঠাৎ তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলেছিল।
শুধু মনে আছে, বৃষ্টি পড়ছিল।
নিরবচ্ছিন্ন।
আর রাস্তার ধারে পড়ে ছিল গৌতম দে।
নিথর।
অচল।
ভয়টা প্রথমে এসেছিল।
তারপর এসেছিল অবিশ্বাস।
তারপর এমন একটা অনুভূতি, যার কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই।
মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের জীবনটাকে বাইরে থেকে দেখছে।
যেন ঘটনাটা তার সঙ্গে ঘটছে না।
অন্য কারও সঙ্গে ঘটছে।
কিন্তু বাস্তবতা খুব নির্মম।
শেষ পর্যন্ত সে সেখান থেকে চলে এসেছিল।
কীভাবে বাড়ি ফিরল, সেটাও পরে স্পষ্ট মনে ছিল না।
শুধু মনে আছে, বাড়ি ঢোকার সময় রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল।
মিতালী তখন ঘুমিয়ে।
ড্রইংরুম অন্ধকার।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ।
আর তার জামাকাপড় ভিজে একাকার।
বাথরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল সে।
কিছুক্ষণ।
নীরবে।
নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে।
মুখটা অদ্ভুত ফ্যাকাশে লাগছিল।
হঠাৎ মনে হলো, আয়নার ভেতরের মানুষটাকে সে চেনে না।
নল খুলে মুখে জল দিল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
তবু বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা গেল না।
সেদিন রাতে ঘুম আসেনি।
বিছানায় শুয়ে বারবার চোখ বন্ধ করার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু যতবার চোখ বন্ধ করেছে, ততবার সেই দৃশ্যটা ফিরে এসেছে।
স্ট্রিটলাইট।
বৃষ্টি।
ধাক্কাধাক্কি।
আর তারপর—
ধপ।
শব্দটা যেন মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
ভোরের দিকে হয়তো কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছিল।
হয়তো না।
সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখন মাথাটা ভারী লাগছিল।
ঘড়িতে সাড়ে আটটা।
মিতালী রান্নাঘরে।
অর্ণব স্কুলের জন্য তৈরি হচ্ছে।
সবকিছু স্বাভাবিক।
এতটাই স্বাভাবিক যে বিভূর অস্বস্তি হচ্ছিল।
কীভাবে পৃথিবী এত স্বাভাবিক থাকতে পারে?
যখন গত রাতে...
সে বাকিটা ভাবল না।
মোবাইলটা হাতে নিল।
Facebook খুলল।
তারপর স্থানীয় কয়েকটা নিউজ গ্রুপ।
প্রথমে কিছুই পেল না।
তার বুকের ভেতর হালকা স্বস্তি এল।
হয়তো...
হয়তো লোকটা বেঁচে গেছে।
হয়তো হাসপাতালে গেছে।
হয়তো...
ঠিক তখনই একটা পোস্ট চোখে পড়ল।
একজন লিখেছে—
"শহরের উপকণ্ঠে রহস্যজনক মৃত্যু। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।"
বিভূর বুক ধক করে উঠল।
সে দ্রুত পোস্টটা খুলল।
তথ্য খুব কম।
নাম উল্লেখ নেই।
ছবি নেই।
কিন্তু জায়গাটা সেই একই।
পুরোনো গুদামঘরের পাশের রাস্তা।
বিভূর গলা শুকিয়ে গেল।
সে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তারপর আবার তুলে নিল।
মনে হচ্ছিল, হাত কাঁপছে।
"কী হয়েছে?"
মিতালীর গলা শুনে সে চমকে উঠল।
"না... কিছু না।"
"শরীর খারাপ?"
"ঘুম কম হয়েছে।"
মিতালী সন্দেহের চোখে তাকাল।
কিন্তু আর কিছু বলল না।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো।
আর শহরের মধ্যে খবরটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
দুপুর নাগাদ নামটাও প্রকাশ পেল।
গৌতম দে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা—
দুর্ঘটনা হতে পারে।
আবার অন্য সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তদন্ত চলছে।
বিভূ খবরটা পড়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
"দুর্ঘটনা হতে পারে।"
লাইনটা বারবার মাথায় ঘুরছিল।
দুর্ঘটনা।
হ্যাঁ।
এটাই তো।
গৌতম পড়ে গিয়েছিল।
সে কি ইচ্ছা করে মেরেছিল?
না।
সে কি কাউকে হত্যা করার জন্য সেখানে গিয়েছিল?
না।
সে কি পরিকল্পনা করেছিল?
না।
তাহলে?
তাহলে এটা দুর্ঘটনা।
নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল বিভূ।
আবার করল।
আরও একবার করল।
কিন্তু মনের একটা অংশ যেন পুরোপুরি রাজি হলো না।
কারণ সে জানে, শেষ ধাক্কাটা কে দিয়েছিল।
অথবা অন্তত সে মনে করে, দিয়েছিল।
বিকেলের দিকে সে বাড়ির বাইরে বেরোল।
অজুহাত—খবর সংগ্রহ।
আসল কারণ—ঘটনাস্থল দেখতে চায়।
নিজের চোখে।
পুলিশ এখনও এলাকাটা ঘিরে রেখেছে।
কৌতূহলী মানুষের ভিড়।
দু-একজন সাংবাদিক।
মোবাইল ক্যামেরা।
ফিসফাস।
জল্পনা।
সব মিলিয়ে একটা ছোটখাটো আলোড়ন।
বিভূ ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল।
যেন সে অন্য সবার মতোই একজন সাধারণ দর্শক।
কেউ তাকে চিনল না।
কেউ সন্দেহ করল না।
কেউ জানল না, সে আগের রাতে এখানে ছিল।
তার সামনে দুজন লোক কথা বলছিল।
"শুনেছি মাথায় আঘাত লেগেছিল।"
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু কেউ দেখেনি নাকি?"
"না।"
"তাহলে রহস্য তো আছেই।"
বিভূ চুপচাপ শুনছিল।
প্রতিটা শব্দ।
প্রতিটা অনুমান।
প্রতিটা গুজব।
তারপর হঠাৎ একটা বিষয় তার মাথায় এল।
এই মুহূর্তে এখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চেয়ে সে অনেক বেশি জানে।
অনেক বেশি।
সে জানে গৌতম রাতে সেখানে কেন এসেছিল।
সে জানে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল।
সে জানে ঠিক কোথায় লোকটা পড়েছিল।
সে জানে এমন কিছু তথ্য, যা এখনও পুলিশও হয়তো জানে না।
এই উপলব্ধিটা তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি তৈরি করল।
ভয়?
হ্যাঁ।
অপরাধবোধ?
সেটাও।
কিন্তু আরও একটা জিনিস ছিল।
খুব পরিচিত একটা অনুভূতি।
সাংবাদিক জীবনে বহুবার অনুভব করেছে।
এক্সক্লুসিভ তথ্য হাতে থাকার অনুভূতি।
অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকার অনুভূতি।
বিভূ দ্রুত সেই চিন্তাটা মাথা থেকে সরিয়ে দিতে চাইল।
এটা ভাবার সময় নয়।
এটা ভাবা উচিতও নয়।
একজন মানুষ মারা গেছে।
এখানে খবরের কথা আসছে কেন?
কিন্তু চিন্তা তো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
ফিরতি পথে মোটরবাইক চালাতে চালাতেও বিষয়টা মাথায় ঘুরছিল।
পুলিশের কাছে যা নেই—
তার কাছে আছে।
অন্য সাংবাদিকদের কাছে যা নেই—
তার কাছে আছে।
বাড়ি ফিরে সে সরাসরি কম্পিউটারের সামনে বসল।
কাজ করার জন্য নয়।
শুধু খবরগুলো দেখবে বলে।
কিন্তু একটার পর একটা পোস্ট খুলতে খুলতে সে বুঝল, বেশিরভাগ পেজ এখনও খুব কম তথ্য নিয়ে কাজ করছে।
কেউ বলছে দুর্ঘটনা।
কেউ বলছে খুন।
কেউ বলছে রহস্যময় মৃত্যু।
কেউই নিশ্চিত নয়।
কেউই পুরো ছবি জানে না।
আর ঠিক তখনই বিভূর মাথায় একটা বিপজ্জনক চিন্তা স্পষ্ট আকার নিতে শুরু করল।
যদি...
যদি "খবর এখন" সবার আগে বিস্তারিত খবরটা প্রকাশ করে?
সে দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
মনে হলো, নিজেকে একটা চড় মারা উচিত।
এমন চিন্তা মাথায় আসছে কীভাবে?
কিন্তু যতই অস্বীকার করুক, চিন্তাটা ইতিমধ্যে জন্ম নিয়েছে।
আর জন্ম নেওয়া চিন্তাকে মেরে ফেলা সবসময় সহজ নয়।
সন্ধ্যা নামতে শুরু করল।
জানলার বাইরে আকাশ ধূসর।
কম্পিউটারের স্ক্রিনে গৌতম দে-র মৃত্যুর খবর।
আর বিভূ বৈদ্য স্থির হয়ে বসে আছে।
একজন মানুষ হিসেবে তার ভেতরে আতঙ্ক কাজ করছে।
কিন্তু একজন সংবাদকর্মী হিসেবে সে বুঝতে পারছে—
তার সামনে জীবনের সবচেয়ে বড় খবরটা পড়ে আছে।
আর সেই খবর সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি তথ্যও তার কাছেই আছে।
প্রশ্ন শুধু একটাই—
সে কোন পরিচয়টাকে বেছে নেবে?
মানুষ?
নাকি সংবাদকর্মী?
সেই উত্তর এখনও তার জানা নেই।
কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে।
__________________________________________
ভিডিওটা আপলোড করার পর প্রথম এক ঘণ্টা বিভূ প্রায় চেয়ার ছেড়ে ওঠেনি।
কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
Analytics খোলা।
মন্তব্যগুলো আসতে শুরু করেছে।
মানুষ প্রশ্ন করছে।
অনুমান করছে।
নিজেদের মতামত দিচ্ছে।
ভিডিওর শিরোনামটা সে অনেক ভেবেচিন্তে লিখেছিল।
মিথ্যা কিছু নয়।
আবার পুরো সত্যিও নয়।
এমনভাবে লেখা, যাতে মানুষ ক্লিক না করে থাকতে না পারে।
আর সেটাই কাজ করেছে।
প্রথম ঘণ্টায় ভিউ ছাড়িয়ে গেল এক হাজার।
দ্বিতীয় ঘণ্টায় তিন হাজার।
তৃতীয় ঘণ্টায় পাঁচ হাজার।
বিভূ বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
মাত্র কয়েক মাস আগেও যেখানে একটা ভিডিও একশো ভিউ পেত না, সেখানে এখন হাজার হাজার মানুষ তার ভিডিও দেখছে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যাটাও বাড়তে লাগল।
সে বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল—
এটা স্বাভাবিক।
বড় খবর।
মানুষ দেখবেই।
কিন্তু মনের ভেতর আরেকটা কণ্ঠস্বর বলছিল—
না।
এটা শুধু বড় খবর নয়।
এটা তোমার সুযোগ।
অনেকদিন পর ভাগ্য তোমার দিকে তাকিয়েছে।
সেই রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগেও সে কয়েকবার ফোন চেক করল।
ভিউ বাড়ছে।
Follower বাড়ছে।
Share বাড়ছে।
সবকিছু যেন একসঙ্গে ঘটছে।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথম কাজ ছিল Facebook খোলা।
সংখ্যাটা দেখে তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
Views: 43,000+
চোখের পাতা কয়েকবার ফেলল সে।
ভুল দেখছে না তো?
না।
সংখ্যাটা সত্যি।
তেতাল্লিশ হাজারেরও বেশি মানুষ ভিডিওটা দেখেছে।
তার হাত কাঁপতে শুরু করল।
বহুদিন পরে এমন একটা অনুভূতি হলো, যেটা সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।
সাফল্য।
নিঃসন্দেহ, স্পষ্ট, বাস্তব সাফল্য।
সকালের নাস্তার টেবিলে মিতালী খেয়াল করল, আজ বিভূর মুখে অন্যরকম উজ্জ্বলতা।
"কী হয়েছে?"
বিভূ ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
মিতালী কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
সংখ্যাগুলোর প্রকৃত গুরুত্ব সে পুরোপুরি বুঝল না।
তবু বুঝল, বিষয়টা বড়।
"এত মানুষ দেখেছে?"
"হ্যাঁ।"
বিভূর গলায় গর্ব ছিল।
চাপা, কিন্তু স্পষ্ট।
মিতালীর মুখেও হালকা হাসি ফুটল।
"তাহলে ভালোই তো।"
বিভূ কিছু বলল না।
কিন্তু অনেকদিন পরে তার মনে হলো, হয়তো সে সত্যিই কিছু একটা করতে পেরেছে।
সেদিন বিকেলে অর্ণব স্কুল থেকে ফিরে উত্তেজিত গলায় বলল,
"বাবা, তোমার ভিডিওটা আমার বন্ধুরাও দেখেছে।"
বিভূ অবাক হয়ে তাকাল।
"সত্যি?"
"হ্যাঁ। স্কুলে কথা হচ্ছিল।"
ছেলেটার চোখে গর্ব ছিল।
আর সেই গর্বটাই বিভূকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল।
কারণ গত কয়েক বছর ধরে সে শুধু হতাশা দেখেছে।
আজ তার ছেলে তাকে নিয়ে গর্ব করছে।
এই অনুভূতির দাম টাকায় মাপা যায় না।
দিনের শেষে ভিডিওটা আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল।
বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার হতে লাগল।
মানুষ ভিডিওর নিচে লিখছে—
"সবচেয়ে আগে খবরটা এখানেই দেখলাম।"
"খবর এখন সবসময় আপডেট দেয়।"
"চ্যানেলটা দ্রুত বড় হবে।"
এই মন্তব্যগুলো পড়তে পড়তে বিভূর বুকের ভেতর অদ্ভুত উষ্ণতা তৈরি হচ্ছিল।
সে জানত, এসব মন্তব্যের অনেকটাই ক্ষণস্থায়ী।
তবু ভালো লাগছিল।
খুব ভালো লাগছিল।
রাতের দিকে একটা ফোন এল।
স্থানীয় একটা মোবাইল দোকানের মালিক।
লোকটা আগে কখনও তাকে ফোন করেনি।
"দাদা, আপনার পেজে একটা বিজ্ঞাপন দিতে চাই।"
বিভূ প্রথমে ভেবেছিল, ভুল শুনেছে।
"বিজ্ঞাপন?"
"হ্যাঁ। আপনার reach এখন ভালো। একটা promotional video দিলে কেমন হয়?"
কয়েক সেকেন্ড সে কোনো উত্তরই দিতে পারল না।
কারণ এই মুহূর্তটার জন্যই তো সে এতদিন অপেক্ষা করছিল।
লোকটা বলল,
"অবশ্য খুব বড় budget না।"
বাজেট বড় না ছোট, সেটা তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
গুরুত্বপূর্ণ ছিল অন্য কিছু।
কেউ প্রথমবার তার কাজের মূল্য দিতে চাইছে।
ফোন কেটে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ সে স্থির হয়ে বসে রইল।
মনে পড়ল সেই দিনগুলোর কথা, যখন একটা ভিডিওতে বিশটা ভিউ আসত।
মনে পড়ল বিদ্যুতের বিলের নোটিশ।
ধার করা টাকা।
ব্যর্থতার রাতগুলো।
সবকিছু।
আর এখন?
প্রথম বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব।
হয়তো ছোট।
তবু বাস্তব।
সেই রাতে সে আবার analytics খুলল।
ভিডিওটা এক লক্ষ ভিউয়ের দিকে এগোচ্ছে।
Follower সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
প্রতিটা নতুন notification তার শরীরে উত্তেজনার ঢেউ তুলছে।
হঠাৎ তার মনে হলো, সে যেন অনেকদিন পরে আবার বেঁচে উঠেছে।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা অস্বস্তিকর উপলব্ধি তাকে ছুঁয়ে গেল।
এই পুরো সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু কী?
একজন মৃত মানুষ।
গৌতম দে।
যে মানুষটার সঙ্গে কয়েকদিন আগেও তার ঝগড়া হয়েছিল।
যে মানুষটা আজ আর বেঁচে নেই।
বিভূ কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর সেই চিন্তাটাকে সরিয়ে দিল।
নিজেকে বোঝাল—
সে কাউকে ব্যবহার করছে না।
সে শুধু খবর প্রকাশ করেছে।
একজন সংবাদকর্মী হিসেবে নিজের কাজ করেছে।
ব্যস।
কিন্তু মনের গভীরে কোথাও একটা প্রশ্ন থেকে গেল।
যদি এই ঘটনা না ঘটত?
তাহলে কি আজ "খবর এখন" এত দ্রুত বড় হতো?
প্রশ্নটার উত্তর সে জানত।
আর সেই উত্তরটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখাচ্ছিল।
কারণ ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করেছে—
এই পৃথিবীতে মানুষের মনোযোগের সবচেয়ে বড় চুম্বক হলো অপরাধ।
আর অপরাধ যত বড় হয়—
ভিউও তত বড় হয়।
সেদিন রাতের শেষে, ঘুমোতে যাওয়ার আগে, বিভূ শেষবারের মতো স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
সংখ্যাগুলো এখনও বাড়ছে।
নিঃশব্দে।
অবিরাম।
আর তার অজান্তেই, সেই সংখ্যাগুলোর প্রতি এক ধরনের আসক্তি জন্ম নিতে শুরু করেছে।
একটা নেশা।
যেটা এখনও ছোট।
কিন্তু খুব দ্রুত বড় হতে চলেছে।
________________________________
গৌতম দে-র মৃত্যুর ঘটনার পর কেটে গেল প্রায় তিন সপ্তাহ।
এই তিন সপ্তাহে বিভূর জীবন এমনভাবে বদলাতে শুরু করল, যা কয়েক মাস আগেও তার কাছে কল্পনার মতো মনে হতো।
"খবর এখন" আর আগের সেই ছোট্ট, অচেনা পেজ নেই।
এখন মানুষ নামটা চিনতে শুরু করেছে।
কমেন্টে অনেকে লিখছে—
"খবর এখন থাকলে অন্য পেজ দেখার দরকার হয় না।"
"সবচেয়ে দ্রুত আপডেট দেয়।"
"এখানকার রিপোর্টিং আলাদা।"
এই প্রশংসাগুলো পড়তে পড়তে বিভূর মনে হতো, বহু বছর পর সে যেন আবার নিজের পরিচয় ফিরে পাচ্ছে।
কোভিডের সময় চাকরি হারানোর পর সবচেয়ে বড় আঘাতটা শুধু আর্থিক ছিল না।
বরং নিজের গুরুত্ব হারানোর অনুভূতি ছিল আরও কষ্টদায়ক।
অফিসে থাকাকালীন ফোন বেজে উঠত।
মানুষ খবর জানতে চাইত।
মিটিং থাকত।
দায়িত্ব থাকত।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল।
তারপর একদিন সব শেষ।
হঠাৎ করেই।
যেন কেউ তার পরিচয়টাই কেড়ে নিয়েছিল।
কিন্তু এখন?
এখন আবার মানুষ তার ফোনে কল করছে।
মেসেজ করছে।
খবর পাঠাচ্ছে।
কেউ কেউ নিজেরাই বলছে—
"দাদা, আগে আপনাকেই জানালাম।"
এই কথাগুলো শুনতে ভালো লাগত।
খুব ভালো লাগত।
একদিন দুপুরে সেই মোবাইল দোকানের মালিক সত্যিই অফিসে এল।
অফিস বলতে অবশ্য বিভূর বাড়ির ছোট্ট ঘর।
যেখানে একটা পুরোনো টেবিল।
একটা ল্যাপটপ।
দু-তিনটা খাতা।
আর দেয়ালে ঝোলানো "খবর এখন"-এর লোগো।
লোকটা চারপাশে তাকিয়ে হেসে বলল,
"দাদা, ভাবছিলাম বড় অফিস হবে।"
বিভূও হেসে ফেলল।
"একদিন হবে।"
কথাটা মজা করে বললেও, ভেতরে ভেতরে সে সত্যিই সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।
আলোচনার শেষে বিজ্ঞাপনের চুক্তি হলো।
অঙ্কটা খুব বড় নয়।
কিন্তু বিভূর কাছে সেটা অনেক।
অনেকদিন পর নিজের উপার্জনের টাকা হাতে পেল সে।
নোটগুলো হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ছিল।
কেউ খেয়াল করেনি।
কিন্তু তার চোখে জল এসে গিয়েছিল।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় সে অর্ণবের জন্য একটা নতুন জ্যামিতি বক্স কিনল।
মেয়ের জন্য একটা গল্পের বই।
মিতালীর জন্য মিষ্টি।
খুব দামি কিছু নয়।
তবু বাড়িতে ঢোকার সময় তার মনে হচ্ছিল, যেন সে বড় কোনো যুদ্ধ জিতে ফিরেছে।
মিতালী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"আজ এত কিছু?"
বিভূ শুধু বলল,
"কাজের টাকা পেয়েছি।"
মিতালী কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে হাসল।
সেই হাসিটা বিভূর কাছে হাজার ভিউয়ের চেয়েও মূল্যবান ছিল।
সেদিন রাতে অনেকদিন পর পরিবারের চারজন একসঙ্গে বসে গল্প করল।
অর্ণব স্কুলের কথা বলল।
মেয়ে তার নতুন বইয়ের কথা বলল।
মিতালী ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলল।
আর বিভূ চুপচাপ শুনছিল।
মনে হচ্ছিল, হয়তো সত্যিই সবকিছু বদলাতে শুরু করেছে।
কিন্তু মানুষ যখন দীর্ঘদিন অভাবের মধ্যে থাকে, তখন সাফল্যের স্বাদ অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
কারণ সে শুধু সাফল্য চায় না।
সে আরও সাফল্য চায়।
আরও।
আরও।
আরও।
বিভূর ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটতে শুরু করল।
এক রাতে সে একা বসে analytics দেখছিল।
গত এক মাসের সমস্ত ভিডিওর পরিসংখ্যান খুলে তুলনা করছিল।
কোন ভিডিও কত ভিউ পেয়েছে।
কতক্ষণ মানুষ দেখেছে।
কতজন শেয়ার করেছে।
একসময় সে একটা কাগজে হিসাব লিখতে শুরু করল।
প্রথমে কৌতূহলবশত।
তারপর ধীরে ধীরে একটা বিষয় চোখে পড়ল।
অপরাধ-সংক্রান্ত ভিডিওগুলো সবসময় এগিয়ে।
সবসময়।
খুন।
ডাকাতি।
রহস্যজনক মৃত্যু।
নিখোঁজ।
পুলিশি অভিযান।
এসব খবর অন্য সবকিছুকে হারিয়ে দিচ্ছে।
একটা রাস্তা মেরামতের খবর?
কম ভিউ।
একটা স্কুলের অনুষ্ঠান?
খুব কম ভিউ।
একটা সামাজিক উদ্যোগ?
মোটামুটি।
কিন্তু একটা খুন?
বিস্ফোরণ।
বিভূ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল।
চোখ স্ক্রিনে।
মাথায় হিসাব।
একবার নয়।
বারবার একই ফল।
যত বড় অপরাধ।
তত বড় ভিউ।
যত বড় ভিউ।
তত বড় follower।
যত বড় follower।
তত বড় আয়।
সমীকরণটা ভয়ঙ্করভাবে সহজ।
সেদিন প্রথমবার সে নিজের খাতায় একটা লাইন লিখল—
"মানুষ খবরের জন্য আসে না। মানুষ উত্তেজনার জন্য আসে।"
লাইনটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর খাতাটা বন্ধ করে দিল।
কিন্তু কথাটা মাথা থেকে গেল না।
পরের কয়েকদিন সে আরও খেয়াল করতে শুরু করল।
পুলিশ স্টেশনের সূত্রগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিতে লাগল।
অপরাধের খবর খুঁজতে লাগল।
রাতের ফোনকল ধরতে লাগল।
যে খবরগুলো আগে হয়তো খুব একটা গুরুত্ব পেত না, এখন সেগুলোই তার কাছে মূল্যবান হয়ে উঠছে।
একদিন পুরোনো এক সহকর্মীর সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল।
লোকটা মজা করে বলল,
"তুই তো এখন crime specialist হয়ে গেছিস।"
বিভূ হেসে উড়িয়ে দিল।
কিন্তু ফোন কেটে যাওয়ার পর কথাটা মনে রয়ে গেল।
Crime specialist.
হয়তো সত্যিই।
কারণ এখন সে জানে, কোথায় মনোযোগ আছে।
কোথায় দর্শক আছে।
কোথায় টাকা আছে।
আর সেই উপলব্ধিটা ধীরে ধীরে তার চিন্তাভাবনাকে বদলে দিচ্ছিল।
বাড়ির সবাই শুধু পরিবর্তনের ভালো দিকটাই দেখছিল।
অর্থ আসছে।
সম্মান বাড়ছে।
চিন্তা কমছে।
কিন্তু কেউ বুঝতে পারছিল না, বিভূর ভেতরে আরেকটা পরিবর্তন চলছে।
একটা অদৃশ্য পরিবর্তন।
যেখানে মানুষের মৃত্যু আর শুধুই ট্র্যাজেডি নয়।
সেটা একটা "স্টোরি"।
একটা "ব্রেকিং নিউজ"।
একটা "ভিউ জেনারেটর"।
প্রথমদিকে এই ভাবনাটা তাকে অস্বস্তি দিত।
এখন আর ততটা দেয় না।
এটাই সবচেয়ে ভয়ের বিষয়।
সেদিন গভীর রাতে সে আবার analytics খুলল।
একটা পুরোনো অপরাধ-সংক্রান্ত ভিডিওর ভিউ এখনও বাড়ছে।
ধীরে ধীরে।
কিন্তু থামছে না।
বিভূর ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল।
তারপর সে নিজের খাতাটা খুলল।
নতুন একটা পাতায় লিখল—
"যখন বড় অপরাধ ঘটে, খবর এখন বড় হয়।"
লাইনটা লিখে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।
বাইরে তখন রাত গভীর।
সারা বাড়ি ঘুমিয়ে।
শুধু বিভূ জেগে আছে।
আর তার অজান্তেই, সফলতার স্বাদ ধীরে ধীরে নেশায় পরিণত হচ্ছে।
একটা এমন নেশা—
যেটা মানুষকে নিজের অজান্তেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
_______________________________
গৌতম দে-র ঘটনার পর যে উত্থান শুরু হয়েছিল, সেটা চিরকাল একই গতিতে চলল না।
সোশ্যাল মিডিয়ার স্মৃতি খুব ছোট।
আজ যে খবর নিয়ে সবাই কথা বলে, কয়েকদিন পর সেটাই ভুলে যায়।
প্রথমদিকে বিভূ বিষয়টা বুঝতে পারেনি।
কারণ প্রতিদিনই নতুন follower আসছিল।
নতুন comment।
নতুন share।
নতুন বিজ্ঞাপন।
কিন্তু এক মাসের মাথায় analytics-এর গ্রাফে একটা পরিবর্তন চোখে পড়ল।
বৃদ্ধি এখনও আছে।
তবে আগের মতো নয়।
গতি কমে গেছে।
অনেকটাই।
এক রাতে সে পরিসংখ্যান খুলে বসেছিল।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
গত সপ্তাহের তুলনায় reach কমেছে।
কিছু ভিডিও প্রত্যাশামতো চলছে না।
Follower বাড়ছে, কিন্তু ধীরে।
খুব ধীরে।
একসময় যেসব সংখ্যা তাকে উত্তেজিত করত, এখন সেগুলো তাকে অস্বস্তি দিতে শুরু করল।
কারণ মানুষ খুব দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে যায়।
যে দশ হাজার ভিউ একসময় স্বপ্ন ছিল, এখন সেটা তাকে খুশি করতে পারছে না।
সে বিশ হাজার চায়।
ত্রিশ হাজার চায়।
পঞ্চাশ হাজার চায়।
আর যখন সেটা পায় না, তখন অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়।
সেদিন রাতেও মিতালী ঘুমিয়ে পড়ার পর বিভূ একা বসে ছিল।
ঘরের আলো নিভিয়ে শুধু ল্যাপটপের স্ক্রিনটা জ্বালিয়ে রেখেছে।
নীরব ঘরে শুধু ফ্যানের শব্দ।
আর analytics-এর সংখ্যা।
হঠাৎ তার মনে পড়ল গৌতম দে-র ঘটনার পরের দিনগুলোর কথা।
সেই উত্তেজনা।
সেই দ্রুত বাড়তে থাকা ভিউ।
সেই অবিশ্বাস্য সাফল্য।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
সে কি সেই সময়টাকে মিস করছে?
প্রশ্নটা মাথায় আসতেই সে অস্বস্তি বোধ করল।
কারণ প্রশ্নটার ভেতরে লুকিয়ে আছে আরেকটা প্রশ্ন।
আরেকটা বড় প্রশ্ন।
যার উত্তর সে শুনতে চায় না।
সে দ্রুত ল্যাপটপ বন্ধ করে দিল।
কিন্তু চিন্তাগুলো বন্ধ হলো না।
পরদিন দুপুরে একটা ছোট খবর কভার করতে গিয়েছিল সে।
একটা ব্যবসায়িক সমিতির সভা।
সাধারণ অনুষ্ঠান।
গুরুত্ব আছে।
কিন্তু উত্তেজনা নেই।
ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার বিরক্ত লাগছিল।
কয়েক মাস আগেও এমন কাজই করত সে।
আজ কেন যেন আর ভালো লাগছে না।
ফিরে আসার সময় পুরোনো এক পরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা হলো।
লোকটার নাম নির্মল সাহা।
মাঝবয়সী।
এলাকার পরিচিত ব্যবসায়ী।
প্রভাবশালীও বলা যায়।
কিন্তু খুব একটা জনপ্রিয় নয়।
অনেকের সঙ্গে ঝামেলা আছে।
কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার অভিযোগও শোনা যায়।
চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লোকটা উচ্চস্বরে কারও সঙ্গে তর্ক করছিল।
চারপাশে কয়েকজন মানুষ।
কেউ কিছু বলছে না।
শুধু শুনছে।
বিভূও থেমে গেল।
অভ্যাসবশত।
সংবাদকর্মীর কৌতূহল এখনও পুরোপুরি মরে যায়নি।
নির্মল সাহা রাগী গলায় বলছিল,
"আমার বিরুদ্ধে যা খুশি বললেই হবে না।"
ওপাশের লোকটাও চুপ ছিল না।
কথা কাটাকাটি চলল বেশ কিছুক্ষণ।
শেষে সবাই আলাদা হয়ে গেল।
ঘটনাটা খুব বড় কিছু নয়।
এমন ঘটনা প্রতিদিনই ঘটে।
তবু বিভূ বাড়ি ফেরার পরও লোকটার কথা ভুলতে পারল না।
কেন?
সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছিল না।
সম্ভবত লোকটা বিতর্কিত।
সম্ভবত তার নাম মানুষ চেনে।
সম্ভবত সে খবরের উপাদান খুঁজতে খুঁজতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যেখানে সাধারণ মানুষকেও গল্পের চরিত্রের মতো দেখতে শুরু করেছে।
সেই রাতেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
ঘুম আসছিল না।
বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিল।
হঠাৎ তার মাথায় নির্মল সাহার মুখটা ভেসে উঠল।
তারপর আরেকটা চিন্তা।
খুব ক্ষণিকের।
খুব দ্রুত।
কিন্তু যথেষ্ট স্পষ্ট।
যদি কোনোদিন ওই লোকটাকে নিয়ে বড় কোনো ঘটনা ঘটে?
"খবর এখন" কি সেটা থেকে লাভবান হবে?
চিন্তাটা মাথায় আসতেই সে চোখ খুলে ফেলল।
নিজের উপরই বিরক্তি লাগল।
এ কেমন চিন্তা?
একজন মানুষকে নিয়ে এমন ভাবা কি স্বাভাবিক?
সে নিজেকে বোঝাল, এটা শুধু পেশাগত চিন্তা।
সাংবাদিকরা সবসময় খবরের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবে।
এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।
কিন্তু মনের গভীরে সে জানত—
এটা পুরো সত্যি নয়।
কারণ আগে সে খবর খুঁজত।
এখন সে খবরের প্রভাব নিয়ে ভাবে।
ভিউ নিয়ে ভাবে।
সংখ্যা নিয়ে ভাবে।
আর এই পরিবর্তনটাই তাকে ভয় দেখানোর কথা।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—
সে আর ততটা ভয় পাচ্ছিল না।
কয়েক মিনিট পরে আবার চোখ বন্ধ করল বিভূ।
বাইরে তখন গভীর রাত।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
পাশে ঘুমিয়ে মিতালী।
অন্য ঘরে ছেলে-মেয়ে।
সবকিছু স্বাভাবিক।
সবকিছু শান্ত।
কিন্তু বিভূ বৈদ্যের মাথার ভেতর ধীরে ধীরে এমন কিছু বদলাচ্ছিল, যা বাইরে থেকে কেউ দেখতে পাচ্ছিল না।
অনেকদিন আগে হলে কোনো অন্ধকার চিন্তা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই সে নিজেকে থামিয়ে দিত।
নিজেকে ধমক দিত।
ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করত।
কিন্তু আজ সে তা করল না।
বরং অন্ধকার ঘরে চুপচাপ শুয়ে থেকে সেই চিন্তাটাকেই আরও কিছুক্ষণ ভাবতে থাকল।
আর ঠিক সেখানেই শুরু হলো তার পতনের পরের ধাপ।
___________________________________
গৌতম দে-র মৃত্যুর পর প্রায় দুই মাস কেটে গেছে।
শহরের মানুষের কাছে ঘটনাটা এখন আর নতুন নয়।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ যেটা নিয়ে চায়ের দোকান থেকে বাজার পর্যন্ত আলোচনা চলেছিল, সেটাও ধীরে ধীরে অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে গেছে।
এটাই স্বাভাবিক।
মানুষের জীবন থেমে থাকে না।
নতুন ঘটনা পুরোনো ঘটনাকে সরিয়ে দেয়।
নতুন আলোচনা পুরোনো রহস্যকে ভুলিয়ে দেয়।
কিন্তু সবাই ভুলে যায়নি।
অন্তত একজন ভুলে যায়নি।
সাব-ইন্সপেক্টর অরিজিৎ সেন।
বয়স মাত্র উনত্রিশ।
দুই বছর আগে পুলিশ একাডেমি থেকে বেরিয়েছে।
এরপর বিভিন্ন থানায় কাজ করেছে।
সম্প্রতি এই শহরে বদলি হয়ে এসেছে।
অনেকের চোখে সে অতিরিক্ত সিরিয়াস।
অনেকের মতে, অতিরিক্ত কৌতূহলী।
আর কিছু সিনিয়র অফিসারের মতে, "অতিরিক্ত বই পড়া ছেলে।"
অরিজিৎ এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না।
সে শুধু একটা জিনিসে বিশ্বাস করে—
প্রতিটা ঘটনার একটা উত্তর থাকে।
সেই উত্তর খুঁজে বের করাই তার কাজ।
সেদিন সকালে থানার রেকর্ড রুমে বসে সে পুরোনো কেস ফাইল দেখছিল।
বেশিরভাগই রুটিন কাজ।
হারিয়ে যাওয়া মোটরবাইক।
ছোটখাটো চুরি।
পারিবারিক অভিযোগ।
তার মাঝখানে একটা ফাইল বারবার চোখে পড়ছিল।
গৌতম দে — অস্বাভাবিক মৃত্যু।
ফাইলটা সে আগেও পড়েছে।
আজ আবার খুলল।
কারণ তার ভেতরে একটা ছোট্ট অস্বস্তি কাজ করছিল।
যদিও কোনো শক্ত প্রমাণ নেই।
তবু কিছু একটা যেন মিলছে না।
ফাইলের পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে আবার ঘটনাস্থলের ছবিগুলো দেখল।
বর্ষার রাত।
রাস্তার ধারে পড়ে থাকা দেহ।
মাথায় আঘাত।
প্রত্যক্ষদর্শী নেই।
স্পষ্ট শত্রুতার প্রমাণ নেই।
কোনো সিসিটিভি নেই।
সবকিছু মিলিয়ে দুর্ঘটনা বললেও চলে।
আবার খুন বললেও পুরোপুরি ভুল হয় না।
সমস্যা হলো—
দুই দিকের কোনো একটার পক্ষেই যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
অরিজিৎ চেয়ারে হেলান দিল।
তারপর পাশের টেবিলে বসা কনস্টেবলকে জিজ্ঞেস করল,
"গৌতম দে-র কেসটা শেষ পর্যন্ত কী হিসেবে গেছে?"
লোকটা ফাইল থেকে চোখ না তুলেই বলল,
"অপেন আছে স্যার।"
"কেউ follow-up করেনি?"
"বিশেষ না।"
"কেন?"
কনস্টেবল হেসে বলল,
"কারণ করার মতো কিছু নেই।"
অরিজিৎ কিছু বলল না।
কিন্তু তার ভেতরের অস্বস্তিটা রয়ে গেল।
দুপুরে থানার ক্যান্টিনে বসে চা খাওয়ার সময়ও বিষয়টা মাথায় ঘুরছিল।
ঠিক তখনই আরেকজন অফিসার এসে পাশে বসল।
"কী নিয়ে এত ভাবছ?"
"গৌতম দে-র কেস।"
লোকটা হেসে ফেলল।
"ওটা নিয়ে এখনও পড়ে আছ?"
"কেন?"
"কারণ ওই কেসে কিছু নেই।"
"কীভাবে নিশ্চিত?"
"কারণ থাকলে এতদিনে বেরোত।"
অরিজিৎ উত্তর দিল না।
সে জানে, পুলিশের কাজে "মনে হয়" খুব বিপজ্জনক শব্দ।
অনেক কেস বছরের পর বছর অমীমাংসিত থাকে।
তার মানে এই নয় যে উত্তর নেই।
শুধু উত্তরটা এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সন্ধ্যায় থানার কাজ শেষ করে সে বাড়ি ফিরছিল।
বাইক চালাতে চালাতে রাস্তার পাশে একটা ইলেকট্রনিক্স দোকানের সামনে তার চোখ পড়ল।
দোকানের টিভিতে একটা ভিডিও চলছে।
লোকজন দাঁড়িয়ে দেখছে।
স্ক্রিনে বড় করে লেখা—
"খবর এখন"
অরিজিৎ কয়েক সেকেন্ড থেমে গেল।
পেজটার নাম সে আগেও শুনেছে।
শহরের জনপ্রিয় হয়ে ওঠা লোকাল নিউজ পেজ।
প্রায়ই মানুষের মুখে নামটা আসে।
কৌতূহলবশত সে ভিডিওটা দেখতে লাগল।
একটা স্থানীয় চুরির ঘটনা নিয়ে রিপোর্ট।
খুব খারাপ না।
বরং বেশ গোছানো।
লোকটার উপস্থাপনাও আত্মবিশ্বাসী।
ভিডিও শেষ হওয়ার আগে স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠল।
বিভূ বৈদ্য।
অরিজিৎ নামটা মনে রাখল।
তারপর আবার বাইক চালিয়ে চলে গেল।
সেদিন রাতে বাড়িতে বসেও সে কয়েকটা ভিডিও দেখল।
একটার পর একটা।
অভ্যাসবশত।
একজন তদন্তকারী মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে।
সে-ও করছিল।
ভিডিওগুলো খারাপ নয়।
বরং ভালো।
লোকটা পরিশ্রমী।
খবর সংগ্রহে দক্ষ।
সূত্রও ভালো।
কিন্তু একটা বিষয় তার নজর কাড়ল।
অদ্ভুতভাবে অনেক বড় অপরাধমূলক ঘটনার ক্ষেত্রে এই পেজটা অন্যদের আগে খবর দিয়েছে।
গৌতম দে-র ঘটনাতেও।
অরিজিৎ ভিডিওটা খুলল।
তারিখ মিলিয়ে দেখল।
সময়ের হিসাব করল।
তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারে সোজা হয়ে বসল।
কোনো অভিযোগ নয়।
কোনো প্রমাণ নয়।
শুধু একটা পর্যবেক্ষণ।
কিন্তু সেই পর্যবেক্ষণটা তাকে ভাবিয়ে তুলল।
কীভাবে একজন স্থানীয় নিউজ-পেজ পরিচালনাকারী ব্যক্তি এত দ্রুত খবর পায়?
কীভাবে সে বারবার সবার আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়?
হতে পারে তার সূত্র খুব ভালো।
হতেই পারে।
সেটাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা।
তবু...
কেন যেন বিষয়টা তার মাথা থেকে বেরোচ্ছে না।
রাত বাড়তে থাকল।
ঘড়ির কাঁটা এগোতে থাকল।
আর অরিজিৎ সেন নিজের নোটবুকে একটা ছোট্ট নাম লিখে রাখল।
"বিভূ বৈদ্য — খবর এখন"
নামের পাশে কোনো অভিযোগ নেই।
কোনো মন্তব্য নেই।
শুধু একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
?
কারণ এখনও সে কিছুই জানে না।
কিন্তু তার অভিজ্ঞতা বলছে—
কখনও কখনও একটা ছোট্ট প্রশ্নই সবচেয়ে বড় সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
অরিজিৎ সেন সাধারণত কোনো সিদ্ধান্তে দ্রুত পৌঁছাত না।
পুলিশ একাডেমিতে তাদের প্রথম যেটা শেখানো হয়েছিল, তার মধ্যে একটা ছিল—
"সন্দেহ করো, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করো না।"
এই কারণেই বিভূ বৈদ্যের নাম নোটবুকে লিখে রাখার পরও সে বিষয়টাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি।
অন্তত প্রথম কয়েকদিন।
কিন্তু কিছু কিছু প্রশ্ন মানুষের মাথায় এমনভাবে আটকে যায়, যেগুলোকে ইচ্ছা করলেও উপেক্ষা করা যায় না।
এটাও তেমনই একটা প্রশ্ন ছিল।
কেন "খবর এখন" বারবার সবার আগে খবর পায়?
শুধু গৌতম দে-র ঘটনায় নয়।
আরও কয়েকটা কেসেও।
এক বিকেলে থানার কাজ শেষ হওয়ার পর অরিজিৎ আবার ল্যাপটপ খুলে বসল।
এবার সে শুধু গৌতম দে-র ঘটনা নয়, গত কয়েক মাসের বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার সময়রেখা মিলিয়ে দেখতে শুরু করল।
কোন ঘটনা কখন ঘটেছে।
পুলিশ কখন খবর পেয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কখন রিপোর্ট করেছে।
আর "খবর এখন" কখন ভিডিও প্রকাশ করেছে।
কাজটা সময়সাপেক্ষ।
কিন্তু অরিজিৎ ধৈর্যশীল মানুষ।
ধীরে ধীরে তথ্য জুড়তে লাগল।
কিছুক্ষণ পর একটা অদ্ভুত বিষয় তার নজরে এল।
কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ নয়।
কোনো শক্ত তথ্যও নয়।
তবু অস্বাভাবিক।
বেশ কয়েকটা ঘটনায় "খবর এখন" এত দ্রুত রিপোর্ট করেছে যে মনে হয়, খবরটা তাদের কাছে পৌঁছেছিল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।
এটা অসম্ভব নয়।
ভালো সূত্র থাকলে সম্ভব।
কিন্তু বারবার?
প্রায় প্রত্যেকবার?
অরিজিৎ চেয়ারে হেলান দিল।
মনে মনে হিসাব করল।
ধরো, বিভূর সত্যিই শক্তিশালী সূত্র আছে।
সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা পুরোপুরি স্বাভাবিক।
কিন্তু যদি না থাকে?
তাহলে?
প্রশ্নটা উত্তরহীনই রয়ে গেল।
পরদিন সকালে থানায় পৌঁছে সে কনস্টেবল প্রদীপকে ডাকল।
"একটা নাম শুনেছ?"
"কোন নাম স্যার?"
"বিভূ বৈদ্য।"
প্রদীপ সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল।
"খবর এখন?"
"হ্যাঁ।"
"চিনি তো।"
"কেমন লোক?"
প্রদীপ কাঁধ ঝাঁকাল।
"ভদ্র মানুষ বলেই শুনেছি।"
"কোনো ঝামেলার ইতিহাস?"
"না।"
"রাজনীতি?"
"না।"
"অপরাধ জগতের কারও সঙ্গে যোগাযোগ?"
"জানি না স্যার।"
অরিজিৎ মাথা নাড়ল।
এতেও নতুন কিছু জানা গেল না।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার।
লোকটা শহরে পরিচিত।
এবং তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনো অভিযোগ নেই।
সেদিন বিকেলে অরিজিৎ বাজারের দিকে একটা ছোট তদন্তের কাজে গিয়েছিল।
কাজ শেষ করে ফেরার সময় দূরে একটা ভিড় দেখতে পেল।
ভিড়ের মাঝখানে একজন মোবাইল হাতে ভিডিও করছে।
লোকটাকে চিনতে অসুবিধা হলো না।
বিভূ বৈদ্য।
অরিজিৎ কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে দেখল।
বিভূ একটা ছোট দুর্ঘটনার খবর কভার করছে।
একজন সাইকেল আরোহী আহত হয়েছে।
বড় কোনো ঘটনা নয়।
তবু বিভূর কাজ করার ভঙ্গিটা লক্ষ করল সে।
লোকটা আত্মবিশ্বাসী।
দ্রুত প্রশ্ন করছে।
মানুষের সঙ্গে সহজে মিশছে।
অনেকটা সেই পুরোনো দিনের সংবাদকর্মীদের মতো।
অরিজিৎ বুঝতে পারল, এই কারণেই সম্ভবত তার এত সূত্র।
মানুষ তাকে বিশ্বাস করে।
তথ্য দেয়।
খবর দেয়।
ব্যাপারটা হয়তো এতটাই সহজ।
কিন্তু তারপরও...
কেন যেন সন্দেহটা পুরোপুরি দূর হলো না।
কারণ তার অভিজ্ঞতায়, কোনো মানুষকে বোঝার সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো—
সে বাইরে যা দেখায়, ভেতরেও কি সত্যিই সে-ই?
ওদিকে বিভূর কোনো ধারণাই ছিল না যে দূরে দাঁড়িয়ে একজন পুলিশ অফিসার তাকে লক্ষ্য করছে।
সে নিজের কাজেই ব্যস্ত।
ক্যামেরার সামনে কথা বলছে।
ফুটেজ নিচ্ছে।
তারপর দ্রুত ভিডিও এডিট করার জন্য বাড়ি ফিরছে।
গত কয়েক সপ্তাহে তার জীবন আরও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও যেতে হচ্ছে।
মানুষ এখন খবর পাঠায়।
ভিডিও পাঠায়।
অনেকে সরাসরি ফোনও করে।
এই জনপ্রিয়তাটা তার ভালো লাগছিল।
খুব ভালো লাগছিল।
কিন্তু একইসঙ্গে একটা নতুন চাপও তৈরি হচ্ছিল।
মানুষ এখন তার কাছ থেকে দ্রুত খবর আশা করে।
সবার আগে খবর আশা করে।
আর সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে সে অস্থির হয়ে পড়ে।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে analytics খুলে বসে ছিল বিভূ।
একটা ভিডিও আশানুরূপ চলেনি।
কমেন্টও কম।
Share-ও কম।
তার বিরক্ত লাগছিল।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে নিচু গলা ভেসে এল।
"দাদা, একটা খবর আছে।"
বিভূ সোজা হয়ে বসল।
"কী খবর?"
লোকটা চারপাশ দেখে কথা বলছে যেন।
গলায় সতর্কতা।
"ফোনে সব বলা যাবে না।"
"তাহলে?"
"কাল দেখা করুন।"
"কোথায়?"
লোকটা একটা নির্জন চায়ের দোকানের নাম বলল।
শহরের প্রান্তে।
বিভূ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
এই ধরনের ফোন নতুন নয়।
অনেক সময় সূত্ররা এভাবেই যোগাযোগ করে।
কিন্তু এই লোকটার গলায় অন্যরকম কিছু ছিল।
একটা অস্বস্তি।
একটা গোপনীয়তা।
ফোন কেটে যাওয়ার পর সে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
ওদিকে, ঠিক একই সময়ে, থানায় নিজের ডেস্কে বসে অরিজিৎ সেনও একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল।
সে এখনও বিভূকে সন্দেহ করছে না।
কিন্তু কৌতূহলী হয়ে উঠেছে।
আর কৌতূহলই অনেক বড় তদন্তের প্রথম ধাপ।
টেবিলের ওপর রাখা নোটবুকটা খুলে সে আবার সেই নামটার দিকে তাকাল।
বিভূ বৈদ্য।
আজ নামটার পাশে সে আরেকটা শব্দ লিখল।
"Observe."
কারণ এখনও তার হাতে কিছু নেই।
শুধু প্রশ্ন আছে।
আর কখনও কখনও প্রশ্নই সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস।
__________________________________
পরদিন সকাল থেকেই বিভূর মাথায় ঘুরছিল আগের রাতের ফোনকলটা।
অচেনা গলা।
সতর্ক ভঙ্গি।
আর সেই কথাটা—
"ফোনে সব বলা যাবে না।"
এই ধরনের কথা সাধারণত দু'ধরনের মানুষ বলে।
একদল সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে আসে।
আরেকদল শুধু নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য রহস্য তৈরি করে।
কোনটা এই লোক?
সেটা জানার জন্যই দুপুরের দিকে নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছাল বিভূ।
শহরের প্রান্তে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান।
দোকান বলতে টিনের চাল।
দুটো বেঞ্চ।
একটা পুরোনো কেটলি।
আর কয়েকজন নিয়মিত খদ্দের।
বিভূ চারপাশে তাকাল।
কাউকে চিনতে পারল না।
প্রায় দশ মিনিট অপেক্ষার পর একজন লোক ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।
রোগা চেহারা।
চোখেমুখে অস্থিরতা।
সে এসে বিভূর সামনে বসল।
"আপনিই বিভূদা?"
"হ্যাঁ।"
"আমি নাম বলতে চাই না।"
বিভূ ভ্রু তুলল।
"ঠিক আছে।"
লোকটা কয়েক সেকেন্ড চারপাশে তাকাল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
"একটা বড় ঝামেলা হতে পারে।"
"কী রকম?"
"নির্মল সাহার ব্যাপার।"
নামটা শুনে বিভূ চুপ করে গেল।
কয়েক সপ্তাহ আগে চায়ের দোকানে যাকে দেখেছিল।
সেই নির্মল সাহা।
"কী হয়েছে?"
লোকটা এবার আরও নিচু গলায় কথা বলল।
"অনেক লোকের সঙ্গে ওর শত্রুতা আছে।"
"এটা তো নতুন কিছু নয়।"
"কিন্তু এবার ব্যাপারটা অন্যরকম।"
বিভূ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
লোকটা বলল,
"কিছুদিন ধরে ওকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।"
"প্রমাণ?"
"নেই।"
"তাহলে?"
"আমি যা জানি, তাই বলছি।"
কথাগুলো খুব শক্তিশালী নয়।
অনেকটাই গুজবের মতো।
তবু বিভূর সাংবাদিকসুলভ কৌতূহল জেগে উঠল।
কারণ গুজবের ভেতর থেকেও অনেক সময় সত্যি বেরিয়ে আসে।
প্রায় আধঘণ্টা কথা চলল।
কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
কোনো ডকুমেন্ট নেই।
কোনো রেকর্ডিং নেই।
শুধু টুকরো টুকরো ইঙ্গিত।
আর সন্দেহ।
বাড়ি ফেরার পথে বিভূ ভাবছিল—
এটার মধ্যে আদৌ কোনো খবর আছে?
নাকি সময় নষ্ট?
আগের বিভূ হয়তো বিষয়টা ভুলে যেত।
কিন্তু বর্তমান বিভূ ভুলতে পারল না।
কারণ তার মাথায় আরেকটা বিষয়ও কাজ করছিল।
নির্মল সাহা পরিচিত মানুষ।
বিতর্কিত মানুষ।
তাকে নিয়ে বড় কোনো ঘটনা ঘটলে সেটা নিশ্চিতভাবেই আলোচনায় আসবে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে নির্মল সাহা সম্পর্কে খোঁজ নিতে শুরু করল।
পুরোনো খবর।
ব্যবসায়িক বিবাদ।
জমিজমার ঝামেলা।
কর্মচারীদের অভিযোগ।
সব মিলিয়ে লোকটার জীবন খুব শান্ত নয়।
ফাইল খুলতে খুলতে বিভূ খেয়াল করল, সে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একই মানুষ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে।
কিন্তু কোনো ভিডিও বানানোর জন্য নয়।
কোনো রিপোর্টের জন্যও নয়।
শুধু কৌতূহল থেকে।
আর সেই কৌতূহলটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।
অনেক বেশি।
রাতে খাওয়ার সময় মিতালী বলল,
"আজকাল তোমাকে খুব চিন্তিত লাগে।"
বিভূ চমকে তাকাল।
"কেন?"
"মনে হয় সবসময় কিছু ভাবছ।"
"কাজের চাপ।"
মিতালী আর কিছু বলল না।
কিন্তু বিভূ জানত, উত্তরটা পুরো সত্যি নয়।
কারণ সে শুধু কাজের কথা ভাবছে না।
সে সংখ্যা নিয়েও ভাবছে।
ভিউ নিয়ে ভাবছে।
আর সবচেয়ে বেশি ভাবছে—
পরের বড় খবর কোথা থেকে আসবে।
ওদিকে অরিজিৎ সেনও নিজের মতো করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।
সে কোনো তদন্ত শুরু করেনি।
কোনো রিপোর্টও তৈরি করেনি।
তবু অবচেতনভাবে বিভূর নামটা মাথায় রয়ে গেছে।
কয়েকদিনের মধ্যে সে আরও একটা বিষয় খেয়াল করল।
যেখানেই কোনো বড় ঘটনা ঘটে, সেখানেই কোনো না কোনোভাবে "খবর এখন"-এর উপস্থিতি দেখা যায়।
আবারও সেটা ব্যাখ্যা করা যায়।
একজন দক্ষ স্থানীয় সাংবাদিক হিসেবে।
কিন্তু অরিজিৎর অভিজ্ঞতা বলছে—
কখনও কখনও একই কাকতালীয় ঘটনা বারবার ঘটলে, সেটাকে আর কাকতালীয় বলা যায় না।
রাত গভীর হলো।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
বিভূ আবার কম্পিউটারের সামনে বসে আছে।
স্ক্রিনে নির্মল সাহার নাম।
কয়েকটা পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদন।
কিছু অভিযোগ।
কিছু বিবাদ।
আর কিছু অস্পষ্ট তথ্য।
সে জানত না কেন এত সময় দিচ্ছে।
শুধু মনে হচ্ছিল, এই মানুষটাকে ঘিরে কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
হয়তো কিছুই ঘটবে না।
হয়তো সবই গুজব।
তবু তার ভেতরের একটা অংশ অপেক্ষা করতে শুরু করেছে।
অপেক্ষা—
পরের বড় গল্পের জন্য।
আর সেই অপেক্ষাটাই তাকে ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।
কারণ সে এখনও খবরের পেছনে ছুটছে।
কিন্তু অজান্তেই খবরও যেন তাকে কোথাও টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
__________________________________
নির্মল সাহাকে নিয়ে সেই রহস্যময় তথ্য পাওয়ার পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেল।
এই সময়ে দৃশ্যত কিছুই ঘটল না।
নির্মল সাহা নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত।
বাজারে দেখা যায়।
দোকানে দেখা যায়।
লোকজনের সঙ্গে তর্কও করে।
যেন সবকিছু স্বাভাবিক।
ধীরে ধীরে বিভূও বিষয়টা ভুলে যেতে শুরু করেছিল।
অন্তত সে তাই ভাবছিল।
কিন্তু মানুষের অবচেতন মন অনেক সময় এমন কিছু ধরে রাখে, যা সে নিজেও বুঝতে পারে না।
এক শুক্রবার রাতে বিভূ বাড়িতে বসে ভিডিও এডিট করছিল।
সেদিনের খবর খুব একটা বড় কিছু নয়।
একটা রাস্তার সংস্কার প্রকল্প।
একটা স্কুলের অনুষ্ঠান।
আর একটা ছোটখাটো চুরির ঘটনা।
ভিডিওর মাঝখানে হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
একজন পরিচিত সূত্র।
লোকটা সাধারণত অকারণে ফোন করে না।
বিভূ ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে দ্রুত গলা ভেসে এল।
"দাদা, বাজারপাড়ায় সমস্যা হয়েছে।"
"কী হয়েছে?"
"ঠিক জানি না। কিন্তু অনেক লোক জড়ো হয়েছে।"
"কেন?"
"মনে হচ্ছে মারামারি হয়েছে।"
কথা শেষ না করেই বিভূ উঠে দাঁড়াল।
ক্যামেরা।
মোবাইল।
ব্যাগ।
সব নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ল।
এখন এটাই তার স্বভাব হয়ে গেছে।
কোথাও কিছু ঘটলেই সে ছুটে যায়।
রাস্তা ফাঁকা ছিল।
রাত তখন সাড়ে দশটা।
মোটরবাইক চালাতে চালাতে তার বুকের ভেতর সেই পুরোনো উত্তেজনা ফিরে এল।
কী হয়েছে?
কত বড় ঘটনা?
কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
এই প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরছিল।
বাজারপাড়ার কাছে পৌঁছাতেই দূর থেকে ভিড় দেখতে পেল।
পুলিশ এখনও আসেনি।
মানুষজন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কেউ চিৎকার করছে।
কেউ ফোনে কথা বলছে।
বিভূ বাইক থামিয়ে দ্রুত ভিড়ের দিকে এগোল।
তারপর সামনে যা দেখল, তাতে কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে গেল।
মাটিতে বসে আছে নির্মল সাহা।
মুখে রক্ত।
জামা ছিঁড়ে গেছে।
পাশে দুজন লোক তাকে ধরে রেখেছে।
চারপাশে উত্তেজিত জনতা।
কেউ বলছে আক্রমণ হয়েছে।
কেউ বলছে পুরোনো শত্রুতা।
কেউ বলছে ব্যবসায়িক ঝামেলা।
সত্যিটা কেউ জানে না।
কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—
বড় কিছু ঘটেছে।
আর সেই মুহূর্তে বিভূর মাথায় প্রথম যে চিন্তাটা এল, সেটা নির্মল সাহার অবস্থা নিয়ে নয়।
বরং—
"এটা বড় খবর।"
চিন্তাটা মাথায় আসতেই সে নিজের উপর বিরক্ত হলো।
একজন মানুষ আহত।
আর সে খবরের কথা ভাবছে।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই সে আবার মোবাইল বের করল।
ভিডিও শুরু করল।
প্রশ্ন করতে লাগল।
মানুষের বক্তব্য নিতে লাগল।
কাজ করতে লাগল।
যেন এটাই স্বাভাবিক।
যেন এটাই তার পেশা।
পনেরো মিনিটের মধ্যে পুলিশ পৌঁছে গেল।
তাদের সঙ্গে ছিল অরিজিৎ সেন।
গাড়ি থেকে নেমেই সে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করল।
আহত মানুষ।
উত্তেজিত ভিড়।
বিভ্রান্ত সাক্ষী।
সবই পরিচিত দৃশ্য।
কিন্তু হঠাৎ তার চোখ গিয়ে থামল ভিড়ের একপাশে।
বিভূ বৈদ্য।
আবার।
অরিজিৎ কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল।
এটা অবশ্যই অস্বাভাবিক নয়।
একজন সংবাদকর্মী ঘটনাস্থলে থাকবে।
এটাই স্বাভাবিক।
তবু তার মাথায় পুরোনো প্রশ্নটা আবার ফিরে এল।
কীভাবে লোকটা এত দ্রুত পৌঁছে যায়?
প্রতিবার?
অরিজিৎ এবার কোনো সিদ্ধান্ত নিল না।
শুধু মনে রাখল।
ঘটনাটা মনে রাখল।
সময়টা মনে রাখল।
আর বিভূর উপস্থিতিটাও মনে রাখল।
ওদিকে বিভূ ইতিমধ্যে কয়েকটা ছোট ভিডিও রেকর্ড করে ফেলেছে।
কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যও নিয়েছে।
তার অভিজ্ঞতা বলছিল—
আজ রাতের এই ঘটনা কাল সকাল পর্যন্ত আলোচনায় থাকবে।
সম্ভবত আরও বেশি।
রাত বাড়তে থাকল।
নির্মল সাহাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
পুলিশ তদন্ত শুরু করল।
ভিড় ধীরে ধীরে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।
কিন্তু বিভূর মাথায় একটা বিষয় ঘুরতে লাগল।
এক সপ্তাহ আগে অচেনা লোকটার ফোন।
নির্মল সাহাকে নিয়ে সতর্কবার্তা।
তারপর আজকের ঘটনা।
কাকতালীয়?
হতে পারে।
আবার নাও হতে পারে।
বাড়ি ফিরে সে দ্রুত ভিডিও এডিট করতে বসে গেল।
ঘড়িতে তখন রাত একটা।
সারা বাড়ি ঘুমিয়ে।
শুধু কম্পিউটারের আলোয় বসে আছে বিভূ।
ভিডিওর টাইমলাইন এগোচ্ছে।
ফুটেজ জোড়া লাগছে।
আর তার ভেতরে ধীরে ধীরে বাড়ছে এক অদ্ভুত অনুভূতি।
এটা ভয় নয়।
এটা আনন্দও নয়।
দুটোর মাঝামাঝি কিছু।
কারণ সে অনুভব করতে পারছে—
কিছু একটা শুরু হয়েছে।
কী, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।
কিন্তু এই ঘটনার শেষ এখানেই নয়।
আর অদ্ভুতভাবে, সেই অসমাপ্ত গল্পটার পরের অংশ জানার জন্য সে নিজেও অপেক্ষা করছে।
____________________________
নির্মল সাহার উপর হামলার ঘটনার পর শহরে নতুন করে আলোচনা শুরু হলো।
চায়ের দোকান।
বাজার।
বাসস্ট্যান্ড।
সব জায়গাতেই একই প্রশ্ন।
কে আক্রমণ করল?
কেন করল?
পুলিশ কি কাউকে ধরতে পারবে?
মানুষের কৌতূহল যত বাড়ছিল, "খবর এখন"-এর ভিউও তত বাড়ছিল।
বিভূ দ্রুত ঘটনাটার আপডেট দিতে শুরু করল।
হাসপাতালের অবস্থা।
পুলিশি তদন্ত।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য।
সবকিছু।
ভিডিওগুলো ভালো চলছিল।
খুব ভালো।
কিন্তু এবার আগের মতো নিখাদ আনন্দ হচ্ছিল না।
কারণ কোথাও একটা অস্বস্তি কাজ করছিল।
সেই অচেনা ফোনকল।
সেই সতর্কবার্তা।
আর তারপর হামলা।
বিষয়টা যতই কাকতালীয় মনে হোক, পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারছিল না সে।
ওদিকে অরিজিৎ সেনও তদন্ত শুরু করেছে।
প্রথমদিকে ঘটনাটা সাধারণ হামলার মামলা হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।
নির্মল সাহার ব্যবসায়িক শত্রু ছিল।
ব্যক্তিগত বিরোধও ছিল।
সন্দেহভাজনের অভাব নেই।
কিন্তু তদন্তে যত এগোনো গেল, ততই একটা সমস্যা সামনে এল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য একে অপরের সঙ্গে মেলেনি।
কেউ বলছে দুইজন হামলাকারী ছিল।
কেউ বলছে তিনজন।
কেউ বলছে মুখ ঢাকা ছিল।
কেউ বলছে না।
সব মিলিয়ে ছবি পরিষ্কার নয়।
সেদিন বিকেলে থানার কনফারেন্স রুমে বসে অরিজিৎ কেসের নোটগুলো দেখছিল।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটা বিষয়ে।
ঘটনার প্রায় দশ মিনিটের মধ্যেই "খবর এখন"-এর প্রথম আপডেট সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে গেছে।
দশ মিনিট।
খুব বেশি সময় নয়।
আবার অসম্ভবও নয়।
তবু তার মাথায় প্রশ্ন জাগল।
এত দ্রুত তথ্য পেল কীভাবে?
সে সঙ্গে সঙ্গে বিভূকে সন্দেহ করল না।
বরং নিজেকেই বোঝাল—
লোকটার সূত্র ভালো।
এই পর্যন্তই।
কিন্তু তারপর আরেকটা তথ্য সামনে এল।
একজন কনস্টেবল জানাল, ঘটনার খবর থানায় পৌঁছাতে যত সময় লেগেছিল, "খবর এখন"-এর কাছে খবর পৌঁছেছিল প্রায় একই সময়ে।
অরিজিৎ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
আবারও সেটা ব্যাখ্যা করা যায়।
আবারও।
কিন্তু একই ধরনের ব্যাখ্যা বারবার ব্যবহার করতে হলে, একসময় মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করে।
সেই রাতেই সে নিজের নোটবুক খুলল।
পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে গৌতম দে-র কেসে পৌঁছাল।
তারপর বর্তমান হামলার ঘটনায়।
দুটো আলাদা কেস।
দুটো আলাদা ঘটনা।
কিন্তু একটা মিল আছে।
দুই ক্ষেত্রেই বিভূ বৈদ্য খুব দ্রুত উপস্থিত হয়েছে।
অরিজিৎ কলমটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।
তারপর নামটার নিচে নতুন একটা লাইন লিখল—
"Always First?"
প্রশ্নচিহ্নসহ।
কারণ এখনও উত্তর নেই।
শুধু প্রশ্ন আছে।
আর একজন ভালো তদন্তকারী উত্তর পাওয়ার আগেই কাউকে দোষী বানায় না।
ওদিকে বিভূ নিজের জগতে ব্যস্ত।
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
নতুন ভিডিও আপলোড হয়েছে।
কমেন্ট আসছে।
মানুষ তর্ক করছে।
অনুমান করছে।
ভিউ বাড়ছে।
কিন্তু আজ সে analytics-এর দিকে আগের মতো আনন্দ নিয়ে তাকাতে পারছিল না।
তার মাথায় ঘুরছিল অন্য কিছু।
সেই অচেনা লোকটা।
লোকটা কে?
কেন ফোন করেছিল?
কীভাবে আগেভাগে জানত?
হঠাৎ তার মনে হলো, আবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা উচিত।
কিন্তু সমস্যা হলো—
লোকটার নম্বরটা আর কাজ করছে না।
কল করলে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
এবার প্রথমবারের মতো বিভূর বুকের ভেতর হালকা অস্বস্তি তৈরি হলো।
যেন সে এমন একটা দরজা খুলেছে, যার ওপাশে কী আছে সেটা সে জানে না।
পরদিন সকালে হাসপাতালে গিয়ে নির্মল সাহার অবস্থা জানার চেষ্টা করল সে।
লোকটা বেঁচে আছে।
কিন্তু এখনও পুরোপুরি সুস্থ নয়।
পুলিশও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
কিন্তু হামলাকারীদের সম্পর্কে পরিষ্কার কিছু জানা যায়নি।
বিভূ হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে ছিল।
ঠিক তখনই তার নজর পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের দিকে।
সাদা শার্ট।
গাঢ় প্যান্ট।
হাতে ফাইল।
অরিজিৎ সেন।
দুজনের চোখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক হলো।
তারপর অরিজিৎ এগিয়ে এল।
মুখে ভদ্র হাসি।
"আপনি বিভূ বৈদ্য?"
"জি।"
"আমি অরিজিৎ সেন।"
দুজন হাত মেলাল।
খুব সাধারণ একটা পরিচয়।
খুব স্বাভাবিক।
অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হলো।
অরিজিৎ বলল,
"আপনার পেজের নাম শুনেছি।"
"ধন্যবাদ।"
"খবর খুব দ্রুত পান দেখছি।"
বাক্যটা সাধারণ ভঙ্গিতে বলা।
কিন্তু বিভূর বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ধাক্কা লাগল।
সে দ্রুত হেসে বলল,
"চেষ্টা করি।"
"ভালো।"
অরিজিৎও হাসল।
তারপর অন্যদিকে চলে গেল।
কথোপকথনটা মোটে এক মিনিটের।
এর বেশি নয়।
তবু দুজনের মনেই কিছু একটা রয়ে গেল।
বিভূর মনে হলো, অফিসারটা তাকে লক্ষ্য করছে।
অরিজিৎর মনে হলো, লোকটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এক মুহূর্তের জন্য অস্বস্তি বোধ করেছিল।
এগুলো কোনো প্রমাণ নয়।
কোনো তথ্যও নয়।
শুধু অনুভূতি।
কিন্তু অনেক বড় তদন্তের শুরু হয় ঠিক এমন অনুভূতি থেকেই।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অরিজিৎ শেষবারের মতো নোটবুক খুলল।
বিভূর নামের পাশে আরেকটা ছোট্ট শব্দ যোগ করল—
"Watch."
কারণ এখনও তার হাতে কিছু নেই।
কোনো অভিযোগ নেই।
কোনো সাক্ষ্য নেই।
কিন্তু এখন আর এটা শুধুই কৌতূহল নয়।
প্রথমবারের মতো, খুব ক্ষীণ হলেও, একটা সন্দেহ জন্ম নিয়েছে।
আর সেই সন্দেহটাই ভবিষ্যতে বিভূ বৈদ্যের জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে উঠবে।
_________________________________
নির্মল সাহার উপর হামলার ঘটনার পর কেটে গেছে প্রায় বারো দিন।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন তিনি।
শরীর এখনও পুরোপুরি সুস্থ নয়, কিন্তু বিপদ কেটে গেছে।
শহরের মানুষের আগ্রহও ধীরে ধীরে অন্যদিকে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু বিভূর জন্য ঘটনাটা এখনও শেষ হয়নি।
কারণ তার মাথায় ঘুরছে অন্য একটা বিষয়।
সেই অচেনা লোক।
যে আগেভাগে হামলার ইঙ্গিত দিয়েছিল।
যে এখন হঠাৎ উধাও।
নম্বর বন্ধ।
কোনো খোঁজ নেই।
কয়েকবার চেষ্টা করেও কোনো ফল পায়নি বিভূ।
অবশেষে এক রাতে সে বিষয়টা ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
যা চলে গেছে, সেটা নিয়ে ভেবে লাভ নেই।
তার সামনে এখন আরও বড় কাজ আছে।
"খবর এখন" দ্রুত বড় হচ্ছে।
প্রতিদিন নতুন follower যোগ হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিজ্ঞাপন দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
প্রথমবারের মতো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত টাকা ঢুকছে।
জীবন বদলাচ্ছে।
এবং এই পরিবর্তনটা বিভূ উপভোগ করছিল।
সেদিন রাতে analytics খুলে বসে ছিল সে।
নতুন ভিডিওর পারফরম্যান্স দেখছে।
ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।
WhatsApp।
অচেনা নম্বর।
বিভূর বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।
মেসেজটা খুলল।
মাত্র দুই লাইন।
"যা খুঁজছেন, সেটা এখনও শেষ হয়নি।
কাল রাত ৮টা। পুরোনো গুদামঘর। একা আসবেন।"
নিচে কোনো নাম নেই।
কিছুই নেই।
শুধু লোকেশন।
বিভূ অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
মেসেজটা কি সেই লোক পাঠিয়েছে?
হতে পারে।
আবার নাও হতে পারে।
যেকোনো বুদ্ধিমান মানুষ এই পরিস্থিতিতে পুলিশের কাছে যেত।
অথবা উপেক্ষা করত।
কিন্তু বিভূর সমস্যা হলো—
সে শুধু একজন সাধারণ মানুষ নয়।
সে একজন সংবাদকর্মী।
আর তার চেয়েও বড় কথা—
সে এখন এক্সক্লুসিভ খবরের নেশায় আক্রান্ত।
পরদিন সারাদিন বিষয়টা মাথায় ঘুরল।
নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল না যাওয়ার জন্য।
কিন্তু যত সময় গেল, কৌতূহল তত বাড়ল।
রাত আটটার দশ মিনিট আগে সে পুরোনো গুদামঘরের কাছে পৌঁছাল।
জায়গাটা শহরের এক প্রান্তে।
বহু বছর আগে ব্যবহৃত হতো।
এখন প্রায় পরিত্যক্ত।
চারপাশে ঝোপঝাড়।
ভাঙা দেওয়াল।
নীরবতা।
বিভূ বাইক থামিয়ে চারদিকে তাকাল।
কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
এক মিনিট।
দুই মিনিট।
পাঁচ মিনিট।
তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা ছায়া বেরিয়ে এল।
লোকটা মুখে মাস্ক পরে আছে।
চেনা যাচ্ছে না।
"আপনি বিভূদা?"
বিভূ মাথা নাড়ল।
লোকটা চারপাশ দেখে নিচু গলায় বলল,
"আমার বেশি সময় নেই।"
"আপনি কে?"
"নাম জানলে আপনারই সমস্যা হবে।"
বিভূ বিরক্ত হলো।
"তাহলে আমাকে এখানে ডাকলেন কেন?"
লোকটা পকেট থেকে একটা খাম বের করল।
"এটার জন্য।"
বিভূ খামটা হাতে নিল।
ভেতরে কয়েকটা ফটোকপি।
কিছু কাগজ।
কিছু ব্যাংক লেনদেনের তথ্য।
কিছু জমির নথি।
সবকিছুর কেন্দ্রে একটা নাম।
নির্মল সাহা।
বিভূ দ্রুত কাগজগুলো উল্টাতে লাগল।
পুরো বিষয়টা পরিষ্কার নয়।
কিন্তু একটা বিষয় বোঝা যাচ্ছে।
নির্মল সাহা সম্ভবত কোনো বড় আর্থিক জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত।
অথবা অন্তত কেউ সেটা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।
"এগুলো কোথা থেকে পেলেন?"
লোকটা উত্তর দিল না।
বরং বলল,
"খবর করতে চাইলে দ্রুত করুন।"
"কেন?"
"কারণ অনেক মানুষ চায় বিষয়টা চাপা পড়ে যাক।"
বিভূ আরও প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল।
কিন্তু লোকটা ইতিমধ্যে পিছিয়ে যেতে শুরু করেছে।
"দাঁড়ান!"
লোকটা থামল না।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল।
বিভূ একা দাঁড়িয়ে রইল।
হাতে খাম।
মাথায় শত প্রশ্ন।
সে জানে না কাগজগুলো সত্যি কি না।
সে জানে না লোকটা কে।
সে জানে না এর পেছনে কী খেলা চলছে।
কিন্তু একটা বিষয় সে খুব ভালো করেই জানে।
যদি এগুলো সত্যি হয়—
তাহলে এটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় এক্সক্লুসিভ খবর হতে পারে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, বহুদিন পর, তার ভেতরে আবার সেই পুরোনো উত্তেজনা ফিরে এল।
সংবাদকর্মীর উত্তেজনা।
নাকি অন্য কিছু?
সে নিজেও নিশ্চিত নয়।
পরদিন সকাল থেকেই বিভূর মাথায় ঘুরছিল আগের রাতের সেই খামটা।
রাত জেগে সে কাগজগুলো অন্তত দশবার দেখেছে।
প্রতিবারই একই অনুভূতি হয়েছে।
কিছু একটা আছে।
কিন্তু ঠিক কী আছে, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।
একজন সংবাদকর্মীর সবচেয়ে বড় ভুল হলো যাচাই না করে বিশ্বাস করা।
আর বিভূ, সমস্ত পরিবর্তনের পরেও, এখনও সেই পুরোনো অভ্যাস পুরোপুরি হারায়নি।
তাই সে সিদ্ধান্ত নিল—
প্রথমে তথ্য যাচাই।
তারপর খবর।
সকালে নাশতা খাওয়ার সময়ও তার মন অন্য কোথাও ছিল।
মিতালী খেয়াল করল।
"কী হয়েছে?"
"কিছু না।"
"আবার কোনো বড় খবর?"
বিভূ একটু হেসে বলল,
"হতে পারে।"
মিতালী আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
বছরের পর বছর সংসার করার পর মানুষ অনেক সময় প্রশ্ন না করেও বুঝে যায়।
সে শুধু বলল,
"খেয়াল রেখো নিজের।"
কথাটা শুনে বিভূর বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
কারণ মিতালী জানে না, সে এখন কেমন সব মানুষের সঙ্গে মিশছে।
কেমন সব তথ্যের পেছনে ছুটছে।
আর কতটা বদলে গেছে।
সেদিন দুপুরে বিভূ তার পুরোনো পরিচিত এক হিসাবরক্ষকের সঙ্গে দেখা করল।
লোকটার নাম অসীম।
একসময় সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত কাজে পরিচয় হয়েছিল।
বিশ্বাসযোগ্য মানুষ।
অন্তত বিভূ তাই মনে করে।
একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্টে বসে সে কাগজগুলোর কিছু অংশ অসীমকে দেখাল।
সব না।
শুধু যেগুলো দরকার।
অসীম মন দিয়ে দেখল।
তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,
"কোথায় পেলে এগুলো?"
"সূত্র।"
"ভরসাযোগ্য?"
"জানি না।"
অসীম আবার কাগজগুলো দেখল।
কয়েক মিনিট চুপ করে থাকার পর বলল,
"একটা কথা বলতে পারি।"
"বলো।"
"কাগজগুলো পুরোপুরি বানানো বলে মনে হচ্ছে না।"
বিভূর চোখ সরু হয়ে এল।
"মানে?"
"মানে কিছু তথ্য সত্যি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।"
"আর বাকিটা?"
"সেটা যাচাই না করে বলা যাবে না।"
এটাই সে শুনতে চেয়েছিল।
আবার এটাই তাকে আরও সতর্ক করে দিল।
কারণ এখন বিষয়টা নিছক গুজব নয়।
এখানে সত্যির গন্ধ আছে।
পরবর্তী কয়েকদিন বিভূ প্রায় গোয়েন্দার মতো কাজ করল।
পুরোনো রেকর্ড খুঁজল।
পরিচিত সূত্রদের ফোন করল।
কিছু সরকারি নথিও সংগ্রহ করার চেষ্টা করল।
কাজটা সহজ ছিল না।
অনেক দরজা বন্ধ।
অনেক মানুষ কথা বলতে রাজি নয়।
কিন্তু ধীরে ধীরে একটা ছবি তৈরি হতে শুরু করল।
অস্পষ্ট।
অসম্পূর্ণ।
তবু একটা ছবি।
নির্মল সাহা গত কয়েক বছরে দ্রুত সম্পত্তি বাড়িয়েছে।
কিছু জমি কিনেছে।
কিছু ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে।
সবকিছু বেআইনি এমন প্রমাণ নেই।
কিন্তু সবকিছু স্বচ্ছও নয়।
বিভূর সাংবাদিকসুলভ প্রবৃত্তি জেগে উঠল।
এটা বড় খবর হতে পারে।
খুব বড়।
কিন্তু সমস্যা হলো—
এখনও প্রমাণ যথেষ্ট নয়।
আর প্রমাণ ছাড়া প্রকাশ করলে সেটা সংবাদ নয়।
অভিযোগ।
সেদিন রাতে কম্পিউটারের সামনে বসে বিভূ দীর্ঘক্ষণ ভাবল।
আগের সে হলে হয়তো অপেক্ষা করত।
আরও তথ্য জোগাড় করত।
নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কিছু প্রকাশ করত না।
কিন্তু বর্তমান বিভূ?
সে জানে এই খবর যদি সত্যি হয়, তাহলে অন্য কেউও এর গন্ধ পেতে পারে।
আর যদি অন্য কোনো পেজ আগে প্রকাশ করে?
তাহলে?
তার বুকের ভেতর অস্থিরতা বাড়তে লাগল।
একটা শব্দ বারবার মাথায় ঘুরতে লাগল।
"এক্সক্লুসিভ।"
সে প্রথম হতে চায়।
সবার আগে।
সবার থেকে দ্রুত।
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল analytics-এর দিকে।
গত সপ্তাহের গ্রাফ।
ভিউ আবার কিছুটা কমেছে।
সংখ্যাগুলো যেন তাকে বিদ্রূপ করছে।
মনে করিয়ে দিচ্ছে—
মানুষ নতুন কিছু চায়।
বড় কিছু চায়।
উত্তেজনাপূর্ণ কিছু চায়।
বিভূ ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিল।
তারপর নিজের অজান্তেই একটা বিপজ্জনক প্রশ্ন করল—
"যদি পুরো প্রমাণ না পাওয়া যায়, তবু কি খবরটা করা উচিত?"
প্রশ্নটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সে চুপ হয়ে গেল।
একসময় এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে খুব সহজ ছিল।
না।
কখনোই না।
কিন্তু আজ?
আজ সে নিশ্চিত নয়।
এবং সেই অনিশ্চয়তাই তাকে ভয় দেখানোর কথা।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—
ভয়ের চেয়ে উত্তেজনাই বেশি লাগছিল।
ওদিকে একই সময়ে অরিজিৎ সেনও অন্য একটা তথ্য নিয়ে ব্যস্ত।
নির্মল সাহার উপর হামলার তদন্তে নতুন কিছু বের হয়নি।
তবে সে একটা বিষয় লক্ষ্য করেছে।
হামলার ঘটনার পর থেকে বিভূ বৈদ্য অস্বাভাবিকভাবে নির্মল সাহার আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে।
হাসপাতাল।
ব্যবসায়িক এলাকা।
পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলা।
সবকিছুই সাংবাদিক হিসেবে স্বাভাবিক।
তবু অরিজিৎর অভিজ্ঞতা বলছে—
কখনও কখনও মানুষ কোনো গল্পের খুব কাছাকাছি চলে আসে।
এতটাই কাছাকাছি যে সে নিজেই গল্পের অংশ হয়ে যায়।
সেই কারণেই সে নোটবুকে নতুন একটা লাইন লিখল—
"Nirmal Saha + Bibhu = Why?"
এখনও উত্তর নেই।
শুধু প্রশ্ন।
আর প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে জমা হচ্ছে।
রাত বাড়তে থাকল।
বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
জানালায় টুপটাপ শব্দ।
বিভূ এখনও কম্পিউটারের সামনে বসে।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে কাগজগুলো।
রহস্যময় খাম।
অসম্পূর্ণ তথ্য।
আর সম্ভাব্য বড় খবর।
হঠাৎ তার ফোনে একটা নতুন মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
মাত্র এক লাইন।
"আপনি যত ভাবছেন, ব্যাপারটা তার চেয়েও বড়।"
মেসেজটা পড়ে বিভূর শরীর দিয়ে যেন ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
কারণ সে বুঝতে পারল—
অন্ধকারের ভেতর থেকে কেউ তাকে দেখছে।
কেউ তার প্রতিটা পদক্ষেপ জানে।
আর সেই মানুষটা এখনও খেলা শেষ করেনি।
_____________________________
অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজটা পড়ার পর অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে ছিল বিভূ।
স্ক্রিনের আলো তার মুখে পড়ছে।
আর মাথার ভেতর ঘুরছে একটাই প্রশ্ন।
লোকটা কে?
কীভাবে জানছে সে কী করছে?
কাগজগুলো কোথা থেকে এসেছে?
আর সবচেয়ে বড় কথা—
কেন তাকে বেছে নেওয়া হয়েছে?
একজন বড় সংবাদমাধ্যমকে নয়।
একজন জাতীয় সাংবাদিককে নয়।
তাকে।
"খবর এখন"-এর বিভূ বৈদ্যকে।
রাত তখন প্রায় বারোটা।
বাইরে বৃষ্টি আরও বেড়েছে।
মোবাইল হাতে নিয়ে নম্বরটায় কল করার চেষ্টা করল সে।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
প্রতিবার একই ফল।
"The number you are trying to call is switched off."
বিরক্ত হয়ে ফোনটা টেবিলে ছুড়ে রাখল বিভূ।
যে-ই হোক, সে যোগাযোগ করতে চাইলে করবে।
পরদিন সকাল।
ঘুম থেকে উঠেই সে আবার কাগজগুলো খুলল।
একটা একটা করে পড়তে লাগল।
হঠাৎ একটা নাম চোখে পড়ল।
আগের দিনও দেখেছিল।
কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি।
একটা ছোট নির্মাণ সংস্থা।
নির্মল সাহার সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত।
নামের পাশে একটা পুরোনো ঠিকানা।
বিভূ কয়েক সেকেন্ড ভাবল।
তারপর নোটবুকে ঠিকানাটা লিখে রাখল।
সরাসরি সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
দুপুর নাগাদ সে পৌঁছাল।
জায়গাটা শহরের বাইরের দিকে।
পুরোনো অফিস।
আধভাঙা সাইনবোর্ড।
দেখে মনে হয় বহুদিন ধরে তেমন কাজকর্ম নেই।
তবু ভেতরে একজন বয়স্ক কেয়ারটেকার ছিল।
বিভূ নিজেকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিল।
লোকটা প্রথমে কথা বলতে চাইছিল না।
কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু তথ্য বেরিয়ে এল।
অফিসটা কয়েক বছর আগে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়।
মালিক বদলে যায়।
কাগজপত্রও নাকি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
সবকিছু আইন মেনেই হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল।
তবে এলাকায় নানা গুজব ছিল।
বিভূ মন দিয়ে শুনছিল।
প্রমাণ নয়।
তবু তথ্য।
প্রত্যেকটা টুকরো তথ্য যেন একটা বড় ছবির অংশ।
ফেরার পথে তার মাথায় একটা চিন্তা এল।
যদি সে পুরো সত্যিটা বের করতে না-ও পারে, তবু কি একটা অনুসন্ধানী রিপোর্ট বানানো যায়?
প্রশ্ন তোলা যায়?
সন্দেহ তুলে ধরা যায়?
কেউ সরাসরি অভিযুক্ত হবে না।
তবু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে বিষয়টা।
এই ভাবনাটা আগের বিভূর কাছে গ্রহণযোগ্য হতো না।
কিন্তু এখন?
এখন সে হিসাব করছে।
ভিডিওটা ভাইরাল হতে পারে।
অনেক মানুষ দেখতে পারে।
পেজ আরও বড় হতে পারে।
তার বুকের ভেতর উত্তেজনা বাড়তে লাগল।
সেই সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে ভিডিওর খসড়া লিখতে শুরু করল।
প্রথম লাইন।
দ্বিতীয় লাইন।
তারপর শিরোনাম।
কয়েকটা শব্দ লিখে আবার মুছে দিল।
আবার লিখল।
শেষ পর্যন্ত একটা শিরোনাম দাঁড়াল—
"নির্মল সাহাকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন: কাকতালীয়, নাকি আরও বড় কিছু?"
পুরোপুরি অভিযোগ নয়।
আবার পুরোপুরি নিরপেক্ষও নয়।
এই ধূসর জায়গাটাই এখন তার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়।
ভিডিও আপলোড করার আগে সে কয়েক সেকেন্ড থেমে রইল।
কাগজগুলোর দিকে তাকাল।
তারপর নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে।
একটা সময় ছিল যখন কোনো তথ্য পুরোপুরি যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সে কিছু প্রকাশ করত না।
আজ সে নিজেই নিজের নিয়ম বদলে দিচ্ছে।
ধীরে ধীরে।
অল্প অল্প করে।
কিন্তু বদলাচ্ছে।
অবশেষে সে "Publish" বাটনে চাপ দিল।
ভিডিও লাইভ হয়ে গেল।
প্রথম আধঘণ্টা বিশেষ কিছু হলো না।
তারপর কমেন্ট আসতে শুরু করল।
মানুষ প্রশ্ন করছে।
আলোচনা করছে।
কেউ নির্মল সাহার বিরুদ্ধে লিখছে।
কেউ তার পক্ষ নিচ্ছে।
এক ঘণ্টার মধ্যে শেয়ার কয়েকশো ছাড়িয়ে গেল।
দুই ঘণ্টার মধ্যে ভিডিওটা পেজের সাম্প্রতিক সব ভিডিওকে ছাড়িয়ে গেল।
বিভূ analytics-এর দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।
সে জানে না ভিডিওর সব তথ্য সত্যি কি না।
কিন্তু সে জানে—
মানুষ দেখছে।
অনেক মানুষ।
ওদিকে রাতেই অরিজিৎ সেনও ভিডিওটা দেখল।
প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত।
তারপর আবার দেখল।
ভিডিওতে সরাসরি কোনো মিথ্যা নেই।
কিন্তু স্পষ্ট প্রমাণও নেই।
তারপরও এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে দর্শকের মনে সন্দেহ তৈরি হয়।
অরিজিৎ চুপচাপ বসে রইল।
তার অভিজ্ঞতা বলছে, এই ধরনের রিপোর্ট অনেক সময় বিপজ্জনক।
কারণ এগুলো মানুষের মতামত বদলে দেয়।
প্রমাণ ছাড়াই।
সে আবার নোটবুক খুলল।
কিছুক্ষণ ভেবে একটা নতুন লাইন লিখল—
"Influencing the story?"
কলমটা নামিয়ে রাখল সে।
প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
বিভূ হয়তো শুধু খবর সংগ্রহ করছে না।
কিছু ক্ষেত্রে খবরের গতিপথও বদলে দিচ্ছে।
রাত গভীর হলো।
বিভূর ভিডিওর ভিউ বাড়তেই থাকল।
হাজার।
দুই হাজার।
পাঁচ হাজার।
তারপর আরও।
মোবাইলের স্ক্রিনে সংখ্যা বাড়ছে।
আর প্রতিটা সংখ্যার সঙ্গে বাড়ছে তার আত্মবিশ্বাস।
একটা সময় সে বুঝতেই পারল না, ঠিক কখন "সত্যি খোঁজা"র জায়গা থেকে "প্রভাব তৈরি করা"র দিকে সরে এসেছে।
কিন্তু সরে এসেছে।
এবং সেই পরিবর্তনটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।
কারণ মানুষ যখন নিজের সীমা অতিক্রম করে, তখন সে সাধারণত সেটা টের পায় না।
বিভূও পাচ্ছে না।
সে শুধু দেখছে—
ভিউ বাড়ছে।
আর সেটাই এই মুহূর্তে তার কাছে সত্যির চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠছে।
__________________________________
নির্মল সাহাকে নিয়ে প্রকাশিত ভিডিওটা আপলোড হওয়ার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই অস্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়ল।
"খবর এখন"-এর ইতিহাসে এত দ্রুত কোনো অনুসন্ধানধর্মী ভিডিও আগে চলেনি।
কমেন্টের পর কমেন্ট।
শেয়ারের পর শেয়ার।
মানুষ নিজেদের মতো করে গল্প বানাতে শুরু করেছে।
কেউ বলছে নির্মল সাহা দুর্নীতিগ্রস্ত।
কেউ বলছে তাকে ফাঁসানো হচ্ছে।
কেউ আবার দাবি করছে, আরও বড় বড় নাম জড়িত।
বিভূ কম্পিউটারের সামনে বসে সংখ্যা বাড়তে দেখছিল।
তার চোখে ক্লান্তি ছিল।
কিন্তু সেই ক্লান্তির নিচে ছিল এক ধরনের তৃপ্তি।
অনেকদিন পর সে অনুভব করছিল—
সে আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মানুষ তার কথা শুনছে।
তার ভিডিও নিয়ে আলোচনা করছে।
একটা সময় ছিল যখন সে চাকরির জন্য অফিসে অফিসে ঘুরত, আর কেউ তাকে গুরুত্ব দিত না।
আজ পরিস্থিতি অন্যরকম।
আজ সে প্রশ্ন করছে।
আর মানুষ উত্তর খুঁজছে।
তবু আনন্দের মাঝেও একটা অস্বস্তি রয়ে গেল।
কারণ সে জানে—
ভিডিওর সবকিছু শতভাগ প্রমাণিত নয়।
এবং সেই সত্যিটা শুধু সে-ই জানে।
দুপুরের দিকে হঠাৎ ফোন এল।
অচেনা নম্বর।
আবার।
বিভূ কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কল রিসিভ করল।
"হ্যালো?"
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর সেই পরিচিত নিচু গলা।
"ভিডিওটা দেখলাম।"
বিভূর বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
"আপনি?"
"আমি কে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না।"
"আপনি আসলে কী চান?"
লোকটা হালকা হেসে বলল,
"আমি চাই সত্যিটা সামনে আসুক।"
"তাহলে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন না কেন?"
"কারণ কিছু মানুষ সত্যি বলার জন্য নাম ব্যবহার করে।"
একটু থেমে সে যোগ করল,
"আর কিছু মানুষ বেঁচে থাকার জন্য নাম লুকিয়ে রাখে।"
বিভূ চুপ করে গেল।
লোকটার কথাগুলো নাটকীয় শোনাচ্ছিল।
তবু তার গলায় এমন কিছু ছিল, যেটা পুরোপুরি অভিনয় মনে হচ্ছিল না।
"আপনি আবার ফোন করলেন কেন?"
"কারণ আপনি এখনও পুরো গল্পটা জানেন না।"
"মানে?"
"নির্মল সাহার ব্যাপারটা শুধু টাকা-পয়সার নয়।"
বিভূর কপালে ভাঁজ পড়ল।
"তাহলে?"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর লোকটা বলল,
"কিছু মানুষ হারিয়ে গেছে।"
বিভূ সোজা হয়ে বসল।
"কী বলছেন?"
"আমি যা বললাম, সেটাই বললাম।"
"প্রমাণ?"
"এখনও নেই।"
"তাহলে আমি কীভাবে বিশ্বাস করব?"
লোকটা শান্ত স্বরে বলল,
"বিশ্বাস করবেন না। খুঁজে বের করুন।"
তারপর কল কেটে গেল।
একেবারে হঠাৎ।
বিভূ আবার কল ব্যাক করল।
নম্বর বন্ধ।
ঠিক আগের মতো।
সন্ধ্যা পর্যন্ত সে কাজ করতে পারল না।
বারবার সেই কথাগুলো মাথায় ঘুরছিল।
"কিছু মানুষ হারিয়ে গেছে।"
এর মানে কী?
কী ধরনের মানুষ?
কোথায় হারিয়েছে?
আর নির্মল সাহার সঙ্গে সম্পর্ক কী?
সবকিছুই অস্পষ্ট।
তবু তার সাংবাদিকসুলভ প্রবৃত্তি জেগে উঠল।
যদি সত্যি হয়?
যদি সত্যিই এর পেছনে বড় কোনো রহস্য থাকে?
তাহলে?
তার মাথার ভেতর আবার সেই শব্দটা ঘুরতে শুরু করল।
এক্সক্লুসিভ।
ওদিকে শহরের অন্য প্রান্তে অরিজিৎ সেন নিজের ডেস্কে বসে ছিল।
নির্মল সাহাকে নিয়ে নতুন ভিডিও প্রকাশের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে।
এখন সাধারণ মানুষও বিষয়টা নিয়ে কথা বলছে।
ফলে থানায় কয়েকটা নতুন অভিযোগ এসেছে।
কিছু তথ্য।
কিছু গুজব।
কিছু পুরোনো শত্রুতার গল্প।
তদন্তের কাজ হঠাৎ বেড়ে গেছে।
অরিজিৎ বিরক্ত হলো না।
কিন্তু একটা বিষয় তার নজর এড়াল না।
এই পুরো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একজন মানুষ আছে।
বিভূ বৈদ্য।
তার ভিডিও প্রকাশের আগে যে বিষয়টা নিয়ে খুব কম মানুষ কথা বলছিল, সেটাই এখন শহরের প্রধান আলোচ্য।
এটা ক্ষমতা।
খুব সূক্ষ্ম ক্ষমতা।
আর ক্ষমতা মানুষকে বদলে দেয়।
সবসময়।
সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার আগে অরিজিৎ নিজের নোটবুক খুলল।
বিভূর নামের নিচে কয়েকটা পুরোনো নোট লেখা ছিল।
Always First?
Observe
Watch
Influencing the story?
কিছুক্ষণ ভেবে সে আরেকটা লাইন যোগ করল।
"Reporter or participant?"
তারপর নোটবুক বন্ধ করে দিল।
এখনও তার কাছে কোনো প্রমাণ নেই।
কিন্তু প্রশ্নের সংখ্যা বাড়ছে।
আর প্রশ্ন যত বাড়ছে, ততই সে অনুভব করছে—
এই গল্পটা সাধারণ কোনো তদন্ত নয়।
রাত প্রায় একটা।
সারা বাড়ি ঘুমিয়ে।
বিভূ একা বসে আছে তার কম্পিউটারের সামনে।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে কাগজপত্র।
নোট।
প্রিন্টআউট।
পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদন।
হঠাৎ তার ফোনে একটা নতুন মেসেজ এল।
এবার কোনো লেখা নেই।
শুধু একটা ছবি।
অন্ধকারে তোলা ঝাপসা ছবি।
একটা পুরোনো গুদামঘরের।
আর ছবির নিচে মাত্র চারটি শব্দ।
"ওখানেই শুরু হয়েছিল।"
বিভূর শরীর দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
কারণ ছবিটা ভালো করে দেখার পর সে বুঝতে পারল—
এটা সেই গুদামঘর।
যেখানে কয়েকদিন আগে সে রহস্যময় সূত্রের সঙ্গে দেখা করেছিল।
আর প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
হয়তো সে শুধু একটা খবরের পেছনে ছুটছে না।
হয়তো সে এমন একটা খেলায় ঢুকে পড়েছে, যার নিয়ম সে এখনও জানে না।
___________________________
সেই রাতটা বিভূ প্রায় না ঘুমিয়েই কাটাল।
ফোনে আসা ছবিটা বারবার খুলে দেখল।
পুরোনো গুদামঘর।
ঝাপসা অন্ধকার।
আর সেই চারটা শব্দ—
"ওখানেই শুরু হয়েছিল।"
কী শুরু হয়েছিল?
কে শুরু করেছিল?
কেন তাকে এসব জানানো হচ্ছে?
প্রশ্নের শেষ নেই।
কিন্তু উত্তর নেই।
ভোরের দিকে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল বিভূ।
আকাশ ধীরে ধীরে ফর্সা হচ্ছে।
রাস্তায় দু-একটা গাড়ি বেরিয়েছে।
অনেকদিন পর তার মনে হলো, সে যেন আবার সেই পুরোনো সংবাদপত্র অফিসের দিনগুলোতে ফিরে গেছে।
যখন একটা বড় খবরের পেছনে ছুটতে গিয়ে রাত-দিনের হিসাব থাকত না।
পার্থক্য শুধু একটাই।
তখন সে সত্যি খুঁজত।
এখন সে সত্যির পাশাপাশি ভিউও খুঁজছে।
আর এই দুই জিনিসের পার্থক্য দিন দিন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
সকালে মিতালী খেয়াল করল, বিভূর চোখ লাল।
"ঘুমাওনি?"
"কাজ ছিল।"
"সব সময় কাজ, কাজ, কাজ।"
বিভূ হালকা হাসল।
"এই কাজটাই তো এখন ভরসা।"
মিতালী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"ভরসা আর নেশার মধ্যে কিন্তু পার্থক্য আছে।"
কথাটা শুনে বিভূ কিছু বলল না।
কারণ উত্তরটা তার নিজের কাছেই পরিষ্কার নয়।
সেদিন দুপুরে সে আবার গুদামঘরের এলাকায় গেল।
এবার কোনো সূত্রের সঙ্গে দেখা করার জন্য নয়।
নিজের কৌতূহল মেটানোর জন্য।
জায়গাটা আগের মতোই নির্জন।
ভাঙা দেওয়াল।
মরিচা ধরা লোহার গেট।
ধুলো জমে থাকা মেঝে।
ভেতরে ঢুকে চারপাশে তাকাল।
কিছুই অস্বাভাবিক মনে হলো না।
কোনো প্রমাণ নেই।
কোনো রহস্যময় নথি নেই।
কিছুই না।
শুধু পরিত্যক্ত একটা ভবন।
কিন্তু বেরিয়ে আসার সময় তার চোখে একটা জিনিস পড়ল।
দেয়ালে পুরোনো রঙে লেখা একটা কোম্পানির নাম।
নামটা খুব পরিচিত লাগল।
কোথায় যেন দেখেছে।
কয়েক সেকেন্ড পরে মনে পড়ল।
নির্মল সাহাকে নিয়ে পাওয়া নথিগুলোর একটাতে একই নাম ছিল।
বিভূর বুকের ভেতর কেমন যেন ধাক্কা লাগল।
এটা হয়তো কাকতালীয়।
আবার নাও হতে পারে।
বিকেলে বাড়ি ফিরে সে আবার নথিগুলো বের করল।
একটার পর একটা মিলিয়ে দেখতে লাগল।
পুরোনো কোম্পানির নাম।
কিছু জমির কাগজ।
কিছু আর্থিক লেনদেন।
পুরো ছবিটা এখনও অস্পষ্ট।
তবু একটা বিষয় পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।
গুদামঘরটা শুধুই একটা পরিত্যক্ত ভবন নয়।
কোনো এক সময় এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বিভূর সাংবাদিকসুলভ প্রবৃত্তি তাকে বলল—
এখানে একটা গল্প আছে।
বড় গল্প।
সন্ধ্যার দিকে সে একটা সিদ্ধান্ত নিল।
পুরো সত্যি না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না।
বরং একটা নতুন ভিডিও বানাবে।
এবার সরাসরি অভিযোগ নয়।
কিন্তু প্রশ্ন তুলবে।
গুদামঘরের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানি।
নির্মল সাহার নাম।
আর রহস্যজনক কিছু অসঙ্গতি।
সব একসঙ্গে।
আগের বিভূ হয়তো এই সিদ্ধান্ত নিত না।
কিন্তু বর্তমান বিভূ নিল।
কারণ তার মাথায় এখন একটা কথাই ঘুরছে—
যে আগে গল্পটা বলবে, মানুষ তার কথাই শুনবে।
রাত আটটার সময় ভিডিওটা আপলোড হলো।
শিরোনাম—
"পরিত্যক্ত গুদামঘর, হারিয়ে যাওয়া নথি এবং নির্মল সাহা: আসলে কী লুকিয়ে আছে?"
ভিডিও প্রকাশের কয়েক মিনিট পর থেকেই প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করল।
কমেন্ট।
শেয়ার।
ফোনকল।
মেসেজ।
সব একসঙ্গে।
মানুষের আগ্রহ আগের চেয়েও বেশি।
অনেকে নতুন তথ্য দেওয়ার দাবি করছে।
অনেকে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলছে।
অনেকে আবার বিভূকে সতর্কও করছে।
কিন্তু সেসবের মধ্যে একটা বিষয় সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ল।
রাত সাড়ে নয়টার দিকে তার ফোনে একটা নতুন নোটিফিকেশন এল।
অচেনা নম্বর।
একটা মাত্র মেসেজ।
"এবার তারা তোমাকে লক্ষ্য করবে।"
বিভূর মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর চারপাশে।
ঘরের ভেতর।
জানালার বাইরে।
অন্ধকার রাস্তায়।
প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
এটা আর শুধু একটা সংবাদ অনুসন্ধান নয়।
কেউ তাকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।
ধীরে ধীরে।
পরিকল্পিতভাবে।
একই সময়ে থানায় বসে অরিজিৎ সেনও নতুন ভিডিওটা দেখছিল।
ভিডিও শেষ হওয়ার পর সে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নোটবুক খুলে বিভূর নামের নিচে শেষ একটা লাইন লিখল।
"Too close to the story."
খুব কাছাকাছি।
অতিরিক্ত কাছাকাছি।
একজন সংবাদকর্মীর যতটা হওয়া উচিত, তার চেয়েও বেশি।
এবং সেই উপলব্ধিটাই তাকে অস্বস্তিতে ফেলল।
কারণ তার অভিজ্ঞতা বলে—
যখন কেউ কোনো গল্পের খুব কাছে চলে যায়, তখন একসময় সে আর গল্পের পর্যবেক্ষক থাকে না।
গল্পের অংশ হয়ে যায়।
সেদিন গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর বিভূ একা বসে analytics দেখছিল।
সংখ্যাগুলো দ্রুত বাড়ছে।
হাজার।
দুই হাজার।
দশ হাজার।
আরও বেশি।
তার জীবনে প্রথমবার কোনো অনুসন্ধানধর্মী সিরিজ এত মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
তার মুখে ধীরে ধীরে তৃপ্তির হাসি ফুটল।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে সে একটা বিষয় বুঝতে পারল না।
আজ রাতে সে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে সত্যি আবিষ্কারের জন্য নয়।
ভিউ পাওয়ার জন্য।
এবং ঠিক সেই কারণেই, অজান্তে, সে নিজের ভেতরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখাটা আরেকবার অতিক্রম করল।
________________________________
প্রায় তিন সপ্তাহ কেটে গেছে।
এই তিন সপ্তাহে "খবর এখন"-এর অবস্থান বদলে গেছে।
আগে যেখানে বিভূ প্রতিদিন নতুন follower পাওয়ার আশায় analytics খুলত, এখন follower নিজেরাই বাড়ছে।
শহরের ছোট ব্যবসাগুলো বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেছে।
একটা ওষুধের দোকান।
দুটো কোচিং সেন্টার।
একটা মোবাইল শোরুম।
টাকাগুলো খুব বেশি নয়।
তবু নিয়মিত।
অনেক বছর পর প্রথমবার বিভূ অনুভব করল, তার কাজ থেকে আবার আয় হচ্ছে।
সকালে চা খেতে খেতে মিতালী বলল,
"এই মাসে স্কুলের ফি নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না, তাই তো?"
বিভূ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর মাথা নাড়ল।
"না। এবার সময়মতো দিতে পারব।"
মিতালীর মুখে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল।
সেই হাসিটা দেখে বিভূর বুকের ভেতর অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
কত বছর পর সে এই দৃশ্য দেখছে?
যখন সংসারের খরচ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মিতালীর চোখে দুশ্চিন্তা থাকে না।
ছেলে ঋত্বিকও খুশি।
স্কুলে বন্ধুরা নাকি "খবর এখন"-এর ভিডিও দেখেছে।
মেয়ে রিয়া একদিন গর্ব করে বলেছে,
"আমার বাবা টিভিতে না থাকলেও সবাই ওনাকে চেনে।"
সেদিন বিভূ কিছু বলেনি।
শুধু হাসছিল।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেই কথাগুলো জমে যাচ্ছিল।
স্বীকৃতি।
সম্মান।
পরিচিতি।
মানুষ এই জিনিসগুলোর জন্য কত কিছু করে।
সে নিজেও করছে।
দুপুরে বাজারে বেরিয়ে বিভূ নতুন একটা ব্যাপার খেয়াল করল।
একজন দোকানদার তাকে দেখে হাত নাড়ল।
একজন রিকশাচালক এসে বলল,
"দাদা, আপনার ভিডিওগুলো দেখি।"
আরেকজন এসে একটা খবরের টিপস দিল।
ঘটনাগুলো ছোট।
খুব সাধারণ।
কিন্তু বিভূর কাছে এগুলো অসাধারণ লাগছিল।
কারণ বহু বছর ধরে সে অদৃশ্য হয়ে ছিল।
এখন আবার মানুষ তাকে চিনছে।
সন্ধ্যায় অফিসঘর হিসেবে ব্যবহার করা ছোট্ট ঘরে বসে ছিল বিভূ।
কম্পিউটারের স্ক্রিনে analytics খোলা।
একটার পর একটা সংখ্যা।
একটার পর একটা গ্রাফ।
হঠাৎ তার চোখে একটা বিষয় পড়ল।
গত তিন মাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিওগুলোর তালিকা।
সে তালিকাটা খুলল।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
কারণ একটা বিষয় খুব পরিষ্কার।
রাস্তা মেরামতের খবর?
মাঝারি ভিউ।
স্কুলের অনুষ্ঠান?
কম ভিউ।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান?
আরও কম।
কিন্তু—
হামলা।
রহস্য।
অভিযোগ।
তদন্ত।
বিতর্ক।
এই ধরনের ভিডিও?
বহুগুণ বেশি ভিউ।
বিভূ ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিল।
তার সামনে যেন একটা অস্বস্তিকর সত্য দাঁড়িয়ে গেল।
মানুষ তথ্য চায় না।
মানুষ উত্তেজনা চায়।
রাতের দিকে সে পুরোনো ভিডিওগুলো আবার দেখতে শুরু করল।
গৌতম দে-র ঘটনা।
নির্মল সাহার হামলা।
গুদামঘরের রহস্য।
প্রতিটা ভিডিওর নিচে হাজার হাজার মন্তব্য।
মানুষ আলোচনা করছে।
তর্ক করছে।
অনুমান করছে।
আর প্রতিটা আলোচনার কেন্দ্রে আছে "খবর এখন"।
তার পেজ।
তার নাম।
তার কাজ।
একটা সময় ছিল যখন সে খবরের পেছনে ছুটত।
এখন মাঝে মাঝে তার মনে হয়—
খবরও যেন তার পেছনে ছুটে আসছে।
ওদিকে অরিজিৎ সেন নিজের অফিসে বসে অন্য হিসাব কষছে।
নির্মল সাহার মামলায় এখনও কোনো বড় অগ্রগতি নেই।
কিন্তু তার নোটবুকের একটা নাম বারবার সামনে আসছে।
বিভূ বৈদ্য।
সে কাউকে অভিযুক্ত করছে না।
প্রমাণও নেই।
তবু একটা অদ্ভুত অস্বস্তি যাচ্ছে না।
কিছু একটা মিলছে না।
আর অরিজিৎ জানে—
একজন তদন্তকারীর কাছে এই অনুভূতিটা কখনও কখনও খুব মূল্যবান।
রাত প্রায় বারোটা।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
বিভূ একা বসে আছে।
কম্পিউটারের আলো তার মুখে পড়ছে।
স্ক্রিনে analytics।
নতুন follower সংখ্যা।
নতুন বিজ্ঞাপন।
নতুন আয়।
সবকিছু।
তারপর হঠাৎ সে একটা খালি নোটপ্যাড খুলল।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
কিছু লিখল না।
তবু মাথার ভেতর একটা ভাবনা ঘুরতে লাগল।
যে ভাবনাটা তাকে নিজেকেও অস্বস্তিতে ফেলল।
"যদি বড় খবরই মানুষ সবচেয়ে বেশি চায়..."
ভাবনাটা সেখানেই থেমে গেল।
সে আর এগোল না।
নোটপ্যাডও বন্ধ করে দিল।
কিন্তু একটা বিষয় বুঝতে পারল না।
কিছু কিছু বিপজ্জনক পরিবর্তন আচমকা আসে না।
খুব ধীরে আসে।
এত ধীরে যে মানুষ নিজেই টের পায় না।
আর বিভূ বৈদ্যের ভেতর সেই পরিবর্তন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
__________________________________________
Part 5-এর শেষের পর থেকে প্রায় এক মাস কেটে গেছে।
এই এক মাসে "খবর এখন" এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যা একসময় বিভূ কল্পনাও করতে পারেনি।
Follower সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ পেজে আসছে।
শুধু নিজের শহর নয়, আশেপাশের এলাকাতেও এখন মানুষ তার ভিডিও শেয়ার করছে।
এক সন্ধ্যায় কম্পিউটারের সামনে বসে analytics দেখছিল বিভূ।
আগে এই সংখ্যাগুলো তার কাছে শুধু তথ্য ছিল।
এখন সেগুলো অনুভূতি হয়ে গেছে।
কোন ভিডিও কতজন দেখল।
কতক্ষণ দেখল।
কোথায় বন্ধ করল।
কতজন শেয়ার করল।
সবকিছু সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করেছে।
একটা ভিডিওর ভিউ যদি প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়, তাহলে তার মন খারাপ হয়।
আর যদি কোনো ভিডিও হঠাৎ ভাইরাল হয়, তাহলে সারাদিন তার মুখে হাসি লেগে থাকে।
সে নিজেও বুঝতে পারছিল না, ঠিক কখন সংখ্যাগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।
সেদিন বিকেলে একটা স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গিয়েছিল সে।
অনুষ্ঠানটা খারাপ ছিল না।
ছাত্রছাত্রীরা ভালো পারফর্ম করেছে।
শিক্ষকেরা অনেক পরিশ্রম করেছেন।
বিভূ ভিডিও করল।
ছবি তুলল।
রিপোর্টও বানাল।
রাতে আপলোড করল।
পরদিন সকালে ভিউ দেখল।
খুবই কম।
মাত্র কয়েকশো।
বিভূ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর একই দিনে এক বাজারে দুই ব্যবসায়ীর ঝগড়ার ছোট্ট ভিডিও আপলোড করল।
দশ মিনিটের ঘটনা।
তেমন গুরুত্বপূর্ণও নয়।
কিন্তু মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ল।
কমেন্ট।
শেয়ার।
তর্ক।
হাজার হাজার ভিউ।
বিভূ অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, পৃথিবীটা যেন উল্টো হয়ে গেছে।
যেখানে ভালো কাজের মূল্য কম।
আর উত্তেজনার মূল্য বেশি।
রাতে খাওয়ার সময় ঋত্বিক বলল,
"বাবা, আজকে তোমার ভিডিওতে আমাদের স্কুলের অনুষ্ঠানটা দেখলাম।"
বিভূ হাসল।
"ভালো লেগেছে?"
"হ্যাঁ। কিন্তু কমেন্ট খুব কম।"
কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল।
কিন্তু বিভূ হাসতে পারল না।
কারণ সেও ঠিক একই জিনিস ভেবেছে।
একটা চৌদ্দ বছরের ছেলেও এখন কমেন্ট আর ভিউ নিয়ে কথা বলছে।
আর সে?
সে তো প্রায় প্রতিদিনই ভাবছে।
সেই রাতেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী তাকে ফোন করলেন।
আগে একবার বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন।
এবার আরও বড় বিজ্ঞাপন দিতে চান।
কারণ?
"আপনার পেজে এখন অনেক reach।"
ফোন রাখার পর বিভূ চুপ করে বসে রইল।
অনেক বছর আগে অফিসে চাকরি করার সময় কেউ তাকে reach-এর জন্য টাকা দেয়নি।
আজ দিচ্ছে।
তার পরিচিতি এখন অর্থে পরিণত হচ্ছে।
এই অনুভূতিটা বিপজ্জনকভাবে মধুর।
ওদিকে মিতালীও পরিবর্তনটা লক্ষ্য করতে শুরু করেছে।
আগে বিভূ ঘুমানোর আগে বই পড়ত।
কখনও পুরোনো সংবাদপত্র দেখত।
এখন?
শুয়ে শুয়েও ফোনে analytics দেখে।
রাত দুটো।
তিনটে।
কখনও চারটেও।
একদিন মিতালী বলল,
"একদিন না দেখলে কী হয়?"
বিভূ চোখ না তুলেই উত্তর দিল,
"দেখতেই হয়।"
"কেন?"
"কাজের জন্য।"
মিতালী কিছু বলল না।
কিন্তু তার মনে হলো, এটা শুধু কাজের জন্য নয়।
আরও কিছু আছে।
একই সময়ে অরিজিৎ সেন নিজের তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত।
নির্মল সাহার মামলায় নতুন কোনো অগ্রগতি নেই।
তবু সে মাঝে মাঝে "খবর এখন"-এর ভিডিওগুলো দেখে।
শুধু তথ্যের জন্য নয়।
বিভূকে বোঝার জন্য।
এক রাতে ভিডিও দেখতে দেখতে সে একটা বিষয় খেয়াল করল।
বিভূর পুরোনো ভিডিও আর নতুন ভিডিওর মধ্যে পার্থক্য আছে।
আগে খবর বলার ভঙ্গি ছিল শান্ত।
এখন বেশি নাটকীয়।
আগে তথ্য বেশি ছিল।
এখন প্রশ্ন বেশি।
আগে সংবাদ ছিল।
এখন আগ্রহ তৈরির চেষ্টা বেশি।
পার্থক্যটা সূক্ষ্ম।
কিন্তু স্পষ্ট।
অরিজিৎ নোটবুকে লিখল—
"Changing."
শুধু একটি শব্দ।
কিন্তু সেই শব্দটার ভেতরে অনেক অর্থ লুকিয়ে ছিল।
রাত গভীর হলো।
বাইরে হালকা বাতাস বইছে।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে।
শুধু বিভূ জেগে।
কম্পিউটারের স্ক্রিনে সংখ্যা বদলাচ্ছে।
ভিউ বাড়ছে।
Follower বাড়ছে।
Income estimate বাড়ছে।
সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ মনে পড়ল চাকরি হারানোর পরের সেই দিনগুলোর কথা।
যখন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা থাকত না।
যখন স্কুলের ফি নিয়ে চিন্তা করতে হতো।
যখন নিজের পরিচয়টাই হারিয়ে ফেলেছিল।
আজ সে আবার গুরুত্বপূর্ণ।
আবার পরিচিত।
আবার সফল।
এবং ঠিক সেই কারণেই সে বুঝতে পারল না—
সে আর খবরের পেছনে ছুটছে না।
সে ছুটছে সংখ্যার পেছনে।
আর সংখ্যার এই খেলায় একবার ডুবে গেলে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন।
রবিবার সকাল।
অনেকদিন পর একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছিল বিভূ।
সাধারণত এখন তার দিন শুরু হয় মোবাইল হাতে নিয়ে।
ঘুম ভাঙার পর প্রথম কাজ—
পেজের reach দেখা।
নতুন follower দেখা।
রাতের ভিডিওর performance দেখা।
কিন্তু আজ ঘুম ভাঙতেই তার চোখে পড়ল বুকশেলফের এক কোণে রাখা পুরোনো একটা ফাইল।
ধুলো জমে গেছে।
অনেকদিন খোলা হয়নি।
কৌতূহলবশত ফাইলটা বের করল সে।
ভেতরে পুরোনো কাগজ।
কিছু ছবি।
আর সংবাদপত্রে প্রকাশিত কয়েকটা প্রতিবেদন।
বছর দশেক আগের।
সেই সময়ের, যখন সে এখনও চাকরিতে ছিল।
বড় কোনো সাংবাদিক ছিল না।
তবু সংবাদ সংগ্রহের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
প্রতিটা প্রতিবেদনের পাশে তার নিজের হাতে লেখা কিছু নোটও ছিল।
একটা পাতায় বড় করে লেখা—
"সবার আগে নয়, সবার ঠিক আগে।"
বাক্যটা পড়ে বিভূ থমকে গেল।
এটা তার নিজের লেখা।
বহু বছর আগে।
তখন সে বিশ্বাস করত, দ্রুত খবর দেওয়ার চেয়ে সঠিক খবর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই হাসল।
কেমন বোকা বোকা লাগে এখন এসব কথা।
নাকি সত্যিই বোকা?
সে নিজেও বুঝতে পারল না।
দুপুরে পুরোনো এক সহকর্মীর ফোন এল।
নাম অম্লান।
কোভিডের আগে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করত।
অনেকদিন যোগাযোগ নেই।
সাধারণ কথাবার্তার পর অম্লান বলল,
"তোর পেজটা দেখছি আজকাল।"
"ভালো?"
"চলছে ভালোই।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর অম্লান বলল,
"একটা কথা বলব?"
"বল।"
"রাগ করিস না।"
বিভূ হেসে ফেলল।
"আগে বল।"
অম্লান একটু ইতস্তত করে বলল,
"আগে তুই খবর নিয়ে বেশি ভাবতিস। এখন মনে হয় presentation নিয়ে বেশি ভাবিস।"
কথাটা শুনে বিভূর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
"মানে?"
"কিছু না। আমার ভুলও হতে পারে।"
"না, বল।"
"আগে তোকে দেখে মনে হতো তুই সত্যিটা খুঁজছিস। এখন মনে হয় মানুষ কী শুনতে চায়, সেটা বেশি ভাবছিস।"
ঘরের ভেতর হঠাৎ অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল।
বিভূর উত্তর দিতে ইচ্ছে করছিল না।
কারণ কথাগুলো তার ভালো লাগেনি।
আর মানুষ সাধারণত সেই কথাগুলোই অপছন্দ করে, যেগুলোর মধ্যে একটু হলেও সত্যি থাকে।
ফোন রাখার পর অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল সে।
রাগ হচ্ছিল।
অম্লানের উপর।
আবার নিজের উপরও।
কারণ সে জানে, গত কয়েক মাসে সে বদলেছে।
কিন্তু কতটা?
সেটা নিয়ে ভাবতে চায় না।
ঠিক তখনই তার ফোনে notification এল।
নতুন ভিডিও।
নতুন কমেন্ট।
নতুন শেয়ার।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার মন অন্যদিকে চলে গেল।
অম্লানের কথা ভুলে গেল।
সংখ্যাগুলো আবার তাকে টেনে নিল।
সন্ধ্যার দিকে মেয়ে রিয়া পড়তে বসেছিল।
হঠাৎ এসে বলল,
"বাবা, আজ আমার আঁকার খাতা দেখবে?"
আগে হলে বিভূ সঙ্গে সঙ্গে উঠে যেত।
রিয়ার আঁকা সে খুব পছন্দ করত।
কিন্তু আজ?
আজ সে analytics দেখছিল।
"একটু পরে দেখছি।"
"কত পরে?"
"পাঁচ মিনিট।"
রিয়া মাথা নেড়ে চলে গেল।
পাঁচ মিনিট।
দশ মিনিট।
বিশ মিনিট।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে বিভূর মনে পড়ল।
সে উঠে রিয়ার ঘরে গেল।
দেখল মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে।
আঁকার খাতাটা খোলা অবস্থায় টেবিলে পড়ে আছে।
প্রথম পাতায় বড় করে লেখা—
"বাবার জন্য"
বিভূর বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
খাতাটা খুলে দেখল।
রঙপেন্সিলে আঁকা একটা ছবি।
একজন মানুষ।
হাতে মোবাইল।
সামনে কম্পিউটার।
ছবির নিচে লেখা—
"আমার বাবা খবর বানায়।"
বিভূ অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আস্তে করে খাতাটা বন্ধ করে দিল।
সেই রাতেই আবার অরিজিৎ সেনের সঙ্গে তার অদ্ভুত একটা যোগাযোগ হয়ে গেল।
সরাসরি নয়।
পরোক্ষভাবে।
অরিজিৎ থানায় বসে একটা পুরোনো ভিডিও দেখছিল।
ভিডিওর মন্তব্যগুলোও পড়ছিল।
হঠাৎ একটা কমেন্ট চোখে পড়ল।
কেউ লিখেছে—
"বিভূদা যা বলে, এখন আমরা সেটাই বিশ্বাস করি।"
অরিজিৎ কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে ল্যাপটপ বন্ধ করল।
কারণ সে জানে, এটা শুধু জনপ্রিয়তা নয়।
এটা প্রভাব।
আর প্রভাব যত বাড়ে, দায়িত্বও তত বাড়ে।
কিন্তু সবাই সেই দায়িত্ব বহন করতে পারে না।
রাত বারোটা।
সবাই ঘুমিয়ে।
বিভূ আবার একা।
পুরোনো ফাইলটা এখনও টেবিলে পড়ে আছে।
সেই পাতাটা খোলা।
"সবার আগে নয়, সবার ঠিক আগে।"
সে কিছুক্ষণ লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে ফাইলটা বন্ধ করে দিল।
ড্রয়ারের ভেতর ঢুকিয়ে দিল।
যেন অতীতটাকেও ভেতরে বন্ধ করে দিল।
কারণ সত্যিটা হলো—
পুরোনো বিভূ এখনও পুরোপুরি মরে যায়নি।
সে এখনও মাঝে মাঝে কথা বলে।
প্রশ্ন করে।
থামতে বলে।
কিন্তু নতুন বিভূ এখন অনেক বেশি শক্তিশালী।
আর নতুন বিভূর কাছে একটা জিনিসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
সংখ্যা।
ভিউ।
আর সেই অনুভূতি, যা তাকে আবার গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বলে মনে করায়।
__________________________________বৃষ্টি পড়ছিল।
টানা তিনদিন ধরে।
শহরের আকাশ যেন ধূসর একটা চাদর মুড়ে বসে আছে।
এই ধরনের আবহাওয়া বিভূর আগে খুব ভালো লাগত।
জানালার পাশে বসে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ত।
কখনও পুরোনো বই।
কখনও গল্প।
কিন্তু এখন?
এখন বৃষ্টি দেখার সময় নেই।
কারণ তার সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস আছে।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করা সংখ্যা।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই সে analytics খুলল।
গত রাতের ভিডিও প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করেছে।
কমেন্টের সংখ্যা বেড়েছে।
শেয়ার বেড়েছে।
Follower বেড়েছে।
একটা সময় ছিল যখন এসব সংখ্যা শুধু রিপোর্টের অংশ ছিল।
এখন এগুলো তার মুড ঠিক করে দেয়।
ভালো সংখ্যা মানে ভালো দিন।
খারাপ সংখ্যা মানে খারাপ দিন।
এবং সে নিজেও বুঝতে পারছে না, কত দ্রুত এই পরিবর্তনটা হয়েছে।
সেদিন দুপুরে এক ছোট ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল বিভূ।
লোকটা বিজ্ঞাপন দিতে চায়।
একটা নতুন শোরুম খুলেছে।
বিভূ এখন প্রায়ই এই ধরনের মিটিং করে।
আগে কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে চাইত না।
এখন মানুষ নিজে থেকে ফোন করে।
চা খাওয়ায়।
সম্মান করে।
এই ব্যাপারটা তার ভালো লাগে।
খুব ভালো লাগে।
মিটিং শেষ হওয়ার পর লোকটা হেসে বলল,
"দাদা, আপনার একটা ভিডিও মানেই এখন শহরে আলোচনা শুরু হয়ে যায়।"
কথাটা শুনে বিভূও হাসল।
কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে বাক্যটা বারবার মাথায় ঘুরতে লাগল।
"আলোচনা শুরু হয়ে যায়।"
মানে মানুষ শুনছে।
মানুষ বিশ্বাস করছে।
মানুষ প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে।
এই প্রভাবটাই ধীরে ধীরে তার সবচেয়ে বড় নেশা হয়ে উঠছে।
ওদিকে থানায় বসে অরিজিৎ সেন অন্য কিছু নিয়ে ভাবছিল।
নির্মল সাহার মামলার ফাইল এখনও তার ডেস্কে পড়ে আছে।
কোনো বড় অগ্রগতি নেই।
তবু সে বিষয়টা ছাড়তে পারছে না।
কেন?
কারণ তদন্তে কখনও কখনও তথ্যের চেয়ে আচরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আর বিভূর আচরণ তার কাছে ক্রমশ অদ্ভুত লাগছে।
সেদিন সে থানার এক কর্মীকে ডেকে কিছু পুরোনো তথ্য বের করতে বলল।
কোনো গোপন তদন্ত নয়।
কোনো বিশেষ অভিযানও নয়।
শুধু কিছু সময়ের হিসাব।
কিছু ঘটনার টাইমলাইন।
কখন কোথায় কী ঘটেছিল।
আর সেই ঘটনাগুলোর সময় "খবর এখন" কত দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল।
অরিজিৎ জানে, হয়তো কিছুই পাওয়া যাবে না।
তবু সে খুঁজছে।
কারণ তার অভিজ্ঞতা বলছে—
কখনও কখনও সত্যি লুকিয়ে থাকে ছোট ছোট অসঙ্গতির মধ্যে।
সন্ধ্যার দিকে বিভূ বাড়ি ফিরছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো কেউ যেন তাকে লক্ষ্য করছে।
অনুভূতিটা খুব অদ্ভুত।
কোনো প্রমাণ নেই।
কেউ তাকে অনুসরণ করছে এমনও নয়।
তবু মনে হচ্ছে কোথাও একটা নজর আছে।
সে বাইক থামিয়ে পিছনে তাকাল।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
কিছুই নেই।
নিজের উপরই বিরক্ত হলো সে।
গত কয়েক মাসের ঘটনা তার মাথার ভেতর এত চাপ তৈরি করেছে যে এখন সাধারণ ব্যাপারও সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।
তবু অস্বস্তিটা পুরোপুরি গেল না।
রাতে বাড়ি ফিরে সে দেখল একটা নতুন মেসেজ এসেছে।
অচেনা নম্বর।
আবার।
মেসেজে মাত্র একটা লাইন।
"জনপ্রিয়তা যত বাড়ে, ছায়াও তত বড় হয়।"
বিভূর বুকের ভেতর কেমন যেন ঠান্ডা অনুভূতি হলো।
এই একই ধাঁচের বার্তা।
এই একই রহস্যময় ভাষা।
কে পাঠাচ্ছে?
কেন?
সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল।
কোনো রিপ্লাই এল না।
পাঁচ মিনিট।
দশ মিনিট।
আধঘণ্টা।
কিছুই না।
যেন কেউ শুধু বার্তা পাঠিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
রাত বাড়তে থাকল।
মিতালী ঘুমিয়ে পড়েছে।
ছেলে-মেয়ের ঘরও নিস্তব্ধ।
শুধু বিভূ জেগে।
টেবিলের ওপর খোলা ল্যাপটপ।
পাশে নোটবুক।
হঠাৎ সে খেয়াল করল, অনেকদিন ধরে সে একটা কাজ করছে।
অজান্তে।
প্রতিটা নতুন মেসেজ।
প্রতিটা নতুন সূত্র।
প্রতিটা নতুন মন্তব্য।
সে লিখে রাখছে।
তারিখ।
সময়।
বিস্তারিত।
প্রথমে সাংবাদিকসুলভ অভ্যাস ছিল।
এখন যেন বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে।
যেন কিছু মিস হয়ে গেলে চলবে না।
কিছু হারিয়ে গেলে চলবে না।
একই সময়ে অরিজিৎও তার ডেস্কে বসে নোট লিখছিল।
আজকের পর্যবেক্ষণ।
আজকের তথ্য।
আজকের সন্দেহ।
সবশেষে সে এক লাইনের একটা মন্তব্য লিখল।
"যে মানুষ সবসময় অন্যদের পর্যবেক্ষণ করে, একসময় সে নিজেও পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে যায়।"
কলমটা নামিয়ে রাখল সে।
তারপর ফাইল বন্ধ করে দিল।
রাত প্রায় দুটো।
বিভূ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
বৃষ্টি থেমে গেছে।
রাস্তায় আলো পড়ছে।
সবকিছু শান্ত।
স্বাভাবিক।
তবু তার মনে হলো—
কোথাও যেন কিছু বদলাচ্ছে।
খুব ধীরে।
খুব নিঃশব্দে।
হয়তো রহস্যময় সূত্র তাকে দেখছে।
হয়তো অরিজিৎ তাকে পর্যবেক্ষণ করছে।
হয়তো দুজনেই।
সে জানে না।
কিন্তু একটা বিষয় সে অনুভব করতে পারছে।
আগে সে শুধু খবর সংগ্রহ করত।
এখন সে নিজেও কারও আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠছে।
আর সেই উপলব্ধিটা তাকে অস্বস্তি দিলেও—
অদ্ভুতভাবে, সামান্য আনন্দও দিচ্ছে।
কারণ জনপ্রিয়তার নেশা এমনই।
মানুষকে নজরের কেন্দ্রে থাকতে শেখায়।
এমনকি সেই নজর বিপজ্জনক হলেও।
__________________________________রবিবার রাত।
ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
সারা বাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে।
শুধু বিভূ জেগে আছে।
কম্পিউটারের স্ক্রিনে "খবর এখন"-এর dashboard খোলা।
সংখ্যাগুলো এখনও বাড়ছে।
দিনের শেষ ভিডিওটা আশাতীত সাফল্য পেয়েছে।
একসময় সে শুধু ভিউ দেখত।
এখন সে মানুষকে দেখার চেষ্টা করে।
কোন বয়সের মানুষ দেখছে।
কোন এলাকা থেকে দেখছে।
কখন ভিডিও বন্ধ করছে।
কখন সবচেয়ে বেশি মন্তব্য করছে।
মনে হয় যেন সে আর সংবাদকর্মী নয়।
একজন গবেষক।
মানুষের আগ্রহ নিয়ে গবেষণা করছে।
আর সেই গবেষণার ফলাফল প্রতিদিন একই কথা বলছে।
মানুষ উত্তেজনা ভালোবাসে।
কিছুক্ষণ পর সে ল্যাপটপ বন্ধ করল।
জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে রাতের শহর।
দূরে একটা কুকুর ডাকছে।
রাস্তার আলোয় ভেজা ডামর চকচক করছে।
এমন সময় তার চোখে পড়ল নিজের প্রতিচ্ছবি।
জানালার কাঁচে।
ক্লান্ত মুখ।
চোখের নিচে কালি।
তবু সেই চোখের ভেতর একটা অদ্ভুত ঝিলিক আছে।
কয়েক বছর আগে চাকরি হারানোর পর এই ঝিলিকটা হারিয়ে গিয়েছিল।
আজ আবার ফিরে এসেছে।
কিন্তু কেন?
সাফল্যের জন্য?
নাকি অন্য কিছুর জন্য?
পরদিন সকালে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
বাজারে যাওয়ার সময় এক মধ্যবয়স্ক লোক হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল।
"আপনি বিভূদা তো?"
বিভূ থেমে গেল।
"হ্যাঁ।"
লোকটা হাসল।
"আপনার ভিডিওগুলো নিয়মিত দেখি।"
"ধন্যবাদ।"
"আপনি না থাকলে আমরা অনেক খবরই জানতে পারতাম না।"
খুব সাধারণ কথা।
প্রতিদিনই কেউ না কেউ এমন কথা বলে।
তবু আজ বাক্যটা তার মনে গেঁথে গেল।
"আপনি না থাকলে..."
কেউ তার কাজের উপর নির্ভর করছে।
কেউ তার কথা বিশ্বাস করছে।
কেউ তার মাধ্যমে পৃথিবীকে দেখছে।
এই অনুভূতিটা নেশার মতো।
বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় মিতালী একটা খাম দিল।
ভেতরে স্কুলের রসিদ।
ছেলে আর মেয়ের ফি জমা হয়ে গেছে।
সময়মতো।
কোনো ধার না করে।
কোনো আত্মীয়ের কাছে হাত না পেতে।
বহু বছর পর।
মিতালী শান্ত গলায় বলল,
"অনেকদিন পর একটু নিশ্চিন্ত লাগছে।"
বিভূ কিছু বলল না।
শুধু মাথা নাড়ল।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অনুভূতি জেগে উঠল।
এই নিশ্চিন্তির একটা দাম আছে।
আর সেই দাম সে দিচ্ছে।
দিনরাত কাজ করে।
খবরের পেছনে ছুটে।
ভিউয়ের পেছনে ছুটে।
সেদিন রাতে অরিজিৎ সেনও বাড়ি ফিরেছিল বেশ দেরি করে।
ডিনার শেষ করে সে আবার ফাইল খুলল।
কিছু পুরোনো নোট।
কিছু নতুন পর্যবেক্ষণ।
কিছু নাম।
সবার উপরে লেখা—
বিভূ বৈদ্য।
অনেকক্ষণ নামটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার সন্দেহ এখনও প্রমাণে পরিণত হয়নি।
হয়তো কোনোদিন হবেও না।
তবু অভিজ্ঞতা তাকে একটা কথাই বলছে—
কিছু একটা ঠিক নেই।
আর সেই "ঠিক নেই" অনুভূতিটাই তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ওদিকে বিভূ নিজের ঘরে বসে পুরোনো একটা ভিডিও দেখছিল।
চাকরি হারানোর কয়েক মাস পরে বানানো ভিডিও।
ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা যেন অন্য কেউ।
চোখে হতাশা।
গলায় অনিশ্চয়তা।
মুখে ক্লান্তি।
ভিডিওটা বন্ধ করে দিল সে।
তারপর বর্তমানের একটা ভিডিও চালাল।
সেখানে আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ কথা বলছে।
মানুষ শুনছে।
বিশ্বাস করছে।
প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে।
দুটো মানুষ একই।
তবু কত আলাদা।
রাত বারোটার পর একটা নতুন notification এল।
অচেনা নম্বর।
আবার।
বিভূর বুক ধক করে উঠল।
মেসেজ খুলল।
এবারও মাত্র একটা লাইন।
"সবচেয়ে বিপজ্জনক নেশা সেইটা, যেটা মানুষ নেশা বলে মানতে চায় না।"
কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল বিভূ।
তারপর ফোনটা টেবিলে রেখে দিল।
আগের মতো উত্তর দিল না।
কলও করল না।
শুধু বসে রইল।
কারণ এই প্রথমবার তার মনে হলো—
হয়তো কথাটার মধ্যে সত্যি কিছু আছে।
ঘরের ভেতর নীরবতা।
কম্পিউটারের স্ক্রিনে এখনও dashboard খোলা।
সংখ্যাগুলো ধীরে ধীরে বাড়ছে।
একটা ভিউ।
আরেকটা।
আরেকটা।
খুব ছোট ছোট পরিবর্তন।
তবু তার চোখ সেখান থেকে সরছে না।
ঠিক তখনই সে নিজের অজান্তে হাসল।
খুব সামান্য।
খুব ক্ষীণ।
কিন্তু সেই হাসিটাই সব বলে দিল।
কারণ বহুদিন পর সে একটা সত্যি বুঝতে পারল।
এখন যদি কেউ তাকে বলে—
সব বন্ধ করে দাও।
পেজ বন্ধ করে দাও।
এই জীবন ছেড়ে দাও।
সে পারবে না।
টাকার জন্য নয়।
সংবাদ ভালোবাসার জন্যও নয়।
বরং অন্য কিছুর জন্য।
একটা অনুভূতির জন্য।
গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অনুভূতি।
মানুষের নজরে থাকার অনুভূতি।
প্রভাব বিস্তার করার অনুভূতি।
এই অনুভূতির স্বাদ সে পেয়ে গেছে।
আর একবার সেই স্বাদ পেয়ে গেলে, মানুষ সাধারণ জীবনে ফিরতে চাইলেও সহজে ফিরতে পারে না।
জানালার বাইরে রাত আরও গভীর হলো।
আর বিভূ বৈদ্য বুঝতে না পেরেই এমন এক পথে আরও কয়েক কদম এগিয়ে গেল, যেখান থেকে ফিরে আসা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
____________________________
শহরে শীত নামতে শুরু করেছে।
ভোরবেলার বাতাসে হালকা কুয়াশা।
রাস্তার চায়ের দোকানগুলোতে ভিড় বাড়ছে।
আর "খবর এখন"-এর follower সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার ছুঁইছুঁই।
সংখ্যাটা দেখে এখনও মাঝে মাঝে বিশ্বাস হয় না বিভূর।
একসময় একশো ভিউ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতো।
আজ হাজার হাজার মানুষ তার প্রতিটা পোস্টের অপেক্ষায় থাকে।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, এই সাফল্যের মধ্যেও একটা অস্বস্তি ধীরে ধীরে তার জীবনে ঢুকে পড়ছে।
সে এখনও জানে না অস্বস্তির উৎস কোথায়।
তবু অনুভব করছে।
সেদিন সকালে থানায় বসে অরিজিৎ সেন পুরোনো কয়েকটা ফাইল খুলে রেখেছিল।
টেবিলের এক পাশে নির্মল সাহার ঘটনা।
আরেক পাশে শহরের আরও কয়েকটি আলোচিত অপরাধ।
ঘণ্টাখানেক ধরে সে শুধু তারিখ মিলিয়ে দেখছিল।
ঘটনার সময়।
খবর প্রকাশের সময়।
ভিডিও আপলোডের সময়।
প্রথম নজরে সব স্বাভাবিক।
কিন্তু বারবার দেখার পর একটা অদ্ভুত বিষয় চোখে পড়ল।
কিছু ক্ষেত্রে বিভূ অন্যদের তুলনায় অস্বাভাবিক দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল।
খুব দ্রুত।
এতটাই দ্রুত যে প্রশ্ন জাগে।
তবে উত্তর নয়।
শুধু প্রশ্ন।
আর প্রশ্নই একজন তদন্তকারীর প্রথম অস্ত্র।
অরিজিৎ নিজের নোটবুক খুলল।
বিভূ বৈদ্যর নামের নিচে নতুন একটা লাইন যোগ করল।
"Timing?"
শুধু একটা শব্দ।
কিন্তু সেই শব্দটার ভেতরেই সন্দেহ লুকিয়ে ছিল।
ওদিকে বিভূর দিনটা শুরু হয়েছিল অন্যভাবে।
সকালে একটা কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনের কাজ ছিল।
তারপর একটা স্থানীয় অনুষ্ঠানের কভারেজ।
সবকিছু স্বাভাবিক।
তবু সারাদিন তার মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাকে লক্ষ্য করছে।
এই অনুভূতিটা নতুন নয়।
গত কয়েক মাস ধরে মাঝে মাঝে হচ্ছে।
কিন্তু আজ একটু বেশি।
চায়ের দোকানে বসেও।
বাজারে হাঁটতেও।
এমনকি ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়েও।
মনে হচ্ছে কোথাও অদৃশ্য একটা দৃষ্টি আছে।
দুপুরে অনুষ্ঠান শেষে বেরিয়ে আসার সময় একজন বৃদ্ধ তাকে থামালেন।
"আপনি বিভূবাবু?"
"জি।"
লোকটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
"আপনার খবরগুলো দেখি।"
বিভূ অভ্যস্ত হাসি দিল।
"ধন্যবাদ।"
লোকটা আবার বললেন,
"একটা কথা বলব?"
"বলুন।"
"আপনি খুব বেশি জানেন।"
বিভূর হাসিটা মিলিয়ে গেল।
"মানে?"
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
"কিছু না। ভুলেও হতে পারে।"
তারপর হেঁটে চলে গেলেন।
বিভূ কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
কথাটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা নয়।
তবু কেন যেন মনে গেঁথে গেল।
"আপনি খুব বেশি জানেন।"
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে কথাটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু পারল না।
আর ঠিক তখনই ফোনে একটা notification এল।
অচেনা নম্বর।
আবার।
বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
মেসেজ খুলল।
মাত্র একটি লাইন।
"সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজো না। কিছু প্রশ্ন বেঁচে থাকাই ভালো।"
বিভূ কয়েক মুহূর্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ফোনটা উল্টে রাখল।
এখন আর আগের মতো কৌতূহল হচ্ছে না।
বরং অস্বস্তি হচ্ছে।
কারণ মেসেজগুলো যেন তাকে কোনো কিছুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আর সে বুঝতে পারছে না কেন।
রাতের দিকে অরিজিৎ সেন নিজের ডেস্ক ছাড়ার আগে শেষবারের মতো ফাইলগুলো গুছিয়ে রাখছিল।
হঠাৎ তার চোখে একটা বিষয় পড়ল।
একটা পুরোনো ঘটনার রিপোর্ট।
খুব ছোট একটা তথ্য।
এতদিন গুরুত্ব পায়নি।
কিন্তু আজ পেল।
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর কাগজটার পাশে একটা লাল দাগ টেনে দিল।
প্রমাণ নয়।
কিন্তু সূত্র হতে পারে।
আর তদন্তে অনেক সময় সূত্রই সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস।
রাত গভীর হলো।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে।
বিভূ একা।
কম্পিউটারের সামনে বসে।
স্ক্রিনে বাড়তে থাকা সংখ্যাগুলো দেখছে।
কিন্তু আজ তার মন সেখানে নেই।
আজ তার মাথায় ঘুরছে অন্য প্রশ্ন।
অরিজিৎ জানে না।
রহস্যময় সূত্র জানে না।
এমনকি বিভূ নিজেও পুরোপুরি জানে না—
কিন্তু গল্পের গতিপথ বদলাতে শুরু করেছে।
আর প্রথমবারের মতো, প্রশ্নগুলো উত্তর পাওয়ার চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।
___________________________
পরের কয়েকটা দিন অদ্ভুতভাবে কেটে গেল।
বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক।
"খবর এখন" আগের মতোই চলছে।
নতুন ভিডিও আপলোড হচ্ছে।
নতুন follower বাড়ছে।
বিজ্ঞাপনও আসছে নিয়মিত।
কিন্তু বিভূর ভেতরে একটা অস্বস্তি জমতে শুরু করেছে।
কারণ কিছু কিছু ঘটনা ঘটছে, যেগুলোকে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
সোমবার বিকেলে একটা ছোট রাজনৈতিক কর্মসূচি কভার করতে গিয়েছিল সে।
অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।
ক্যামেরা গুছিয়ে বাইকের দিকে ফিরছিল বিভূ।
হঠাৎ খেয়াল করল রাস্তার ওপারে একজন দাঁড়িয়ে আছে।
মাথায় ক্যাপ।
গায়ে ধূসর জ্যাকেট।
লোকটা যেন তার দিকেই তাকিয়ে।
বিভূ একবার তাকিয়ে আবার অন্যদিকে নজর দিল।
এমন তো হয়ই।
অনেকেই এখন তাকে চেনে।
তাকিয়ে থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরে আবার চোখ পড়তেই দেখল—
লোকটা এখনও একইভাবে দাঁড়িয়ে।
একইভাবে তাকিয়ে।
অস্বস্তি হলো।
তবু কিছু বলল না।
বাইক স্টার্ট দিল।
কিছুক্ষণ পর যখন মোড় ঘুরল, তখনও রিয়ারভিউ মিররে ধূসর জ্যাকেটটা দেখতে পেল।
তারপর আর না।
সেই রাতেই আরেকটা ঘটনা ঘটল।
বাড়ি ফিরে কম্পিউটার খুলতেই inbox-এ একটা নতুন মেসেজ দেখতে পেল।
কোনো নাম নেই।
কোনো প্রোফাইল ছবি নেই।
নতুন অ্যাকাউন্ট।
মেসেজে মাত্র একটা লাইন।
"পুরোনো গুদামঘর নিয়ে আর ভিডিও বানিও না।"
বিভূর বুকের ভেতর কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।
এবার প্রথমবারের মতো মেসেজটা সরাসরি।
স্পষ্ট।
কোনো ধাঁধা নেই।
কোনো ইঙ্গিত নেই।
শুধু সতর্কবাণী।
সে সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই করল।
"আপনি কে?"
Seen-ও হলো না।
কোনো উত্তরও এল না।
যেন অ্যাকাউন্টটা শুধু ওই একটি মেসেজ পাঠানোর জন্যই তৈরি করা হয়েছিল।
রাতে খাওয়ার টেবিলে মিতালী খেয়াল করল, বিভূ অস্বাভাবিক চুপচাপ।
"কিছু হয়েছে?"
"না।"
"নিশ্চয়?"
"হ্যাঁ।"
মিতালী আর চাপ দিল না।
কিন্তু এত বছর একসঙ্গে থাকার পর সে জানে—
বিভূ যখন সবচেয়ে কম কথা বলে, তখনই তার মাথায় সবচেয়ে বেশি চিন্তা থাকে।
পরদিন থানায় অরিজিৎ সেনের দিনটা শুরু হলো এক নতুন তথ্য দিয়ে।
একজন সহকর্মী কয়েকটা পুরোনো রিপোর্ট এনে দিল।
অরিজিৎ ধীরে ধীরে সেগুলো দেখতে লাগল।
তারপর একটা বিষয় খেয়াল করল।
কিছু বড় ঘটনার ক্ষেত্রে "খবর এখন" অন্য অনেক পেজের আগে পোস্ট করেছিল।
মিনিটের ব্যবধান।
কখনও দশ মিনিট।
কখনও পনেরো।
প্রথমে ব্যাপারটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো না।
ভালো সূত্র থাকলে এমন হতেই পারে।
তবু তার মাথায় প্রশ্নটা থেকে গেল।
কী ধরনের সূত্র?
আর কেন বারবার একই মানুষ এগিয়ে থাকছে?
অরিজিৎ নিজের নোটবুকে নতুন একটা পাতা খুলল।
উপরে লিখল—
বিভূ বৈদ্য
নিচে কয়েকটা পয়েন্ট।
- ঘটনাস্থলে দ্রুত উপস্থিতি
- রহস্যময় সূত্র
- সময়ের অস্বাভাবিক মিল
তারপর কলম থামিয়ে দিল।
এর বেশি লেখা যায় না।
কারণ এখনও কোনো প্রমাণ নেই।
শুধু সন্দেহ।
আর সন্দেহকে প্রমাণ মনে করা তদন্তকারীর সবচেয়ে বড় ভুল।
অরিজিৎ সেই ভুল করতে চায় না।
ওদিকে বিভূর অস্বস্তি আরও বাড়ল বুধবার বিকেলে।
একটা দোকানের বিজ্ঞাপনের কাজ শেষ করে বেরোচ্ছিল।
হঠাৎ দোকানের মালিক বললেন,
"দাদা, আপনার বন্ধুটা চলে গেল?"
বিভূ থমকে দাঁড়াল।
"কোন বন্ধু?"
"এই যে, একটু আগে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।"
"কেউ ছিল?"
"হ্যাঁ। আপনার দিকেই দেখছিল। ভাবলাম একসঙ্গে এসেছেন।"
বিভূর বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
সে দ্রুত বাইরে বেরোল।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
কেউ নেই।
শুধু দূরে একটা বাস চলে গেল।
সেদিন রাতে সে প্রথমবারের মতো সবকিছু লিখে রাখল।
ধূসর জ্যাকেট পরা লোক।
রহস্যময় মেসেজ।
দোকানদারের কথা।
তারিখ।
সময়।
সব।
লিখতে লিখতে হঠাৎ একটা বিষয় খেয়াল করল।
গত কয়েক মাসে সে অন্যদের নিয়ে যত নোট করেছে, নিজের সম্পর্কে কখনও করেনি।
আজ করছে।
অদ্ভুত ব্যাপার।
ঘড়িতে তখন রাত একটা।
সবাই ঘুমিয়ে।
বিভূ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।
বাইরে অন্ধকার রাস্তা।
হঠাৎ তার চোখে পড়ল রাস্তার ওপারে একটা ছায়ামূর্তি।
খুব দূরে।
স্পষ্ট দেখা যায় না।
দুই-তিন সেকেন্ডের বেশি নয়।
তারপর লোকটা হেঁটে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
বিভূ জানে না সে সত্যিই কাউকে দেখেছে কিনা।
নাকি কল্পনা।
কিন্তু তার ভেতরের অস্বস্তিটা এবার আর কল্পনা নয়।
কারণ প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
হয়তো কেউ সত্যিই তাকে লক্ষ্য করছে।
আর যদি তা-ই হয়...
তাহলে প্রশ্নটা আর শুধু "কে?" নয়।
প্রশ্নটা হলো—
"কেন?"
__________________________
বৃহস্পতিবার সকাল।
সারা রাত ঠিকমতো ঘুম হয়নি বিভূর।
রাস্তার ওপারের সেই অস্পষ্ট ছায়াটা বারবার মনে পড়েছে।
সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে—
হয়তো ভুল দেখেছে।
হয়তো অন্য কেউ ছিল।
হয়তো সবটাই কল্পনা।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মানুষ যখন কোনো কিছু নিয়ে ভয় পেতে শুরু করে, তখন যুক্তি খুব কমই কাজ করে।
সকালে চা খেতে খেতে মিতালী বলল,
"তোমাকে কয়েকদিন ধরে খুব ক্লান্ত লাগছে।"
বিভূ কাপের দিকে তাকিয়ে রইল।
"কাজ একটু বেশি।"
"শুধু কাজ?"
প্রশ্নটা শুনে সে চোখ তুলল।
মিতালী তার দিকে তাকিয়ে আছে।
অনেক বছরের সংসার।
একজন মানুষ অন্যজনকে যতটা বোঝে, তার চেয়েও বেশি পড়তে পারে।
বিভূ হাসার চেষ্টা করল।
"আর কী হবে?"
মিতালী কিছু বলল না।
কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তি বলছিল, সে উত্তরটা বিশ্বাস করেনি।
ওদিকে থানায় অরিজিৎ সেন একটা নতুন তথ্য পেয়েছে।
খুব ছোট একটা তথ্য।
কিন্তু কখনও কখনও ছোট তথ্যই বড় দরজা খুলে দেয়।
কয়েক মাস আগের একটা ঘটনার রিপোর্ট ঘাঁটতে গিয়ে সে দেখল, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময় নিয়ে সাক্ষীদের বক্তব্য আর অনলাইন পোস্টের সময়ের মধ্যে সামান্য অসঙ্গতি আছে।
বড় কিছু নয়।
মাত্র কয়েক মিনিটের পার্থক্য।
তবু বিষয়টা তার চোখ এড়াল না।
সে সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো কয়েকটা রিপোর্ট আবার বের করল।
একটার সঙ্গে আরেকটা মিলিয়ে দেখতে লাগল।
তারপর চুপ করে গেল।
কারণ প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
এগুলো হয়তো আলাদা আলাদা ঘটনা নয়।
হয়তো কোথাও একটা অদৃশ্য সুতো আছে।
যেটা সবকিছুকে যুক্ত করছে।
বিকেলে বিভূ একটা স্থানীয় হাসপাতালের অনুষ্ঠান কভার করতে গেল।
অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে সন্ধ্যা।
ক্যামেরা গুছিয়ে বেরোচ্ছিল।
হঠাৎ একটা পরিচিত অনুভূতি হলো।
কেউ যেন তাকিয়ে আছে।
আবার।
সে দ্রুত চারপাশে চোখ বুলাল।
মানুষজন আছে।
নার্স।
রোগীর আত্মীয়।
দুই-একজন সাংবাদিক।
সব স্বাভাবিক।
তবু সেই অনুভূতি যাচ্ছে না।
কয়েক সেকেন্ড পরে হাসপাতালের কাঁচের দরজায় নিজের প্রতিবিম্বের পাশে আরেকটা অস্পষ্ট অবয়ব দেখতে পেল।
সে ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ নেই।
শুধু কয়েকজন সাধারণ পথচারী।
বিভূর কপালে ঘাম জমল।
শীতের সন্ধ্যায়।
রাতে বাড়ি ফিরে সে নিজের নোটবুক খুলল।
গত কয়েকদিনের সব ঘটনাগুলো এক জায়গায় লিখতে শুরু করল।
ধূসর জ্যাকেট।
অচেনা মেসেজ।
দোকানদারের কথা।
রাতের ছায়া।
হাসপাতালের অনুভূতি।
সব।
লিখতে লিখতে হঠাৎ একটা বিষয় খেয়াল করল।
প্রতিটা ঘটনার পর তার ভেতরে একটা পরিবর্তন হচ্ছে।
আগে সে শুধু কৌতূহলী ছিল।
এখন সে সতর্ক।
আর সতর্কতা আর ভয়ের মধ্যে দূরত্ব খুব কম।
সেই সময়ে ফোনে একটা notification এল।
বিভূর বুক ধক করে উঠল।
অচেনা নম্বর।
আবার।
কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মেসেজ খুলল।
এবার মাত্র তিনটি শব্দ।
"সময় ফুরিয়ে আসছে।"
বিভূ কয়েক মুহূর্ত স্থির বসে রইল।
আগের বার্তাগুলো ধাঁধার মতো ছিল।
এই বার্তাটা আলাদা।
এখানে একটা তাড়াহুড়ো আছে।
একটা সতর্কতা আছে।
কিন্তু কিসের?
সে জানে না।
অন্যদিকে অরিজিৎও সেই রাতেই অফিস ছাড়ার আগে একটা সিদ্ধান্ত নিল।
সে এখনও কাউকে অভিযুক্ত করবে না।
কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপও নেবে না।
কিন্তু বিভূ বৈদ্যকে নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ আরও গভীর করবে।
কারণ তার মনে হচ্ছে, ঘটনাগুলোর কেন্দ্রে না থাকলেও বিভূ ঘটনাগুলোর খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে।
অস্বাভাবিকভাবে কাছাকাছি।
রাত দেড়টা।
বাইরে কুয়াশা।
জানালার কাঁচে জল জমেছে।
বিভূ টেবিলে বসে আছে।
ফোনটা সামনে রাখা।
স্ক্রিনে এখনও সেই মেসেজ।
"সময় ফুরিয়ে আসছে।"
হঠাৎ তার মনে হলো, গত কয়েক মাস ধরে সে একটা বড় ভুল করেছে।
সে বারবার চেষ্টা করেছে বুঝতে—
কে তাকে মেসেজ পাঠাচ্ছে।
কিন্তু কখনও ভাবেনি—
লোকটা কী চায়।
আর যদি সেটাই আসল প্রশ্ন হয়?
যদি কেউ তাকে কোনো কিছুর দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে চায়?
যদি পুরো খেলাটাই সে বুঝতে না পারে?
এই চিন্তাটা মাথায় আসতেই তার বুকের ভেতর অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল।
কারণ প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
হয়তো সে শুধু একটা রহস্য অনুসরণ করছে না।
হয়তো কেউ তাকে অনুসরণ করাচ্ছে।
আর এই খেলায় সে নিজেই হয়তো একটা ঘুঁটি।
___________________________
শুক্রবার সকাল।
আকাশ পরিষ্কার।
অনেকদিন পর রোদ উঠেছে।
কিন্তু বিভূর মনটা অদ্ভুত ভারী।
গত রাতের মেসেজটা এখনও মাথা থেকে যাচ্ছে না।
"সময় ফুরিয়ে আসছে।"
সকালবেলা চা খেতে খেতেও কথাটা মনে পড়ছে।
ক্যামেরা গুছাতে গিয়েও মনে পড়ছে।
এমনকি একটা সাধারণ স্থানীয় খবর কভার করার সময়ও।
যেন কথাগুলো মাথার ভেতর আটকে গেছে।
অন্যদিকে অরিজিৎ সেন সকাল থেকেই ব্যস্ত।
গত কয়েকদিনের নোটগুলো আবার সাজিয়ে দেখছিল।
একটা বিষয় তাকে বারবার ভাবাচ্ছিল।
নির্মল সাহা।
গুদামঘর।
রহস্যময় তথ্য।
বিভূ বৈদ্য।
নামগুলো আলাদা।
ঘটনাগুলোও আলাদা।
তবু কোথাও যেন একটা যোগসূত্র আছে।
শুধু সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।
অরিজিৎ চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
তারপর হঠাৎ একটা পুরোনো কথোপকথনের কথা মনে পড়ল।
কয়েক মাস আগে নির্মল সাহার ঘটনায় একজন সাক্ষী একটা নাম বলেছিল।
তখন গুরুত্ব পায়নি।
কারণ নামটা খুব সাধারণ ছিল।
কোনো প্রমাণও ছিল না।
তবু আজ আবার মনে পড়ে গেল।
সে দ্রুত পুরোনো নোট খুঁজতে শুরু করল।
প্রায় দশ মিনিট পর কাগজটা পেয়ে গেল।
সেখানে একটা নাম লেখা।
সঞ্জয় পাল
অরিজিৎ ভ্রু কুঁচকাল।
নামটা তার কাছে নতুন নয়।
কিন্তু কোথায় শুনেছে?
কয়েক সেকেন্ড ভেবে হঠাৎ মনে পড়ল।
এই নামটাই কয়েক সপ্তাহ আগে অন্য একটা রিপোর্টেও এসেছিল।
সম্পূর্ণ আলাদা ঘটনার রিপোর্টে।
একই নাম।
একই ব্যক্তি?
নাকি কাকতালীয়?
ওদিকে বিভূ দুপুরে নিজের অফিসঘরে বসে পুরোনো নথিগুলো আবার দেখছিল।
কিছুতেই মন বসছে না।
বারবার মনে হচ্ছে, কিছু একটা সে মিস করছে।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
কিন্তু এবার কোনো মেসেজ নয়।
সরাসরি কল।
বিভূ কয়েক সেকেন্ড দ্বিধা করল।
তারপর রিসিভ করল।
"হ্যালো?"
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর সেই পরিচিত নিচু গলা।
"তুমি ধীর হয়ে গেছ।"
বিভূর বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল।
"আপনি কে?"
"এখনও সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।"
"তাহলে কী গুরুত্বপূর্ণ?"
লোকটা বলল,
"যে সময় খুব কম।"
"কিসের সময়?"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর এল,
"যেটা খুঁজছ, সেটা অন্য কেউও খুঁজছে।"
বিভূর কপালে ভাঁজ পড়ল।
"অরিজিৎ সেন?"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর হালকা হাসি।
"তুমি যতটা ভাবছ, খেলার বোর্ড তার চেয়ে অনেক বড়।"
বিভূ আরও কিছু বলার আগেই কল কেটে গেল।
ফোনটা নামিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল সে।
প্রথমবার।
প্রথমবার রহস্যময় লোকটা অরিজিৎর নাম সরাসরি না বললেও এমন কিছু বলল, যাতে স্পষ্ট বোঝা যায় সে অনেক কিছু জানে।
অস্বাভাবিকভাবে অনেক কিছু।
এবং সেই বিষয়টাই বিভূকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি দিল।
সন্ধ্যার দিকে অরিজিৎ একটা নতুন তথ্য পেল।
খুব বড় কিছু নয়।
তবু গুরুত্বপূর্ণ।
সঞ্জয় পাল নামের মানুষটা গত কয়েক বছরে একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
আর আশ্চর্যের বিষয়—
তার মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম সেই পুরোনো গুদামঘরের নথিতেও আছে।
অরিজিৎ ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে সোজা হয়ে বসল।
প্রথমবারের মতো দুইটা আলাদা পথ এক জায়গায় এসে মিলছে।
এখনও প্রমাণ নয়।
কিন্তু এবার আর শুধু সন্দেহও নয়।
এটা একটা বাস্তব সূত্র।
সেই রাতে বিভূ ঘুমাতে পারল না।
বারবার মনে পড়ছিল ফোনকলটা।
আর একটা প্রশ্ন।
লোকটা কে?
একজন তথ্যদাতা?
কেউ তাকে ব্যবহার করছে?
নাকি কেউ ইচ্ছা করে তাকে একটা নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
সে উত্তর জানে না।
কিন্তু একটা বিষয় বুঝতে পারছে।
খেলাটা বদলাচ্ছে।
ধীরে ধীরে।
আর সে আর শুধু দর্শক নয়।
রাত প্রায় দুটো।
বাইরে কুয়াশা।
শহর ঘুমিয়ে।
হঠাৎ ফোনে একটা নতুন notification এল।
বিভূর বুক কেঁপে উঠল।
মেসেজ।
আবার।
এবার কোনো ধাঁধা নয়।
কোনো সতর্কবাণীও নয়।
শুধু একটা নাম।
"সঞ্জয় পাল"
নিচে মাত্র একটি লাইন।
"ওকে খুঁজে বের করো।"
বিভূ কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইল।
কারণ সে জানে না সঞ্জয় পাল কে।
কিন্তু শহরের অন্য প্রান্তে ঠিক এই মুহূর্তে অরিজিৎ সেনও একই নাম নিয়ে বসে আছে।
আর প্রথমবারের মতো—
তারা দুজন অজান্তেই একই দরজার দিকে এগোতে শুরু করেছে।
_________________________
শনিবার সকাল।
সঞ্জয় পালের নামটা মাথায় নিয়েই ঘুম ভেঙেছিল বিভূর।
রাতের মেসেজটা এখনও ফোনে আছে।
সে বারবার পড়ছে।
একই প্রশ্ন বারবার মাথায় আসছে।
কে এই সঞ্জয় পাল?
আর কেন তাকে খুঁজে বের করতে হবে?
সকালে নাস্তার টেবিলে বসেও তার মন অন্য কোথাও।
ঋত্বিক স্কুলের একটা প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলছিল।
রিয়া নতুন আঁকা ছবি দেখাতে চাইছিল।
মিতালী বাজারের হিসাব বলছিল।
কিন্তু বিভূর মনোযোগ ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
সে শুধু মাথা নাড়ছিল।
প্রকৃতপক্ষে কিছুই শুনছিল না।
মিতালী একসময় জিজ্ঞেস করল,
"তোমার কি কোনো সমস্যা হয়েছে?"
বিভূ একটু চমকে উঠল।
"না।"
"তোমাকে দেখে কিন্তু তা মনে হচ্ছে না।"
"কাজের চাপ।"
মিতালী আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার চোখে উদ্বেগ স্পষ্ট ছিল।
সেই দিনই বিভূ নিজের মতো করে সঞ্জয় পালের খোঁজ শুরু করল।
পুরোনো পরিচিতদের ফোন করল।
কিছু স্থানীয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলল।
অনলাইনেও খুঁজল।
কিছু তথ্য পেল।
খুব বেশি নয়।
তবু একটা বিষয় পরিষ্কার হলো।
সঞ্জয় পাল একসময় বেশ পরিচিত ব্যবসায়ী ছিল।
কিন্তু গত কয়েক বছরে লোকটা যেন ধীরে ধীরে জনসম্মুখ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
খুব কম মানুষ এখন তার কথা বলে।
আর যারা বলে, তারা খুব সাবধানে বলে।
যেন নামটার সঙ্গে কোনো অস্বস্তি জড়িয়ে আছে।
অন্যদিকে থানায় অরিজিৎও একই নাম নিয়ে ব্যস্ত।
সে কয়েকটা পুরোনো নথি মিলিয়ে দেখছিল।
গুদামঘরের মালিকানা।
ব্যবসায়িক লেনদেন।
পুরোনো লাইসেন্স।
সবকিছুর মধ্যে কোথাও কোথাও সঞ্জয় পালের ছায়া দেখা যাচ্ছে।
খুব স্পষ্ট নয়।
তবু আছে।
এবং সেটাই যথেষ্ট।
কারণ একজন তদন্তকারীর কাছে ছায়াও গুরুত্বপূর্ণ।
যদি সেই ছায়া বারবার সামনে আসে।
বিকেলে অরিজিৎ নিজের ডেস্কে বসে একটা নতুন তালিকা তৈরি করল।
নির্মল সাহা।
সঞ্জয় পাল।
গুদামঘর।
তারপর কিছুক্ষণ ভেবে আরেকটা নাম যোগ করল।
বিভূ বৈদ্য
কলম থেমে গেল।
নামটা লিখেই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কারণ সে এখনও নিশ্চিত নয়।
একদমই নয়।
তবু গত কয়েক মাসে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বিভূ অদ্ভুতভাবে উপস্থিত ছিল।
খুব দ্রুত।
খুব কাছাকাছি।
খুব নিয়মিত।
এবং সেই কারণেই প্রথমবারের মতো সে একটা প্রশ্ন লিখল—
"বিভূ কি শুধুই পর্যবেক্ষক?"
প্রশ্নটা লেখার পর সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নোটবুক বন্ধ করে দিল।
সন্ধ্যার দিকে বিভূ একটা ছোট্ট সূত্র পেল।
একজন পুরোনো পরিচিত তাকে জানাল,
সঞ্জয় পালের একটা পরিত্যক্ত অফিস ছিল শহরের পুরোনো শিল্পাঞ্চলে।
বহু বছর ধরে বন্ধ।
এখন প্রায় ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে।
খবরটা শুনে বিভূর ভেতরে কৌতূহল জেগে উঠল।
স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।
তার মনে হলো, এখানেই হয়তো কোনো উত্তর লুকিয়ে আছে।
অথবা নতুন প্রশ্ন।
রাত নামার পর সে একা বসে সেই অফিসের অবস্থান নিয়ে খোঁজ করছিল।
ঠিক তখনই ফোনে আবার একটা মেসেজ এল।
একই অচেনা নম্বর।
এবার কোনো ধাঁধা নয়।
শুধু একটি বাক্য।
"দেরি করো না।"
বিভূর হাত অজান্তেই শক্ত হয়ে গেল।
কারণ এখন সে নিশ্চিত।
যে-ই হোক, লোকটা তার প্রতিটা পদক্ষেপ জানে।
সে কী খুঁজছে, তাও জানে।
ওদিকে একই সময়ে অরিজিৎ সেন থানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
রাতের বাতাস ঠান্ডা।
হাতে চায়ের কাপ।
তার মাথায় বারবার একটা বিষয় ঘুরছে।
গত কয়েক মাসে বিভূর নাম এতবার সামনে এসেছে কেন?
কাকতালীয়?
হতে পারে।
ভালো সূত্র?
সেটাও হতে পারে।
কিন্তু যদি অন্য কিছু হয়?
যদি এই পুরো গল্পে বিভূর ভূমিকা তার দেখানো ভূমিকার চেয়ে বড় হয়?
প্রথমবারের মতো এই চিন্তাটা তাকে অস্বস্তি দিল।
কারণ সে জানে—
সন্দেহ আর অভিযোগ এক জিনিস নয়।
কিন্তু কখনও কখনও সন্দেহই সত্যির দিকে প্রথম দরজা খুলে দেয়।
রাত গভীর হলো।
বিভূ নিজের ঘরে বসে মানচিত্র দেখছে।
পুরোনো শিল্পাঞ্চল।
পরিত্যক্ত অফিস।
সঞ্জয় পাল।
রহস্যময় সূত্র।
সবকিছু যেন ধীরে ধীরে এক জায়গায় গিয়ে মিলছে।
আর তার অজান্তেই শহরের অন্য প্রান্তে অরিজিৎ সেনও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে—
এখন আর বিভূ বৈদ্যকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
হয়তো সে নির্দোষ।
হয়তো নয়।
কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত।
প্রথম শক্তিশালী সন্দেহ জন্ম নিয়েছে।
আর একবার সন্দেহ জন্ম নিলে, তাকে মেরে ফেলা খুব কঠিন।
_____________________________________
পরিত্যক্ত অফিসের ঠিকানাটা একটা কাগজে লিখে টেবিলের ওপর রেখেছিল বিভূ।
গত তিনদিন ধরে কাগজটা সেখানেই পড়ে আছে।
কিন্তু সে এখনও সেখানে যায়নি।
যেতে চেয়েছে।
বারবার।
তবু যায়নি।
কারণ তার ভেতরে একটা অদ্ভুত দ্বন্দ্ব কাজ করছে।
কৌতূহল তাকে টানছে।
ভয় তাকে আটকে রাখছে।
রাত তিনটা।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে।
শুধু বিভূ জেগে।
ল্যাপটপ খোলা।
পাশে মোবাইল।
টেবিলে অর্ধেক খাওয়া চা।
ঘণ্টাখানেক ধরে একই ভিডিওর analytics দেখছে সে।
কিন্তু আসলে কিছুই দেখছে না।
মাথার ভেতর শুধু একটাই নাম ঘুরছে।
সঞ্জয় পাল।
হঠাৎ তার মনে পড়ল পাঁচ বছর আগের একটা রাত।
সেই সময় চাকরি চলে গেছে।
ব্যাংকের ব্যালেন্স প্রায় শেষ।
ঘুম আসত না।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকত।
ভাবত—
সংসার কীভাবে চলবে?
ছেলের পড়াশোনা?
মেয়ের ভবিষ্যৎ?
আজও তার ঘুম আসছে না।
কিন্তু কারণ আলাদা।
আজ তার কাছে টাকা আছে।
পরিচিতি আছে।
মানুষ তাকে চেনে।
তবু শান্তি নেই।
বরং অস্বস্তি আরও বেশি।
ভোরের দিকে একটু ঘুম এসেছিল।
কিন্তু সকাল সাতটার আগেই ফোন বেজে উঠল।
একটা ছোট দুর্ঘটনার খবর।
আগে হলে সে বিরক্ত হতো।
এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।
দ্রুত জামা বদলে বেরিয়ে পড়ল।
দুর্ঘটনার জায়গায় পৌঁছে ভিডিও করতে করতে হঠাৎ সে খেয়াল করল—
মানুষজন তাকে চেনে।
কেউ কেউ নাম ধরে ডাকছে।
কেউ ছবি তুলতে চাইছে।
কেউ আবার নিজের সমস্যার কথা বলছে।
"দাদা, এটা নিয়েও একটা ভিডিও করুন।"
"দাদা, আমাদের রাস্তাটার অবস্থা দেখুন।"
"দাদা, আপনার ভিডিও দেখেই সবাই জানবে।"
একসময় এসব শুনে ভালো লাগত।
আজ অদ্ভুত ক্লান্ত লাগছে।
কারণ এখন প্রতিটা মানুষ তার কাছে একটা প্রত্যাশা নিয়ে আসে।
আর সেই প্রত্যাশার ওজনও কম নয়।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর হয়ে গেল।
খেতে বসে মিতালী বলল,
"তুমি কাল রাতেও ঘুমাওনি, তাই না?"
বিভূ থমকে গেল।
"কেন?"
"আমি দেখেছি।"
"কাজ ছিল।"
মিতালী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"কাজের জন্য মানুষ রাত জাগে। কিন্তু তোমার মুখে যে চিন্তা দেখি, সেটা শুধু কাজের চিন্তা না।"
বিভূ বিরক্ত হয়ে গেল।
"সবসময় এত বিশ্লেষণ করার দরকার নেই।"
কথাটা মুখ দিয়ে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই সে বুঝল, স্বরটা বেশি কঠিন হয়ে গেছে।
মিতালী চুপ করে গেল।
টেবিলেও নীরবতা নেমে এল।
দূরে বসে ঋত্বিক সব দেখছিল।
কিছু বলল না।
শুধু মাথা নিচু করে খেতে লাগল।
রিয়াও চুপ।
এই দৃশ্য আগে খুব কম দেখেছে তারা।
বাবা সাধারণত এমন নয়।
খাওয়া শেষ করে বিভূ নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
কয়েক সেকেন্ড পরে নিজের উপরই রাগ হলো।
মিতালী কোনো ভুল কথা বলেনি।
তবু সে এমন আচরণ করল কেন?
উত্তরটা সে জানে।
কারণ সে ক্লান্ত।
আর চাপের মধ্যে থাকা মানুষ সবচেয়ে বেশি আঘাত করে কাছের মানুষদেরই।
বিকেলে সে আবার সেই কাগজটার দিকে তাকাল।
পুরোনো শিল্পাঞ্চল।
সঞ্জয় পালের পরিত্যক্ত অফিস।
ঠিকানাটা যেন তাকে ডাকছে।
কিন্তু এখনও সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
যাবে?
নাকি যাবে না?
ওদিকে থানায় অরিজিৎ সেনও একটা দীর্ঘ দিন পার করছিল।
সে গত কয়েক মাসের ঘটনাগুলোর টাইমলাইন তৈরি করছে।
দেয়ালে বড় কাগজ ঝুলিয়ে।
নাম।
তারিখ।
স্থান।
সব লিখে রাখছে।
তার সহকর্মী একসময় মজা করে বলল,
"কী ব্যাপার স্যার, সিনেমার গোয়েন্দাদের মতো লাগছে।"
অরিজিৎ হেসে ফেলল।
কিন্তু কিছু বলল না।
কারণ সে জানে—
কখনও কখনও সত্যি খুঁজে পাওয়ার আগে সবকিছু বিশৃঙ্খলই মনে হয়।
সন্ধ্যার দিকে টাইমলাইনটা দেখতে দেখতে তার চোখ আবার একটা নামের উপর গিয়ে থামল।
বিভূ বৈদ্য।
নামটা এখন আর কাকতালীয়ভাবে সামনে আসছে না।
বারবার আসছে।
অস্বস্তিকরভাবে আসছে।
তবু এখনও কোনো প্রমাণ নেই।
এবং সেই কারণেই সে নিজেকে বারবার থামাচ্ছে।
রাত নেমে এলো।
বাড়ির সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কিন্তু বিভূর ঘরে এখনও আলো জ্বলছে।
সে চুপচাপ টেবিলে বসে আছে।
সামনে সেই কাগজ।
পরিত্যক্ত অফিসের ঠিকানা।
হঠাৎ ফোনে একটা notification এল।
বুক ধক করে উঠল।
অচেনা নম্বর।
আবার।
মেসেজে মাত্র একটা লাইন।
"যদি উত্তর চাও, কাল যাও।"
বিভূ অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
কারণ সে বুঝতে পারছে—
যে খেলাটা এতদিন দূর থেকে দেখছিল, এখন সে তার ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
আর আগামীকাল হয়তো সবকিছু বদলে যেতে পারে।
__________________________
পরদিন সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা।
সূর্যের দেখা নেই।
বাতাসে একটা অদ্ভুত ভারী ভাব।
বিভূ খুব ভোরেই উঠে পড়েছিল।
আসলে ঘুমই হয়নি ঠিকমতো।
সারা রাত বারবার চোখ খুলে গেছে।
আর প্রতিবারই তার চোখ গিয়ে পড়েছে টেবিলের ওপর রাখা কাগজটার দিকে।
সঞ্জয় পালের পরিত্যক্ত অফিস।
সকালে মিতালী খেয়াল করল বিভূ অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো করছে।
"আজ আবার কোথায় যাচ্ছ?"
"একটা কাজ আছে।"
"কী কাজ?"
বিভূ জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতে বলল,
"একটু খোঁজখবর নিতে হবে।"
মিতালী কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর শুধু বলল,
"নিজের খেয়াল রেখো।"
কথাটা শুনে বিভূর বুকের ভেতর হালকা একটা অপরাধবোধ জন্ম নিল।
কারণ সে নিজেও জানে না ঠিক কোথায় যাচ্ছে।
আর কেন যাচ্ছে।
শহরের পুরোনো শিল্পাঞ্চল এখন প্রায় মৃত।
একসময় এখানে অসংখ্য ছোট কারখানা ছিল।
ট্রাকের শব্দ ছিল।
শ্রমিকদের ভিড় ছিল।
আজ বেশিরভাগ গেট বন্ধ।
দেয়ালের রং উঠে গেছে।
অনেক জায়গায় আগাছা জন্মেছে।
ভাঙা জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকে অদ্ভুত শব্দ করছে।
বিভূ বাইকটা রাস্তার পাশে রেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
হাতে শুধু মোবাইল।
আর ছোট একটা ক্যামেরা।
পুরোনো অভ্যাস।
যেখানেই যায়, কিছু না কিছু রেকর্ড করে।
কাগজে লেখা ঠিকানা মিলিয়ে একটা ভাঙাচোরা তিনতলা ভবনের সামনে এসে দাঁড়াল সে।
গেটের অর্ধেক অংশ মরিচা পড়ে ঝুলছে।
দেয়ালে ফিকে হয়ে যাওয়া একটা সাইনবোর্ড।
অক্ষরের অর্ধেক মুছে গেছে।
তবু একটা অংশ এখনও পড়া যায়।
"... Enterprises"
বিভূর বুকের ভেতর অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করতে লাগল।
যেন বহুদিন ধরে খোঁজা কোনো দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ভেতরে ঢুকতেই একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এল।
চারদিকে ধুলো।
মাকড়সার জাল।
ভাঙা আসবাব।
মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা পুরোনো কাগজ।
অনেক বছর ধরে এখানে কেউ আসেনি বলেই মনে হয়।
তবু একটা বিষয় তার চোখে পড়ল।
ধুলোর মধ্যে কয়েকটা তুলনামূলক নতুন পায়ের ছাপ।
খুব স্পষ্ট নয়।
কিন্তু আছে।
বিভূ নিচু হয়ে ভালো করে দেখল।
তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
মানে—
সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত নয়।
কেউ না কেউ এখানে এসেছে।
সম্প্রতি।
প্রথম তলায় তেমন কিছু পাওয়া গেল না।
ভাঙা টেবিল।
পুরোনো ফাইল ক্যাবিনেট।
ফাঁকা ঘর।
কিন্তু দ্বিতীয় তলায় উঠতেই একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল।
একটা দরজা।
বাকিগুলো খোলা।
শুধু এই দরজাটাই বন্ধ।
বাইরে পুরোনো তালা ঝুলছে।
কিন্তু তালাটা নতুন।
খুব নতুন।
প্রায় চকচকে।
বিভূ কয়েক সেকেন্ড দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর চারপাশে নজর বুলাল।
কেউ নেই।
সম্পূর্ণ নীরবতা।
সে দরজার কাছে গিয়ে কান লাগাল।
ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না।
কিন্তু যতই তাকাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে এই ঘরটাই গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘরটাই অন্যরকম।
ঠিক তখনই তার ফোন কেঁপে উঠল।
অচেনা নম্বর।
আবার।
বিভূর হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
মেসেজ খুলল।
মাত্র একটি লাইন।
"তুমি দেরি করে ফেলেছ।"
তার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
স্বতঃস্ফূর্তভাবে সে চারদিকে তাকাল।
খালি করিডর।
ভাঙা জানালা।
ধুলো।
কেউ নেই।
তবু মনে হলো কেউ যেন তাকে দেখছে।
খুব কাছ থেকে।
মেসেজটা পড়ার পর হঠাৎ প্রথমবারের মতো তার মাথায় একটা প্রশ্ন এল।
যে লোকটা তাকে এখানে পাঠিয়েছে...
সে কীভাবে জানল বিভূ এখন এখানে দাঁড়িয়ে আছে?
কীভাবে?
প্রশ্নটা মাথায় আসতেই অস্বস্তি ভয়ে বদলে যেতে শুরু করল।
ঠিক তখনই নিচের তলা থেকে একটা শব্দ ভেসে এল।
ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ।
খটাং!
পুরো ভবনটা যেন প্রতিধ্বনিতে কেঁপে উঠল।
বিভূ স্থির হয়ে গেল।
শব্দটা স্পষ্ট।
কেউ আছে।
অথবা কিছু একটা নড়েছে।
সে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল।
আর কোনো শব্দ নেই।
নীরবতা।
শুধু দূরে বাতাসের আওয়াজ।
হঠাৎ তার মনে হলো এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়াই ভালো।
এখানে আসার উদ্দেশ্য ছিল তথ্য খোঁজা।
কোনো বিপদে জড়ানো নয়।
সে দ্রুত সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল।
কিন্তু নামার সময় একটা জিনিস চোখে পড়ল।
দেয়ালের কোণে পড়ে থাকা একটা পুরোনো ফাইল।
অর্ধেক ধুলোর নিচে চাপা।
যেন তাড়াহুড়ো করে কেউ ফেলে গেছে।
অথবা লুকিয়েছে।
বিভূ থেমে গেল।
ফাইলটা তুলে নিল।
ধুলো ঝাড়ল।
সামনের কভারে কিছু লেখা ছিল।
বেশিরভাগ মুছে গেছে।
তবু একটা নাম স্পষ্ট।
"সঞ্জয় পাল"
বিভূর বুকের ভেতর আবার ধক করে উঠল।
সে দ্রুত ফাইলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলল।
তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
ভবনের বাইরে বেরিয়ে এসে গভীর শ্বাস নিল।
বাতাস যেন হঠাৎ অনেক হালকা লাগছে।
কিন্তু মাথার ভেতর ঝড় চলছে।
সঞ্জয় পালের নাম।
নতুন তালা।
পায়ের ছাপ।
অচেনা মেসেজ।
সবকিছু যেন একটা অদৃশ্য জালের অংশ।
আর সে ধীরে ধীরে সেই জালের কেন্দ্রে ঢুকে যাচ্ছে।
ঠিক একই সময়ে থানায় বসে অরিজিৎ সেন একটা নতুন তথ্য পেয়েছে।
পুরোনো শিল্পাঞ্চলের সেই ভবনের নাম তার সামনেও এসেছে।
একটা পুরোনো ব্যবসায়িক নথিতে।
সে ফাইলটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
কারণ প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
সে হয়তো সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
কিন্তু সে জানে না, কয়েক কিলোমিটার দূরে ঠিক এই মুহূর্তে বিভূও একই সূত্র হাতে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে।
আর খুব শিগগিরই সেই সূত্র তাদের দুজনকেই একই সত্যের দিকে ঠেলে দেবে।
_________________________
বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গিয়েছিল।
পুরো রাস্তা জুড়ে বিভূর মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরছিল।
ফাইলটা।
সঞ্জয় পালের নাম লেখা সেই পুরোনো ফাইল।
পরিত্যক্ত ভবন থেকে পাওয়া।
নতুন তালা লাগানো রহস্যময় ঘরের ঠিক পাশ থেকে পাওয়া।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
যে অচেনা মানুষটা তাকে সেখানে পাঠিয়েছে, সে যেন আগেই জানত ফাইলটা সেখানে আছে।
বাড়ি ফিরে সে কাউকে কিছু বলল না।
মিতালী শুধু জিজ্ঞেস করল,
"কাজ শেষ?"
"হ্যাঁ।"
"খাবে?"
"পরে।"
তারপর সরাসরি নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
টেবিলের ওপর ফাইলটা রাখল।
হাতের তালুতে এখনও ধুলোর গন্ধ।
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ বসে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে কভার খুলল।
ভেতরের কাগজগুলো পুরোনো।
অনেক জায়গায় হলদেটে হয়ে গেছে।
কিছু পাতা ছিঁড়েও গেছে।
প্রথম কয়েকটা পৃষ্ঠায় ব্যবসায়িক হিসাব।
চেক নম্বর।
লেনদেন।
কোম্পানির নাম।
এসব দেখে প্রথমে তেমন কিছু মনে হলো না।
কিন্তু কয়েক পাতা উল্টানোর পর একটা বিষয় তার নজর কাড়ল।
কিছু নাম বারবার এসেছে।
একই নাম।
আবার।
আবার।
আবার।
সে একটা খাতা টেনে নিয়ে নামগুলো লিখতে শুরু করল।
সঞ্জয় পাল।
নির্মল সাহা।
আরও দু-তিনজন।
নামগুলো তার কাছে পুরোপুরি অপরিচিত নয়।
বিশেষ করে নির্মল সাহার নাম।
সেই মানুষ, যার মৃত্যুর খবর কভার করে প্রথম বড় ভাইরাল সাফল্য পেয়েছিল সে।
নামটা দেখেই তার বুকের ভেতর হালকা একটা চাপ অনুভূত হলো।
কয়েক মিনিট পরে আরও অদ্ভুত কিছু চোখে পড়ল।
একটা পাতার কোণে হাতে লেখা একটা তারিখ।
অনেক বছরের পুরোনো।
তার পাশে ছোট্ট একটা মন্তব্য।
লেখাটা প্রায় মুছে গেছে।
তবু কয়েকটা শব্দ বোঝা যায়।
"...বিশ্বাস করা যাবে না..."
"...সব নথি সরিয়ে ফেলতে হবে..."
বিভূর শরীরের ভেতর ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল।
এটা কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক ফাইল নয়।
কিছু একটা লুকানো আছে এখানে।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
ঠক ঠক।
বিভূ চমকে উঠল।
তাড়াতাড়ি ফাইলটা বন্ধ করে দিল।
"কে?"
"আমি।"
মিতালীর গলা।
বিভূ দরজা খুলল।
মিতালী কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
"সব ঠিক আছে?"
"হ্যাঁ।"
"নিশ্চয়?"
বিভূ উত্তর দেওয়ার আগে মিতালী বলল,
"তুমি কয়েক সপ্তাহ ধরে বদলে গেছ।"
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
"কীভাবে?"
"তুমি সবসময় চিন্তায় থাকো। রাতে ঘুমাও না। বাচ্চাদের সঙ্গে আগের মতো কথা বলো না।"
বিভূ কিছু বলল না।
কারণ প্রতিবাদ করার মতো যুক্তি তার কাছে নেই।
মিতালী চলে যাওয়ার পর সে আবার ফাইল খুলল।
কিন্তু এবার মনোযোগ আগের মতো নেই।
স্ত্রীর কথাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরছে।
সে কি সত্যিই এতটা বদলে গেছে?
ওদিকে থানায় বসে অরিজিৎও একটা দীর্ঘ সন্ধ্যা কাটাচ্ছিল।
সঞ্জয় পালের পুরোনো নথি ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে একটা বিষয় খুঁজে পেল।
একাধিক ব্যবসায়িক নথি হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
কোনো ব্যাখ্যা নেই।
কোনো সরকারি রেকর্ড নেই।
যেন কেউ ইচ্ছে করেই ইতিহাসের একটা অংশ মুছে ফেলেছে।
অরিজিৎ চুপ করে বসে রইল।
তার অভিজ্ঞতা বলছে—
যখন কেউ কোনো তথ্য লুকাতে চায়, তখন সেই তথ্য সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ হয়।
রাত সাড়ে এগারোটা।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেছে।
বিভূ এখনও জেগে।
টেবিল ভর্তি কাগজ।
নোট।
তারিখ।
নাম।
সে চেষ্টা করছে একটা সম্পর্ক খুঁজে বের করতে।
সঞ্জয় পাল।
নির্মল সাহা।
পুরোনো গুদামঘর।
পরিত্যক্ত অফিস।
অচেনা বার্তা।
সবকিছু।
কিন্তু যতই খুঁজছে, ততই জটিল লাগছে।
হঠাৎ একটা কাগজের ভাঁজের মধ্যে থেকে ছোট্ট একটা সাদা কাগজ বেরিয়ে এল।
মনে হয় আগে চোখে পড়েনি।
কাগজটায় মাত্র একটি ঠিকানা লেখা।
আর নিচে একটা সময়।
কোনো নাম নেই।
কোনো ব্যাখ্যা নেই।
শুধু—
ঠিকানা।
আর—
রাত ৯টা।
বিভূ কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
হৃদস্পন্দন ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে।
কারণ তার সাংবাদিকসুলভ অভিজ্ঞতা একটা কথাই বলছে।
এটা কোনো সাধারণ নোট নয়।
কেউ ইচ্ছে করে এটা রেখে গেছে।
ঠিক তখনই ফোনে নতুন মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
আবার।
বিভূর বুক ধক করে উঠল।
মেসেজ খুলল।
এবার মাত্র চারটি শব্দ।
"ফাইলটা ভালো করে পড়ো।"
সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
ঘরের চারপাশে তাকাল।
হঠাৎ আবার সেই পুরোনো অনুভূতিটা ফিরে এল।
যেন কেউ তাকে দেখছে।
খুব কাছ থেকে।
খুব মনোযোগ দিয়ে।
আর শহরের অন্য প্রান্তে অরিজিৎ সেন নিজের নোটবুকে নতুন একটা বাক্য লিখছিল।
"যে ব্যক্তি উত্তর খুঁজছে, সে হয়তো নিজেই অজান্তে উত্তরটির দিকে পরিচালিত হচ্ছে।"
কলমটা নামিয়ে রাখল সে।
কারণ প্রথমবারের মতো তার মনে হচ্ছে—
এই কেসে কেউ একজন পর্দার আড়াল থেকে সুতো টানছে।
আর সেই সুতো এখন ধীরে ধীরে বিভূর গলায় জড়িয়ে যাচ্ছে।
_____________________________
পরদিন সকাল থেকেই বিভূর মাথায় ঘুরছিল সেই কাগজের ঠিকানাটা।
আর নিচে লেখা সময়—
রাত ৯টা।
একটা ঠিকানা।
একটা সময়।
কোনো নাম নেই।
কোনো ব্যাখ্যা নেই।
তবু অদ্ভুতভাবে সে অনুভব করছিল, বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ।
খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সারাদিন কাজের চেষ্টা করেও মন বসাতে পারল না।
একটা স্থানীয় খবর কভার করতে গিয়েও বারবার ফোন বের করে ঠিকানাটা দেখছিল।
দুপুরে একটা বিজ্ঞাপনের ভিডিও এডিট করতে বসেও একই অবস্থা।
মনে হচ্ছিল রাতটা যেন কিছুতেই আসতে চাইছে না।
ওদিকে বাড়িতে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।
ঋত্বিক এখন আর আগের মতো বাবার ঘরে আসে না।
রিয়াও কম আসে।
তারা বুঝতে শিখেছে—
বাবা ব্যস্ত।
সবসময় ব্যস্ত।
আর মিতালী?
সে এখনও কিছু বলে না।
কিন্তু নীরবে সব লক্ষ্য করছে।
রাত আটটার দিকে বিভূ সিদ্ধান্ত নিল।
সে যাবে।
একাই যাবে।
কাউকে কিছু বলবে না।
কেন যাচ্ছে, তাও বলবে না।
কারণ তার নিজের কাছেই উত্তর নেই।
আটটা চল্লিশ।
বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে।
ঠিকানাটা শহরের এক পুরোনো আবাসিক এলাকার।
খুব জনবহুল নয়।
আবার একেবারে নির্জনও নয়।
রাস্তায় হলুদ স্ট্রিটলাইট জ্বলছে।
কিছু দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।
কিছু এখনও খোলা।
ন'টার কয়েক মিনিট আগে সে ঠিকানার সামনে পৌঁছাল।
একতলা পুরোনো বাড়ি।
বাইরে কোনো নামফলক নেই।
জানালাগুলো বন্ধ।
বাড়িটাকে দেখে পরিত্যক্তও মনে হচ্ছে না।
আবার বসবাসযোগ্যও মনে হচ্ছে না।
অদ্ভুত একটা মাঝামাঝি অবস্থা।
বিভূ বাইকটা একটু দূরে রেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
হৃদস্পন্দন দ্রুত হচ্ছে।
নিজেকেই বারবার বোঝাচ্ছে—
সে শুধু একজন সংবাদকর্মী।
তথ্য খুঁজতে এসেছে।
এর বেশি কিছু নয়।
বাড়িটার সামনে পৌঁছে সে থমকে গেল।
দরজাটা আধখোলা।
ভেতরে আলো নেই।
কিন্তু সম্পূর্ণ অন্ধকারও নয়।
কোথাও থেকে হালকা আলো আসছে।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
কেউ ডাকল না।
কেউ বাধাও দিল না।
অবশেষে সাহস করে ভেতরে ঢুকল।
পুরোনো কাঠের গন্ধ।
ধুলো।
নীরবতা।
একটা ফাঁকা ড্রইংরুম।
ভাঙা চেয়ার।
দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরোনো ক্যালেন্ডার।
সবকিছু যেন সময়ের মধ্যে আটকে আছে।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল।
ঘরের এক কোণে একটা টেবিল।
আর টেবিলের উপর একটা খাম।
সাদা খাম।
উপরে কালো কালি দিয়ে লেখা—
"বিভূ বৈদ্য"
বিভূর বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল।
এই নাম এখানে কেন?
কে লিখেছে?
কীভাবে?
সে দ্রুত এগিয়ে গেল।
খামটা হাতে তুলে নিল।
ভেতরে কয়েকটা কাগজ।
কিছু পুরোনো নথির কপি।
আর একটা ছবি।
ছবিটা দেখে সে স্থির হয়ে গেল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—
সঞ্জয় পাল।
আর তার পাশে দাঁড়িয়ে নির্মল সাহা।
দুজনেই অনেক কম বয়সী।
পেছনে একটা গুদামঘরের মতো ভবন।
বিভূর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
মানে—
দুজন একে অপরকে চিনত।
এবং সম্ভবত খুব কাছ থেকে চিনত।
এই তথ্য আগে কোথাও আসেনি।
হঠাৎ বাইরে কোনো একটা শব্দ হলো।
খসখস।
তারপর পায়ের শব্দ।
খুব ক্ষীণ।
কিন্তু স্পষ্ট।
কেউ আছে।
বাড়ির বাইরে।
বিভূর সাংবাদিকসুলভ কৌতূহল আর আতঙ্ক একসঙ্গে কাজ করতে লাগল।
সে দ্রুত দরজার দিকে এগোল।
বাইরে বেরিয়ে চারদিকে তাকাল।
কেউ নেই।
রাস্তা ফাঁকা।
নিঃশব্দ।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সে একটা ভুল করল।
খুব ছোট ভুল।
যেটা তখন তার চোখেই পড়েনি।
উত্তেজনায় সে টেবিলের উপর থাকা খামটা আগের জায়গায় ফেরত রাখেনি।
আর খাম থেকে বের করা একটা কাগজও মেঝেতে পড়ে রইল।
সে খেয়ালই করেনি।
কয়েক সেকেন্ড পর সে দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
বাইক স্টার্ট দিল।
এলাকা ছেড়ে চলে গেল।
তার মাথা তখন পুরোপুরি ব্যস্ত অন্য চিন্তায়।
সঞ্জয় পাল।
নির্মল সাহা।
পুরোনো গুদামঘর।
ছবিটা।
সবকিছু।
প্রায় বিশ মিনিট পরে বাড়িটার সামনে আরেকজন এসে দাঁড়াল।
অন্ধকারে মুখ স্পষ্ট বোঝা যায় না।
লোকটা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
সরাসরি সেই ঘরে গেল।
মেঝেতে পড়ে থাকা কাগজটা তুলে নিল।
কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে হাসল।
যেন সে ঠিক এই ঘটনাটার অপেক্ষায় ছিল।
সেই রাতেই বাড়ি ফিরে বিভূ ছবি আর নথিগুলো আবার দেখতে বসল।
সে বুঝতেই পারল না—
আজ সে প্রথমবার একটা ভুল করে ফেলেছে।
আর সেই ভুলটাই ভবিষ্যতে তার জন্য বিপদ ডেকে আনবে।
শহরের অন্য প্রান্তে অরিজিৎ সেন নিজের নোটবুকে নতুন তথ্য যোগ করছিল।
এখনও সে জানে না বিভূ কোথায় গিয়েছিল।
কী পেয়েছে।
কী ভুল করেছে।
কিন্তু খুব শিগগিরই সেই ভুলের একটা চিহ্ন তার সামনে এসে পড়বে।
আর সেটাই হবে—
প্রথম বাস্তব ক্লুর শুরু।
___________________________
রাত প্রায় আড়াইটে।
বিভূ এখনও জেগে।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে সেই পুরোনো ছবি, কিছু নথির কপি আর নিজের হাতে লেখা নোট।
সঞ্জয় পাল।
নির্মল সাহা।
গুদামঘর।
পরিত্যক্ত অফিস।
রহস্যময় বার্তা।
সবকিছু যেন ধীরে ধীরে একটা জটিল গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে।
কিন্তু যতই সে এগোচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে কেউ তাকে আরও গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
সেদিন রাতে মিতালী একবার ঘুম ভেঙে বিভূর ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।
দরজার ফাঁক দিয়ে আলো বেরোচ্ছে।
ঘড়িতে তখন দুইটা।
সে আস্তে করে দরজা খুলল।
দেখল বিভূ টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসে আছে।
চোখ লাল।
মুখ ক্লান্ত।
হাতে একটা পুরোনো ছবি।
মিতালী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
"এভাবে আর কতদিন?"
বিভূ চমকে মাথা তুলল।
"কী?"
"তুমি নিজেকে শেষ করে দিচ্ছ।"
ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
বিভূ উত্তর দিল না।
কারণ সে নিজেও জানে, কথাটা পুরোপুরি ভুল নয়।
পরদিন সকালে সে প্রায় ঘুম না নিয়েই বেরিয়ে গেল।
একটা ছোট খবর কভার করতে।
তারপর আরেকটা।
তারপর আরেকটা।
কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে চাইছিল।
কারণ কাজ না করলে মাথার মধ্যে প্রশ্নগুলো আরও জোরে চিৎকার করতে শুরু করে।
কিন্তু মানুষ যতই নিজেকে ব্যস্ত রাখুক, বাস্তবতা থেকে বেশিক্ষণ পালাতে পারে না।
দুপুরে একসময় ঋত্বিক স্কুল থেকে ফিরে বাবার ঘরে ঢুকল।
হাতে একটা সার্টিফিকেট।
স্কুলের বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে পুরস্কার পেয়েছে।
"বাবা, দেখো!"
বিভূ তখন ফোনে একটা সূত্রের সঙ্গে কথা বলছিল।
সে এক ঝলক তাকিয়ে বলল,
"খুব ভালো হয়েছে। পরে দেখি।"
ঋত্বিক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
হাতে ধরা সার্টিফিকেটটা আর কাউকে দেখাল না।
সন্ধ্যায় মিতালী বিষয়টা বলার পর বিভূর খারাপ লাগল।
খুব খারাপ।
সে ছেলের ঘরে গেল।
ঋত্বিক পড়ছিল।
বিভূ বলল,
"সার্টিফিকেটটা দেখাবি?"
ছেলেটা তাকাল।
মুখে হাসি নেই।
"মা দেখে ফেলেছে।"
সাধারণ একটা উত্তর।
কিন্তু কথাটার ভেতরে একটা দূরত্ব ছিল।
আর সেই দূরত্বটা প্রথমবার স্পষ্টভাবে অনুভব করল বিভূ।
ওদিকে অরিজিৎ সেনের দিনটা অন্যরকম ছিল।
একজন পুরোনো তথ্যদাতার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল সে।
আড্ডার মাঝখানে কথায় কথায় পুরোনো শিল্পাঞ্চলের সেই ভবনের প্রসঙ্গ উঠল।
অরিজিৎ থেমে গেল।
"ওই জায়গাটা সম্পর্কে কিছু জানো?"
লোকটা কাঁধ ঝাঁকাল।
"অনেকদিন বন্ধ।"
"কেউ আসে যায়?"
লোকটা একটু ভেবে বলল,
"মাঝে মাঝে।"
"কে?"
"চিনি না। তবে গত সপ্তাহেও নাকি কেউ গিয়েছিল।"
অরিজিৎ চুপ করে গেল।
কারণ সময়টা মিলে যাচ্ছে।
অদ্ভুতভাবে।
সেই সন্ধ্যাতেই সে ভবনটার বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করল।
পুরোনো রেকর্ড।
মালিকানার ইতিহাস।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ।
সব।
এবং ধীরে ধীরে একটা বিষয় পরিষ্কার হতে লাগল।
সঞ্জয় পালের নাম যতবার সামনে আসছে, ততবারই আশেপাশে আরও কিছু নাম ঘুরে ফিরে আসছে।
যার মধ্যে নির্মল সাহাও আছে।
রাত আটটার দিকে অরিজিৎ একটা ফোন পেল।
একজন স্থানীয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী পুরোনো বাড়িটা পরিষ্কার করতে গিয়ে কিছু কাগজ পেয়েছে।
বিশেষ কিছু না।
তবু কৌতূহলবশত থানায় জমা দিয়েছে।
অরিজিৎ প্রথমে বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি।
কিন্তু কাগজগুলো হাতে পাওয়ার পর তার চোখ সরু হয়ে এল।
কারণ কাগজের এক কোণে একটা হাতের লেখা ছিল।
কিছু সংখ্যা।
কিছু তারিখ।
আর একটি সংক্ষিপ্ত নোট।
নোটটা নিজে থেকে কোনো অপরাধ প্রমাণ করে না।
কোনো বড় তথ্যও দেয় না।
তবু একটা জিনিস করে।
এটা দেখায়—
সম্প্রতি কেউ সেখানে গিয়েছিল।
এবং তাড়াহুড়ো করে কিছু লিখেছিল।
অরিজিৎ কাগজটা টেবিলে রেখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে নিজের নোটবুক খুলল।
একটা নতুন পৃষ্ঠা।
উপরে লিখল—
"প্রথম বাস্তব ক্লু"
তার নিচে কয়েকটা পর্যবেক্ষণ লিখল।
তারিখ।
স্থান।
সময়।
আর শেষে একটা প্রশ্নচিহ্ন।
কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়ার সময় আসেনি।
কিন্তু প্রথমবারের মতো তার হাতে এমন কিছু এসেছে, যা শুধুই অনুমান নয়।
সেই রাতেই বিভূ নিজের ঘরে বসে ছিল।
হাতে সেই পুরোনো ছবি।
সঞ্জয় পাল আর নির্মল সাহার ছবি।
সে জানে না, ঠিক এই মুহূর্তে তদন্ত অন্য গতিতে এগোতে শুরু করেছে।
সে জানে না, তার অজান্তে ফেলে আসা একটা ছোট ভুল এখন অন্য কারও হাতে পৌঁছে গেছে।
সে জানে না, তার চারপাশের জালটা আরও শক্ত হয়ে উঠছে।
রাত বাড়তে থাকল।
বাইরে বাতাস বইছে।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
বিভূ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ মনে হলো—
সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে।
সে এখনও এগিয়ে আছে।
সে এখনও খেলাটা বুঝতে পারছে।
কিন্তু বাস্তবে ঠিক উল্টোটা ঘটছে।
কারণ শহরের অন্য প্রান্তে অরিজিৎ সেন প্রথমবারের মতো এমন একটা সুতো হাতে পেয়েছে, যেটা টানতে টানতে একদিন সরাসরি বিভূ বৈদ্যর দরজায় পৌঁছে যেতে পারে।
আর সেই কারণেই—
চাপ এখন শুধু বিভূর মাথার ভেতর নেই।
চাপ ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।
_______________________________
সোমবার সকাল।
অনেকদিন পর বিভূ একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠল।
শরীর ক্লান্ত।
মাথা ভারী।
চোখের নিচে কালো দাগ আরও স্পষ্ট।
গত কয়েক সপ্তাহ যেন তাকে কয়েক বছর বুড়ো করে দিয়েছে।
ঘুম থেকে উঠেই সে অভ্যাসমতো ফোন হাতে নিল।
নিউজ পেজের notification।
নতুন follower।
মন্তব্য।
শেয়ার।
সবকিছু স্বাভাবিক।
বরং আগের চেয়ে ভালো।
"সিটি লাইভ ২৪" এখন আর ছোট কোনো পেজ নয়।
শহরের বহু মানুষ প্রতিদিন তার আপডেটের অপেক্ষা করে।
কিছু স্থানীয় ব্যবসায়ী নিয়মিত বিজ্ঞাপনও দেয়।
যে স্বপ্নটা একদিন অসম্ভব মনে হতো, সেটা আজ বাস্তব।
তবু অদ্ভুতভাবে এই সাফল্য তাকে আর আনন্দ দেয় না।
মিতালী চা এনে টেবিলে রাখল।
"আজ কোথাও যাবে?"
"দু-একটা কাজ আছে।"
"নিজের শরীরটারও খেয়াল রাখো।"
বিভূ হালকা হাসল।
কিন্তু উত্তর দিল না।
কারণ সে জানে, শরীরের চেয়ে বড় সমস্যা এখন মাথার ভেতর।
খাওয়ার টেবিলে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার চোখ গেল ঋত্বিকের দিকে।
ছেলেটা চুপচাপ খাচ্ছে।
আগে সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে অনেক কথা বলত।
এখন বলে না।
রিয়াও আগের মতো বাবার পাশে এসে বসে না।
এই পরিবর্তনটা ধীরে ধীরে হয়েছে।
তাই এতদিন চোখে পড়েনি।
আজ পড়ল।
আর সেটা ভালো লাগল না।
সকাল দশটার দিকে বিভূ অফিসঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
তারপর টেবিলের ড্রয়ার খুলে সেই ছবি বের করল।
সঞ্জয় পাল।
নির্মল সাহা।
পেছনে পুরোনো গুদামঘর।
ছবিটা যতবার দেখছে, ততবার মনে হচ্ছে এর ভেতরেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ উত্তর লুকিয়ে আছে।
কিন্তু উত্তরটা ঠিক কোথায়?
ওদিকে থানায় অরিজিৎ সেন নিজের ডেস্কে বসে ছিল।
তার সামনে রাখা সেই কাগজ।
পুরোনো বাড়ি থেকে পাওয়া।
বড় কোনো প্রমাণ নয়।
তবু গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এই কাগজ দেখাচ্ছে—
সম্প্রতি কেউ সেখানে গিয়েছিল।
আর ঘটনাচক্রে সেই সময়ে বিভূও সঞ্জয় পালের খোঁজ করছিল।
অরিজিৎ চেয়ারে হেলান দিল।
তার অভিজ্ঞতা বলছে—
কাকতালীয় ঘটনা একবার হয়।
দুবারও হতে পারে।
কিন্তু একই মানুষ যদি বারবার একই ধরনের ঘটনার আশেপাশে উপস্থিত থাকে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে।
সে নিজের নোটবুক খুলল।
পাতার উপরে লিখল—
বিভূ বৈদ্য
তার নিচে কয়েকটা তারিখ লিখল।
তারপর একটার সঙ্গে আরেকটা লাইন টানল।
প্রথম মৃত্যু।
দ্বিতীয় ঘটনা।
সঞ্জয় পালের সূত্র।
পুরোনো বাড়ি।
সবকিছু।
ধীরে ধীরে একটা অস্বস্তিকর ছবি তৈরি হতে শুরু করল।
যদিও এখনও সেখানে ফাঁক অনেক।
দুপুরের দিকে অরিজিৎ একটা পুরোনো রেকর্ড বের করল।
নির্মল সাহার মৃত্যুর সময়কার।
ফাইল খুলে সে স্থির হয়ে গেল।
কারণ একটা বিষয় সে আগে খেয়াল করেনি।
ঘটনার প্রথম অনলাইন আপডেটের সময় আর পুলিশের আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়ার সময়ের মধ্যে পার্থক্য অস্বাভাবিকভাবে কম।
খুব কম।
যেন কেউ ঘটনাটা ঘটার পরপরই জানত।
অথবা...
ঘটনার খুব কাছাকাছি ছিল।
অরিজিৎ ধীরে ধীরে ফাইলটা বন্ধ করল।
তারপর জানালার বাইরে তাকাল।
প্রথমবারের মতো একটা চিন্তা তার মাথায় স্পষ্ট আকার নিল।
এখনও সেটা অভিযোগ নয়।
কিন্তু আর শুধু সন্দেহও নয়।
সেই বিকেলে বিভূ একটা ফোন পেল।
পুরোনো পরিচিত এক সূত্র।
লোকটা বলল,
"সঞ্জয় পালের ব্যাপারে যেটা খুঁজছ, সেটা ছেড়ে দাও।"
বিভূ থমকে গেল।
"কেন?"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর উত্তর এল,
"কারণ কিছু পুরোনো দরজা খোলা ভালো না।"
কল কেটে গেল।
বিভূ কয়েক মুহূর্ত ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার বুকের ভেতর আবার সেই পুরোনো অস্বস্তি ফিরে এল।
কিন্তু এবার ভয়ের সঙ্গে আরেকটা জিনিস মিশে গেছে।
জেদ।
কারণ যত বেশি মানুষ তাকে থামাতে চাইছে, তত বেশি সে জানতে চাইছে সত্যিটা কী।
সন্ধ্যার দিকে সে আবার ফাইলগুলো খুলল।
ছবিগুলো সাজাল।
নোটগুলো মিলিয়ে দেখল।
আর ঠিক তখনই একটা বিষয় তার চোখে পড়ল।
ছবির পেছনের গুদামঘরের দেয়ালে একটা লোগো।
খুব ছোট।
খুব অস্পষ্ট।
আগে খেয়াল করেনি।
কিন্তু এবার করল।
সে দ্রুত ছবিটা zoom করল।
মনে হলো—
এই লোগোটা কোথাও আগে দেখেছে।
খুব সম্প্রতি।
কিন্তু কোথায়?
তার মাথার ভেতর স্মৃতিগুলো দ্রুত ঘুরতে লাগল।
তারপর হঠাৎ সে স্থির হয়ে গেল।
কারণ সে মনে করতে পেরেছে।
ঠিক একই লোগো সে দেখেছিল—
সঞ্জয় পালের পরিত্যক্ত অফিসের দ্বিতীয় তলার সেই বন্ধ ঘরের দরজায়।
বিভূর বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
কারণ এর মানে—
ছবিটা।
গুদামঘর।
অফিস।
সবকিছু একই সুতোয় বাঁধা।
আর সেই সুতো এখন ধীরে ধীরে তাকে এমন এক সত্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে ফিরে আসা হয়তো আর সম্ভব হবে না।
___________________________
সারা রাত বিভূ ঠিকমতো ঘুমাতে পারল না।
ছবির পেছনের সেই লোগোটা মাথার মধ্যে ঘুরতেই থাকল।
একই চিহ্ন।
একই প্রতীক।
একবার পুরোনো গুদামঘরের ছবিতে।
আরেকবার সঞ্জয় পালের পরিত্যক্ত অফিসের দ্বিতীয় তলার বন্ধ ঘরের দরজায়।
এটা কাকতালীয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই।
ভোর পাঁচটার দিকে সে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল।
বাড়ির সবাই তখনও ঘুমিয়ে।
জানালার বাইরে ফিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে।
সে চুপচাপ রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ চা বানাল।
তারপর টেবিলে বসে আবার ছবিটা বের করল।
যতই দেখছে, ততই নিশ্চিত হচ্ছে।
সে ভুল করেনি।
একই লোগো।
একই প্রতীক।
সকাল সাতটার মধ্যে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
আজই আবার শিল্পাঞ্চলে যাবে।
আজই।
কারণ এবার তার লক্ষ্য স্পষ্ট।
বন্ধ ঘরটা।
মিতালী খেয়াল করল, আজও বিভূ অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো করছে।
"আবার কোথায় যাচ্ছ?"
"একটা পুরোনো সূত্র যাচাই করতে।"
"তুমি কি কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ছ?"
প্রশ্নটা শুনে বিভূ থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
"না।"
কিন্তু উত্তরটা দেওয়ার সময় সে নিজেই বুঝল, কথাটার ভেতরে আত্মবিশ্বাস নেই।
দুপুরের একটু আগে সে শিল্পাঞ্চলে পৌঁছাল।
দিনের আলোয় জায়গাটা আগের চেয়ে আরও নির্জন দেখাচ্ছে।
ভাঙা কারখানা।
মরিচা ধরা গেট।
উঠে যাওয়া রং।
সবকিছু যেন অতীতের কোনো মৃত অধ্যায়।
পরিত্যক্ত ভবনের সামনে এসে বাইক থামাল।
চারপাশে তাকাল।
কেউ নেই।
শুধু দূরে একটা কুকুর শুয়ে আছে।
ভবনের ভেতরে ঢুকে সে সোজা দ্বিতীয় তলার দিকে এগোল।
গতবারের মতোই করিডর নিঃশব্দ।
ধুলোর গন্ধ।
ভাঙা জানালা।
নীরবতা।
আর করিডরের শেষে—
সেই দরজা।
আজও দরজার গায়ে নতুন তালা ঝুলছে।
বিভূ কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর দরজার পাশে ঝুঁকে লোগোটা পরীক্ষা করল।
এবার কাছে থেকে।
সন্দেহ নেই।
ছবির পেছনের লোগোর সঙ্গে একদম মিলে যাচ্ছে।
তার বুকের ভেতর উত্তেজনা বাড়তে লাগল।
এই ঘরের ভেতরেই কিছু আছে।
অবশ্যই আছে।
নাহলে এত বছর পরও নতুন তালা লাগানো থাকবে কেন?
সে চারপাশে তাকাল।
কেউ নেই।
তারপর হাত বাড়িয়ে তালাটা পরীক্ষা করল।
মজবুত।
কিন্তু পুরোনো দরজার কাঠ ততটা মজবুত নয়।
ঠিক তখনই নিচে কোথাও একটা গাড়ির শব্দ ভেসে এল।
বিভূ থমকে গেল।
কয়েক সেকেন্ড কান পেতে রইল।
তারপর শব্দটা মিলিয়ে গেল।
সম্ভবত রাস্তা দিয়ে কেউ চলে গেছে।
অন্যদিকে একই সময়ে অরিজিৎ সেন থানায় বসে নতুন একটা তথ্য যাচাই করছিল।
পুরোনো ব্যবসায়িক নথির মধ্যে একটা কোম্পানির নাম বারবার উঠে আসছে।
আর সেই কোম্পানির ঠিকানা আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যাচ্ছে শিল্পাঞ্চলের ওই ভবনের সঙ্গে।
অরিজিৎ চুপ করে বসে রইল।
কারণ ধীরে ধীরে ছবিটা পরিষ্কার হচ্ছে।
তার ডেস্কে রাখা নোটবুকে এখন তিনটা নাম মোটা অক্ষরে লেখা।
সঞ্জয় পাল।
নির্মল সাহা।
বিভূ বৈদ্য।
এখনও তিনজনকে এক সুতোয় বাঁধার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
কিন্তু দূরত্ব আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
এদিকে শিল্পাঞ্চলে বিভূর ধৈর্য শেষ হয়ে আসছে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে একটা সিদ্ধান্ত নিল।
আজ উত্তর না পেয়ে ফিরবে না।
যেভাবেই হোক।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল—
দরজার নিচে ধুলোর ওপর একটা সরু আঁচড়ের দাগ।
যেন সম্প্রতি দরজাটা খোলা হয়েছে।
খুব বেশি দিন আগে নয়।
বিভূ হাঁটু গেড়ে বসে দাগটা পরীক্ষা করল।
তারপর আরও একটা জিনিস দেখতে পেল।
দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে একটা কাগজের কোণা বেরিয়ে আছে।
খুব সামান্য।
প্রায় চোখে পড়ে না।
হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেল।
সে সাবধানে কাগজটা টেনে বের করল।
ছোট্ট একটা ছেঁড়া অংশ।
তাতে মাত্র কয়েকটা শব্দ পড়া যাচ্ছে।
"...সব নথি ধ্বংস করতে হবে..."
আর নিচে—
"...ও জানতে পেরেছে..."
বাকিটা ছিঁড়ে গেছে।
বিভূর গলা শুকিয়ে গেল।
"ও" কে?
কী জানতে পেরেছে?
কোন নথি ধ্বংস করতে হবে?
ঠিক তখনই তার ফোন কেঁপে উঠল।
অচেনা নম্বর।
আবার।
স্ক্রিনে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিল।
মেসেজে মাত্র এক লাইন।
"তুমি যা খুঁজছ, তার চেয়ে সে তোমাকে আগে খুঁজে পাবে।"
বিভূ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পেছনে তাকাল।
ফাঁকা করিডর।
ভাঙা জানালা।
ধুলো।
কেউ নেই।
তবু এবার প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
সে শুধু কোনো রহস্য অনুসরণ করছে না।
কেউ একজন সত্যিই তাকে অনুসরণ করছে।
আর শহরের অন্য প্রান্তে অরিজিৎ সেন নিজের নোটবুকে একটা নতুন বাক্য লিখল—
"যদি নথি ধ্বংস করার প্রয়োজন হয়ে থাকে, তবে কোনো এক সময় সত্যিটা বিপজ্জনক ছিল।"
তারপর সে শিল্পাঞ্চলের ভবনটার ঠিকানা আবার সামনে টেনে নিল।
কারণ অজান্তেই সে এখন সেই জায়গার দিকে এগোতে শুরু করেছে।
আর যখন সে সেখানে পৌঁছাবে—
বিভূর চারপাশের ফাটলগুলো আরও বড় হয়ে যাবে।
___________________________
পরিত্যক্ত ভবন থেকে বেরিয়ে আসার পরও বিভূর মাথা থেকে একটা কথাই যাচ্ছিল না।
"...ও জানতে পেরেছে..."
এই চারটা শব্দ।
খুব সাধারণ।
তবু ভেতরে যেন অদ্ভুত একটা ভয় লুকিয়ে আছে।
কারণ এর মানে দাঁড়ায়—
কেউ কোনো সত্য গোপন করতে চেয়েছিল।
আর কেউ সেই সত্য জেনে গিয়েছিল।
সেই রাতেই বাড়ি ফিরে বিভূ নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসল।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে দিল সবকিছু।
পুরোনো ছবি।
ফাইল।
ছেঁড়া কাগজ।
নিজের নোট।
একটা একটা করে মিলিয়ে দেখতে লাগল।
প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
সে ভুল জায়গায় উত্তর খুঁজছিল।
সঞ্জয় পাল কে ছিল, সেটা নয়।
প্রশ্নটা হওয়া উচিত—
সঞ্জয় পাল কী জানত?
ওদিকে অরিজিৎ সেনও একই সময়ে নিজের অফিসে বসে ছিল।
এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা টেবিলে পড়ে আছে।
সামনে পুরোনো ব্যবসায়িক নথির স্তূপ।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সে একই কাজ করছে।
তারিখ মিলিয়ে দেখা।
নাম মিলিয়ে দেখা।
কোম্পানির রেকর্ড দেখা।
হঠাৎ একটা ফাইলের ভেতর সে এমন একটা তথ্য পেল, যেটা তার মনোযোগ পুরোপুরি কেড়ে নিল।
সঞ্জয় পালের কোম্পানি প্রায় পনেরো বছর আগে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—
কোম্পানি বন্ধ হওয়ার সরকারি কারণ আর বাস্তব ঘটনাগুলো মিলছে না।
সরকারি কাগজে লেখা—
ব্যবসায়িক ক্ষতি।
আর্থিক সংকট।
স্বেচ্ছায় বন্ধ।
কিন্তু অন্য কিছু নথি অন্য গল্প বলছে।
সেখানে দেখা যাচ্ছে—
বন্ধ হওয়ার ঠিক কয়েক মাস আগে কোম্পানির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছিল।
তারপর হঠাৎ সব অভিযোগ অদৃশ্য হয়ে যায়।
কেসগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
নথিগুলোও হারিয়ে যায়।
অরিজিৎ ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিল।
তার অভিজ্ঞতা বলছে—
এগুলো কাকতালীয় নয়।
কেউ ইচ্ছে করে ইতিহাসের একটা অংশ মুছে দিয়েছে।
পরদিন দুপুরে বিভূ একটা পুরোনো সূত্রের সঙ্গে দেখা করল।
লোকটার নাম হেমন্ত দে।
একসময় স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে বেশ পরিচিত ছিল।
এখন অবসর নিয়েছে।
শহরের এক কোণে ছোট্ট বাড়িতে থাকে।
প্রথমে হেমন্ত কিছুই বলতে চাইছিল না।
বারবার বিষয় বদলানোর চেষ্টা করছিল।
কিন্তু সঞ্জয় পালের নাম শুনতেই তার মুখের রঙ বদলে গেল।
বিভূ সেটা খেয়াল করল।
"আপনি ওকে চিনতেন?"
হেমন্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"অনেকেই চিনত।"
"কেমন মানুষ ছিল?"
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
"মানুষটা খারাপ ছিল না।"
"তাহলে?"
"ভুল জায়গায় ভুল জিনিস দেখে ফেলেছিল।"
বিভূর বুক ধক করে উঠল।
"মানে?"
হেমন্ত চারদিকে তাকাল।
যেন এখনও কেউ শুনে ফেলবে এই ভয়।
তারপর নিচু গলায় বলল,
"অনেক বছর আগে কিছু বড় লোকের সঙ্গে ব্যবসা করত সঞ্জয়।"
"তারপর?"
"তারপর ও এমন কিছু নথি হাতে পায়, যেগুলো ওর পাওয়া উচিত ছিল না।"
বিভূর গলা শুকিয়ে গেল।
"কী ধরনের নথি?"
হেমন্ত মাথা নাড়ল।
"সেটা আমি জানি না।"
তারপর একটু থেমে যোগ করল,
"কিন্তু জানি, ওই ঘটনার পর সঞ্জয় পাল আর আগের মতো ছিল না।"
"কেন?"
"কারণ ও ভয় পেতে শুরু করেছিল।"
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
বিভূ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর জিজ্ঞেস করল,
"সঞ্জয় পালের কী হয়েছিল?"
হেমন্ত উত্তর দিল না।
জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
অনেকক্ষণ।
তারপর ধীরে বলল,
"সরকারি কাগজে যা লেখা আছে, আমি সেটা বিশ্বাস করি না।"
বিভূর বুকের ভেতর আবার অস্বস্তি বাড়তে লাগল।
কারণ সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী—
সঞ্জয় পাল বহু বছর আগে দুর্ঘটনায় মারা গেছে।
হেমন্ত আবার বলল,
"কেউ কেউ বলত দুর্ঘটনা।"
"আর বাকিরা?"
"বাকিরা বলত, ও খুব বেশি জেনে ফেলেছিল।"
কথাটা শুনে বিভূর শরীরের ভেতর ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল।
কারণ এই প্রথমবার—
সঞ্জয় পালের গল্পটা শুধুই ব্যবসায়িক রহস্যের মতো লাগছে না।
বরং মনে হচ্ছে, এটা এমন একটা গল্প যার শেষটা ইচ্ছে করে বদলে দেওয়া হয়েছে।
সেই সন্ধ্যাতেই অরিজিৎ আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেল।
একটা পুরোনো সাক্ষ্য।
খুব গুরুত্বহীন বলে একসময় ফাইলে চাপা পড়ে গিয়েছিল।
সাক্ষ্য অনুযায়ী—
সঞ্জয় পালের মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে তাকে নির্মল সাহার সঙ্গে একাধিকবার দেখা গিয়েছিল।
অরিজিৎ স্থির হয়ে গেল।
সঞ্জয় পাল।
নির্মল সাহা।
দুজনের সংযোগ এখন আর অনুমান নয়।
নথিভুক্ত সত্য।
সে নিজের নোটবুকে নতুন একটা লাইন টানল।
দুই নামের মাঝে।
তারপর দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল।
কারণ ছবিটা দ্রুত পরিষ্কার হচ্ছে।
আর যত পরিষ্কার হচ্ছে, ততই অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।
রাত নেমেছে।
বাড়ি ফিরে বিভূ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
শহরের আলো দূরে ঝাপসা দেখাচ্ছে।
তার মাথায় ঘুরছে হেমন্তের কথাগুলো।
"ভুল জায়গায় ভুল জিনিস দেখে ফেলেছিল।"
"খুব বেশি জেনে ফেলেছিল।"
হঠাৎ তার মনে হলো—
সঞ্জয় পালের গল্পটা হয়তো অতীতের কোনো রহস্য নয়।
হয়তো এটা একটা সতর্কবার্তা।
কারণ সেও এখন ঠিক একই কাজ করছে।
সেও এমন কিছু খুঁজছে, যা হয়তো তার খোঁজা উচিত নয়।
আর ঠিক তখনই ফোনে নতুন একটা মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
আবার।
বিভূ ধীরে ধীরে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
এবার লেখা—
"সঞ্জয় পালের ভুলটা পুনরাবৃত্তি কোরো না।"
মেসেজটা পড়ে তার বুকের ভেতর কেমন যেন জমে গেল।
কারণ প্রথমবারের মতো সে বুঝতে পারল—
যে-ই হোক, লোকটা শুধু অতীত জানে না।
সে বিভূর বর্তমানটাও জানে।
আর হয়তো তার ভবিষ্যৎও।
_____________________________
পরদিন সকাল।
বিভূর মাথার ভেতর এখনও ঘুরছে সেই মেসেজ।
"সঞ্জয় পালের ভুলটা পুনরাবৃত্তি কোরো না।"
আগের বার্তাগুলোর মতো এটাও রহস্যময়।
কিন্তু এবার একটা বিষয় আলাদা।
এবার প্রথমবারের মতো বার্তাটা সরাসরি সতর্কবাণীর মতো শোনাচ্ছে।
যেন কেউ তাকে থামাতে চাইছে।
অথবা বাঁচাতে।
সকালবেলা চা খেতে খেতে মিতালী বলল,
"এই রবিবারটা অন্তত বাড়িতে থাকবে?"
বিভূ মাথা তুলল।
"কেন?"
"অনেকদিন আমরা কোথাও যাইনি।"
রিয়া পাশ থেকে বলল,
"বাবা, চিড়িয়াখানায় যাব?"
ঋত্বিক কিছু বলল না।
শুধু চুপচাপ বসে রইল।
বিভূর বুকের ভেতর অস্বস্তি হলো।
একসময় এমন কোনো আবদার সে ফেলত না।
আজও ইচ্ছে করছে না ফেলতে।
কিন্তু সে জানে—
মাথার ভেতরে যে ঝড় চলছে, সেটা নিয়ে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়।
"দেখি।"
শুধু এটুকুই বলল।
ঋত্বিক মুখ নামিয়ে ফেলল।
ছোট্ট একটা শব্দ।
কিন্তু বিভূর কাছে সেটা বড় ধাক্কার মতো লাগল।
কারণ সে বুঝতে পারছে—
সে ধীরে ধীরে নিজের পরিবারকেও হারাচ্ছে।
ওদিকে অরিজিৎ সেনের সকালটা শুরু হলো এক পুরোনো আর্কাইভ রুমে।
থানার পুরোনো নথি সংরক্ষণের ঘর।
ধুলোমাখা ফাইল।
হলদেটে কাগজ।
বছরের পর বছর কেউ খোলেনি এমন রেকর্ড।
অরিজিৎ গত কয়েকদিন ধরে একটা বিষয় নিয়ে ভাবছিল।
সঞ্জয় পালের মৃত্যুর আগের সময়কাল।
বিশেষ করে নির্মল সাহার সঙ্গে তার সম্পর্ক।
তাই সে পুরোনো অভিযোগ, ব্যবসায়িক বিবাদ আর সাক্ষীদের বিবৃতি খুঁজছিল।
প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজার পর সে একটা পুরোনো ফাইল পেল।
প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি।
একটা ছোট ব্যবসায়িক বিরোধের রিপোর্ট।
খুব সাধারণ।
কিন্তু ভেতরে একটা নাম দেখে সে থেমে গেল।
বিভূ বৈদ্য
অরিজিৎ কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।
তারপর আবার পড়ল।
হ্যাঁ।
ভুল দেখেনি।
নামটা সত্যিই লেখা আছে।
ফাইল অনুযায়ী ঘটনাটা প্রায় বারো বছর আগের।
তখন বিভূ সংবাদমাধ্যমে কাজ করত।
ঘটনাটা খুব বড় কিছু নয়।
একটা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মধ্যে তথ্য ফাঁস হওয়া নিয়ে অভিযোগ।
মামলা পর্যন্ত গড়ায়নি।
কিছুদিন পরে বিষয়টা চেপে যায়।
কিন্তু অরিজিৎকে থামিয়ে দিল অন্য একটা বিষয়।
সেই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল—
সঞ্জয় পালের কোম্পানি।
অরিজিৎ ধীরে ধীরে ফাইলটা বন্ধ করল।
তারপর আবার খুলল।
সে নিশ্চিত হতে চাইছিল।
কোনো ভুল হচ্ছে না তো?
না।
সব ঠিক।
প্রথমবারের মতো বিভূর নাম শুধু বর্তমানের ঘটনাগুলোর সঙ্গে নয়—
অতীতের ঘটনাগুলোর সঙ্গেও জুড়ে গেল।
এখনও এটা অপরাধের প্রমাণ নয়।
কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
কারণ এর মানে—
বিভূ এবং সঞ্জয় পালের মধ্যে সম্ভাব্য সংযোগ বহু পুরোনো।
সম্ভবত অনেক পুরোনো।
অরিজিৎ নিজের নোটবুক খুলল।
তারপর লিখল—
"বিভূ বৈদ্য সঞ্জয় পালের নাম প্রথমবার শুনছে—এই ধারণা ভুল হতে পারে।"
কলম থামিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
কারণ এই বাক্যটার গুরুত্ব অনেক।
সেই সময়ে বিভূ নিজের অফিসঘরে বসে ছবিটা আবার দেখছিল।
সে জানে না—
ঠিক এই মুহূর্তে তার অতীতের একটা দরজা খুলে গেছে।
একটা দরজা, যেটা এতদিন বন্ধ ছিল।
বিকেলের দিকে অরিজিৎ আরও একটা সাক্ষীর খোঁজ পেল।
বৃদ্ধ মানুষ।
স্মৃতিশক্তি খুব ভালো নয়।
তবু একটা কথা বলল।
"সঞ্জয় পালের কোম্পানিতে একবার একজন সাংবাদিক ধরনের ছেলে এসেছিল।"
"নাম মনে আছে?"
"না।"
"মুখ?"
"এত বছর পরে বলব কী করে?"
তথ্যটা দুর্বল।
খুব দুর্বল।
তবু অরিজিৎ সেটাও নোট করে রাখল।
কারণ তদন্তে কখন কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, আগে থেকে বলা যায় না।
রাতের দিকে বাড়ি ফিরে বিভূ আবার নথিগুলো নিয়ে বসেছিল।
হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটা পুরোনো কাগজ।
সঞ্জয় পালের ফাইল থেকে পাওয়া।
আগে খেয়াল করেনি।
কাগজের এক কোণে একটা ফোন নম্বর লেখা।
খুব পুরোনো।
সম্ভবত আর চালু নেই।
তবু সে নম্বরটার দিকে তাকিয়ে রইল।
কেন জানি না, নম্বরটা অদ্ভুত পরিচিত লাগছে।
যেন বহু বছর আগে কোথাও দেখেছিল।
কিন্তু মনে করতে পারছে না।
মাথার ভেতর একটা চাপা ব্যথা শুরু হলো।
স্মৃতির গভীরে কিছু একটা নড়ে উঠছে।
কিন্তু পুরোটা এখনও স্পষ্ট নয়।
ঠিক তখনই ফোনে আরেকটা মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
এবার লেখা মাত্র একটি লাইন—
"তুমি সত্যের খুব কাছে চলে এসেছ।"
বিভূ ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
জানালার বাইরে তাকাল।
আর প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
হয়তো সে সত্যের কাছে যাচ্ছে না।
হয়তো সত্যিটাই তার দিকে এগিয়ে আসছে।
আর শহরের অন্য প্রান্তে অরিজিৎ সেন নিজের নোটবুকের শেষ পাতায় একটা বড় বৃত্ত আঁকল।
বৃত্তের কেন্দ্রে লিখল—
বিভূ বৈদ্য
তার চারপাশে—
সঞ্জয় পাল।
নির্মল সাহা।
শিল্পাঞ্চলের ভবন।
পুরোনো অভিযোগ।
গোপন নথি।
সব নাম একে একে যুক্ত হতে লাগল।
আর বহুদিনের তদন্তে প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
সে হয়তো সত্যের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
___________________________
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
শুধু বিভূ জেগে আছে।
টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলোয় তার মুখটা ক্লান্ত আর বয়স্ক দেখাচ্ছে।
সামনের টেবিলে ছড়িয়ে আছে গত কয়েক মাসের নোট, ছবি, সংবাদ কাটিং আর ফাইল।
একসময় এগুলো তাকে উত্তেজিত করত।
এখন এগুলো তাকে ভয় দেখায়।
সঞ্জয় পালের ফাইল থেকে পাওয়া পুরোনো ফোন নম্বরটার দিকে সে আবার তাকাল।
তারপর হঠাৎ একটা কাজ করল।
ড্রয়ারের ভেতর থেকে বহু বছরের পুরোনো একটা ডায়েরি বের করল।
চাকরি হারানোর পর অনেক কিছু ফেলে দিলেও এই ডায়েরিটা সে রেখে দিয়েছিল।
কেন রেখেছিল, সে নিজেও জানে না।
সম্ভবত স্মৃতির জন্য।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে হঠাৎ থেমে গেল।
একটা পুরোনো নোট।
বারো বছর আগের।
আর তার নিচে—
একটা ফোন নম্বর।
একই নম্বর।
একদম একই।
বিভূর হাত কেঁপে উঠল।
বুকের ভেতর ধকধক শুরু হয়ে গেল।
কারণ এখন সে মনে করতে পারছে।
অনেক বছর আগে, যখন সে সংবাদ প্রতিষ্ঠানে কাজ করত, তখন একবার একটা তথ্য যাচাই করতে তাকে সঞ্জয় পালের কোম্পানিতে পাঠানো হয়েছিল।
খুব ছোট একটা কাজ।
খুব সাধারণ।
এতটাই সাধারণ যে পরে সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।
কিন্তু আজ হঠাৎ সেই স্মৃতিটা ফিরে এল।
আর স্মৃতির সঙ্গে ফিরল আরও কিছু দৃশ্য।
একটা অফিস।
কয়েকজন উদ্বিগ্ন মানুষ।
তর্কাতর্কি।
আর একজন লোক—
সঞ্জয় পাল।
বিভূ চেয়ারে বসে রইল।
চোখের সামনে যেন অতীতের দৃশ্য ভেসে উঠছে।
সেই সময়ে সে বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি।
কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, সেদিন সে এমন কিছু শুনেছিল যা পরে আর কখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
হঠাৎ তার মাথায় আরেকটা চিন্তা এল।
যদি এই কারণেই তাকে বারবার বার্তা পাঠানো হয়ে থাকে?
যদি কেউ জানে যে সে অতীতে ওই ঘটনার কাছাকাছি ছিল?
ওদিকে একই সময়ে অরিজিৎ সেন থানায় বসে শেষ কয়েক সপ্তাহের সব তথ্য সাজাচ্ছিল।
দেয়ালে টাঙানো বোর্ডে একের পর এক ছবি।
নোট।
তারিখ।
লোকজনের নাম।
সবকিছু।
সে ধীরে ধীরে পেছনে সরে দাঁড়াল।
তারপর পুরো বোর্ডটার দিকে তাকাল।
একটা বিষয় এখন পরিষ্কার।
প্রথম ঘটনাটা দুর্ঘটনা ধরে নিলেও—
পরবর্তী ঘটনাগুলোকে কাকতালীয় বলা কঠিন।
খুব কঠিন।
আর সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়—
প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আশেপাশে কোনো না কোনোভাবে বিভূর উপস্থিতি রয়েছে।
কখনও সংবাদকর্মী হিসেবে।
কখনও প্রথম সাক্ষী হিসেবে।
কখনও এমন একজন হিসেবে, যে অস্বাভাবিক দ্রুত তথ্য পেয়ে যায়।
অরিজিৎ ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল।
তার মনে প্রথমবারের মতো একটা কঠিন সিদ্ধান্ত তৈরি হতে শুরু করেছে।
বিভূকে আর শুধু পর্যবেক্ষণ করলেই হবে না।
তার অতীতও খতিয়ে দেখতে হবে।
পুরোপুরি।
সেই রাতেই থানার ডাটাবেসে পুরোনো রেকর্ড খোঁজার অনুমতি চাইল সে।
আনুষ্ঠানিকভাবে।
এটা বড় পদক্ষেপ।
কারণ এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে একজন নির্দিষ্ট মানুষ চলে আসছে।
এদিকে বিভূর মাথায় একের পর এক স্মৃতি ফিরে আসছে।
সঞ্জয় পালের কোম্পানির সেই দিন।
অফিসের ভেতরের উত্তেজনা।
কিছু নথি নিয়ে তর্ক।
আর একটা বাক্য।
খুব অস্পষ্ট।
তবু সে যেন শুনতে পাচ্ছে।
"ওগুলো বাইরে গেলে অনেক মানুষ শেষ হয়ে যাবে।"
বিভূর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
এতদিন সে ভাবছিল সে নতুন একটা রহস্যের পেছনে ছুটছে।
কিন্তু যদি রহস্যটা নতুন না হয়?
যদি সে অজান্তেই নিজের অতীতের দিকেই ফিরে আসছে?
তারপর সে হঠাৎ বুঝতে পারল—
যে লোগোটা সে ছবিতে দেখেছে...
যে কোম্পানির নথি সে খুঁজছে...
যে মানুষগুলোর নাম বারবার সামনে আসছে...
এসবের কিছু অংশ সে আগে দেখেছে।
বহু বছর আগে।
কিন্তু ভুলে গিয়েছিল।
অথবা ভুলে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
রাত প্রায় বারোটা।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
আবার।
বিভূ কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কল রিসিভ করল।
ওপাশে কোনো কথা নেই।
শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।
"কে?"
নীরবতা।
"কী চান?"
কয়েক সেকেন্ড পর ওপাশ থেকে খুব শান্ত একটা গলা শোনা গেল।
প্রথমবার।
এতদিন শুধু মেসেজ এসেছে।
আজ কণ্ঠস্বর।
লোকটা বলল,
"তুমি অবশেষে মনে করতে শুরু করেছ।"
বিভূর শরীর জমে গেল।
"আপনি কে?"
ওপাশ থেকে উত্তর এল না।
বরং আরেকটা কথা শোনা গেল।
"সঞ্জয় পালের মতো ভুল কোরো না।"
তারপর লাইন কেটে গেল।
বিভূ অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
কোনো শব্দ নেই।
কোনো নড়াচড়া নেই।
শুধু একটাই অনুভূতি—
কিছু একটা খুব বড় সত্য তার দিকে এগিয়ে আসছে।
আর সে সেটা থামাতে পারবে না।
একই সময়ে থানায় বসে অরিজিৎ নিজের রিপোর্টের শেষ লাইনে লিখল—
"বিভূ বৈদ্য এখন আর শুধু একজন সাক্ষী নয়।"
কলম থামিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর নিচে আরেকটা লাইন যোগ করল।
"তিনি সম্ভবত এই পুরো রহস্যের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি।"
দেয়ালে টাঙানো বোর্ডের মাঝখানে বিভূর ছবিটা নীরবে ঝুলছিল।
আর বহু মাস ধরে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া সন্দেহ এখন প্রায় নিশ্চিত বিশ্বাসে পরিণত হতে শুরু করেছে।
একটা ফোনকল।
একটা কণ্ঠস্বর।
আর একটা বাক্য—
"তুমি অবশেষে মনে করতে শুরু করেছ।"
এতদিন বিভূ অন্যদের অতীত খুঁজছিল।
এবার অতীত তাকে খুঁজে বের করেছে।
ওদিকে অরিজিৎও প্রায় নিশ্চিত—
বিভূ বৈদ্য শুধু একজন সংবাদকর্মী নয়।
সে এই পুরো রহস্যের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও উত্তরহীন—
সঞ্জয় পাল আসলে কী জানত?
আর কেন এত বছর পর সেই সত্য আবার ফিরে আসছে?
___________________________
পরদিন সকাল।
বিভূর ঘুম ভাঙল মাথাব্যথা নিয়ে।
গত রাতের ফোনকলটা এখনও কানে বাজছে।
কণ্ঠস্বরটা খুব শান্ত ছিল।
কিন্তু সেই শান্ত স্বরের মধ্যেই এমন কিছু ছিল, যা তাকে অস্বস্তিতে ভরিয়ে দিয়েছে।
সে বিছানায় বসে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারল—
সে ভয় পাচ্ছে।
অনেকদিন পর সত্যিকারের ভয়।
খুনের পরও সে এতটা ভয় পায়নি।
তদন্ত শুরু হওয়ার পরও না।
অরিজিৎ সেন সন্দেহ করছে জেনেও না।
কিন্তু এই ফোনকল...
এটা আলাদা।
কারণ এই মানুষটা এমন কিছু জানে, যা অন্য কেউ জানে না।
নিচে নাস্তার টেবিলে মিতালী অপেক্ষা করছিল।
রিয়া স্কুলের ব্যাগ গুছাচ্ছে।
ঋত্বিক চুপচাপ বসে মোবাইলে কিছু দেখছে।
একটা সাধারণ সকাল।
একটা সাধারণ পরিবার।
বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝবে না, এই পরিবারের একজন মানুষ কয়েকটা মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত।
বিভূ হঠাৎ করে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল।
একটু বেশি সময় ধরে।
মিতালী অবাক হয়ে বলল,
"কী হলো?"
"কিছু না।"
কিন্তু আসলে কিছু একটা হয়েছিল।
অনেকদিন পর প্রথমবার তার মনে হলো—
যদি সব শেষ হয়ে যায়?
যদি সত্যিটা বেরিয়ে আসে?
তাহলে এদের কী হবে?
এই প্রশ্নটা এতদিন সে এড়িয়ে গেছে।
নিজেকে বোঝিয়েছে—
সে পরিবারের জন্যই সব করছে।
সংসার বাঁচানোর জন্য।
সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য।
কিন্তু আজ সেই যুক্তিগুলো দুর্বল শোনাচ্ছে।
ওদিকে থানায় অরিজিৎ সেন সকাল থেকেই ব্যস্ত।
গত রাতে অনুমোদন পাওয়ার পর সে বিভূর অতীত নিয়ে খোঁজ শুরু করেছে।
পুরোনো চাকরি।
পুরোনো যোগাযোগ।
পুরোনো সংবাদ সূত্র।
সব।
প্রথম কয়েক ঘণ্টায় বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না।
তারপর একটা পুরোনো ই-মেইল রেকর্ড সামনে এল।
বারো বছর আগের।
খুব সাধারণ।
তবু একটা নাম আবার সামনে চলে এল।
সঞ্জয় পাল
অরিজিৎ নথিটা পড়তে শুরু করল।
আর যত পড়ল, ততই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
কারণ সেখানে দেখা যাচ্ছে—
বিভূ একবার নয়, একাধিকবার সঞ্জয় পালের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।
সরকারি তদন্তের অংশ হিসেবে নয়।
সংবাদ সংগ্রহের কাজেও নয়।
অন্য কোনো কারণে।
সেটা কী কারণ?
রেকর্ডে স্পষ্ট নয়।
কিন্তু এতটুকু পরিষ্কার—
Part 9-এ যে সম্ভাবনার কথা উঠেছিল, সেটা এখন আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
বিভূ এবং সঞ্জয় পালের পরিচয় ছিল।
এবং সেটা বিভূর দাবি করার চেয়ে অনেক গভীর।
দুপুর নাগাদ বিভূ নিজের অফিসঘরে বসেছিল।
টেবিলে রাখা ছিল সেই পুরোনো ডায়েরি।
সে বারবার চেষ্টা করছে আরও কিছু মনে করার।
কিন্তু স্মৃতিগুলো যেন ভাঙা আয়নার টুকরোর মতো।
সব আছে।
তবু পুরো ছবি দেখা যাচ্ছে না।
হঠাৎ তার চোখ একটা নামের উপর থেমে গেল।
একটা পুরোনো নোট।
বারো বছর আগের।
একটা মিটিংয়ের উল্লেখ।
আর তার পাশে লেখা—
"রবিন"
নামটা দেখেই তার মাথার ভেতর কিছু একটা ঝলসে উঠল।
রবিন।
হ্যাঁ।
এমন একজন ছিল।
সঞ্জয় পালের অফিসে কাজ করত।
খুব সাধারণ কর্মচারী।
কম কথা বলত।
সবসময় নথিপত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকত।
বিভূ দ্রুত ডায়েরির পাতা উল্টাতে লাগল।
আরও কিছু পাওয়া যায় কি না।
তারপর হঠাৎ সে থেমে গেল।
কারণ একটা পাতায় বড় করে লেখা—
"রবিন বলছে নথিগুলো নিরাপদ নয়।"
বিভূর বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
এতদিন পরে সে প্রথমবার এমন একটা সূত্র পেল, যা সরাসরি অতীতের সঙ্গে যুক্ত।
আর ঠিক তখনই তার ফোনে নতুন একটা মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
আগের মতোই।
মেসেজে লেখা—
"রবিনকে খুঁজে বের করো।"
বিভূর শরীর কেঁপে উঠল।
কারণ এই নামটা সে মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে মনে করেছে।
এটা কেউ জানল কীভাবে?
তার মাথায় একটা ভয়ঙ্কর সম্ভাবনা এল।
যদি কেউ তাকে নজরদারি করে?
যদি বহুদিন ধরে করে?
ওদিকে অরিজিৎ সেনও ঠিক সেই সময়ে আরেকটা তথ্য পেয়েছে।
সঞ্জয় পালের প্রতিষ্ঠানের পুরোনো কর্মচারীদের তালিকা।
তালিকায় একটা নাম ঘিরে লাল দাগ টেনে দিল সে।
রবিন সরকার
কারণ আশ্চর্যজনকভাবে—
সঞ্জয় পালের মৃত্যুর কিছুদিন পর থেকেই লোকটা নিখোঁজ।
কোনো সরকারি রেকর্ড নেই।
কোনো নতুন চাকরির তথ্য নেই।
কিছুই নেই।
যেন মানুষটা হঠাৎ পৃথিবী থেকে মুছে গেছে।
অরিজিৎ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল।
তার অভিজ্ঞতা বলছে—
এটা সাধারণ ঘটনা নয়।
একই সময়ে শহরের দুই প্রান্তে দুই মানুষ একই নামের দিকে তাকিয়ে আছে।
একজন বিভূ বৈদ্য।
অন্যজন অরিজিৎ সেন।
দুজনেই এখনও জানে না—
রবিন সরকারই সেই মানুষ, যে গত বারো বছর ধরে বেঁচে আছে একটা গোপন সত্য নিয়ে।
আর সেই সত্য প্রকাশ পেলে—
শুধু সঞ্জয় পালের রহস্য নয়,
বিভূর জীবনের সব মুখোশও ভেঙে পড়বে।
____________________________________________
সেদিন রাতটা বিভূর কাছে অস্বাভাবিক দীর্ঘ মনে হলো।
বারবার সে একই নামটা ভাবছিল।
রবিন সরকার।
বারো বছর আগে সঞ্জয় পালের অফিসে কাজ করত।
আর আজ, এতদিন পরে, অচেনা কেউ তাকে সেই নামটাই খুঁজে বের করতে বলছে।
বিছানায় শুয়েও ঘুম এল না।
মিতালী পাশেই ঘুমিয়ে।
রিয়া আর ঋত্বিক নিজেদের ঘরে।
পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ।
কিন্তু বিভূর মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
রাত তিনটার দিকে সে উঠে পড়ল।
চুপচাপ নিজের ঘরে গিয়ে পুরোনো ডায়েরি খুলল।
রবিন সম্পর্কে আর কিছু লেখা আছে কি না দেখতে লাগল।
অধিকাংশ পাতাই সাধারণ নোট।
কিন্তু কয়েকটা জায়গায় একই নাম বারবার এসেছে।
"রবিন উদ্বিগ্ন।"
"রবিন দেখা করতে চায়।"
"রবিন বলল নথিগুলো কপি করা হয়েছে।"
শেষ লাইনটা পড়ে বিভূর বুক কেঁপে উঠল।
"নথিগুলো কপি করা হয়েছে।"
মানে—
মূল নথি হারিয়ে গেলেও কোথাও একটা কপি ছিল।
অথবা এখনও আছে।
হঠাৎ করেই সঞ্জয় পালের রহস্যটা অনেক বেশি স্পষ্ট মনে হতে শুরু করল।
সম্ভবত সেই নথিগুলোই পুরো ঘটনার কেন্দ্র।
যে নথির জন্য মানুষ ভয় পেয়েছিল।
যে নথির জন্য কেউ মারা গেছে।
আর যে নথির জন্য এখনও কেউ ছায়ার আড়াল থেকে নজর রাখছে।
পরদিন সকাল।
অরিজিৎ সেন থানায় পৌঁছেই রবিন সরকারের ফাইল খুঁজতে শুরু করল।
কিন্তু ফল আশানুরূপ হলো না।
সরকারি রেকর্ডে লোকটা যেন হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে।
শেষ ভোটার তালিকায় নাম আছে।
তারপর নেই।
শেষ ব্যাংক লেনদেনের রেকর্ড আছে।
তারপর নেই।
শেষ মোবাইল নম্বর সক্রিয় ছিল।
তারপর বন্ধ।
অরিজিৎ ধীরে ধীরে বুঝতে পারল—
এটা সাধারণ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়।
কেউ ইচ্ছে করে নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলেছে।
অথবা মুছে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।
বিকেলের দিকে এক পুরোনো সূত্রের সঙ্গে দেখা করল সে।
অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশকর্মী।
সঞ্জয় পালের সময়কার ঘটনাগুলো সম্পর্কে কিছুটা জানে।
কথার এক পর্যায়ে অরিজিৎ জিজ্ঞেস করল,
"রবিন সরকার নামটা মনে আছে?"
লোকটা চুপ হয়ে গেল।
একেবারে চুপ।
কয়েক সেকেন্ড পরে ধীরে বলল,
"অনেক বছর এই নামটা শুনিনি।"
"লোকটা কোথায় গেছে?"
বৃদ্ধ মানুষটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"যদি জানতাম, হয়তো আজও বেঁচে থাকতাম না।"
অরিজিৎ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
উত্তরটা অদ্ভুত।
খুব অদ্ভুত।
"মানে?"
লোকটা মাথা নাড়ল।
"কিছু বিষয় ভুলে যাওয়াই ভালো।"
ওদিকে বিভূও থেমে থাকেনি।
নিজের পুরোনো পরিচিতদের ফোন করতে শুরু করেছে।
সংবাদজগতের লোকজন।
পুরোনো কর্মচারী।
ব্যবসায়ী।
যে কেউ রবিনকে চিনে থাকতে পারে।
প্রথম কয়েকটা ফোনে কোনো লাভ হলো না।
কেউ নামটা মনে করতে পারল না।
কেউ আবার মনে করতে চাইল না।
কিন্তু সন্ধ্যার দিকে একটা ফোনকল তার পুরো মনোযোগ কেড়ে নিল।
একজন বৃদ্ধ হিসাবরক্ষক।
একসময় সঞ্জয় পালের কোম্পানিতে কাজ করত।
লোকটা দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"রবিন খুব ভয় পেয়েছিল।"
"কেন?"
"কারণ সে কিছু দেখেছিল।"
বিভূর বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
"কী দেখেছিল?"
ওপাশে নীরবতা।
তারপর উত্তর এল,
"আমি জানি না।"
একটু থেমে আবার বলল,
"কিন্তু যেদিন শেষবার ওকে দেখেছিলাম, সেদিন ও বলেছিল—"
বিভূ প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।
লোকটা ধীরে ধীরে বলল,
"যদি আমার কিছু হয়, তাহলে সত্যিটা একদিন বের হবেই।"
কল কেটে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল বিভূ।
কারণ এই কথাটা কোনো সাধারণ ভয়ের কথা নয়।
এটা এমন একজন মানুষের কথা, যে জানত তার জীবন বিপদে।
সেই রাতেই অরিজিৎ আরেকটা তথ্য পেল।
পুরোনো সম্পত্তির রেকর্ড।
একটা ছোট্ট গ্রামের বাড়ি।
শহর থেকে অনেক দূরে।
মালিকের নাম—
রবিন সরকার
অরিজিৎর চোখ জ্বলে উঠল।
কারণ বহুদিন পরে প্রথম বাস্তব ঠিকানা পাওয়া গেছে।
হয়তো পুরোনো।
হয়তো আর কেউ থাকে না।
তবু এটা একটা সূত্র।
একই সময়ে বিভূর ফোনে আবার মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
এবার মাত্র একটি লাইন।
"দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
বিভূর বুকের ভেতর অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল।
কারণ সে অনুভব করছে—
সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
আর শহরের অন্য প্রান্তে অরিজিৎ সেন নিজের টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল।
আগামীকাল সে সেই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।
সে জানে না কী পাবে।
কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত—
রবিন সরকারকে খুঁজে পাওয়া গেলে, বারো বছরের পুরোনো অন্ধকারের দরজা খুলে যাবে।
আর সেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে—
সঞ্জয় পালের সত্য,
নির্মল সাহার সত্য,
এবং বিভূ বৈদ্যর সত্য।
_____________________________
পরদিন ভোর।
আকাশ তখনও পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি।
হালকা কুয়াশা রাস্তার ওপর ঝুলে আছে।
অরিজিৎ সেন থানার জিপে বসে শহর ছাড়ছিল।
গন্তব্য—
রবিন সরকারের পুরোনো গ্রামের বাড়ি।
একই সময়ে শহরের অন্য প্রান্তে বিভূও বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।
গত রাতের মেসেজটা তার মাথা থেকে যাচ্ছে না।
"দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
মাত্র তিনটা শব্দ।
কিন্তু এই তিনটা শব্দই যেন তাকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে।
সে জানে না অরিজিৎও একই গন্তব্যে যাচ্ছে।
আর অরিজিৎও জানে না বিভূ ইতিমধ্যে পথে।
কিন্তু ভাগ্য যেন ধীরে ধীরে দুজনকে একই জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।
দুই ঘণ্টার যাত্রার পর বিভূ গ্রামটায় পৌঁছাল।
শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে।
ছোট রাস্তা।
ধানক্ষেত।
পুরোনো কাঁচা বাড়ি।
সময় যেন এখানে ধীরে চলে।
ঠিকানাটা খুঁজে পেতে খুব বেশি কষ্ট হলো না।
গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা একতলা বাড়ি।
দেয়ালের রং উঠে গেছে।
ছাদের টিনে মরিচা।
বাড়িটা দেখে মনে হচ্ছে বহু বছর কেউ থাকেনি।
বিভূ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোল।
কড়া নাড়ল।
কোনো উত্তর নেই।
আবার নাড়ল।
নীরবতা।
ঠিক তখনই পাশের বাড়ি থেকে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এল।
লোকটা বিভূকে কিছুক্ষণ দেখে বলল,
"কাকে খুঁজছেন?"
"রবিন সরকার।"
নামটা শুনতেই বৃদ্ধের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
"অনেকদিন এই নাম শুনিনি।"
"উনি এখানে থাকেন?"
বৃদ্ধ একটু দ্বিধা করল।
তারপর বলল,
"থাকতেন।"
বিভূর বুক ধক করে উঠল।
"এখন কোথায়?"
বৃদ্ধ সরাসরি উত্তর দিল না।
বরং জিজ্ঞেস করল,
"আপনি কে?"
"পুরোনো পরিচিত।"
মিথ্যাটা সহজে বেরিয়ে এল।
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
"পেছনের উঠোনে যান।"
বিভূ বাড়ির পেছনে গেল।
আর সেখানে গিয়ে থেমে গেল।
একটা ছোট্ট সমাধিফলক।
মাটির কাছে।
খুব সাধারণ।
খুব নিঃশব্দ।
পাথরের ওপর লেখা—
রবিন সরকার
মৃত্যুর সাল—
দশ বছর আগে।
বিভূর বুকের ভেতর হঠাৎ শূন্যতা তৈরি হলো।
সে দেরি করে ফেলেছে।
অনেক দেরি।
ঠিক তখনই পেছন থেকে গাড়ির শব্দ এল।
অরিজিৎ সেন পৌঁছে গেছে।
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।
কেউ কিছু বলল না।
কিন্তু দুজনেই বুঝল—
তারা একই মানুষকে খুঁজতে এসেছে।
অরিজিৎ ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
"আপনি এখানে?"
বিভূ উত্তর দেওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল।
"একটা পুরোনো সূত্র খুঁজছিলাম।"
অরিজিৎ কিছু বলল না।
তার চোখ সমাধিফলকের দিকে।
তারপর বিভূর দিকে।
দুজনের মাঝখানে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল।
ঠিক তখনই বৃদ্ধ লোকটা আবার বাইরে এল।
তার হাতে একটা পুরোনো টিনের বাক্স।
"মরার আগে রবিন এটা রেখে গিয়েছিল।"
লোকটা বলল।
"কাদের জন্য?"
অরিজিৎ জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধ ধীরে উত্তর দিল,
"বলেছিল, যদি কোনোদিন কেউ সঞ্জয় পালের খোঁজ করতে আসে, তাহলে এটা দিয়ে দিতে।"
বিভূ আর অরিজিৎ দুজনেই স্থির হয়ে গেল।
বৃদ্ধ বাক্সটা তাদের হাতে তুলে দিল।
ধুলো জমে আছে।
তালা নেই।
অরিজিৎ ধীরে ধীরে ঢাকনা খুলল।
ভেতরে কয়েকটা পুরোনো ফাইল।
একটা ডায়েরি।
আর একটা খাম।
খামের ওপর কাঁপা হাতে লেখা—
"যদি তুমি এটা পড়ো, তাহলে বুঝবে আমি আর বেঁচে নেই।"
চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
অরিজিৎ খামটা খুলল।
ভেতরে কয়েক পাতার চিঠি।
রবিনের লেখা।
প্রথম লাইন পড়তেই দুজনেই থমকে গেল।
"সঞ্জয় পাল মারা যায়নি দুর্ঘটনায়।"
বিভূর বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল।
অরিজিৎ পড়তে থাকল।
"ওকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কারণ ও কিছু নথি খুঁজে পেয়েছিল।"
আরও নিচে—
"আমি সেই নথিগুলোর কপি লুকিয়ে রেখেছিলাম।"
বিভূর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।
চিঠির শেষ অংশে এসে অরিজিৎর গলা শুকিয়ে গেল।
কারণ সেখানে লেখা—
"যদি সত্যিটা বের করতে চাও, তাহলে পুরোনো নদীর ধারের গুদামঘরে যাও। সব উত্তর সেখানে আছে।"
আর একদম নিচে—
একটা নাম।
যেটা দেখে বিভূর মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
কারণ রবিন লিখেছে—
"বিভূ, তুমি যদি এটা পড়ো, তাহলে বুঝবে তুমি একসময় সবকিছুর খুব কাছাকাছি ছিলে। হয়তো তোমারও মনে নেই। কিন্তু সত্যিটা তোমার ধারণার চেয়েও ভয়ংকর।"
অরিজিৎ ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখ এবার সরাসরি বিভূর দিকে।
প্রথমবার।
একেবারে সরাসরি।
আর সেই দৃষ্টিতে স্পষ্ট ছিল—
সন্দেহ।
প্রশ্ন।
আর একটা কঠিন উপলব্ধি।
খেলার শেষ পর্ব শুরু হয়ে গেছে।
___________________________
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে।
আকাশে কালো মেঘ জমেছে।
দূরে কোথাও বজ্রপাতের আলো দেখা যাচ্ছে।
আর সেই সময়ে একটা গাড়ি আর একটা বাইক নদীর ধারের পুরোনো রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে।
গন্তব্য—
পুরোনো গুদামঘর।
গাড়িতে অরিজিৎ।
বাইকে বিভূ।
দুজনেই জানে, এই জায়গাতেই হয়তো এতদিনের উত্তর লুকিয়ে আছে।
কিন্তু দুজনের উদ্দেশ্য আলাদা।
অরিজিৎ সত্য খুঁজতে এসেছে।
বিভূ এসেছে সত্যকে বোঝার জন্য।
নদীর পাড়ে পৌঁছাতেই তারা গুদামঘরটা দেখতে পেল।
ছবির সেই গুদামঘর।
বহু বছর আগের।
এখন আরও জীর্ণ।
আরও নিঃসঙ্গ।
বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে।
হালকা।
টুপটাপ।
টিনের ছাদে শব্দ হচ্ছে।
দুজন একসঙ্গে ভেতরে ঢুকল।
ভাঙা কাঠ।
ধুলো।
জাল।
বহুদিনের পরিত্যক্ত পরিবেশ।
রবিনের চিঠিতে একটা নির্দিষ্ট ঘরের কথা লেখা ছিল।
পশ্চিম দিকের স্টোররুম।
তারা সেদিকেই এগোল।
ঘরটা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল না।
কিন্তু দরজাটা আটকে গিয়েছিল।
অরিজিৎ ধাক্কা দিতেই খুলে গেল।
ধুলোর মেঘ উড়ে উঠল।
ভেতরে একটা পুরোনো লোহার আলমারি।
আর কিছু নেই।
বিভূর বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়তে লাগল।
কারণ সে অনুভব করছে—
এই আলমারির ভেতরেই উত্তর আছে।
অরিজিৎ আলমারিটা খুলল।
ভেতরে কয়েকটা ফাইল।
একটা পেনড্রাইভ।
আর একটা মোটা খাম।
খামের ওপর লেখা—
"যদি কেউ এখানে পৌঁছায়, তাহলে সত্য লুকিয়ে রাখার আর কোনো অর্থ নেই।"
অরিজিৎ খামটা খুলল।
আর প্রথম কয়েকটা পাতা পড়তেই ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
সঞ্জয় পালের কোম্পানি বহু বছর আগে কিছু অবৈধ আর্থিক লেনদেনের তথ্য খুঁজে পেয়েছিল।
বড় ব্যবসায়ী।
স্থানীয় প্রভাবশালী মানুষ।
কয়েকজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা।
সবাই জড়িত ছিল।
সঞ্জয় সেই তথ্য প্রকাশ করতে চেয়েছিল।
কিন্তু তার আগেই তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়।
সরকারি রিপোর্টে দুর্ঘটনা লেখা হয়।
কিন্তু বাস্তবে সেটা দুর্ঘটনা ছিল না।
অরিজিৎ ধীরে ধীরে পাতা উল্টাচ্ছিল।
বিভূ পাশে দাঁড়িয়ে পড়ছিল।
তারপর একটা জায়গায় এসে বিভূর বুকের ভেতর ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
কারণ সেখানে তার নিজের নাম লেখা।
বিভূ বৈদ্য
অরিজিৎ থেমে গেল।
চোখ সরু হয়ে এল।
নথিতে লেখা—
বারো বছর আগে সংবাদ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় বিভূ এমন কিছু তথ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, যেগুলো পরে হারিয়ে যায়।
তবে সেখানে আরও লেখা ছিল—
"বিভূ সম্ভবত পুরো বিষয়টা জানত না।"
অরিজিৎ কিছুটা স্বস্তি পেল।
কারণ এটা অন্তত প্রমাণ করছে না যে বিভূ সেই পুরোনো ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল।
কিন্তু পরের পাতাগুলো অন্য গল্প বলছিল।
বর্তমানের গল্প।
রবিন বহু বছর ধরে দূর থেকে খবর অনুসরণ করছিল।
সঞ্জয় পালের ঘটনার পর সে আত্মগোপনে চলে যায়।
কিন্তু সংবাদ আর স্থানীয় ঘটনাগুলো সে নজরে রাখত।
আর তার নোটে একটা পর্যবেক্ষণ লেখা ছিল—
"যে মানুষটা একসময় সত্যের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, সে আজ নিজেই অন্ধকারের অংশ হয়ে গেছে।"
অরিজিৎ ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখ এবার সরাসরি বিভূর দিকে।
কারণ নোটের পরের অংশে সাম্প্রতিক কয়েকটা ঘটনার উল্লেখ ছিল।
তারিখ।
স্থান।
সময়।
সব।
আর আশ্চর্যজনকভাবে সেগুলো অরিজিৎর তদন্তের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
একেবারে মিলে যাচ্ছে।
বিভূর বুকের ভেতর ধকধক শুরু হলো।
সে বুঝতে পারছে—
এবার আর সন্দেহের জায়গা খুব বেশি নেই।
ঠিক তখনই অরিজিৎ পেনড্রাইভটা ল্যাপটপে লাগাল।
রবিন কিছু ভিডিও রেকর্ড করে রেখেছিল।
প্রথম ভিডিওতে রবিন নিজে।
বয়স্ক।
ক্লান্ত।
ভীত।
সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল,
"যদি এই ভিডিও কেউ দেখে, তাহলে আমি হয়তো আর বেঁচে নেই।"
ভিডিও এগোতে লাগল।
আর হঠাৎ এক জায়গায় এসে রবিন এমন একটা কথা বলল, যা ঘরের বাতাস ভারী করে দিল।
"আমি সঞ্জয় পালের খুনিদের নাম জানি না। কিন্তু আমি নিশ্চিত, সাম্প্রতিক মৃত্যুগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়।"
আরও নিচে—
"যে ব্যক্তি সবার আগে খবর পায়, তাকে নজরে রাখো।"
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল।
শুধু বাইরে বৃষ্টির শব্দ।
অরিজিৎ কিছু বলল না।
প্রয়োজনও ছিল না।
কারণ দুজনেই জানে, রবিন কাকে ইঙ্গিত করছে।
বিভূ ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল।
প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
পালানোর পথ সত্যিই শেষ হয়ে আসছে।
বাইরে বজ্রপাত হলো।
আলো এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা আলোকিত করল।
আর সেই আলোয় অরিজিৎ বুঝতে পারল—
তার হাতে এখন এমন কিছু তথ্য এসেছে, যা তদন্তকে শেষ ধাপে নিয়ে যাবে।
আর বিভূ বুঝতে পারল—
এতদিন সে খবর তৈরি করছিল।
এবার সে নিজেই খবর হয়ে উঠতে চলেছে।
_____________________________
বৃষ্টি তখন আরও জোরে পড়ছে।
নদীর ধারের গুদামঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বিভূর মনে হচ্ছিল, যেন তার জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও ভেঙে পড়েছে।
অরিজিৎ কিছু বলেনি।
কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি সব বলে দিয়েছে।
তদন্ত শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
সেই রাতেই থানায় জরুরি বৈঠক ডাকা হলো।
রবিনের নথি।
ভিডিও।
পুরোনো রেকর্ড।
সাম্প্রতিক তদন্ত।
সব একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হলো।
সঞ্জয় পালের খুনিদের পরিচয় পুরোপুরি জানা যায়নি।
বহু বছর কেটে গেছে।
অনেক প্রমাণ হারিয়ে গেছে।
অনেক মানুষ মারা গেছে।
কিন্তু বর্তমানের ঘটনাগুলো নিয়ে চিত্রটা অনেক পরিষ্কার।
অরিজিৎর সামনে সাজানো ছিল বিভূর বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্যগুলো।
প্রতিটি ঘটনার আগে ও পরে তার অবস্থান।
কিছু ডিজিটাল রেকর্ড।
কিছু সাক্ষ্য।
কিছু অসঙ্গতি।
একটা তথ্য একা যথেষ্ট নয়।
কিন্তু সবগুলো একসঙ্গে একটা গল্প বলছে।
একটা ভয়ংকর গল্প।
রাত তিনটার দিকে অরিজিৎ শেষ রিপোর্টে সই করল।
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কোনো আনন্দ নেই।
কোনো বিজয়ের অনুভূতি নেই।
শুধু ক্লান্তি।
কারণ সে জানে—
যাকে গ্রেপ্তার করতে যাচ্ছে, সে কোনো পেশাদার অপরাধী নয়।
সে একজন ভেঙে পড়া মানুষ।
যে ভুল পথ বেছে নিয়েছিল।
পরদিন সকাল।
বিভূ খুব ভোরে উঠে পড়ল।
ঘুম আসেনি।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল।
চোখের নিচে কালো দাগ।
মুখে ক্লান্তি।
চুলে পাক।
হঠাৎ মনে পড়ল—
কোভিডের পর চাকরি হারানোর দিনটা।
সেদিনও সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল।
সেদিনও ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হয়েছিল।
কিন্তু একটা পার্থক্য আছে।
সেদিন সে নির্দোষ ছিল।
আজ নয়।
নিচে নাস্তার টেবিলে মিতালী বসে ছিল।
রিয়া স্কুলের জন্য তৈরি হচ্ছে।
ঋত্বিক বই গুছাচ্ছে।
বিভূ অনেকক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ বলল,
"তোদের একটা কথা বলার ছিল।"
তিনজনই অবাক হয়ে তাকাল।
কিন্তু ঠিক তখনই দরজার কলিংবেল বেজে উঠল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
মিতালী দরজার দিকে এগোতে যাচ্ছিল।
বিভূ বলল,
"আমি খুলছি।"
ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল সে।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত শান্তি।
কারণ সে জানে।
দরজার ওপাশে কে দাঁড়িয়ে আছে।
দরজা খুলতেই কয়েকজন পুলিশ অফিসারকে দেখা গেল।
সামনে অরিজিৎ সেন।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর অরিজিৎ খুব শান্ত গলায় বলল,
"বিভূ বৈদ্য, আমাদের সঙ্গে আপনাকে থানায় যেতে হবে।"
পেছন থেকে মিতালীর কণ্ঠ ভেসে এল।
"কী হয়েছে?"
কেউ উত্তর দিল না।
ঋত্বিক দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
রিয়াও।
বিভূ তাদের দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।
এই মুহূর্তটার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।
কেউই ছিল না।
মিতালী কাঁপা গলায় বলল,
"বিভূ... কী হচ্ছে?"
বহু বছর ধরে জমে থাকা মিথ্যার পাহাড়টা যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল।
বিভূ প্রথমবারের মতো চোখ তুলে স্ত্রীর দিকে তাকাল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
"আমি দুঃখিত।"
মিতালী কিছু বুঝতে পারছিল না।
কিন্তু সেই তিনটা শব্দ শুনেই তার মুখের রঙ বদলে গেল।
বাইরে প্রতিবেশীরা জড়ো হতে শুরু করেছে।
ফিসফিসানি।
কৌতূহল।
মোবাইল ফোন।
সব শুরু হয়ে গেছে।
বিভূকে পুলিশ গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হলো।
কেউ তাকে ধাক্কা দিল না।
হাতকড়াও পরানো হলো না।
কারণ সে কোনো প্রতিরোধ করেনি।
গাড়িতে উঠে বসার আগে সে একবার বাড়িটার দিকে তাকাল।
যে বাড়ির জন্য সে সবকিছু করেছিল বলে নিজেকে বোঝাত।
যে পরিবারের জন্য সে নিজের পতনকে ন্যায্য মনে করেছিল।
আজ সেই পরিবারই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
শহরের রাস্তাগুলো পেছনে সরে যাচ্ছে।
বৃষ্টির ফোঁটা জানালায় আছড়ে পড়ছে।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটা notification এল।
ফোনটা পুলিশ জব্দ করার আগে শেষবারের মতো স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
Notification এসেছে—
"সিটি লাইভ ২৪"
তার নিজের নিউজ পেজ।
বিভূ ধীরে ধীরে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
আর সেখানে লেখা—
🚨 BREAKING NEWS
"জনপ্রিয় স্থানীয় সংবাদকর্মী বিভূ বৈদ্য গ্রেপ্তার। একাধিক রহস্যজনক ঘটনার তদন্তে বড় অগ্রগতি। বিস্তারিত আসছে..."
কয়েক সেকেন্ড সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
নিঃশব্দে।
তারপর খুব ধীরে ফোনটা বন্ধ করে দিল।
জীবনের এতগুলো বছর সে অন্যদের খবর লিখেছে।
অন্যদের গল্প বলেছে।
অন্যদের পতন নিয়ে শিরোনাম বানিয়েছে।
আজ প্রথমবার—
খবরটা তার নিজের।
আর প্রথমবারের মতো—
সেই খবরটা সে নিজে কভার করতে পারবে না।
THE END
📢 পাঠকদের উদ্দেশ্যে
গল্পটি পড়ে আপনার কেমন লাগল, তা অবশ্যই নিচের কমেন্ট বক্সে জানাবেন। আপনার মতামত, পরামর্শ এবং সমালোচনা আমাদের আরও ভালো গল্প উপহার দিতে অনুপ্রাণিত করে। গল্পটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন, যাতে আরও বাংলা গল্পপ্রেমীরা এটি পড়ার সুযোগ পান। আপনার একটি শেয়ার এবং একটি মন্তব্য আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। ❤️
Tanmoy Roy
Bengali Author • Storyteller • Founder & Lead Author of CHOLO GOLPO SUNI
Tanmoy Roy is a Bengali author, storyteller, and founder of CHOLO GOLPO SUNI. He writes original Bengali fiction across mystery, thriller, horror, adventure and emotional drama. His stories focus on suspense, realism, emotion and memorable characters, creating immersive reading experiences for Bengali readers worldwide.
Mystery • Thriller • Horror • Adventure • Emotional Drama • Bengali Fiction
© Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI | Bengali Mystery, Thriller, Horror & Original Fiction

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন