বেণী খোলার নিষেধ ছিল | beni kholar nisedh chhilo | A horror ghost possessing story of a little girl that is inspired by true events | Story by Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI




প্রতিটি গ্রামেরই কিছু গল্প থাকে।
কিছু গল্প লোকমুখে ঘুরে বেড়ায় বছরের পর বছর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেগুলো শুনে বড় হয়। কেউ বিশ্বাস করে, কেউ করে না। কিন্তু এমন কিছু গল্প আছে, যেগুলোর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও সেগুলোর ভয় মানুষকে আজীবন তাড়া করে বেড়ায়।

এটাও তেমনই একটি গল্প।

একটি অমাবস্যার রাতের গল্প।

একটি পুরোনো কালীমন্দিরের গল্প।

আর একটি ছোট্ট মেয়ের গল্প, যে একদিন অজান্তেই এমন একটি নিষেধ ভেঙেছিল, যার ফল ভোগ করতে হয়েছিল পুরো পরিবারকে।

.........

আজ থেকে প্রায় বারো বছর আগের কথা।

অর্ণব তখন বি.কম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে সবে। দীর্ঘ কয়েক মাসের মানসিক চাপের পর অবশেষে একটু স্বস্তির সময় পেয়েছিল সে।

সেদিন দুপুরে খাওয়ার টেবিলে বসে পরিবারের সবাই গল্প করছিল।

হঠাৎ অর্ণবের মা বললেন,

— অনেকদিন তো গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয়নি। ভাবছি কয়েকদিনের জন্য ঘুরে আসা যাক।

অর্ণবের বাবা সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি জানালেন।

— সেটাই ভালো হবে। বাবা-মাও অনেকদিন ধরে ডাকছে।

কথাটা শুনে অর্ণবের বড় বোন মিতা হাসিমুখে বলল,

— তাহলে আমরাও যাব।

তার পাশেই বসে ছিল পাঁচ বছরের মেয়ে মিষ্টি।

মুহূর্তের মধ্যে সে চিৎকার করে উঠল,

— আমি গ্রামে যাব! আমি গরু দেখব! আমি পুকুরে মাছ দেখব!

তার উৎসাহ দেখে সবাই হেসে ফেলল।

মিষ্টির জন্ম শহরে। গ্রামের জীবন সম্পর্কে তার ধারণা ছিল শুধুই গল্পের বই আর টেলিভিশন থেকে পাওয়া।

তাই গ্রামের বাড়ি যাওয়ার খবরটা তার কাছে যেন একটা নতুন অভিযানের আমন্ত্রণ।

.........

দুই দিন পর তারা রওনা দিল।

সকালের ট্রেনে।

অর্ণব, তার বাবা-মা, বড় বোন মিতা আর ছোট্ট মিষ্টি।

দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা শুরু হতেই মিষ্টির প্রশ্নও শুরু হয়ে গেল।

— মামা, গ্রামের আকাশ কি বড় হয়?

— না।

— তাহলে সবাই কেন বলে?

— কারণ গ্রামে অনেক খোলা জায়গা থাকে।

— ও।

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে আবার প্রশ্ন করল,

— মামা, ভূত কি সত্যি আছে?

অর্ণব হেসে ফেলল।

— না।

— তাহলে সিনেমায় আসে কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অর্ণব নিজেই আটকে গেল।

পুরো কামরা হেসে উঠল।

.........

সময় যত গড়াতে লাগল, ট্রেন ততই শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে এগোতে থাকল।

জানালার বাইরে ধানক্ষেত, নদী, ছোট ছোট গ্রাম আর বিস্তীর্ণ সবুজ জমি দেখতে দেখতে দুপুর কেটে বিকেল হয়ে গেল।

সন্ধ্যার পর আকাশ ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যেতে শুরু করল।

কিন্তু কেন জানি না, সেই সময় থেকেই অর্ণবের মনে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করতে শুরু করল।

কারণটা সে নিজেও বুঝতে পারছিল না।

মাঝে মাঝে এমন হয়।

কোনো কারণ ছাড়াই মনে হয় যেন সামনে কিছু একটা অপেক্ষা করছে।

অদ্ভুত কিছু।

অস্বাভাবিক কিছু।

.........

রাত প্রায় এগারোটার সময় তারা গ্রামের স্টেশনে পৌঁছাল।

ছোট্ট একটা স্টেশন।

ম্লান আলো।

নির্জন প্ল্যাটফর্ম।

ট্রেনটা চলে যেতেই চারপাশ যেন হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

শহরের মানুষ এমন নীরবতার সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নয়।

দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছিল।

মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছিল কুকুরের চিৎকার।

বাতাসে ছিল স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে অর্ণব একবার আকাশের দিকে তাকাল।

চাঁদ দেখা যাচ্ছে না।

আকাশটা কেমন যেন অস্বাভাবিক অন্ধকার।

তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে কেমন অজানা আশঙ্কায় ভরে উঠল।

.........

বাড়িতে পৌঁছানোর পর অবশ্য সেই অস্বস্তি অনেকটাই কেটে গেল।

দাদু আর ঠাকুমা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন।

মিষ্টিকে দেখেই ঠাকুমা জড়িয়ে ধরলেন।

— আহা, এ যে একেবারে পুতুল!

মিষ্টি গম্ভীর মুখে বলল,

— আমি শহর থেকে এসেছি।

কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল।

রাতের খাবার খেতে খেতে অনেকটা সময় কেটে গেল।

তারপর ক্লান্ত শরীর বিছানায় পড়তেই সবাই ঘুমিয়ে পড়ল।

.........

পরদিন সকালে অর্ণব ঘুম ভাঙতেই জানালার বাইরে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল।

চারপাশে শুধু সবুজ।

ধানক্ষেতের ওপর সকালের রোদ পড়েছে।

দূরে তালগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

পাখির ডাক ভেসে আসছে।

শহরের ধোঁয়া আর কোলাহল থেকে অনেক দূরে, যেন অন্য এক পৃথিবী।

সারাদিন তারা গ্রামের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াল।

পুকুর।

বটগাছ।

খেলার মাঠ।

পুরোনো স্কুল।

সবকিছুই মিষ্টির কাছে নতুন।

তার আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা বুঝি এটাই।

.........

বিকেলের দিকে অর্ণবের মা বললেন,

— চল, আজ কালীমন্দিরে যাওয়া যাক।

এই মন্দিরের নাম অর্ণব ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছে।

গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, মন্দিরটি অত্যন্ত জাগ্রত।

কেউ কেউ বলত, এখানে প্রার্থনা করলে মনস্কামনা পূরণ হয়।

আবার কেউ কেউ এমন কিছু গল্প বলত, যেগুলো শুনলে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত।

অর্ণব অবশ্য এসবকে কুসংস্কার বলেই মনে করত।

.........

মন্দিরে পৌঁছাতে প্রায় আধঘণ্টা সময় লাগল।

মন্দিরটা গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে।

চারপাশে বড় বড় গাছ।

নির্জন পরিবেশ।

মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বটগাছটা যেন পুরো জায়গাটার ওপর ছায়া ফেলে রেখেছে।

গাছটার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি বলল,

— মামা, এই গাছে ভূত থাকে?

অর্ণব হাসল।

— না।

কিন্তু কেন জানি না, উত্তরটা দেওয়ার সময় তার নিজেরই কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস ছিল না।

.........

মন্দিরের ভেতরে ঢুকতেই ধূপ আর ধুনোর গন্ধ নাকে এল।

প্রদীপের আলোয় মা কালীর মুখটা যেন জীবন্ত মনে হচ্ছিল।

চারপাশে এক ধরনের গম্ভীর নীরবতা।

যেন এই জায়গাটা অন্য কোথাও নয়।

অন্য কোনো জগতের দরজা।

.........

পুজো শেষ করে তারা মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিল।

ঠিক তখনই অর্ণবের কানে কয়েকজন গ্রামের মানুষের কথা ভেসে এল।

— আজ অমাবস্যা।

— হ্যাঁ... আজ রাতে আবার হবে।

অর্ণব এগিয়ে গেল।

— কী হবে?

বৃদ্ধ লোকটা কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিচু গলায় বলল,

— খারাপ ছায়া তাড়ানো।

অর্ণব ভ্রু কুঁচকে বলল,

— মানে?

— যাদের ওপর অশুভ শক্তি ভর করে, তাদের এখানে আনা হয়।

লোকটার চোখে কোনো হাসি ছিল না।

শুধু এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য।

যেটা দেখে অর্ণবের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।

.........

সমস্যা হলো, পুরো কথোপকথনটাই মিষ্টি শুনে ফেলেছিল।

তার চোখ দুটো উত্তেজনায় চকচক করে উঠল।

— ভূত আসবে?

কেউ উত্তর দিল না।

— আমি দেখব!

— না, দেখবি না।

— আমি দেখব!

— না।

— আমি দেখব!

তার জেদ ক্রমশ বাড়তেই থাকল।

.........

সন্ধ্যা নামার আগেই তারা বাড়ি ফিরে এল।

কিন্তু মিষ্টির মুখে তখনও একটাই কথা।

সে অমাবস্যার রাতের অনুষ্ঠান দেখতে যাবে।

সে ভূত দেখতে চায়।

কেউ তাকে বুঝিয়ে থামাতে পারছিল না।

শেষ পর্যন্ত সবাই বিরক্ত হয়ে পড়ল।

অবশেষে অর্ণবের মা বললেন,

— ঠিক আছে। সন্ধ্যায় শুধু পুজো দেখে চলে আসা হবে।

মিষ্টি আনন্দে হাততালি দিল।

কিন্তু সেই মুহূর্তে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঠাকুমার মুখটা হঠাৎ কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

ধীরে ধীরে তিনি মিষ্টির কাছে এগিয়ে এলেন।

তারপর মাথায় হাত রেখে বললেন,

— যাও যদি... তবে একটা কথা মনে রেখো।

সবাই তার দিকে তাকাল।

ঠাকুমার কণ্ঠে তখন অদ্ভুত একটা গাম্ভীর্য।

— সন্ধ্যার পর কোনো অবস্থাতেই ওর বেণী খুলতে দিও না।

ঘরের মধ্যে হঠাৎ যেন এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল।

অর্ণব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— কেন?

ঠাকুমা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

— সব নিষেধের কারণ জানতে নেই। কিছু নিষেধ শুধু মেনে চলতে হয়।

বাইরে তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছে।

আকাশের আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে।

আর কেউই বুঝতে পারেনি...

সেই রাতেই তাদের জীবনে শুরু হতে চলেছে এমন এক ঘটনা, যা বহু বছর পরেও ভুলতে পারেনি কেউ।

..........

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের পরিবেশটা যেন বদলে যেতে শুরু করল।

দিনের সেই চেনা কোলাহল ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। চারপাশে নেমে এল এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।

আকাশে চাঁদ নেই।

কারণ সেদিন ছিল অমাবস্যা।

দূরে কোথাও কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে বাতাসে ভেসে আসছিল ধূপ আর ধুনোর গন্ধ।

মিষ্টি অবশ্য এসবের কিছুই খেয়াল করছিল না।

সন্ধ্যা থেকে সে একটানা একই কথা বলে চলেছে।

— আমি কখন মন্দিরে যাব?

— এখনো সময় হয়নি।

— এখন?

— না।

— এখন?

অবশেষে রাত নামার পর অর্ণবের মা তাকে তৈরি করে দিলেন।

ছোট্ট গোলাপি রঙের ফ্রক।

মাথায় সুন্দর করে বাঁধা দুটি বেণী।

বেরোনোর আগে ঠাকুমা আবারও মিষ্টির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বললেন,

— দিদিভাই, একটা কথা মনে রাখবে?

— কী?

— বেণী খুলবে না।

মিষ্টি মুখ বাঁকিয়ে বলল,

— কেন?

— খুলবে না মানে খুলবে না।

বাচ্চাটা আর কিছু বলল না।

কিন্তু তার চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, সে মোটেও কথাটা গুরুত্ব দেয়নি।

.........

অর্ণব যখন বেরোতে যাবে, তখন মিতা হঠাৎ বলল,

— আমি আজ যাব না।

— কেন?

— শরীরটা ভালো লাগছে না।

অর্ণব আর জোর করল না।

তাই শেষ পর্যন্ত সে একাই মিষ্টিকে নিয়ে মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

.........

মন্দিরের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অর্ণব লক্ষ্য করল, আজ মানুষের ভিড় অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি।

আশেপাশের গ্রাম থেকেও লোকজন এসেছে।

মন্দিরের সামনে ছোটখাটো মেলার মতো পরিবেশ।

কয়েকটা খাবারের দোকান।

খেলনার দোকান।

কাচের চুড়ি।

বেলুন।

বাচ্চাদের খেলনা।

মিষ্টি তো আনন্দে আত্মহারা।

একটা দোকান থেকে বাঁশি কিনতে চাইল।

আরেকটা দোকান থেকে রঙিন ঘূর্ণি।

কষ্টে তাকে সামলাতে হচ্ছিল।

.........

তবে মন্দিরের সিঁড়ির দিকে এগোতেই পরিবেশটা বদলে গেল।

হাসি-আনন্দের জায়গায় নেমে এল চাপা উত্তেজনা।

লোকজন ফিসফিস করে কথা বলছে।

কারও মুখে হাসি নেই।

সবাই যেন কিছুর অপেক্ষায়।

অর্ণবের বুকের ভেতরটা অকারণে ধড়ফড় করতে লাগল।

.........

মন্দিরের প্রধান চত্বরে পৌঁছেই সে থমকে দাঁড়াল।

তার সামনে যা দৃশ্য ছিল, তার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।

দুটি মহিলাকে লোহার শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।

তাদের চুল এলোমেলো।

চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে লাল।

তারা অদ্ভুত ভঙ্গিতে চিৎকার করছে।

মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলছে, যা ঠিক মানুষের স্বাভাবিক আচরণ বলে মনে হয় না।

তাদের চারপাশে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে।

কেউ মন্ত্র পড়ছে।

কেউ ধূপ জ্বালাচ্ছে।

কেউ প্রার্থনা করছে।

অর্ণব অনুভব করল, তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

.........

হঠাৎ তার পাশ থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

— বাচ্চাটাকে নিয়ে এখানে কেন এসেছ?

অর্ণব চমকে উঠে তাকাল।

একজন লালবস্ত্রধারী সাধু দাঁড়িয়ে আছেন।

মাথায় জটা।

কপালে লাল সিঁদুর।

চোখ দুটো অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ।

সেই চোখ যেন মানুষের ভেতরটা ভেদ করে দেখতে পারে।

সাধুর দৃষ্টি সরাসরি গিয়ে পড়ল মিষ্টির ওপর।

তারপর তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন,

— ওর চুল কে খুলেছে?

.........

অর্ণব অবাক হয়ে মিষ্টির দিকে তাকাল।

তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল।

দুটি বেণীর একটি পুরোপুরি খুলে গেছে।

চুল ছড়িয়ে পড়েছে কাঁধের ওপর।

কখন খুলেছে?

কীভাবে খুলেছে?

সে কিছুই জানে না।

কয়েক মিনিট আগেও তো ঠিকই ছিল!

.........

সাধুর মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল।

তিনি এক পা এগিয়ে এলেন।

— এখনই বাড়ি নিয়ে যাও।

— কেন?

— যা বলছি তাই করো।

— কিন্তু—

— এক মুহূর্তও দেরি কোরো না।

তার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যা শুনে অর্ণব আর প্রশ্ন করার সাহস পেল না।

.........

সে দ্রুত মিষ্টির হাত ধরল।

মেয়েটা তখনও পিছনে তাকিয়ে সেই মহিলাদের দেখার চেষ্টা করছে।

— মামা, ওরা এমন করছে কেন?

— চুপ করে হাঁটো।

— ওরা কি ভূত?

— চুপ।

— ভূত কি সত্যি?

অর্ণব উত্তর দিল না।

তার নিজেরই তখন বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্বস্তি জমতে শুরু করেছে।

.........

বাড়ি ফেরার পুরো রাস্তা জুড়ে সে অনুভব করছিল, যেন কেউ তাদের অনুসরণ করছে।

বারবার পিছনে তাকাচ্ছিল।

কিন্তু কাউকে দেখতে পাচ্ছিল না।

শুধু অন্ধকার।

গভীর, নিস্তব্ধ অন্ধকার।

.........

বাড়ি ফিরে সে কাউকে কিছু বলল না।

সাধুর কথাও না।

মন্দিরের দৃশ্যও না।

শুধু বলল, পুজো দেখে চলে এসেছে।

মিষ্টিও আশ্চর্যজনকভাবে চুপচাপ।

যে মেয়েটা সারাক্ষণ কথা বলে, সে যেন হঠাৎ করেই অনেক শান্ত হয়ে গেছে।

মিতা জিজ্ঞেস করল,

— এত চুপ কেন?

মিষ্টি শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল।

কোনো উত্তর দিল না।

.........

রাতের খাবারের সময়ও একই অবস্থা।

মেয়েটা প্রায় কথা বলছেই না।

খাবারও খুব কম খেল।

ঠাকুমা একবার তার মাথায় হাত রেখে কেমন যেন চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

— ওর শরীর খারাপ লাগছে নাকি?

কেউ উত্তর দিতে পারল না।

.........

রাত বাড়তে লাগল।

একসময় সবাই নিজেদের ঘরে চলে গেল।

বাইরে তখন সম্পূর্ণ অন্ধকার।

অমাবস্যার রাত।

চারপাশে কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।

আর মাঝে মাঝে বাতাসে কেঁপে ওঠা জানালার শব্দ।

.........

রাত প্রায় আড়াইটে।

হঠাৎ গ্রামের নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে এল এক বিকট চিৎকার।

সেই চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল অর্ণবের।

প্রথমে সে বুঝতে পারল না কী হয়েছে।

তারপর আবারও সেই চিৎকার।

এবার সে চিনতে পারল।

এটা মিতার গলা।

বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে সে দরজার দিকে ছুটল।

আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বুঝতে পারল...

ভয়াবহ কিছু একটা ঘটে গেছে।

..........

রাত প্রায় আড়াইটে।

মিতার আতঙ্কিত চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠেছিল।

ঘুম ভাঙার পর এক মুহূর্তও দেরি না করে অর্ণব বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে এল। করিডোর পেরিয়ে দৌড়ে পৌঁছে গেল মিতার ঘরের সামনে।

সেখানে পৌঁছে সে যা দেখল, তা কোনোদিন ভুলতে পারেনি।

মিতা ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

অর্ণবের মা তাকে সামলানোর চেষ্টা করছেন।

আর মেঝেতে বসে থাকা মিষ্টিকে দু'হাত দিয়ে শক্ত করে জাপটে ধরে রেখেছেন অর্ণবের বাবা।

.........

প্রথমে অর্ণব কিছুই বুঝতে পারছিল না।

মিষ্টি প্রচণ্ড ছটফট করছে।

চিৎকার করছে।

তার মুখের অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

সেই পরিচিত শিশুসুলভ নিষ্পাপ চেহারার কোনো চিহ্ন যেন আর নেই।

চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে গেছে।

মুখে এক অদ্ভুত কঠোরতা।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টা ছিল মেঝেতে পড়ে থাকা চুলগুলো।

অনেকগুলো চুল।

এলোমেলোভাবে কাটা।

যেন কেউ তাড়াহুড়ো করে কাঁচি চালিয়েছে।

.........

অর্ণব কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর মিতার দিকে তাকিয়ে বলল,

— কী হয়েছে?

মিতা কাঁপতে কাঁপতে উত্তর দিল,

— আমি ঘুমোচ্ছিলাম... হঠাৎ একটা শব্দে ঘুম ভাঙে...

সে কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলল।

— দেখি মিষ্টি মেঝেতে বসে আছে। নিজের চুল নিজেই কাটছে...

অর্ণব অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল।

মিষ্টি নিজের চুল নিজে কাটছে?

এটা অসম্ভব।

এই মেয়েটা নিজের চুল কতটা ভালোবাসত, সেটা সবাই জানত।

মজা করে চুল কাটার কথা বললেও সে কেঁদে ফেলত।

.........

মিতা আবার বলতে শুরু করল।

— আমি ওকে থামাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ও আমার দিকে তাকিয়ে এমন কিছু কথা বলল...

— কী কথা?

মিতা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।

তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— ওর মুখ দিয়ে এমন সব গালাগাল বের হচ্ছিল, যা একটা পাঁচ বছরের বাচ্চার জানার কথা নয়।

ঘরের ভেতর হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এল।

.........

অর্ণবের ঠাকুমা তখন পর্যন্ত চুপ করে ছিলেন।

হঠাৎ তিনি নিচু গলায় বললেন,

— ওকে মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?

অর্ণব মাথা নাড়ল।

— আর ওর বেণী?

এই প্রশ্ন শুনে অর্ণবের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

তার মনে পড়ে গেল সেই সাধুর কথা।

"ওর চুল কে খুলেছে?"

"এখনই বাড়ি নিয়ে যাও।"

.........

কোনো সময় নষ্ট না করে অর্ণব পাশের বাড়ির জ্যাঠুকে ডাকতে ছুটল।

জ্যাঠু সব কথা শুনে এক মুহূর্তও দেরি করলেন না।

— মন্দিরে যেতে হবে।

— এখন?

— এখনই।

.........

গ্রামের নিস্তব্ধ রাত চিরে জ্যাঠু দ্রুত মন্দিরের দিকে রওনা দিলেন।

প্রায় আধঘণ্টা পরে তিনি ফিরে এলেন।

তার সঙ্গে ছিলেন সেই লালবস্ত্রধারী সাধু।

সাধুকে দেখেই অর্ণব চিনতে পারল।

মন্দিরে দেখা সেই মানুষ।

.........

ঘরে ঢুকেই সাধু মিষ্টির দিকে তাকালেন।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

তারপর মুখ শক্ত হয়ে গেল।

— সবাই বাইরে যাও।

— কিন্তু—

— এখনই।

তার কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে কেউ আর প্রতিবাদ করল না।

.........

ঘরের ভেতরে রইলেন শুধু সাধু, অর্ণবের বাবা, মা আর মিষ্টি।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

অর্ণব, মিতা, জ্যাঠু আর ঠাকুমা পাশের ঘরে বসে রইল।

.........

তারপর শুরু হলো অপেক্ষা।

জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা।

প্রথম আধঘণ্টা কেটে গেল।

তারপর এক ঘণ্টা।

তারপর আরও।

মাঝে মাঝে ভেসে আসছিল মন্ত্রপাঠের শব্দ।

ধূপের গন্ধ।

আর কখনো কখনো এমন কিছু শব্দ, যেগুলো শুনে অর্ণবের শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।

.........

একসময় ভেতর থেকে ভেসে এল একটা বিকট চিৎকার।

মিষ্টির।

অথবা...

হয়তো মিষ্টির নয়।

শব্দটা যেন কোনো শিশুর গলা থেকে বেরোচ্ছে না।

বরং মনে হচ্ছিল, একাধিক কণ্ঠ একসঙ্গে চিৎকার করছে।

মিতা কান দু'হাতে চেপে ধরে বসে পড়ল।

অর্ণবের ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছিল।

সে জীবনে এত ভয় কখনও পায়নি।

.........

রাত ধীরে ধীরে শেষ হতে শুরু করল।

বাইরে পাখির ডাক শোনা যেতে লাগল।

পূর্ব আকাশে আলো ফুটতে শুরু করেছে।

তবুও দরজা খুলল না।

.........

অবশেষে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ঘরের দরজাটা খুলল।

প্রথমে বেরিয়ে এলেন অর্ণবের বাবা।

তারপর মা।

সবশেষে সেই সাধু।

তিনজনকেই ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।

.........

অর্ণব দৌড়ে গেল।

— মিষ্টি কেমন আছে?

সাধু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

— ঘুমোচ্ছে।

— ও ঠিক আছে?

— এখন ঠিক আছে।

"এখন" শব্দটার ওপর তিনি একটু বেশি জোর দিলেন।

.........

মিতা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,

— কী হয়েছিল?

সাধু সরাসরি উত্তর দিলেন না।

জানালার বাইরে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

— সবকিছু মানুষের বোঝার জন্য নয়।

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল।

.........

কিছুক্ষণ পরে তিনি আবার বললেন,

— কখনও কখনও কিছু জায়গায় এমন কিছু শক্তি থাকে, যাদের বিরক্ত করা উচিত নয়।

— আর মিষ্টি?

— ওর ওপর একটা খারাপ ছায়ার নজর পড়েছিল।

অর্ণবের গলা শুকিয়ে গেল।

— এখন?

— এখন আর ভয় নেই।

.........

বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সাধু একবার মিষ্টির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালেন।

তারপর বললেন,

— তবে মনে রাখবে, সব সতর্কবাণী কুসংস্কার নয়।

কিছু সতর্কবাণী আসে অভিজ্ঞতা থেকে।

আর কিছু নিষেধ ভাঙার মূল্য অনেক বড় হতে পারে।

.........

সেদিনের পর আর কখনও মিষ্টির সঙ্গে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি।

ধীরে ধীরে সে বড় হয়ে উঠল।

স্কুলে ভর্তি হলো।

বন্ধু হলো।

স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেল।

কয়েক বছরের মধ্যে সেই রাতের স্মৃতিও তার মন থেকে মুছে গেল।

.........

কিন্তু অর্ণব ভুলতে পারেনি।

মিতা ভুলতে পারেনি।

তার বাবা-মাও না।

কারণ তারা সবাই দেখেছিল মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাটা চুল।

শুনেছিল সেই অদ্ভুত চিৎকার।

আর দেখেছিল এক শিশুর মুখে এমন এক অভিব্যক্তি, যা কোনো শিশুর মুখে থাকার কথা নয়।

.........

আজ এত বছর পরেও যখন অর্ণব সেই রাতের কথা মনে করে, তখন তার শরীর শিউরে ওঠে।

সে আজও জানে না সেদিন আসলে কী ঘটেছিল।

সবকিছুর কি কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা ছিল?

নাকি সত্যিই কোনো অদৃশ্য ছায়া মিষ্টির পিছু নিয়েছিল?

সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিন জানা যাবে না।

তবে একটা কথা সে নিশ্চিতভাবে জানে।

সেদিন যদি মিষ্টি তার বেণী না খুলত...

তাহলে হয়তো সেই রাতের গল্পটাও জন্ম নিত না।



সমাপ্ত


- Tanmoy Roy

Cholo Golpo Suni

................

পাঠকদের উদ্দেশ্যে


আমার গল্পটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

যদি গল্পটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান এবং গল্পটি আপনার বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন।

আপনার প্রতিটি মন্তব্য, পরামর্শ ও উৎসাহ আমাকে আরও ভালো গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।

আবারও ধন্যবাদ।


— তন্ময় রায়



✍️ About The Writer

Tanmoy Roy is a Bengali story writer passionate about emotional storytelling, horror, adventure and relationship-based stories.

Follow Him 👇

@

মন্তব্যসমূহ