সর্প-দ্বীপ (Snake Island) | Part 04 | সমুদ্রের অন্ধকারে শেষ রাত | Thriller adventure story of a bengal boy in a Brazil mysterious island full of venomous snakes | Story by Tanmoy Roy| CHOLO GOLPO SUNI


স্টোর রুমের পাশে রাখা কাঠের বাক্সের ফাঁক থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে দুটো গোল্ডেন ল্যান্সহেড।

জাহাজের মৃদু আলোয় তাদের সোনালি রঙের শরীর চকচক করছিল।

সাপ দুটো ফণা তুলে ধীরে ধীরে সামনে এগোতে লাগল।

মুহূর্তের মধ্যে সবাই পিছিয়ে গেল।

রাজেশের বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে উঠল।

এত কষ্টে মৃত্যুর দ্বীপ থেকে পালানোর পরও যেন মৃত্যু তাদের পিছু ছাড়ছে না।

অপূর্ববাবু কাঁপা গলায় বললেন,

— “এগুলো… এখানে এলো কীভাবে?”

ড্যানিয়েল দাঁত চেপে সাপ দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিচু গলায় বলল,

— “জঙ্গলের ভেতর যখন দৌড়াচ্ছিলাম, তখন হয়তো কোনোভাবে বাক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।”

বাইরে তখনও ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে।

সমুদ্রের ঢেউ আগের তুলনায় অনেক উঁচু হয়ে উঠেছে।

জাহাজ মাঝ সমুদ্রে দাঁড়িয়ে আছে।

ইঞ্জিন বন্ধ।

পেট্রোল শেষ।

চারদিকে শুধু অন্ধকার জল।

আর সেই অন্ধকারের মাঝখানে তাদের সঙ্গে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষধর সাপ।

ড্যানিয়েল ধীরে ধীরে বলল,

— “কেউ নড়বে না।”

সাপ দুটোও স্থির হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।

মনে হচ্ছিল ঠিক সুযোগ খুঁজছে।

ঠিক তখনই—

ফসসসস!

পেছনের দিক থেকেও আরেকটা হিসহিস শব্দ ভেসে এল।

রাজেশ ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।

আর তাকাতেই তার মুখ শুকিয়ে গেল।

জাহাজের সিঁড়ির পাশে আরও দুটো গোল্ডেন ল্যান্সহেড ফণা তুলে বসে আছে।

অপূর্ববাবু আতঙ্কে পিছিয়ে গেলেন।

— “অসম্ভব…”

এখন তারা পুরোপুরি ঘিরে গেছে।

সামনে দুইটা।

পেছনে দুইটা।

মাঝখানে তারা।

ড্যানিয়েল ধীরে ধীরে চারপাশ দেখল।

তারপর নিচু গলায় বলল,

— “এখানে আর থাকা নিরাপদ না।”

রাজেশ ফিসফিস করে বলল,

— “তাহলে এখন কি করব?”

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ।

তারপর রাজেশ হঠাৎ বলল,

— “জলে ঝাঁপ দিতে হবে।”

অপূর্ববাবু অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন।

— “পাগল নাকি? মাঝ সমুদ্রে?”

রাজেশ বলল,

— “এখানে থাকলে আমরা নিশ্চিত মরব।”

ড্যানিয়েল চুপ করে রইল।

তার চোখে অদ্ভুত একটা কষ্ট ফুটে উঠল।

সে ধীরে ধীরে জাহাজটার দিকে তাকাল।

এই জাহাজটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

বহু বছর সমুদ্রে কাজ করে টাকা জমিয়ে সে এটা কিনেছিল।

এই জাহাজই ছিল তার সবকিছু।

সে নিচু গলায় বলল,

— “আমি এটা ছেড়ে যেতে পারব না…”

রাজেশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— “জাহাজ পরে আবার কেনা যাবে। কিন্তু আমরা মরে গেলে আর কিছুই থাকবে না।”

ঠিক তখনই সামনের সাপ দুটো আরও একটু এগিয়ে এল।

ড্যানিয়েল বুঝতে পারল সময় খুব কম।

অপূর্ববাবু দ্রুত স্টোর রুমের দিকে দৌড়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর তিনি হাতে কয়েকটা ডিনামাইট নিয়ে ফিরে এলেন।

ড্যানিয়েল অবাক হয়ে বলল,

— “এগুলো কোথায় পেলে?”

— “মাছ ধরার কাজের জন্য রাখা ছিল।”

রাজেশ দ্রুত বলল,

— “জাহাজটা উড়িয়ে দিতে হবে। না হলে সাপগুলো বেঁচে যাবে।”

ড্যানিয়েলের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

তার চোখ লাল হয়ে উঠল।

কিন্তু সে কিছু বলল না।

বাইরে আবার বাতাসের গতি বেড়ে গেছে।

দূরে বজ্রপাত হচ্ছে।

সমুদ্রের ঢেউ জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়ছে।

সাপগুলো ধীরে ধীরে আরও কাছে আসছে।

এখন তাদের চোখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

সেই চোখে যেন অদ্ভুত হিংস্রতা।

অপূর্ববাবু ডিনামাইটে আগুন ধরালেন।

তারপর চিৎকার করে বললেন,

— “ঝাঁপ দাও!”

পরের মুহূর্তেই তিনি রাজেশ আর ড্যানিয়েলকে জোরে ধাক্কা মেরে সমুদ্রে ফেলে দিলেন।

নিজেও ডিনামাইট জাহাজের ভেতরে ছুড়ে দিয়ে জলে ঝাঁপ দিলেন।

তারপর—

ধুমমমম!!!

ভয়ংকর বিস্ফোরণে পুরো সমুদ্র কেঁপে উঠল।

আগুনের লেলিহান শিখা মুহূর্তের মধ্যে জাহাজটাকে গ্রাস করে ফেলল।

চারদিকে কাঠের টুকরো ছিটকে পড়তে লাগল।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জাহাজটা ধীরে ধীরে সমুদ্রের নিচে ডুবে যেতে শুরু করল।

জলের মধ্যে ভাসতে ভাসতে রাজেশ অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল।

তার মনে পড়ে গেল টাইটানিক সিনেমার কথা।

ঠিক সেভাবেই জাহাজটা ধীরে ধীরে অন্ধকার সমুদ্রের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে।

শুধু পার্থক্য একটাই—

ওটা ছিল সিনেমা।

এটা বাস্তব।

ঠান্ডা পানিতে তার পুরো শরীর জমে যাচ্ছিল।

চারদিকে শুধু অন্ধকার।

ঝড়ের মধ্যে ঢেউ বারবার তাদের ডুবিয়ে দিচ্ছিল।

হঠাৎ ড্যানিয়েলের গলা ভেসে এল।

— “এইদিকে!”

রাজেশ কষ্ট করে সাঁতার কেটে সামনে এগোল।

কিছু দূরে জাহাজের ভাঙা ছাদের একটা অংশ জলের উপর ভাসছে।

ড্যানিয়েল আর অপূর্ববাবু সেটার উপর উঠে বসেছে।

রাজেশও কষ্ট করে উঠে পড়ল।

সবাই হাঁপাচ্ছে।

কারও শরীরে আর শক্তি নেই।

বৃষ্টি আবার বাড়তে শুরু করেছে।

দূরে বজ্রপাতের আলোয় মাঝে মাঝে সমুদ্রটা সাদা হয়ে উঠছে।

রাজেশ কাঁপতে কাঁপতে বলল,

— “আমরা… বাঁচব তো?”

কেউ উত্তর দিল না।

কারণ কেউই জানত না।

রাত যত বাড়তে লাগল, তুফানও তত ভয়ংকর হয়ে উঠল।

বাতাস এত জোরে বইছিল যে তারা ভাঙা কাঠের উপর ঠিকমতো বসেও থাকতে পারছিল না।

হঠাৎ একটা বিশাল ঢেউ এসে তাদের উপর আছড়ে পড়ল।

রাজেশ ভারসাম্য হারিয়ে জলের মধ্যে পড়ে গেল।

পরের মুহূর্তেই ড্যানিয়েল আর অপূর্ববাবুও জলে তলিয়ে গেলেন।

তারপর…

সব অন্ধকার।


যখন রাজেশের জ্ঞান ফিরল, সে বুঝতে পারল সে একটা বিছানায় শুয়ে আছে।

চারপাশে সাদা দেয়াল।

হালকা ওষুধের গন্ধ।

কিছুক্ষণ পর সে বুঝতে পারল— এটা একটা হাসপাতাল।

তার পাশের বেডে অপূর্ববাবু শুয়ে আছেন।

আর একটু দূরে ড্যানিয়েল।

তিনজনই বেঁচে আছে।

ঠিক তখনই একজন মাঝবয়সী লোক রুমে ঢুকলেন।

লোকটা হাসিমুখে বললেন,

— “আজ সকালে সমুদ্রের ধারে আপনাদের অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। তাই হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।”

ড্যানিয়েল ধীরে ধীরে উঠে বসে লোকটাকে ধন্যবাদ দিল।

লোকটা কিছুক্ষণ পর চলে গেল।

দুই দিন হাসপাতালে থাকার পর তারা বাড়ি ফিরল।

ট্যাক্সিতে ফেরার সময় কেউ খুব একটা কথা বলছিল না।

সবাই যেন এখনও সেই দ্বীপের আতঙ্ক থেকে বেরোতে পারেনি।

ড্যানিয়েল জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

হঠাৎ অপূর্ববাবু নিচু গলায় বললেন,

— “তোমার জাহাজটার জন্য খারাপ লাগছে…”

ড্যানিয়েল সঙ্গে সঙ্গে তাকে থামিয়ে দিল।

— “ওসব নিয়ে আর কথা বলো না।”

তার গলায় কষ্ট স্পষ্ট ছিল।

বাড়ি ফিরে রাজেশ প্রথমবার নিজের রুমে গিয়ে শান্তিতে শুয়ে পড়ল।

ঠিক তখনই তার মা কলকাতা থেকে ফোন করলেন।

— “তোর ফোন কোথায় ছিল? এতবার কল করলাম!”

রাজেশ থেমে গেল।

তার মনে পড়ল—

মোবাইলটা তো সেই দ্বীপেই পড়ে গেছে।

কিন্তু সে মাকে সত্যিটা বলল না।

শুধু বলল ফোনটা হারিয়ে গেছে।

পরের এক সপ্তাহ রাজেশ কোথাও বেরোল না।

রাতে ঘুমালেই সে দুঃস্বপ্ন দেখত।

কখনও দেখত অসংখ্য সাপ তাকে ঘিরে আছে।

কখনও দেখত সমুদ্রের অন্ধকার থেকে একটা গোল্ডেন ল্যান্সহেড ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে।

এক সপ্তাহ পর তার দেশে ফেরার দিন এল।

বিকেলে এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় সে শেষবারের মতো ব্রাজিলের সমুদ্রের দিকে তাকাল।

আকাশে তখন লাল সূর্য ডুবছে।

কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মধ্যেও তার মনে শুধু সেই দ্বীপটার কথাই ঘুরছিল।

প্লেনে উঠে জানালার পাশে বসে সে নিচের সমুদ্র দেখতে লাগল।

অন্ধকার সমুদ্রের মধ্যে ছোট ছোট দ্বীপ দেখা যাচ্ছিল।

হঠাৎ তার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।

তার মনে হলো—

সমুদ্রের কোথাও না কোথাও এখনও সেই অভিশপ্ত দ্বীপটা রয়েছে।

যেখানে হাজার হাজার গোল্ডেন ল্যান্সহেড আজও অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যে অপেক্ষা করে আছে।

আর হয়তো…

কোনো একদিন আবার কেউ ভুল করে সেখানে পৌঁছে যাবে।

সেই রাতে প্লেনের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিল রাজেশ।

কিন্তু মাঝরাতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙে গেল।

সে দেখল—

পুরো প্লেন ফাঁকা।

চারপাশে কেউ নেই।

শুধু সিটের উপর, জানলার পাশে, মেঝেতে…

অসংখ্য গোল্ডেন ল্যান্সহেড ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে।

আর তাদের হলুদ চোখগুলো অন্ধকারের মধ্যে জ্বলছে…

রাজেশ হঠাৎ চমকে ঘুম ভেঙে উঠে বসে পড়ল।

তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে।

সে কাঁপা হাতে জানলার বাইরে তাকাল।

নিচে শুধু অন্ধকার সমুদ্র।

আর সেই মুহূর্তে সে মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা করল—

জীবনে আর কোনোদিন সে সমুদ্রের মাঝখানে জাহাজে ঘুরতে যাবে না।

সমুদ্র বাইরে থেকে যত সুন্দরই লাগুক…

তার অন্ধকারের ভেতরে লুকিয়ে থাকে এমন কিছু রহস্য, যেগুলো মানুষের কখনও জানা উচিত নয়।



— সমাপ্ত —

📢 পাঠকদের উদ্দেশ্যে

গল্পটি পড়ে আপনার কেমন লাগল, তা অবশ্যই নিচের কমেন্ট বক্সে জানাবেন। আপনার মতামত, পরামর্শ এবং সমালোচনা আমাদের আরও ভালো গল্প উপহার দিতে অনুপ্রাণিত করে। গল্পটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন, যাতে আরও বাংলা গল্পপ্রেমীরা এটি পড়ার সুযোগ পান। আপনার একটি শেয়ার এবং একটি মন্তব্য আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। ❤️


``` Tanmoy Roy

Tanmoy Roy

Bengali Author • Storyteller • Founder & Lead Author of CHOLO GOLPO SUNI

```

Tanmoy Roy is a Bengali author, storyteller, and founder of CHOLO GOLPO SUNI. He writes original Bengali fiction across mystery, thriller, horror, adventure and emotional drama. His stories focus on suspense, realism, emotion and memorable characters, creating immersive reading experiences for Bengali readers worldwide.

📚 Genres:
Mystery • Thriller • Horror • Adventure • Emotional Drama • Bengali Fiction
Connect With The Author 👇

© Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI | Bengali Mystery, Thriller, Horror & Original Fiction

মন্তব্যসমূহ