সর্প-দ্বীপ (Snake Island) | Part 03 | মৃত্যুর জঙ্গল | Thriller adventure story of a bengal boy in a Brazil mysterious island full of venomous snakes | Story by Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI


চারপাশের অন্ধকারে অসংখ্য সাপ ধীরে ধীরে নড়তে শুরু করেছে।
জ্বলন্ত মশালের আলোয় তাদের চকচকে শরীরগুলো ভয়ংকরভাবে ঝলসে উঠছিল। গাছের ডাল, শুকনো পাতা, মাটির ফাঁক— সব জায়গাতেই যেন সাপ ছড়িয়ে রয়েছে।
রাজেশের বুকের ভেতরটা ধকধক করতে লাগল।
তার হাত কাঁপছিল।
জীবনে সে অনেক হরর সিনেমা দেখেছে, অনেক গল্প পড়েছে, কিন্তু বাস্তবে এমন দৃশ্য সে কল্পনাও করেনি।
ড্যানিয়েল দাঁত চেপে বলল,
— “কেউ দৌড়াবে না। সবাই ধীরে ধীরে পেছাতে থাকো।”
তার গলায় এমন একটা কড়া ভাব ছিল, যা শুনে কেউ আর প্রশ্ন করার সাহস পেল না।
সামনে মৃত কর্মচারীটা এখনও মাটিতে পড়ে আছে। তার চোখ দুটো বিস্ফারিত। শরীরের রং ধীরে ধীরে নীলচে হয়ে উঠছে।
কিন্তু কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেল না।
কারণ তারা সবাই জানত— এখন এক মুহূর্তের ভুল মানেই মৃত্যু।
তারা ধীরে ধীরে পেছাতে শুরু করল।
মশালের আগুনের আলোয় সাপগুলো কিছুটা দূরে সরে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি পিছিয়ে যাচ্ছিল না।
মনে হচ্ছিল তারা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় আছে।
হঠাৎ উপরের গাছের ডাল থেকে একটা সাপ ঝুলে পড়ল।
রাজেশ চমকে পিছিয়ে গেল।
সাপটা তার মুখের একেবারে সামনে এসে ফণা তুলে দাঁড়াল।
মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো— এবার সব শেষ।
কিন্তু ড্যানিয়েল দ্রুত মশালটা সামনে ধরতেই সাপটা হিসহিস করতে করতে পিছিয়ে গেল।
ড্যানিয়েল গর্জে উঠল,
— “মশাল নিচে নামাবে না!”
সবাই আরও শক্ত করে মশাল ধরল।
চারপাশে তখন শুধু আগুনের আলো, বৃষ্টির আগের ঠান্ডা বাতাস আর সাপের ফোঁসফোঁস শব্দ।
হঠাৎ দূরে বজ্রপাত হলো।
আকাশের এক কোণে বিদ্যুতের আলো ঝলসে উঠল।
তারপরই প্রচণ্ড জোরে বাতাস বইতে শুরু করল।
ড্যানিয়েল আকাশের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
— “তুফান আসছে…”
তার কথার সঙ্গে সঙ্গেই যেন পুরো জঙ্গলটা আরও অন্ধকার হয়ে গেল।
বাতাসের ধাক্কায় মশালের আগুন কাঁপতে লাগল।
তারা দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
ড্যানিয়েল সামনে।
পেছনে অপূর্ববাবু, রাজেশ আর বাকি কর্মচারীরা।
জঙ্গলের মাটিটা ভিজে থাকায় হাঁটতেও অসুবিধা হচ্ছিল।
কোথাও পা পিছলে যাচ্ছে, কোথাও কাঁটা গাছের ডাল জামায় আটকে যাচ্ছে।
কিন্তু কেউ থামল না।
কারণ তারা জানত— থামলেই মৃত্যু।
হঠাৎ একটা কর্মচারী ভয়ে চিৎকার করে উঠল।
তার পায়ের পাশ দিয়ে একটা সাপ দ্রুত চলে গেল।
লোকটা ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
তার হাত থেকে মশাল ছিটকে দূরে পড়ল।
মশালের আগুন মাটিতে পড়তেই কয়েকটা সাপ মুহূর্তের মধ্যে তার দিকে এগিয়ে এল।
লোকটা আতঙ্কে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও পারল না।
সে চিৎকার করতে লাগল,
— “বাঁচাও! আমাকে বাঁচাও!”
রাজেশ এগিয়ে যেতে যাচ্ছিল।
কিন্তু ড্যানিয়েল তার হাত চেপে ধরল।
— “না! কাছে যাস না!”
পরের মুহূর্তেই—
একটা গোল্ডেন ল্যান্সহেড বিদ্যুতের গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার গলায়।
তারপর আরেকটা।
তারপর আরও একটা।
লোকটার চিৎকার মুহূর্তের মধ্যে থেমে গেল।
তার শরীরটা কয়েক সেকেন্ড কাঁপল।
তারপর নিস্তব্ধ।
রাজেশের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল।
তার গা গুলিয়ে উঠছিল।
সে জীবনে প্রথমবার নিজের চোখের সামনে কাউকে এভাবে মরতে দেখল।
অপূর্ববাবু কাঁপা গলায় বললেন,
— “এখান থেকে বেরোতে হবে… এখনই…”
ঠিক তখনই আকাশ ফেটে প্রবল বৃষ্টি নামল।
ঝড়ের হাওয়া এত জোরে বইছিল যে দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন হয়ে উঠল।
বৃষ্টির পানি পড়তে শুরু করতেই তাদের মশালের আগুন দুর্বল হয়ে গেল।
ড্যানিয়েল চিৎকার করে বলল,
— “দৌড়াও!”
সবাই প্রাণপণে দৌড়াতে শুরু করল।
চারপাশে শুধু বজ্রপাতের আলো।
সেই আলোয় মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছিল গাছের ডালে অসংখ্য সাপ ঝুলছে।
বৃষ্টির জলে মাটি পিচ্ছিল হয়ে গেছে।
রাজেশ কয়েকবার পড়ে যেতে যেতে বাঁচল।
হঠাৎ—
ফসসসস!
একটা সাপ গাছের ডাল থেকে তার কাঁধের উপর পড়ল।
রাজেশ আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।
সাপটা ছোবল মারার আগেই ড্যানিয়েল মশাল দিয়ে সেটাকে আঘাত করল।
সাপটা ছিটকে দূরে পড়ে গেল।
ড্যানিয়েল গর্জে উঠল,
— “দৌড়া!”
ঠিক তখনই প্রচণ্ড বাতাসের ধাক্কায় অপূর্ববাবুর হাতে থাকা মশাল নিভে গেল।
তারপর একে একে আরও দুটো মশাল নিভে গেল।
অন্ধকার আরও ঘন হয়ে উঠল।
এখন শুধু ড্যানিয়েল আর রাজেশের হাতে আগুন জ্বলছে।
কিন্তু সেই আগুনও ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে।
রাজেশ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
— “আর কত দূর?”
ড্যানিয়েল বলল,
— “জঙ্গল শেষ হলেই সমুদ্র!”
ঠিক তখনই—
ঝপ!
একটা সাপ হঠাৎ একজন কর্মচারীর মুখের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
লোকটা চিৎকার করতে করতে মাটিতে পড়ে গেল।
তার মুখ রক্তে ভরে গেল।
আর কেউ থামল না।
কারণ এখন থামা মানেই সবাই মারা যাবে।
রাজেশের চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছিল।
সে বুঝতেই পারছিল না বৃষ্টির জন্য নাকি ভয়ের জন্য।
হঠাৎ সামনে সমুদ্রের শব্দ শোনা গেল।
ড্যানিয়েল চিৎকার করে উঠল,
— “আর একটু!”
সবাই প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল।
অবশেষে তারা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের ধারে পৌঁছাল।
সামনেই তাদের জাহাজ।
কিন্তু ঠিক তখনই রাজেশ থেমে গেল।
কিছু দূরে মাটিতে একটা মানুষ পড়ে আছে।
বজ্রপাতের আলোয় সে চিনতে পারল—
এটা সেই কর্মচারী, যে প্রথমে ডিম নিতে গিয়েছিল।
তার পুরো শরীর রক্তাক্ত।
মনে হচ্ছে অসংখ্য সাপ তাকে কামড়েছে।
রাজেশ এগোতে যাচ্ছিল।
কিন্তু ঠিক তখনই—
ফসসস!
অন্ধকার থেকে একটা গোল্ডেন ল্যান্সহেড বিদ্যুতের গতিতে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
রাজেশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ড্যানিয়েল সামনে এসে সাপটার মাথা চেপে ধরল।
তারপর সমস্ত শক্তি দিয়ে সেটাকে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল।
— “জাহাজে ওঠ!”
সবাই দ্রুত জাহাজে উঠে পড়ল।
ড্যানিয়েল সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন চালু করল।
কিছুক্ষণ পর জাহাজটা ধীরে ধীরে সমুদ্রে ভাসতে শুরু করল।
সবাই হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ল।
তাদের শরীর কাঁপছে।
কেউ কিছু বলছে না।
শুধু বাইরে বৃষ্টির শব্দ।
কিছুক্ষণ পর অপূর্ববাবু ধীরে ধীরে বললেন,
— “আমরা… বেঁচে গেছি?”
ড্যানিয়েল গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
— “হয়তো…”
কিন্তু তার গলায় নিশ্চিন্ত ভাব ছিল না।
সমুদ্রের উপর দিয়ে জাহাজ এগিয়ে চলছিল।
বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে।
দূরে অন্ধকারের মধ্যে দ্বীপটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
রাজেশ ডেকের পাশে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার এখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না যে তারা সত্যিই ওই মৃত্যুর দ্বীপ থেকে পালিয়ে এসেছে।
ঠিক তখনই—
ঘড়ঘড়ঘড়…
জাহাজটা হঠাৎ কেঁপে উঠে থেমে গেল।
সবাই চমকে উঠল।
ড্যানিয়েল দ্রুত নিচে দৌড়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে ফিরে এল।
— “পেট্রোল শেষ…”
অপূর্ববাবু অবাক হয়ে বললেন,
— “কি?”
ড্যানিয়েল দাঁত চেপে বলল,
— “লাইন লিক করছিল। সব পেট্রোল বেরিয়ে গেছে।”
চারপাশে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এল।
মাঝ সমুদ্রে আটকে পড়েছে তারা।
চারদিকে শুধু কালো জল।
কেউ কিছু বলার আগেই—
ফসসস…
একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল।
সবাই ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাল।
আর তারপর…
তাদের বুক হিম হয়ে গেল।
স্টোর রুমের পাশে রাখা কাঠের বাক্সের ফাঁক থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে দুটো গোল্ডেন ল্যান্সহেড…
(চলবে)


📢 পাঠকদের উদ্দেশ্যে

গল্পটি পড়ে আপনার কেমন লাগল, তা অবশ্যই নিচের কমেন্ট বক্সে জানাবেন। আপনার মতামত, পরামর্শ এবং সমালোচনা আমাদের আরও ভালো গল্প উপহার দিতে অনুপ্রাণিত করে। গল্পটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন, যাতে আরও বাংলা গল্পপ্রেমীরা এটি পড়ার সুযোগ পান। আপনার একটি শেয়ার এবং একটি মন্তব্য আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। ❤️


``` Tanmoy Roy

Tanmoy Roy

Bengali Author • Storyteller • Founder & Lead Author of CHOLO GOLPO SUNI

```

Tanmoy Roy is a Bengali author, storyteller, and founder of CHOLO GOLPO SUNI. He writes original Bengali fiction across mystery, thriller, horror, adventure and emotional drama. His stories focus on suspense, realism, emotion and memorable characters, creating immersive reading experiences for Bengali readers worldwide.

📚 Genres:
Mystery • Thriller • Horror • Adventure • Emotional Drama • Bengali Fiction
Connect With The Author 👇

© Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI | Bengali Mystery, Thriller, Horror & Original Fiction

মন্তব্যসমূহ