সর্প-দ্বীপ (Snake Island) | Part 01 | ব্রাজিলের সমুদ্রের পথে | Thriller adventure story of a bengal boy in a Brazil mysterious island full of venomous snakes | Story by Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI

ব্রাজিলে আসার আজ ঠিক দুই দিন হয়ে গেল রাজেশের। অথচ এখনও পর্যন্ত সে ব্রাজিলের কিছুই ভালোভাবে ঘুরে দেখতে পারেনি। কলকাতার ব্যস্ত জীবন থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে এসেছে সে গরমের ছুটি কাটাতে। তার কাকা অপূর্ববাবু বহু বছর ধরে ব্রাজিলের রেলওয়ে ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। তিনি থাকেন ব্রাজিলের উপকূলবর্তী ছোট্ট শহর ম্যাচিওতে।

শহরটা অদ্ভুত সুন্দর। চারপাশে নারকেল গাছ, রঙিন বাড়ি, দূরে নীল সমুদ্র আর সমুদ্রের হাওয়ায় ভেসে আসা নোনা গন্ধ। সন্ধ্যার সময় রাস্তার পাশে দাঁড়ালে মনে হয় যেন পুরো শহরটা ধীরে ধীরে ঢেউয়ের সঙ্গে দুলছে।

তবুও রাজেশের মনটা খুব একটা ভালো ছিল না। সে ভেবেছিল ব্রাজিলে এসে প্রতিদিন নতুন নতুন জায়গায় ঘুরবে, সমুদ্র দেখবে, অ্যাডভেঞ্চার করবে। কিন্তু দুই দিন ধরে সে শুধু বাড়িতেই বসে আছে।

সেদিন দুপুরে অপূর্ববাবু অফিসে গিয়েছিলেন। বাড়িতে একা বসে রাজেশ মোবাইলে গেম খেলছিল। বাইরে প্রচণ্ড গরম। জানলার বাইরে দূরের সমুদ্রের দিকে তাকালে গরমের মধ্যে ঝাপসা ঝাপসা আলো নাচছিল।

হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।

ফোন করেছিলেন অপূর্ববাবু।

— “কি করছিস?”

— “কিছু না কাকা, বোর হচ্ছি।”

ওপাশ থেকে একটু হেসে অপূর্ববাবু বললেন,

— “তাহলে কাল আর বোর হবি না।”

— “মানে?”

— “আমরা কাল সমুদ্রে বেড়াতে যাচ্ছি।”

রাজেশ সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল।

— “সত্যি?”

— “হ্যাঁ। আমার এক বন্ধু আছে, নাম ড্যানিয়েল। ওর একটা জাহাজ আছে। পুরো একটা দিন জাহাজে কাটাবো।”

এই কথাটা শোনার পর রাজেশের মুখে প্রথমবারের মতো হাসি ফুটল। সে জীবনে কোনোদিন জাহাজে ওঠেনি। ছোটবেলা থেকে সিনেমায় বিশাল বিশাল জাহাজ দেখে তার খুব ইচ্ছা ছিল একদিন সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে জাহাজে ঘুরবে।

ফোন রেখে দেওয়ার পর থেকেই উত্তেজনায় তার আর মন বসছিল না। সে বারবার কল্পনা করতে লাগল বিশাল সমুদ্র, বড় জাহাজ, দূরের দ্বীপ আর অ্যাডভেঞ্চারের কথা।

সারা বিকেল সে ইউটিউবে সমুদ্রযাত্রার ভিডিও দেখতে লাগল। এমনকি রাতে ঘুমানোর আগেও টাইটানিক সিনেমার কিছু দৃশ্য দেখছিল।

পরদিন সকালবেলা অপূর্ববাবুর সঙ্গে ড্যানিয়েলের বাড়িতে পৌঁছাল রাজেশ।

ড্যানিয়েল মাঝবয়সী একজন মানুষ। মুখে ছোট দাড়ি, রোদে পোড়া চেহারা আর চোখে অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। সমুদ্রের মানুষের মধ্যে একটা আলাদা ব্যাপার থাকে। ড্যানিয়েলকে দেখলেই সেটা বোঝা যায়।

অপূর্ববাবুর সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার কারণে ড্যানিয়েল কিছুটা বাংলা বলতে পারত।

তাদের দেখেই সে হাসতে হাসতে বলল,

— “চলো বন্ধু, আজ সমুদ্র তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

তারপর সবাই মিলে বন্দরের দিকে রওনা দিল।

কিন্তু বন্দরে পৌঁছে জাহাজটা দেখার পর রাজেশের সব উত্তেজনা মুহূর্তের মধ্যে অর্ধেক হয়ে গেল।

সে ভেবেছিল বিশাল কোনো ক্রুজ শিপ হবে। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজটা আসলে মাঝারি আকারের একটা মাছ ধরার জাহাজ।

জাহাজটার গায়ে জং ধরেছে। কিছু জায়গায় রং উঠে গেছে। সামনে একটা পুরোনো লাইট ঝুলছে।

মনে মনে রাজেশ বলল,

“এটা তো টাইটানিকের সামনে খেলনা।”

তবুও বাইরে কিছু বলল না। প্রথমবার সমুদ্রে নামছে — এটাই তার কাছে বড় ব্যাপার ছিল।

জাহাজ ছাড়ল ধীরে ধীরে।

প্রথমে রাজেশ খুব উৎসাহ নিয়ে চারপাশ দেখতে লাগল। চারদিকে শুধু নীল জল আর জল। দূরে দূরে ছোট ছোট ঢেউ। মাঝে মাঝে সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়া এসে তার মুখে লাগছিল।

সমুদ্রের মাঝখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের দৃশ্য বদলে যেতে লাগল। তীরের বাড়িগুলো ছোট হয়ে গেল। শহরের শব্দ হারিয়ে গেল। শুধু রয়ে গেল ঢেউয়ের শব্দ আর জাহাজের ইঞ্জিনের আওয়াজ।

ড্যানিয়েলের সঙ্গে থাকা কয়েকজন কর্মচারী জাহাজের বিভিন্ন কাজ করছিল। কেউ দড়ি গুছাচ্ছে, কেউ নেট ঠিক করছে।

রাজেশ মাঝে মাঝেই মোবাইলে ছবি তুলছিল।

প্রায় আড়াই ঘণ্টা কেটে গেল।

এরপর ধীরে ধীরে তার বিরক্ত লাগতে শুরু করল। চারপাশে শুধু জল ছাড়া আর কিছুই নেই।

সে জাহাজের একপাশে বসে মোবাইল দেখতে লাগল।

ঠিক তখনই অপূর্ববাবু তাকে ডাকলেন।

— “এইদিকে আয়!”

রাজেশ উঠে ডেকের পেছনের দিকে গেল।

আর সেখানে গিয়ে যা দেখল, সেটা দেখে তার চোখ চকচক করে উঠল।

জাহাজের পাশ দিয়ে কয়েকটা ডলফিন সাঁতার কাটতে কাটতে এগিয়ে চলেছে।

নীল জলের মধ্যে তাদের লাফিয়ে ওঠা যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো লাগছিল।

রাজেশ তাড়াতাড়ি মোবাইল বের করে ভিডিও করতে শুরু করল।

— “ওয়াও!”

ড্যানিয়েল হেসে বলল,

— “সমুদ্র সবসময় প্রথমে বোরিং লাগে। তারপর ধীরে ধীরে নিজের জাদু দেখায়।”

সন্ধ্যা নামতে শুরু করল ধীরে ধীরে।

সূর্য ডুবে যাওয়ার পর সমুদ্র যেন এক অন্য জগতে পরিণত হলো। চারপাশে ঘন অন্ধকার। শুধু জাহাজের আলো আর দূরে দূরে ঢেউয়ের শব্দ।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ আরও নিস্তব্ধ হয়ে উঠল।

রাজেশ ডেকের উপর দাঁড়িয়ে দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার মনে হলো — পৃথিবীতে মানুষ আসলে খুব ছোট। এই বিশাল সমুদ্রের সামনে মানুষ কত অসহায়।

সেই অন্ধকার সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে ড্যানিয়েল খুব অভিজ্ঞভাবে জাহাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।

রাত গভীর হলে সবাই ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে হঠাৎ চিৎকারে সবার ঘুম ভাঙল।

ড্যানিয়েলের এক কর্মচারী চেঁচামেচি করছে।

ড্যানিয়েল দৌড়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর তার মুখ গম্ভীর হয়ে ফিরে এল।

সমস্যাটা খুব বড়।

রাতে যারা জাহাজ পাহারা দিচ্ছিল, তারা দুজন নেশা করে ভুল দিকে জাহাজ নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, জাহাজের মূল ম্যাপটাও অসাবধানতায় সমুদ্রে পড়ে গেছে।

ড্যানিয়েলের মুখে প্রচণ্ড রাগ ফুটে উঠল।

সে বারবার বলছিল,

— “আমি বলেছিলাম মদ খেয়ো না!”

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

উত্তরের আকাশ ধীরে ধীরে কালো হয়ে আসছিল।

মনে হচ্ছিল যেকোনো মুহূর্তে তুফান নামবে।

ঠিক তখনই দূরে একটা ছোট দ্বীপ দেখতে পেল ড্যানিয়েল।

সে দ্রুত জাহাজটার দিক ঘুরিয়ে দিল।

— “ওই দ্বীপে পৌঁছতে পারলে রাতটা কাটানো যাবে।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতাসের গতি বেড়ে গেল।

আকাশ কালো হয়ে এল।

সমুদ্রের ঢেউ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠতে লাগল।

রাজেশ জীবনে প্রথমবার বুঝতে পারল সমুদ্র আসলে কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

তুফান শুরু হয়ে গেল।

বাতাস এত জোরে বইছিল যে দাঁড়িয়ে থাকাই কঠিন হয়ে উঠেছিল।

হঠাৎ একটা বিশাল ঢেউ এসে জাহাজটাকে ধাক্কা মারল।

পরের মুহূর্তেই—

ধাম!

জাহাজটা গিয়ে সজোরে একটা পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেল।

সবাই ছিটকে পড়ল।

জাহাজের নিচের দিকের কিছু অংশ ভেঙে গেল।

তুফানের মধ্যে সেদিন আর কেউ জাহাজ থেকে বের হওয়ার সাহস পেল না।

সারা রাত তারা আতঙ্কের মধ্যে জাহাজেই কাটাল।

পরদিন সকালে তুফান কিছুটা কমলে ড্যানিয়েল নিচে নেমে জাহাজ পরীক্ষা করল।

তার মুখ দেখে সবাই বুঝে গেল পরিস্থিতি ভালো না।

জাহাজের নিচের অংশ ভেঙে গেছে।

এ অবস্থায় সমুদ্রে নামলে জাহাজে জল ঢুকে ডুবে যেতে পারে।

ড্যানিয়েল ধীরে ধীরে বলল,

— “এটা ঠিক করতে অন্তত দুই দিন লাগবে।”

সবাই চুপ হয়ে গেল।

কারণ তারা একদিনের হিসেব করে বেরিয়েছিল।

এত খাবারও তাদের সঙ্গে নেই।

শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো — দুই দিন এই দ্বীপেই থাকতে হবে।

যা খাবার পাওয়া যাবে, জঙ্গল থেকে জোগাড় করতে হবে।

ড্যানিয়েল জাহাজ মেরামত করতে বসে গেল।

আর বাকিরা দ্বীপের আশেপাশে খাবার আর কাঠ খুঁজতে বেরোল।

সন্ধ্যার দিকে ঠান্ডা বাড়তে শুরু করল।

সমুদ্রের দিক থেকে বরফের মতো ঠান্ডা হাওয়া বইছিল।

রাজেশ আশেপাশ থেকে শুকনো কাঠ কুড়িয়ে এনে আগুন জ্বালাল।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপটা আরও অদ্ভুত লাগতে শুরু করল।

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল—

এখানে প্রায় কোনো পাখির শব্দ নেই।

চারপাশে এত বড় জঙ্গল, অথচ অস্বাভাবিক নীরবতা।

ড্যানিয়েল আগুনের পাশে বসে ছিল।

হঠাৎ তার মনে হলো — জঙ্গলের ভেতর থেকে কেউ যেন তাকিয়ে আছে।

সে দ্রুত পেছন ফিরে তাকাল।

কেউ নেই।

কিছুক্ষণ পর আবার একই অনুভূতি।

যেন অন্ধকারের আড়াল থেকে অসংখ্য চোখ তাদের দেখছে।

ড্যানিয়েল নিজেকে বোঝাল এটা হয়তো ক্লান্তির কারণে হচ্ছে।

কিন্তু সেদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তার বুকের ভেতর অজানা একটা অস্বস্তি জন্ম নিয়েছিল।

আর সে জানত না — পরদিন সকালে এই দ্বীপের এমন এক সত্য তাদের সামনে আসতে চলেছে, যেটা জানার পর হয়তো আর কেউ জীবিত ফিরে যেতে পারবে না…

Click here for PART 02

Click here for PART 03

Click here for PART 04


📢 পাঠকদের উদ্দেশ্যে

গল্পটি পড়ে আপনার কেমন লাগল, তা অবশ্যই নিচের কমেন্ট বক্সে জানাবেন। আপনার মতামত, পরামর্শ এবং সমালোচনা আমাদের আরও ভালো গল্প উপহার দিতে অনুপ্রাণিত করে। গল্পটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন, যাতে আরও বাংলা গল্পপ্রেমীরা এটি পড়ার সুযোগ পান। আপনার একটি শেয়ার এবং একটি মন্তব্য আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। ❤️


``` Tanmoy Roy

Tanmoy Roy

Bengali Author • Storyteller • Founder & Lead Author of CHOLO GOLPO SUNI

```

Tanmoy Roy is a Bengali author, storyteller, and founder of CHOLO GOLPO SUNI. He writes original Bengali fiction across mystery, thriller, horror, adventure and emotional drama. His stories focus on suspense, realism, emotion and memorable characters, creating immersive reading experiences for Bengali readers worldwide.

📚 Genres:
Mystery • Thriller • Horror • Adventure • Emotional Drama • Bengali Fiction
Connect With The Author 👇

© Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI | Bengali Mystery, Thriller, Horror & Original Fiction

মন্তব্যসমূহ