রি রি রি… | এক ঝড়ের রাতের বিভীষিকা | Story by Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI


কাল রাত থেকেই তুফান বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রাতভর আকাশ যেন ছিঁড়ে জল পড়েছে। মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের ঝলকানিতে পুরো পাহাড়পুর গ্রামটা কেঁপে উঠছিল। তবে আজ সকালে বৃষ্টির প্রকোপ কিছুটা কমেছে। জানলার বাইরে তাকিয়ে নমিতা মনে মনে ভাবল, “বোধহয় আজ দিনটা ভালোই যাবে।”

নমিতা দ্রুত তৈরি হতে লাগল। পুরোনো কাঠের আলমারির ভেতর থেকে ধোয়া একটা শাড়ি বের করে পরল। তারপর মাটির রান্নাঘর থেকে মায়ের জন্য ভাত আর ডাল গরম করে রেখে দিল।

নমিতার মা চারুবালা দেবী তখন বিছানায় বসে কাশছিলেন।

— “এত বৃষ্টির মধ্যে আজ না গেলেই হত মা,” বৃদ্ধা কাঁপা গলায় বললেন।

নমিতা মৃদু হেসে বলল,
— “না গেলে চলবে কী করে মা? স্কুলে না গেলে মাসের শেষে টাকা পাবো না।”

চারুবালা দেবী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই সংসারের সমস্ত দায়িত্ব নমিতার কাঁধে এসে পড়েছে। পাহাড়পুর গ্রামের এক প্রাইমারি স্কুলে বাংলা পড়িয়ে আর দুটো টিউশনি করে কোনো মতে সংসার চলে তাদের।

ত্রিপুরার সীমান্ত ঘেঁষা ছোট্ট পাহাড়পুর গ্রামটা দিনের বেলাতেই নির্জন লাগে। আর বর্ষাকালে তো আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। চারদিকে পাহাড়, জঙ্গল আর কাদামাখা রাস্তা।

ছাতা হাতে নিয়ে নমিতা বেরিয়ে পড়ল। তবে আজ বাতাস এত জোরে বইছিল যে ছাতাটা বারবার উলটে যাচ্ছিল।

অনেক কষ্টে স্কুলে পৌঁছল সে।

আজ স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীও খুব কম এসেছে। বৃষ্টির জন্য অনেকেই আসেনি। শিক্ষকদের মধ্যেও দু-তিনজন অনুপস্থিত।

তবুও প্রতিদিনের মতো নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল নমিতা।

সে বাংলা ক্লাসে গল্প পড়াচ্ছিল। কিন্তু আজ তার মনটা কেমন যেন অস্থির লাগছিল। জানলার বাইরে কালো মেঘ জমছিল আবার। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলোয় আকাশ চকচক করে উঠছিল।

একটা ছোট্ট ছেলে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
— “দিদিমণি, আজ আবার খুব ঝড় হবে?”

নমিতা হেসে বলল,
— “না রে, কিছু হবে না।”

কিন্তু কথাটা বললেও তার নিজের মনেই যেন ভয় ঢুকে গিয়েছিল।

স্কুল ছুটি হল বিকেলের দিকে।

আজ আবার দুটো টিউশনি আছে। বাড়িতে বলে এসেছে ফিরতে দেরি হবে। এই বৃষ্টি-বাদলের দিনে টিউশনি করতে যাওয়ার একদম ইচ্ছে ছিল না নমিতার। কিন্তু টিউশনি কামাই করলে চলবে না।

সন্ধ্যার দিকে টিউশনি শেষ করে যখন সে বাড়ির পথে বেরোল, তখন আকাশ আরও কালো হয়ে গেছে।

নমিতার বাড়ি যাওয়ার মূল রাস্তা পুরো জলে ডুবে গেছে। গ্রামের লোকেরা বলছিল ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়া অসম্ভব।

আজ তাকে অন্য রাস্তা দিয়েই ফিরতে হবে।

প্রতিদিন সে ডানদিকের রাস্তা দিয়ে বাড়ি যায়। কিন্তু আজ বাধ্য হয়ে বামদিকের পুরোনো রাস্তা ধরল।

এই রাস্তা দিয়ে গেলে বাড়ি পৌঁছতে অনেক বেশি সময় লাগে। তাছাড়া রাস্তার দুপাশে বিশাল মাঠ আর ঝোপঝাড়। সন্ধ্যার পর সাধারণত কেউ এদিকে আসে না।

নমিতা একটু ইতস্তত করল।

তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।

রাস্তায় হাঁটু সমান কাদা জমেছে। পা তুললেই চপচপ শব্দ হচ্ছে।

চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা।

শুধু দূরে কোথাও ব্যাঙের ডাক।

আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের গর্জন।

আকাশ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে।

নমিতার মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে। সে কয়েকবার পিছনে তাকাল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না।

শুধু নির্জন রাস্তা।

আর ঝড়ের আগের সেই অস্বস্তিকর বাতাস।

প্রায় আধঘণ্টা ধরে হাঁটার পরেও পথ যেন শেষ হচ্ছিল না।

হঠাৎ আবার ঝোড়ো হাওয়া শুরু হল।

নমিতা আকাশের দিকে তাকাল।

কালো মেঘ যেন পুরো আকাশ ঢেকে ফেলেছে।

তারপর মুহূর্তের মধ্যে শুরু হল প্রবল বর্ষণ।

মুষলধারে বৃষ্টি নামল।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নমিতা পুরো ভিজে গেল।

সে দৌড়াতে শুরু করল।

কোথাও আশ্রয় না পেলে আজ বিপদ আছে।

ঠিক তখনই আবছা অন্ধকারের মধ্যে সে দূরে একটা ছোট্ট বাড়ি দেখতে পেল।

মাঠের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো একটা ঘর।

ঘরটার চারপাশে বড় বড় গাছ।

বিদ্যুতের আলোয় বাড়িটা কেমন যেন ভয়ংকর লাগছিল।

তবুও আর কোনো উপায় ছিল না।

নমিতা দৌড়ে গিয়ে বাড়িটার বারান্দায় উঠল।

বৃষ্টির জল থেকে বাঁচলেও তার বুকের ধুকপুকানি থামছিল না।

ঘরটার দেওয়ালে শ্যাওলা জমেছে। জানালাগুলো অর্ধেক ভাঙা। ছাদের অনেক অংশ নষ্ট হয়ে গেছে।

দেখলেই বোঝা যায় বহু পুরোনো বাড়ি।

প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।

বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই।

বরং ঝড় আরও বাড়ছে।

ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে একটা কাঁপা কাঁপা আওয়াজ ভেসে এল।

— “কে... কে ওখানে?”

নমিতা চমকে উঠল।

অন্ধকারের মধ্য থেকে ধীরে ধীরে একজন বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন।

সাদা শাড়ি পরা।

মুখে অসংখ্য ভাঁজ।

চুলগুলো পুরো সাদা।

বৃদ্ধার চোখদুটো কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছিল।

তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন,
— “কে তুমি?”

নমিতা ভদ্রভাবে বলল,
— “আমি নমিতা। বৃষ্টির জন্য এখানে দাঁড়িয়েছি। বৃষ্টি কমলেই চলে যাব।”

বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,
— “ভেতরে এসো মা। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে অসুখ করবে।”

নমিতার ভেতরে যেতে ইচ্ছে করছিল না।

কেন জানি না, বাড়িটার ভেতরটা খুব অস্বস্তিকর লাগছিল।

তবুও বৃদ্ধার জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত সে ভেতরে ঢুকল।

ঘরের ভেতরে ঢুকতেই একটা স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ নাকে এল।

দেওয়ালগুলো ফেটে গেছে।

পুরোনো কাঠের আসবাবপত্রে ধুলো জমে আছে।

এক কোণে কেরোসিনের ক্ষীণ আলো জ্বলছে।

বৃদ্ধা তাকে বসতে বললেন।

তারপর একটা গ্লাসে জল এনে দিলেন।

নমিতার খুব তেষ্টা পেয়েছিল। সে জলটা খেয়ে নিল।

বৃদ্ধা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

সেই দৃষ্টিতে কেমন যেন অস্বাভাবিক কিছু ছিল।

নমিতার বুকটা কেঁপে উঠল।

বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় আরও অনেকক্ষণ কেটে গেল।

রাত ক্রমশ গভীর হতে লাগল।

অবশেষে বৃদ্ধা এসে বললেন,
— “আজ আর বৃষ্টি থামবে না মা। এই রাতে বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না। আজ এখানেই থেকে যাও।”

নমিতা দ্বিধায় পড়ে গেল।

তার মা নিশ্চয়ই চিন্তা করছেন।

কিন্তু এই ঝড়ের মধ্যে বেরোনোও অসম্ভব।

সবচেয়ে বড় কথা, তাদের কাছে কোনো ফোনও নেই যে মাকে খবর দেবে।

অবশেষে নিরুপায় হয়ে সে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

রাতে বৃদ্ধা সামান্য ভাত আর আলুভর্তা খেতে দিলেন।

খাওয়ার সময়ও বৃদ্ধা খুব কম কথা বলছিলেন।

শুধু মাঝে মাঝে অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছিলেন।

যেন নমিতাকে খুব মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন।

খাওয়া শেষ হলে বৃদ্ধা বললেন,
— “পাশের ঘরে শুয়ে পড়ো মা।”

নমিতা ছোট্ট একটা ঘরে শুতে গেল।

ঘরের ভেতর একটা পুরোনো খাট।

ছেঁড়া মশারি।

জানলার ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকছে।

বাইরে তখনও ঝড় চলছে।

অনেক চেষ্টা করে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়ল সে।

কিন্তু রাতের কোনো এক সময় হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল।

সে বুঝতে পারছিল না কটা বাজে।

চারদিক অদ্ভুত নিস্তব্ধ।

বৃষ্টিও অনেকটা কমেছে।

ঠিক তখনই সে শব্দটা শুনতে পেল।

“রি... রি... রি... রি...”

একটা ভয়ংকর কর্কশ শব্দ।

যেন কেউ গলা চিরে আওয়াজ করছে।

নমিতার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

শব্দটা কোথা থেকে আসছে বোঝা যাচ্ছে না।

সে ধীরে ধীরে খাট থেকে নামল।

তারপর কাঁপতে কাঁপতে দরজার বাইরে বেরোল।

অন্ধকার করিডোরে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারল শব্দটা বৃদ্ধার ঘর থেকেই আসছে।

“রি... রি... রি...”

শব্দটা ক্রমশ জোরে শোনা যাচ্ছে।

নমিতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।

দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ।

সে আলতো করে ডাকল,
— “বুড়িমা...?”

কোনো উত্তর নেই।

সে আবার ডাকল।

তবুও কোনো সাড়া নেই।

ঠিক তখনই দরজাটা নিজে থেকেই কড়কড় শব্দ করে খুলে গেল।

নমিতার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

সে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে উঁকি দিল।

আর তারপর...

যা দেখল, তা দেখে তার শরীর অবশ হয়ে গেল।

ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই বৃদ্ধা।

কিন্তু এখন তাকে মানুষ বলে মনে হচ্ছে না।

তার সাদা চুলগুলো এলোমেলোভাবে বাতাসে উড়ছে।

জানলাটা পুরো খোলা।

ঝড়ের হাওয়ায় ঘরের ভেতর সবকিছু কাঁপছে।

বৃদ্ধার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে।

মুখ থেকে লালা ঝরছে।

আর সেই ভয়ংকর “রি রি রি” শব্দটা তার গলা থেকেই বেরোচ্ছে।

নমিতার পা কাঁপতে শুরু করল।

সে পিছিয়ে যেতে চাইলো।

কিন্তু হঠাৎ দরজাটা বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।

নমিতা দৌড়ে দরজার কাছে গেল।

অনেক চেষ্টা করল খুলতে।

কিন্তু দরজা খুলল না।

ঘরের ভেতর হঠাৎ তীব্র ঠান্ডা ছড়িয়ে পড়ল।

নমিতা কাঁদতে শুরু করল।

— “আমায় যেতে দাও... আমি বাড়ি যাব... মা চিন্তা করছে...”

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে তার দিকে এগোতে লাগল।

তার হাতের নখগুলো অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে গেছে।

মুখে এক বিভৎস হাসি।

নমিতা আতঙ্কে দেখল বৃদ্ধার পা দুটো উল্টো দিকে বাঁকানো।

তার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল।

বৃদ্ধা ভয়ংকর গলায় বলল,
— “অনেকদিন পর মানুষ পেলাম... খুব খিদে পেয়েছে...”

তারপর বিকট হাসিতে পুরো ঘর কেঁপে উঠল।

নমিতা চিৎকার করে উঠল।

সে জানলা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করল।

কিন্তু ঝড়ের বাতাস এত জোরে বইছিল যে কাছে যেতেই পারছিল না।

বৃদ্ধা এবার ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর।

নমিতা মেঝেতে পড়ে গেল।

বৃদ্ধা তার দুই হাত হাঁটুর নিচে চেপে ধরল।

তারপর নমিতার মাথাটা সজোরে মেঝেতে আছাড় মারল।

নমিতার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

সে আর নড়তে পারছিল না।

শুধু অনুভব করছিল অসহ্য যন্ত্রণা।

বৃদ্ধা তার শরীর ছিঁড়ে খেতে শুরু করেছে।

ঘরের মধ্যে শুধু নমিতার আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

কতক্ষণ এভাবে চলল সে জানে না।

ধীরে ধীরে তার শরীর অবশ হয়ে গেল।

সে চোখ খুলতে পারছিল না।

হাত-পা নাড়াতে পারছিল না।

শুধু খুব ধীরে তার হৃদস্পন্দন চলছিল।

সেই অবস্থায়ও তার শুধু মায়ের কথা মনে পড়ছিল।

“মা এখন নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে...”

বন্ধ চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।

ঠিক তখনই দূর থেকে একটা পরিচিত আওয়াজ ভেসে এল।

— “এরে নমিতা! ওঠ! কাঁপছিস কেন?”

নমিতা হঠাৎ ধড়ফড় করে উঠে বসল।

চারদিকে তাকিয়ে দেখল সে নিজের ঘরেই শুয়ে আছে।

তার মা তাকে জাগানোর চেষ্টা করছেন।

চারুবালা দেবী উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
— “খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস নাকি?”

নমিতা হাঁপাচ্ছিল।

তার পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে।

সে কিছু না বলে মাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল।

বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে।


................

পাঠকদের উদ্দেশ্যে


আমার গল্পটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

যদি গল্পটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান এবং গল্পটি আপনার বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন।

আপনার প্রতিটি মন্তব্য, পরামর্শ ও উৎসাহ আমাকে আরও ভালো গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।

আবারও ধন্যবাদ।


— তন্ময় রায়



✍️ About The Writer

Tanmoy Roy is a Bengali story writer passionate about emotional storytelling, horror, adventure and relationship-based stories.

Follow Him 👇

মন্তব্যসমূহ