ধার বাকি | Bengali Horror Story | Psychological Thriller Ghost Revenge Story by Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI
বিশ্বজিতের শেষকৃত্য সেরে সবে স্নান করে বেরিয়েছে সোমা। ভেজা চুল থেকে এখনও টুপটুপ করে জল পড়ছে। ঘরের ভেতর ধূপ, ফুল আর শোকের ভারী গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছে। বাইরে রাত অনেক হয়েছে। অথচ সোমার চোখে একফোঁটা জলও নেই।
কারণ বিশ্বজিতের মৃত্যুতে তার কোনো দুঃখ নেই।
বিশ্বজিত ছিল সোমার স্বামী। আট বছরের সংসার তাদের। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো সুখী দম্পতি। কিন্তু সেই হাসি-খুশির আড়ালে লুকিয়ে ছিল বিশ্বাসঘাতকতা, লোভ আর এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র।
কারণ বিশ্বজিতের মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।
সোমাই তাকে হত্যা করেছিল।
প্রায় এক বছর তিন মাস আগে কালীপূজোর রাতে মৈনাকের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় সোমার। তারপর ধীরে ধীরে চ্যাট, ফোনকল, লুকিয়ে দেখা করা—সব মিলিয়ে সম্পর্কটা এমন জায়গায় পৌঁছয়, যেখান থেকে ফেরার পথ আর ছিল না।
মৈনাক চাইত সোমা বিশ্বজিতকে ডিভোর্স দিক। কিন্তু সোমা সমাজে নিজের সম্মান নষ্ট করতে রাজি ছিল না। তার উপর ছিল বিশ্বজিতের সম্পত্তির লোভ।
তখনই তারা ঠিক করে—বিশ্বজিতকে সরিয়ে ফেলতে হবে।
এক দুপুরে অফিস থেকে হঠাৎ বাড়ি ফিরে তাদের একসাথে দেখে ফেলে বিশ্বজিত। রাগে, অপমানে ডিভোর্সের কথা বলতেই মৈনাক ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর। তারপর দুজনে মিলে বিশ্বজিতকে দড়ি দিয়ে বেঁধে বাথরুমে আটকে রেখে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়।
আলোও নিভিয়ে দেয়।
বিশ্বজিতের ক্লস্ট্রোফোবিয়া ছিল। বন্ধ অন্ধকার জায়গায় আটকে পড়লে সে ভয়ংকরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ত। সোমা সেই দুর্বলতাটাকেই ব্যবহার করেছিল।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা আতঙ্কে ছটফট করতে করতে অবশেষে হার্টফেল হয় বিশ্বজিতের।
তারপর শুরু হয় অভিনয়।
কান্না, চিৎকার, প্রতিবেশীদের ভিড়, পুলিশ—সবাই বিশ্বাস করে এটা একটা দুর্ঘটনা।
এমনকি পোস্টমর্টেম রিপোর্টেও আসে—হার্টফেল।
কয়েকদিন পর বিশ্বজিতের সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে করে নেয় সোমা। বাড়িটাও বিক্রি হয়ে যায়। পরদিনই মৈনাককে নিয়ে আমেরিকা চলে যাওয়ার পরিকল্পনা।
সেদিন রাতেই সব গুছিয়ে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছিল সোমা।
রাত প্রায় দেড়টা।
হঠাৎ কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভাঙে তার।
দরজার ফুটো দিয়ে তাকিয়ে দেখে বাইরে মৈনাক দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে মৈনাক কোনো কথা না বলে তার হাত ধরে টানতে টানতে দৌড়াতে শুরু করে।
চারদিকে অন্ধকার।
সোমা কিছুই বুঝতে পারছে না।
হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় সে।
তারপর…
দেখে সে দাঁড়িয়ে আছে শ্মশানের সামনে।
যে শ্মশানে বিশ্বজিতের শেষকৃত্য হয়েছিল।
ভয়ে দৌড়াতে শুরু করে সোমা। কিন্তু রাস্তা যেন শেষই হচ্ছে না। চারপাশের বাড়িগুলোর কোনো দরজা নেই। শুধু জানলা।
হঠাৎ সব জানলায় একসাথে আলো জ্বলে ওঠে।
আর প্রতিটা জানলায় দেখা যায় এক একটা মুখ।
স্থির।
নিঃশব্দ।
শুধু তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ভয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে পড়ে যেতেই ধড়মড় করে ঘুম ভেঙে যায় সোমার।
স্বপ্ন।
সবটাই স্বপ্ন ছিল।
নিজেকে শান্ত করতে জল খেয়ে আবার শুয়ে পড়ে সে।
বাইরে পূর্ণিমার আলো। খোলা জানালা দিয়ে সেই আলো ঘরের ভেতর পড়েছে।
ঘুমোনোর জন্য ডানদিকে কাত হতেই হিম হয়ে যায় সোমার শরীর।
তার পাশেই বিশ্বজিত শুয়ে আছে।
গোল গোল চোখ।
ফ্যাকাসে মুখ।
আর ঠোঁটে একটা ভয়ংকর হাসি।
ঠিক যেমনটা বাথরুমে পড়ে থাকার সময় ছিল।
হঠাৎ বুকের বাঁদিকে তীব্র ব্যথা শুরু হয় সোমার। সে চিৎকার করতে চায়, কিন্তু পারে না। হাত-পা নাড়াতে চায়, কিন্তু শরীর যেন অবশ হয়ে গেছে।
বিশ্বজিত স্থির চোখে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল—
“তুমি আমাকে যেই ভয়টা দিয়েছিলে… সেই ভয়টাই তোমায় ফেরত দিলাম। আমি কারও ধার বাকি রাখি না…”
কিছুক্ষণ পর নিঃশব্দে সোমার শরীর থেকে প্রাণটা বেরিয়ে গেল।
পরদিন পুলিশ এসে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে।
পোস্টমর্টেম রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ লেখা ছিল—
হার্টফেল।
একদম বিশ্বজিতের মতো।
................
পাঠকদের উদ্দেশ্যে
আমার গল্পটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
যদি গল্পটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান এবং গল্পটি আপনার বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন।
আপনার প্রতিটি মন্তব্য, পরামর্শ ও উৎসাহ আমাকে আরও ভালো গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।
আবারও ধন্যবাদ।
— তন্ময় রায়

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন