আমার কালি | আমাদের ঘরের সবচেয়ে আদুরে সদস্যের গল্প | Story by Tanmoy Roy | cholo golpo suni

 


বাড়িতে পোষা প্রাণী থাকলে তারা ধীরে ধীরে পরিবারের একজন হয়ে যায় — এই কথাটা আগে শুধু শুনেছিলাম। কিন্তু “কালি” নামের ছোট্ট কালো বিড়ালটা আমার জীবনকে এমনভাবে ছুঁয়ে যাবে, সেটা আমি কোনোদিন ভাবিনি।


আজও যখন বাড়ির উঠোনে সন্ধ্যার হাওয়া লাগে, কিংবা দূর থেকে কোনো স্কুটির শব্দ কানে আসে, তখন অজান্তেই মনে হয় — “কালি কি দৌড়ে আসছে?”

তারপরই মনে পড়ে, সে আর নেই…


প্রায় দু’বছর আগে আমাদের পাশের বাড়িতে একটা কালো বিড়ালের জন্ম হয়েছিল। পুরো শরীর একদম কুচকুচে কালো। ছোটবেলা থেকেই ও পাশের বাড়িতেই থাকত, খেত, বড় হতো। আমাদের বাড়িতে তখন শুধু আসা-যাওয়া করত।


ঠিক তখন আমি কাজের জন্য আগরতলায় ভাড়া থাকতাম। সপ্তাহের পাঁচ-ছয় দিন শহরে কাটত, শুধু weekend-এ বাড়ি ফিরতাম। তাই ওই বিড়ালটার দিকে খুব একটা মনোযোগ দিতাম না। ওও আমায় তেমন চিনত না।


কিন্তু ধীরে ধীরে লক্ষ্য করলাম, বিড়ালটা আমার বাবা-মায়ের সাথে অদ্ভুত একটা bonding তৈরি করে ফেলেছে। মা রান্নাঘরে গেলেই ও পেছনে পেছনে যেত, বাবা উঠোনে বসলেই ও পাশে গিয়ে বসে থাকত।


আর সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার ছিল — আমি বাড়িতে না থাকলে ও নাকি আমার বিছানাতেই ঘুমাত!


শুনে একটু বিরক্তই হতাম। বিছানায় বিড়াল ওঠা আমার একদম পছন্দ ছিল না। তাই ওকে খুব একটা পাত্তা দিতাম না।


কিন্তু মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না, কোন মুহূর্তে একটা প্রাণী তার হৃদয়ের খুব কাছে চলে আসে।


একদিন দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়া করে আমি বিছানায় শুয়ে ছিলাম। ঘরটা শান্ত ছিল। হঠাৎ অনুভব করলাম, কেউ যেন ধীরে ধীরে বিছানায় উঠছে।


চোখ খুলে দেখি সেই কালো বিড়ালটা।


ও এসে আমার পায়ের কাছে বসতেই আমি একটু চমকে উঠলাম। অভ্যাস না থাকায় বিরক্ত হয়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে ওকে নিচে নামিয়ে দিলাম।


ও নিচে নেমে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।


তারপর মাথা তুলে আমার দিকে এমন একটা করুণ চোখে তাকাল, আর খুব নরম স্বরে একটা “meaw” করল — যেন অভিমান মেশানো আদর।


সেই মুহূর্তটা আজও ভুলতে পারিনি।


ওর চোখদুটোতে এমন একটা মায়া ছিল যে, আমার ভেতরটা হঠাৎ নরম হয়ে গেল। মনে হলো, ছোট্ট প্রাণীটা শুধু একটু ভালোবাসা চাইছিল।


সেদিনের পর থেকেই সবকিছু বদলে গেল।


তারপর থেকে কালি প্রায় সবসময় আমার আশেপাশেই থাকত।


আমি খেতে বসলে ও পাশে এসে বসত।

আমি বিছানায় শুলে ও একটু দূরে গোল হয়ে শুয়ে থাকত।

কখনো কখনো ধীরে ধীরে এসে গা ঘেঁষে বসে থাকত।


মা আমার পুরোনো একটা shirt বিছানার একপাশে বিছিয়ে দিয়েছিল। কালি সেই shirt-এর উপর ঘুমোতে ভীষণ ভালোবাসত। হয়তো সেখানে আমার গায়ের গন্ধ পেত।


আমি যখন আগরতলা থেকে বাড়ি ফিরতাম, ওর excitement দেখার মতো ছিল।


দূর থেকে আমার scooty-র শব্দ শুনলেই ও দৌড়ে বেরিয়ে আসত। লেজ উঁচু করে লাফালাফি করত। যেন অনেকদিন পর নিজের প্রিয় মানুষটাকে পেয়েছে।


একটা অবলা প্রাণীও যে এভাবে কাউকে অপেক্ষা করতে পারে, সেটা কালিকে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না।


আমার girlfriend-ই ওর নাম রেখেছিল — “কালি”।


কারণ পুরো শরীরটাই ছিল একদম কালো।

কিন্তু সেই কালো রঙের মাঝেও ওর সবুজাভ চোখ দুটো অসম্ভব সুন্দর ছিল।


রাতে আলো কম থাকলে শুধু চোখদুটো জ্বলজ্বল করত।


নামটা শুনে প্রথমে একটু হাসি পেয়েছিল। কিন্তু পরে মনে হলো, নামটা ওর জন্য একদম perfect।


তারপর থেকে সবাই ওকে “কালি” বলেই ডাকত।


কালির অনেক আদুরে অভ্যাস ছিল।


বিকেল হলেই ও রান্নাঘরে চলে যেত। তারপর powder milk-এর jar-এর দিকে তাকিয়ে “meaw meaw” করতে থাকত। যেন বলছে —

“দুধটা গুলে দাও তো!”


আর খাওয়ার ব্যাপারে ওর ছিল ভীষণ জেদ।


এমনিই ভাত দিলে খেত না। সুন্দর করে ডাল, মাছের ঝোল বা দুধ মিশিয়ে না দিলে মুখই দিত না।


রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ হলেই শুরু হতো ওর দৌড়ঝাঁপ। পুরো ঘর জুড়ে লেজ উঁচু করে ছোটাছুটি করত।


মনে হতো, একটা ছোট্ট বাচ্চা খেলছে।


কখনো বিছানার নিচে ঢুকত, কখনো হঠাৎ লাফিয়ে বেরিয়ে আসত।

ওর এই ছোট ছোট দুষ্টুমিগুলো দেখলেই মন ভালো হয়ে যেত।


সবচেয়ে সুন্দর লাগত ওর ঘুমানোর ভঙ্গি।


একদম ছোট্ট বাচ্চাদের মতো কুঁকড়ে ঘুমাত। মাঝে মাঝে হাত-পা ছড়িয়ে এমন নিশ্চিন্তে ঘুমাত, যেন পৃথিবীতে কোনো ভয় নেই।


ধীরে ধীরে এমন একটা সময় এলো, যখন আমি বাড়ি গেলে কালি প্রায় আমার সাথেই থাকত।


আমি বিছানায় বসলে ও এসে গা ঘেঁষে বসত। তারপর একটু পর নিজে থেকেই কোলের উপর উঠে বসে থাকত।


কখনো মাথা ঘষত হাতে, কখনো চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বসে থাকত।


কথা বলতে পারত না, কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারত খুব ভালোভাবেই।


অনেক সময় রাতে ও আমার পাশেই ঘুমিয়ে পড়ত।

আমি মাঝরাতে উঠে দেখতাম, ও নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।


তখন বুঝতাম, একটা প্রাণী যখন কাউকে বিশ্বাস করে, তখন সে পুরো মন দিয়েই বিশ্বাস করে।


কিন্তু সুখের সময়গুলো খুব বেশি দিন থাকল না।


পাশের বাড়িতে একটা মোটা brown colour-এর বিড়াল ছিল। ও প্রায়ই কালিকে দেখলেই আক্রমণ করত।


কামড়াত, তাড়া করত, মারধর করত।


ধীরে ধীরে কালি দুর্বল হয়ে যেতে শুরু করল।


আগের মতো খেলাধুলা করত না। খাওয়াও কমিয়ে দিয়েছিল।


আমরা বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু ঠিক কতটা গুরুতর, সেটা বুঝিনি।


শেষের দিকে ও প্রায় খাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিল। জলও ঠিকমতো খেতে চাইত না।


চোখেমুখে কেমন একটা ক্লান্তি চলে এসেছিল।


সেদিন আমি আগরতলায় কাজে ছিলাম।


বিকেলের দিকে বাবা ফোন করল।


ফোনটা ধরতেই বাবার গলায় অদ্ভুত একটা ভারী ভাব টের পেলাম।


তারপর বাবা বলল —

“আমাদের কালি আর নেই…”


মুহূর্তের জন্য যেন সবকিছু থেমে গিয়েছিল।


বাবা বলল, দুপুরের দিকে কালি হঠাৎ বমি করতে শুরু করেছিল। মা জল এনে দিলে ও অনেকটা জল খেয়েছিল।


তারপর আবার বমি…


আর সেই বমির সাথে বেরিয়ে এসেছিল একটা লম্বা tapeworm।


তারপর একটু ছটফট করে শান্ত হয়ে গেল কালি।


ফোনের ওপাশে বাবার কথা শুনছিলাম, কিন্তু কিছুই যেন মাথায় ঢুকছিল না।


শুধু মনে হচ্ছিল —

আমি কেন তখন বাড়িতে ছিলাম না?


শেষবার কেন ওকে আদর করতে পারলাম না?


কালি চলে গেছে অনেকদিন হয়ে গেছে।

তবুও আজও ওর কথা খুব মনে পড়ে।


বাড়ি গেলে এখনও মাঝে মাঝে মনে হয়, স্কুটির শব্দ শুনে ও দৌড়ে বেরিয়ে আসবে।


রাতে বিছানায় শুয়ে থাকলে মনে পড়ে, ও এসে গা ঘেঁষে বসত।


রান্নাঘরের দিকে তাকালে মনে পড়ে, powder milk-এর jar-এর দিকে তাকিয়ে ওর meaw করা।


ছোট্ট একটা প্রাণী, অথচ কত বড় একটা শূন্যতা রেখে গেছে।


অনেকে বলে — “এ তো শুধু একটা বিড়াল ছিল।”


কিন্তু যারা কোনো প্রাণীকে সত্যি মন থেকে ভালোবেসেছে, তারা জানে —

ওরা “শুধু প্রাণী” না।


ওরা পরিবারের অংশ হয়ে যায়।

ওরা নিঃশব্দে ভালোবাসতে শেখায়।

আর চলে যাওয়ার পর নিঃশব্দেই অনেকটা শূন্যতা রেখে যায়।


কালি হয়তো আজ আর নেই।

কিন্তু ওর ছোট ছোট পায়ের শব্দ, ওর আদুরে meaw, আর ওর সেই সবুজ চোখ দুটো আজও আমাদের বাড়ির স্মৃতির মধ্যে বেঁচে আছে।


কখনো কখনো মনে হয়, ভালোবাসার জন্য ভাষা লাগে না।


একটা ছোট্ট কালো বিড়ালও মানুষকে এমনভাবে ভালোবাসতে পারে, যা অনেক মানুষও পারে না।


আর তাই আজও মনে মনে বলি—


“কালি, তুই যেখানে আছিস ভালো থাকিস।

আমাদের বাড়ির একটা অংশ হয়ে তুই সবসময় থেকে যাবি।”



................

পাঠকদের উদ্দেশ্যে


আমার গল্পটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

যদি গল্পটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান এবং গল্পটি আপনার বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন।

আপনার প্রতিটি মন্তব্য, পরামর্শ ও উৎসাহ আমাকে আরও ভালো গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।

আবারও ধন্যবাদ।


— তন্ময় রায়



✍️ About The Writer

Tanmoy Roy is a Bengali story writer passionate about emotional storytelling, horror, adventure and relationship-based stories.

Follow Him 👇

মন্তব্যসমূহ